মুক্তচিন্তা

রোজিনা ইস‍্যু ইন, মুনিয়া আউট!

মন্তব‍্যকথা:
।। শামসুল আলম লিটন ।।

লেখক: সম্পাদক সাপ্তাহিক সুরমা

হুজুগে বাঙালির সর্বশেষ ইস্যু রোজিনা ইসলাম। দুর্নীতির রিপোর্ট করার কারণে তাঁকে হত্যা প্রচেষ্টা, আটক ও পরে ফাইল চুরির দায়ে জেলহাজতে প্রেরণ। নজিরবিহীন এই নৃশংস ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই দেশে-বিদেশে সকলকে আলোড়িত ও বিক্ষুব্ধ করেছে। এই সুযোগে মুনিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা যথারীতি চলে যাবে কালের গহবরে। গোল্ডফিশ মেমোরি একই সময়ে একটির বেশী বিষয় হ্যান্ডেল করতে পারেনা। বলা যেতে পারে এই পর্যায়ে রোজিনা ইসলাম ইন, মুনিয়া আউট!

মুনিয়া হত‍্যা: মিডিয়ার আত্মসমর্পন

কোনো না কোন ইস্যু নিয়ে মেতে থাকা চাই বাঙালির। আর সে কারণেই প্রকৃতি কিছুদিন পরপর একেকটি মচমচে ইস্যু তাদের হাতে তুলে দেয়। সর্বশেষ ২৬ এপ্রিল থেকে ১৭ মে টানা তিন সপ্তাহ মুনিয়ার নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত বসুন্ধরা গ্রূপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর জড়িত থাকার বিষয়টি নিয়ে সর্বত্র একটা গরম গরম ভাব ছিল। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা ইস্যুকে কত দূর নিয়ে যেতে পারে সেটা মুনিয়া হত্যাকাণ্ডের পরবর্তীতে লক্ষ্য করা গেছে। মূল ধারার গণমাধ্যম বলতে গেলে বাধ্য হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচন্ড চাপে এ বিষয়ে খুব যৎসামান্য সংবাদ প্রকাশ করেছে। এবারের ইস্যু সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের উপর হামলা। প্রায় ছয় ঘন্টা সচিবালযয়ে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ এবং পরে ফাইল চুরির মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ। বাঙালি সমাজের ব্রাহ্মণ কুল সাংবাদিকগণ চড়ে বসেছে। সরকারপন্থী, সরকারবিরোধী ও কথিত নিরপেক্ষ কেউই বাকি নেই। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ অব্যাহত আছে সর্বত্র। ঘটনার নির্মমতা বিবেচনায় এরকম বিক্ষোভ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এ কথা বলে রাখা দরকার আগামীকাল আরেকটি ইস্যুর জন্ম হলে রোজিনা ইসলামকে সবাই ভুলে যাবেন। এমনকি তিনি যদি ততদিনে কারাগার থেকে মুক্তি না পেয়ে থাকেন তাহলেও! (যদিও তেমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, কারণ ডেইলি ষ্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম লিখেছেন, …”তাহলে কেনো রোজিনা ইসলামকে তিনদিন জেলে থাকতে হবে?”), সমঝোতা হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট। কারণ রোজিনা ইসলামের নিজ পত্রিকা তাকে গলা টিপে ধরাকে হত্যাপ্রচেষ্টা বলে সরকারকে বিব্রত করতে চায়নি। এই কৌশল সমঝোতার শর্তও হতে পারে!

মুনিয়া হত‍্যাকারীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত এই মামলার যে পরিণতিই হোক না কেনো,এই ঘটনা সচিবালয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও পেটোয়া বাহিনীর হাতে সাংবাদিক নির্যাতনের একটি ন্যাক্কারজনক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। রোজিনার উপর হামলা হয়েছে। ঘটনার দুই দিনের মধ্যে তাঁর উপর হামলা, আটক, হত্যাপ্রচেষ্টার ব্যাপারে একটা সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত হয়নি। অথচ হামলাকারীরা তাকে চুরির অপরাধে অপবাদ দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। এরচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হতে পারে না কিন্তু মর্মান্তিক অথবা সন্ত্রাসী ঘটনা হিসেবে নয় বরং বাঙালি সমাজ এটিকে একটি হায়হায় ধরণের মুখরোচক আলোচনার বিষয় হিসেবেই বেছে নেবে। তার যেনো কিছু করণীয় নেই যার ব্যাপার, তার ব্যাপার। ধিক এই দুর্বল অনুভূতি! রোজিনা ইসলাম ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও করোনা নিয়ে শ’ কোটি টাকার জনগণের সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি আর করোনা মোকাবেলায় সকল উদ্যোগ দুর্নীতির কাছে হেরে যাবার ঘটনা তুলে ধরছিলেন। তার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে নয়. অথচ জনগণ আলোচনা করবে, একবারও সাংবাদিকদের সাথে গিয়ে সংহতি প্রকাশ করবেনা। এই সামাজিক মাধমের প্রতিবাদ দিয়ে কি হবে? রোজিনা ইসলামের পাশে থাকবে শুধু সাংবাদিক সমাজ, আর মুখরোচক আলোচনা যতদিন দরকার তা আলোচনার টেবিলে রাখবে ‘বিক্ষুব্দ’ নাগরিক সমাজ। নতুন আরেকটি মচমচে ইস্যু না আসা পর্যন্ত।

সো গুড লাক আনভীর। ইতিমধ্যে হয়তো পরিস্থিতি বিবেচনায় কুখ্যাত সন্ত্রাসী সিকদার ব্রাদার্সের মত সায়েম সোবহান আনভীর নীরবে-নিভৃতে হাইকোর্টে আগাম জামিন পেয়ে যাবেন। আর স্বল্প মাত্রায় স্মৃতি শক্তির অধিকারী বাঙালি সমাজ ভুলে যাবেন এই শীর্ষ ব্যবসায়ী শিল্পপতির বিরুদ্ধে নরহত্যার অভিযোগ। কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে অপরাধের আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা। মচমচে ইস্যুর আবরণে মানবতা আর বিচারের বাণী এভাবেই নীরবে-নিভৃতে কেঁদে যাবে। ইস্যুর পর ইস্যু তার ওপর নতুন ইস্যু। যেহেতু তার কাছে গণতন্ত্ ও বাক স্বাধীনতা আর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের বিতর্কের আর কোন সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই তাই কিছু একটা নিয়ে তো বাঙালীকে বেঁচে থাকতে হবে?

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close