নিউজ

কঠিন চাপের মুখে হাসিনা: অন্তর্বর্তী সরকারে কারা থাকছেন?

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৫ আগস্ট : বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের উপর শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের চাপ জোরদার হয়েছে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবর্তন এখন শুধু সময় এবং প্রক্রিয়ার ব্যাপার। সরকারের তরফ থেকে শক্ত অবস্থান বা বক্তব্য শেষ মুহুর্তের দরকষাকষির সুবিধার্থে করা হচ্ছে। অথবা প্রতিবেশী দেশের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বেঁচে যাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বা সুবিধার্থেও এটা করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরকার পরিচালনা একটা বড় ব্যাপার। ১৮ কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা অনেক বড় ইস্যু হওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে দেউলিয়া হতে দিতে চায়না বলেই ইতিমধ্যে দুই বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে আইএমএফই ২.৫ বিলিয়ন ঋণ আবেদন বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এই সাহায্য শর্তসাপেক্ষ এবং স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেয়া হচ্ছে। সুতরাং নির্বাচন পূর্ব বা অন্তর্বতীকালীন সরকারে করা থাকতে পারেন, এটা এই মুহূর্তে বেশ গুরুত্ব সহকারে বিভিন্ন মহল থেকে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের ভিতরে মিডিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণের কারণে ঢাকার মিডিয়ায় তার কোনো প্রতিফলন নেই।

কারা আসতে পারেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে? জাতীয় সরকার, অন্তর্বর্তী অথবা অন্য যেকোন নামের বা পদ্ধতির সরকার হোক না কেন, সেখানে কারা থাকবেন, কারা সেটা নির্ধারণ করবেন, সেটা এখন জরুরী কারণ এই বিষয়গুলোতে মানুষের গভীর আগ্রহ রয়েছে। সেই সম্ভাব্য নামগুলো নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। তবে এটি নীতি নির্ধারণী মহল গুলোতে কিংবা দেশি এবং বিদেশী শক্তিগুলোর কাছে এই নামগুলো নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। সামরিক বাহিনী প্রধান গত মাসে যুক্তরাস্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেন। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে তাদের একটা কার্যকর ভূমিকা থাকতে পারে।

সম্প্রতি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় সরকারের যে রূপরেখা দিয়েছেন, তা আলোচনার সূত্রপাত ঘটালেও সরকার কিংবা বিরোধী কোনো পক্ষই সরাসরি কোন মতামত দেয়নি। খুব সতর্ক প্রতিক্রিয়া তারা ব্যক্ত করেছিলেন অথবা কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মার্চ মাসে বৃটেনে তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালে গৌরবজনক ভূমিকার সম্মাননা গ্রহণ করতে লন্ডন সফর করেন। ওইসময় যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন বলে সাপ্তাহিক সুরমা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু ওই সাক্ষাতের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সাপ্তাহিক সুরমা সম্পাদকের এ ব্যাপারে প্রশ্নের জবাবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সরাসরি কিছু বলেননি। তবে তিনি সুরমাকে বলেন, বাংলাদেশ ও তার জনগণের স্বার্থে আমি যেকোনো মহলের সাথে আলাপ-আলোচনা করার মধ্যে কোনো অসুবিধা দেখছি না। শেখ হাসিনা ১/১১-র সময় যখন বিদেশে আটকে যান, তখন বিদেশিদের সাহায্য নিয়েছিলেন। প্রণব মুখার্জী তার বইয়েতো আরও অনেক কিছু লিখে গেছেন।
ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী লন্ডন থেকে ফিরে গিয়ে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেন। আর নতুন কোন ফর্মুলা কোন মহল থেকে উপস্থাপন করা হয়নি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে থেমে নেই পরবর্তী সরকারের সম্ভাব্য নামগুলো। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসছে ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস এর নাম। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস আন্তর্জাতিক প্রায় সকল মহলের কাছে এক নম্বর বিবেচনায় থাকছেন যথারীতি। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন কিনা তা নিয়ে অনেকেই সংশয়ে আছে। এরপর ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের নাম নানা মহলে ঘুরেফিরে আলোচিত হচ্ছে। তিনি সকল মহলের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। সরকার প্রধান হিসেবে সিনিয়রদের মধ্যে প্রফেসর রহমান সোবহান, সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব ড. আবকবর আলী খান, সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেস্টা প্রফেসার সোফিয়া রহমান, সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওয়াহাব মিয়া, সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা, সাবেক সচিব সৈয়দ মার্গুব মোরশেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর এস এম এ ফায়েজ, সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া, সেনাবাহিনীর মধ্যে একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও নীতিবান সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত জেনারেল ইমামুজ্জামান (যিনি নাসিমের সেনা অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন)।

এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের কৃতি শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল, পরিবেশ আন্দোলনের এডভোকেট রিজওয়ানা হাসান, নারী পক্ষের সভাপতি শিরিন হক, সি পি ডি সভাপতি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর ইফতেখারুজ্জামানের নামও গুরুত্বপূর্ণ মহলে আলোচনায় আছে বলে জানা গেছে।
আলোচিত প্রথম কয়েকজনের নাম সরকার প্রধান হিসেবে আলোচিত হলেও পরবর্তী নামগুলো আসছে সরকারের মন্ত্রী বা উপদেষ্টা পদমর্যাদার নির্ভরযোগ্য নাম হিসেবে। এছাড়া নানা মহলে নানা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় উপজাতি সম্প্রদায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং নারী সংগঠকদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিছু নাম মাঝে মাঝে আলোচিত হয় এবং এই ক্ষেত্রগুলো থেকে কম করে হলেও এক বা একাধিক প্রতিনিধি সম্ভাব্য ওই সরকারের স্থান পেতে পারেন। দেশীয় নীতি নির্ধারক অবশ্যই বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কিচেন ক্যাবিনেট অথবা মাফিয়া চক্রের কেউ পরবর্তী ওই সরকারে স্থান পাবেনা, এটা মোটামুটি নিশ্চিত সকল পক্ষের কাছে। তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনার প্রশ্ন অথবা সুযোগ হয়তো থাকবে না।

জাতীয় পর্যায়ে ঐক্যমত এবং বিদেশি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে জাতিসংঘ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটা বড় ধরনের প্রভাব সম্ভাব্য সরকার গঠনে সক্রিয়ভাবে কাজ করবে এ কথা এখন মোটামুটি নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। অনেকে ধারণা করছেন, ভারতের নগ্ন সমর্থনে হাসিনা সরকার দুটি বিতর্কিত নির্বাচন করে প্রায় সবগুলো আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের যেকোনো পরিবর্তনে ভারতের কোনো কূটনৈতিক প্রভাবকে সতর্কভাবে এড়িয়ে চলবে অথবা ভারতকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করবে। ইতিমধ্যে হাসিনা সরকারের উপর দিল্লীর সমর্থন জিরো পয়েন্টে নেমে আসার কারণে ওই সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রয়াস সফল হবার সম্ভাবনা অধিক বলেও মনে করা হচ্ছে। কৌশলের খেলায় কোনপক্ষ কতদূর যেতে পারে, সবকিছুই নির্ভর করছে তার উপর।

নিউজ

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close