ফিচার

নারীবৃক্ষ: নারীর আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠার গল্পের সমাহার

গ্রন্থালোচনা

নাহিদ নেওয়াজ

 নারীবৃক্ষ গল্পগ্রন্থটি লেখক লুনা রাহনুমার একটি অনবদ্য সৃষ্টি। এই বইটির পরতে পরতে সমাজ, সংসারের জীবন গাঁথা।নারীবৃক্ষ গল্পগ্রন্থের ১৬টি গল্প জুড়েই প্রেম, প্রণয়, বিনয়, ব্যক্তিত্ব যেন আমাদের চারপাশের মানুষগুলোকে বিশ্লেষণ করে।পাঠকের কাছে নারীবৃক্ষ গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্পে নারী যেন বৃক্ষের মতো আগলে রাখে প্রতিটি সংসারকে। প্রতিটি গল্পে আছে নতুননতুন শিক্ষা, আছে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। জীবনযুদ্ধে জয়ের তৃষ্ণা কিংবা কঠোরের প্রচ্ছন্নে কোমলতার স্পর্শ। গল্পের পরতেপরতে বিচিত্র মানুষের সচিত্র অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা জীবনের সাধারণ কিছু ভুল থেকে নিজেদের সচেতন করে স্বাভাবিক ওসুন্দরের ইঙ্গিত দেয়। ভুলগুলো ঝরাপাতা কিংবা মরা ফুলের মতো খসে পড়ে জীবনকে অর্থবহ করে তোলার প্র‍য়াস রাখেনারীবৃক্ষ গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্প।

একজন নারী কীভাবে অগ্রসর হতে পারে অথবা অসহায় নির্ভরশীল নারী হঠাৎ কীভাবে সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে, কিংবাভালোবাসার মানুষের কঠিন অপমানকে হাজার কষ্ট সত্ত্বেও তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আত্মশক্তিতে বলীয়ান ও আকর্ষণীয়ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে এসবই এই গল্পগ্রন্থ “নারীবৃক্ষের” প্রধান উপজীব্য। তাই পাঠকের কাছে গল্পের বইটি প্রকৃতইএকটি শিক্ষামূলক,জীবনদর্শী ও বাস্তবতার ছবিতে আঁকা একটি অসাধারণ অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

এই গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প “তরুলতা“- যে তরুলতাদের জীবনের গল্প নীরবে আড়াল হয়ে যায় সমাজের নিয়মের বেড়াজালে। শুধুলতারা বুকে আগলে রাখে কিছু ব্যথাতুর স্মৃতি।শৈশব পার করে কৈশোরের উদ্দাম হওয়া লেগেছিলো তরু ও লতার জীবনে।ভালোবেসেছিল একে অপরকে। আর তাই কোন এক নিঝুম রাতে তরু লতাকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু পরিবার মেনে নেয়নি।মর্যাদা ও শক্তির কাছে লতার পরিবার মাথা নত করে। দিব্যি কেটে যায় দিন, যেন কিছুই হয়নি। এ যেন বউ পুতুল খেলার মতো।তরুর সাথে লতার সংসার হয়নি। সমাজে নারীরাই সকল পাপের স্রষ্টা। ফলাফল কিছুদিন পর লতাদের চলে যেতে হয় গ্রামছেড়ে। কিন্তু তরুর কিছু হয় না, কখনো খবরও নেয়নি। আমাদের চারপাশের লতারা এভাবেই হেরে যায় ভালোবাসার কাছে, সমাজের নিয়মের কাছে।

ছোটবেলা থেকে বাবা মা হারানো এতিম পারুর এ পৃথিবীতে একমাত্র ভালোবাসার আশ্রয় স্বামী শিপন। ভালোবাসার কাঙালপারু “মেন্দি মেন্দি ভালোবাসা” খেলা খেলে। মেন্দি মেন্দি ভালোবাসা গল্পে পারুর মনে সব সময় ভয় ও সংশয় কাজ করেশিপনকে হারানোর। শিপন যতই ভালোবাসে, পারু মরিয়া হয়ে ওঠে আরো ভালোবাসার জন্য। আর শিপন পারুর মাথার উপরছাদ হয়ে থাকে পরম ভালোবাসায়। বিশ্বাস ও ভরসার হাত দিয়ে পারুকে আগলে রাখে বুকের পাঁজরে।

