নিউজবাংলাদেশ

যত চুক্তি তত লাভ

  • বাংলাদেশের লোকসান
  • হাসিনা-মোদি’র‘পোয়া বারো’

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।

লণ্ডন, ০৪ ফেব্রুয়ারি: ২০১৫ সালের আগে-পরে বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের চুক্তি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এরপর যতটা না চাহিদা বেড়েছে, তারচেয়ে বেশি বেড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আরেকটি ব্যয়বহুল চুক্তির কোনো প্রয়োজনই ছিল না। অথচ ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম বাংলাদেশ সফরের ২ মাসের মাথায় ১১ আগস্ট আদানি পাওয়ারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে পিডিবি। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ভেতরেই একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র করার প্রস্তাব ছিল আদানির। কিন্তু সমঝোতার ২ বছর পর ২০১৭ সালে—যখন দেশে ইতোমধ্যেই কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছিল—শেখ হাসিনা সরকার ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গোড্ডা জেলায় এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি কেন করেছিল, এর কোনো যৌক্তিকতাই খুঁজে পাওয়া যায় না।

দেশের অন্যতম প্রধান ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের অনুরোধে আদানির সঙ্গে করা চুক্তিটি পর্যালোচনা করে দেশ-বিদেশের ৩ জন আইন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, চুক্তিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং শুধুমাত্র আদানি গ্রুপের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করেই তা করা হয়েছে। সিডনিভিত্তিক ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্স, অস্ট্রেলেশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ টিম বাকলি বলেছিলেন, ‘এক কথায় এই চুক্তিটিতে কেবল আদানিই জিতেছে। এই চুক্তিটি এতটাই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে আমি ভাবছি, কোনো সচেতন মানুষ কেন বাংলাদেশের পক্ষে এই চুক্তিটি সই করবেন।’ ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পিডিবির চেয়ারম্যান ছিলেন খালেদ মাহমুদ। তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বর্তমানে বারাকা পাওয়ারের স্বাধীন পরিচালক খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। বুঝতেই পারছেন, এখন সময়টা ঝুঁকিপূর্ণ।’ বাংলাদেশের কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান এম শামসুল আলম বলেছিলেন, ‘এই ধরনের একটি চুক্তিতে সই করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা বিশ্বাস করি, এই চুক্তিতে থাকা দুর্নীতিগুলো চিহ্নিত করার ক্ষমতা আমাদের এজেন্সিগুলোর আছে। চুক্তি বাতিল করলেও কোনো সমাধান হবে না। যারা এই ধরনের চুক্তি করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’

অর্থাৎ শেখ হাসিনার অনৈতিক সরকার বিদ্যুৎ চুক্তি করেছে ভারতের আদানি কোম্পানির সঙ্গে। সেই বিদ্যুৎ চুক্তি সবাই বলছেন, দেশি-বিদেশি সবাই যে, এটা অপ্রয়োজনীয় চুক্তি, অসম চুক্তি। যে কারণে বাংলাদেশকে শুধু পয়সাই দিতে হবে, বাংলাদেশ বেশি লাভ পাবে না। এই ধরনের চুক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে তারা সম্পদ লুট করছে, বিদেশে সম্পদ গড়ছে। তারা ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিগত ১৪ বা ১৫ বছর থেকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই রাষ্ট্রের সব সম্পদ ভোগ করার জন্য একের পর এক বিভিন্ন রকম অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে টাকা ব্যয় করে অর্থ লুট করছে, পাচার করছে এবং বিদেশে সম্পদ গড়ে তু্লেছে।

গত ৩০ জানুয়ারি মঙ্গলবার দ্য ডেইলি স্টার ‘বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিক্রির টাকায় আদানি পাওয়ারের পোয়া বারো’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কেনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির প্রচুর মুনাফা হয়েছে।