তিতির-রুশাপা দুই বন্ধুর জীবনের গল্প “প্রেমিক” – দুই বন্ধুর দুষ্টু মিষ্টি নিত্যদিনের খুনসুটির মাঝে হঠাৎ এসে জায়গা করে নেয়সুমাইয়া। রুশাপা ভালোবাসতো তিতিরকে। কিন্তু কখনো বলা হয়নি। একদিন খুব লাজুক কন্ঠে তিতির রুশাপাকে তারভালোবাসার মানুষের কথা বলে। সেই মানুষটি হলো সুমাইয়া। অভিমান ও চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে তিতিরকে সুখে দেখে চলে গেলরাজশাহী। সেখানে রুশাপা একটি ছেলের প্রেমে পড়লেও তিতিরের স্মৃতি মাঝেমাঝেই তাকে কষ্ট দেয়। বহুদিন পর রুশাপাজানতে পারে সুমাইয়া ছেড়ে গেছে তিতিরকে। তিতির এখন এ্যাসাইলামে। আগপিছ কিছু চিন্তা না করে রুশাপার যুদ্ধ শুরু হয়তিতিরকে ভালোবাসার। তিতিরকে নিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার ইচ্ছে রুশাপার প্রবল হয়ে উঠে। তারা একসাথে ছিলো খুবকাছাকাছি। রুশাপা তিতিরকে আগলে রাখে বুকে। আর তিতির মনে সুমাইয়ার জন্য ভালোবাসা। এই দুইয়ের মাঝে তিতির আররুশাপা এক সাথে থেকেও যেন যোজন যোজন দূরত্বে বসবাস।

ভালোবাসা যেমন মানুষকে উদার করে তেমনি মাঝে মাঝে করে তোলে হিংস্র,অপরাধী। ভালোবাসার লোভে স্বার্থপর হয়ে ওঠেমানুষ। তবুও কখনো অবসরে জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে মানুষ অনুভব করে তার অপরাধ যা “ভালোবাসার দায়” গল্পে উঠেএসেছে। রুবার জীবনে সব আছে। কিন্তু তবুও সে শান্তি পায় না। কারণ একসময় সে ঠকিয়েছে সাগুফতাকে। যন্ত্রণার আগুনেদগ্ধ হয় রুবা। আজ বহু বছর পর তার এসব মনে পড়ছে। উচ্চবিত্ত পরিবারের সৌখিন আদুরে মেয়ে সাগুফতার সাথে প্রেম ছিলোতুষারের। এসব জেনেও রুবা ফোনে কথা বলতে বলতে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছিলো তুষারকে।তারপর বিয়ে করে চলে এলোজাপানে। দীর্ঘ ১২ বছর পর আজ বড্ড খারাপ লাগছে সাগুফতার জন্য। নিজেকে অপরাধী লাগছে। ঘনিষ্ঠ বান্ধবী সীমারমাধ্যমে সাগুফতার করুণ কাহিনী শুনে রুবার কষ্টের পরিমাণ যেন আরো বেড়ে যায়। ধনীর দুলালী মেয়েটির এখন সংসার চলেমানুষের যাকাত ফেতরার টাকা দিয়ে। রুবা ভাবতে থাকে, এই মিলিয়ন ডলারের ফ্ল্যাট, এমন চাকচিক্যময় বিলাসবহুল জীবন, বাচ্চাদের ঝকঝকে ভবিষ্যত সবকিছুর সাথে সাগুফতা না থেকেও জড়িয়ে আছে। রুবা তুষারকে জানায় সে কথা। আর তাইভালোবেসে প্রেম নিয়ে আসা যৌবনের একজন মধুর নারীর জন্য গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস আলগোছে বেরিয়ে আসে তুষারের জমাটবুকের ভেতর থেকে।

জয় পরাজয়ের দ্বৈত তলা” গল্পে সরলতার সুযোগে বিশ্বস্ত বান্ধবীর অবিশ্বাস্য বিশ্বাসঘাতকতার এক করুণ কাহিনী চিত্রিতহয়েছে। সামসুন্নাহারের মতো সুন্দরী, আত্মপ্রত্যয়ী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একটি আপোষহীন মেয়ের বান্ধবী নীলু।নীলু শামসুন্নাহারকেভালোবাসলেও মেনে নিতে পারত না তার সফলতা ও গ্রহনযোগ্যতাকে। প্রতিটি বিষয়ের পরাজয় নীলু একটু একটু করে জমিয়েরেখেছিল বুকের ভেতরে। জীবন বড় বিচিত্র। কে আপন কে পর- এক জীবনে বোঝা বড় দায়। বিয়ের বেশ কিছু দিন পরশামসুন্নাহারের বাড়িতে বেড়াতে এসে চুরি করে নিল তার স্বামী নিজামকে। নিজের লাবন্যময়ী শরীর যেমন নারীর নিজের শত্রু, তেমনি পুরুষের অপ্রতিরোধ্য নারী বাসনাও তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এই দুর্বলাতাকেই কাজে লাগিয়ে সামসুর স্বামী নিজামকেসাত মাসের মাথায় বিয়ে করে নীলু। নীলুর তখন মনে হলো এই প্রথম সে সামসুর কাছে জিতে গিয়েছে। সামসুর সাথে নীলুরদেখা হলো মেলায়। নীলু আশা করেছিল সামসু তার কাছে আজ যা চাইবে তাই দেবে হাত ঢেলে। কিন্তু সামসু কখনো চেয়ে নেওয়ামানুষ নয়। সামসু বলে, ‘তোর জীবনে আমি দাতা হয়ে ছিলাম আগে, চিরকাল তাই থাকবো। আমি দিবো, তুই নিবি।আমারএঁটো তুই খাবি’। সামসু চলে যায়। জয় পরাজয়ের হিসেবে কে আসলে জয়ী হলো এই হিসেবটা নতুন করে কষতে থাকে প্রতারকবোকা নীলু।

বিয়ের বারো বছর পরেও নাদিয়া মা হতে পারেনি। তাই বাড়িতে তার তেমন কোন কদর নেই। নিত্যদিনের রান্না, খাওয়া, সংসারসবই আছে নাদিয়ার, নেই শুধু উঠোন জুড়ে খেলে বেড়াবার মতো একটা বাচ্চা কিংবা মা বলে ডাকে এমন কোন সন্তান। কিছুকিছু মেয়ের গোটা জীবনটাই ট্রাজেডির মতো। বয়স হলে বিয়ে কেন হচ্ছে না, বিয়ে হলে বাচ্চা কেন হচ্ছে না, বাচ্চা হলে মেয়ে কেনহলো, মেয়েটা দেখতে মায়ের মতোই কালো। “নারীবৃক্ষ” গল্পের নাদিয়ার জীবন যেন প্রকান্ড একটা শূন্যের মতো স্থির। মাঝেমাঝে সে ভাবে, এই সংসারের প্রতি মানুষের এতো মায়া জন্মায় কেন! টানটা আসলে কোথায়!কিসের জন্য মানুষ বেঁচে থাকে? সন্তানহীন নাদিয়া ঘরের এক একটি পুরোনো আসবাবপত্রের মতোই এখন নিতান্ত সাদামাটা আর বিশেষত্বহীন এই সংসারে।উঠোনে তার প্রিয় একটি সজনে গাছ আছে। পুরো বাড়ি জুড়ে রাতের নীরবতার শব্দ। ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ায়নাদিয়া। সাদা ফুলে ছেয়ে যাওয়া সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা সজনে গাছটিকে নাদিয়ার মানুষ মনে হয়। একজন নারী। ফুল-ফল-ছায়া আর বিশুদ্ধ বাতাস দিয়ে চারপাশের সবাইকে কেমন পরিতৃপ্ত করে রেখেছে নারীবৃক্ষটি যা পারেনি নাদিয়া।