ভারতের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরে আদানি পাওয়ারের আয় ৪০ শতাংশ বেড়ে ৩৭ হাজার ১৭৩ কোটি রুপি (৪৮ হাজার ৯১১ কোটি টাকা) হয়। ঝাড়খণ্ড ইউনিট থেকে আয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। এটি মোট আয়ের ১৪ দশমিক তিন শতাংশ। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিশ্লেষকদের সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আমদানির জন্য আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে চুক্তি করে। বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, এর ফলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটিই বেশি লাভবান হবে।

ভারতের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরে আদানি পাওয়ারের আয় ৪০ শতাংশ বেড়ে ৩৭ হাজার ১৭৩ কোটি রুপি (৪৮ হাজার ৯১১ কোটি টাকা) হয়। ঝাড়খণ্ড ইউনিট থেকে আয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। এটি মোট আয়ের ১৪ দশমিক তিন শতাংশ। এভাবে নয় মাসে আদানি পাওয়ারের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩০ শতাংশ বেড়ে ১৮ হাজার ৯২ কোটি রুপিতে (২৩ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা) দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, আদানির সঙ্গে যখন চুক্তি হয় তখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ১২ হাজার ৯২২ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল নয় হাজার ৫০৭ মেগাওয়াট। গত এপ্রিলে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা জেলায় আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। গত সপ্তাহে আদানি পাওয়ারের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা শৈলেশ সাওয়া বলেন যে তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বিক্রি বেড়েছে। গত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে আদানি পাওয়ারের আয় এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭২ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা হয়েছে। এই সময়ে মুনাফা নয় কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য—বেশি আয় ও সেই তুলনায় খরচ কম হওয়ায় এত মুনাফা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, গোড্ডা প্ল্যান্ট চালু হওয়ার পর পরিচালন ক্ষমতা ও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং আমদানি করা জ্বালানি পণ্যের দাম কম হওয়ায় তাদের আয় বেড়েছে। গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে তৃতীয় প্রান্তিকে আদানি পাওয়ারের আয়ের খাতায় যোগ হয়েছে এক হাজার ৮২৪ কোটি রুপি। প্রতিষ্ঠানটি ইবিআইটিডিএ (সুদ, কর, অবচয় ও পরিশোধনের আগে আয়) সেই প্রান্তিকে এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪২ শতাংশ বেড়ে পাঁচ হাজার ৫৯ কোটি রুপি হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের কাজ কতটা ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা ইবিআইটিডিএর মাধ্যমে জানা যায়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আদানি পাওয়ারের আয় ৬১ শতাংশ বেড়ে ১২ হাজার ১৫৫ কোটি রুপি হয়। গোড্ডা প্ল্যান্ট থেকে আসে দুই হাজার ৩৪ কোটি রুপি। প্রথম প্রান্তিকে গোড্ডা প্ল্যান্ট থেকে আয় হয় এক হাজার ৪৬৮ কোটি রুপি।

শৈলেশ সাওয়া আরও জানান—গোড্ডা প্ল্যান্ট ছাড়াও মুন্দ্রা, উদুপি, রায়পুর ও মহন প্ল্যান্ট থেকেও ভালো আয় হয়েছে। তিনি বলেন, আমদানি করা কয়লার দাম কমে হওয়ায় তা মুন্দ্রা ও উদুপি প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করেছে। ভারতের প্রধান কয়লা উৎপাদন কেন্দ্রের কাছাকাছি হওয়ায় আদানি পাওয়ার এর সুবিধা পাচ্ছে। ‘এর পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সর্বাধিক লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে,’ বলে মনে করেন তিনি। গোড্ডা থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আসছে ভারতের ভেতরে প্রায় ১০৬ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে।

গত বছরের ৪ এপ্রিল বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরুর পর ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটি ১৫৯ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রার হিসাবে প্রতি ইউনিটে খরচ হয়েছে ১৪ টাকা দুই পয়সা।

Sheikhsbay

Related Articles

Back to top button
Close
Close