পাখি তুমি উড়ে যাওশব হয়ে নিভে যাও” – গল্পে এক সংগ্রামী নারীর করুণ জীবন কাহিনী বিধৃত হয়েছে। সন্তানদেরসুশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্নে স্বামী-মরা নাজমার আপোষহীন জীবন যুদ্ধের গল্প। তার অসহায় জীবনে গ্রামের পুরুষ কেউ কেউসাহায্যের হাত বাড়াতে চায়। কিন্তু সহানুভূতির হাতগুলো থাকে ভীষণ নোংরা। স্যাতস্যাতে সাপের লিকলিকে জিহ্বার মতোশরীরের নানান খাঁজে-ভাজে আড়ালে আবডালে ছোবল মারতে চায়। আত্মসম্মানের সাথে আপোষহীন নাজমা পাড়ি জমায়ইসলাম ধর্মের লীলাভূমি সৌদি আরবে। দালালরা তাকে হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার কথা বললেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয়বাসাবাড়িতে কাজের জন্য। তবে দেশের হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও রক্ষা পায় না পূন্যভূমি আরবের পুরুষদের ছোবলথেকে।অনাহার, অর্ধাহার, নির্যাতন, রাতের আঁধারে কখনো বাবা, কখনো ছেলের শরীরের চাহিদা মেটাতে মেটাতে ক্লান্ত নাজমাএকদিন জীবনযুদ্ধে হার মানে।লোক জানাজানি হবে দেখে বাড়ির মালকিন ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় গর্ভবতী নাজমাকে।দেশে পড়ে রয় তার স্বপ্নময় দুটি সন্তান ও মা।

জীবনের বাঁকে বাঁকে রহস্য। প্রতিটি মানুষের জীবনই এক একটি গল্প। লক ডাউনে মানুষ যখন ঘরবন্দী, অফিস যখন ঘরে-ওয়ার্কিং ফ্রম হোম এমন সময়ের একটি গল্প “ব্যবকলন” – রুবিনা ও শাহেদ কর্মজীবী দম্পতি। দুজনেই ঘরে বসে অফিস করে।শাহেদ যখন মর্নিং ওয়ার্ক করে রুবিনা তখন সকালের নাস্তা বানায়। অফিসের ফাঁকে বিরতিতে শাহেদ যখন বিশ্রাম নেয় রুবিনাতখন দুপুরের রান্না করে। বাচ্চারা ঘরে থাকায় বাচ্চাদের নানান রকম চাহিদা মেটাতে হয়। নতুন নতুন রান্না করে খাওয়াতে হয়।শাহেদ থাকে নিজের মতো, যেন অফিসে আছে যেখানে বসে বাচ্চা বা স্ত্রীর সাথে কথাও বলা যায় না।রুবিনার কঠোর পরিশ্রমে, তাদের দুজনের দীর্ঘ সংগ্রামে সংসারের অবস্থা ফিরেছে। তবে এখন বিলাসী এই জীবনে অবসরের সময়টুকুতে একে অন্যের পাশেথেকেও আনন্দ পায় না তারা। রুবিনার আয় করা ডলারে তাদের বাড়ির মান্থলি মর্টগেজ, কাউন্সিল ট্যাক্স, মোবাইল বিলসহআরো অনেক খরচ যায় বাকি ডলার ট্রান্সফার হয় শাহেদের একাউন্টে যা রুবিনা পছন্দ করে না।পরিশ্রান্ত রুবিনা চাকরি ছেড়েদিতে চায়। শাহেদ তাতে বাধ সাদে। দিন দিন দুটি মনে পরস্পরের প্রতি অরুচি বাড়তেই থাকে। রুবিনা সিদ্ধান্ত নেয় সে শাহেদেরসাথে থাকবে না। যেহেতু বাড়ির দায়িত্ব ও খরচ রুবিনা সামলায় সেহেতু রুবিনা শাহেদকে চলে যেতে বলে। বুক ভরে নিঃশ্বাসনিয়ে কিছুদিন বাঁচার ইচ্ছে রুবিনার। হয়তো এটাই তার নিজের জন্য নিজের দেওয়া সেরা উপহার- শান্তি!

যদিও সে চেয়েছিল কাছে থাকতে” – গল্পটিতে কে চেয়েছিল? কৃতজ্ঞতা না ভালোবাসার জন্য কাছে থাকতে চেয়েছিল? একসাথে কি দুজন কে ভালোবাসা যায়? গল্পের নায়িকা সায়মা ভালোবাসার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে। ম্যাকডোনাল্ডাইসে কঠোরপরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত করেছিল প্রানপ্রিয় স্বামীকে। বুকে আগলে রেখেছিল সন্তানদের। এতোদিন পর স্বামী যখন চাকরি পেলতখন যেন তাদের জীবনে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। কিন্তু কে জানতো এই আনন্দের ঢেউয়ের নোনা জলে ভেসে যাবে তারসংসার। ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়বে ভালোবাসা। সাগরের তীরে পরিচয় হলো এক দম্পতির সাথে তাদের। দম্পতিটির স্ত্রীর বয়স অনেককম। কিছুদিনের মধ্যে তাদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হলো। সায়মা রাইমাকে নিজের বোনের মতো আদর স্নেহ আরভালোবাসার সব অধিকার দেয়। একদিন এই রাইমা তার স্বামীর সাথে ডিভোর্স করে থেকে গেল সায়মাদের বাসায়। হঠাৎ করেএতোদিন পর অবিশ্বাসের ছুরি বুকে বসিয়ে চিরচেনা স্বামী মুহুর্তে অচেনা হয়ে যায়। মেয়ের বয়সী রাইমাকে বিয়ে করতে চায়পাভেল। ধর্মের নানা অযুহাত দেখিয়ে সায়মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পাভেল এক সাথে দুজনকেই চায়। এখন সায়মারচেয়ে রাইমাকেই তার বেশি ভালো লাগে। তবু সে দুজনের সাথে থাকতে চায় সায়মার প্রতি তার অশেষ কৃতজ্ঞতা থেকে।আত্মসম্মানে আঘাত লাগে সায়মার।সন্তানদের নিয়ে আবারো ফিরে আসে ঘিঞ্জি সেই ছোট্ট ঘরটিতে। শুরু করে আবারও কাজ।সেই জীবনযুদ্ধ, সন্তানদের আঁকড়ে বেঁচে থাকার প্রতিজ্ঞা।সায়মার জীবনের গল্প যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ঠিক সেখানেই এসেথেকে গেছে। তবু হাল ছাড়ে না সায়মা।

তিন বন্ধুর প্রেমের গল্প “দ্বিতীয় সম্পর্ক” – অজিত ভালোবাসতো পিয়ানাকে।পিয়ানাও হয়তো ভালোবাসতো অজিতকে। কিন্তুবন্ধুত্বকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলো পিয়ানা। তাই অজিত কখনো সাহস পায়নি। একমাত্র বন্ধুত্ব ছাড়া পৃথবীর আর সবসম্পর্কই দেনা পাওনার দাঁড়িপাল্লায় মাপা যায় বলে পিয়ানা মনে করে। তবে শর্মিলা অজিতকে ভালোবাসার সুযোগ হাতছাড়াকরেনি। কৌশলে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করে শর্মিলা অজিতকে বিয়ে করে পাড়ি জমায় দেশের বাইরে। যেখানে ভালোবাসা থাকেনা, সেখানে সুখ থাকে না। অজিতকে বিয়ে করলেও বেশিদিন সংসার হয়নি তার। কয়েক বছরের মাথায় ডিভোর্স হয়ে যায়তাদের। কারণ অজিত মনে প্রাণে ভালোবাসতো পিয়ানাকে। বিচ্ছেদ হলেও তাদের বন্ধুত্ব থেকে যায়। দীর্ঘ বছর পর তিন বন্ধুরদেখা হয়েছে। দেখে কেউ বলবে না, অজিত ও শর্মিলার বিচ্ছেদ হয়েছে অথবা অজিত পিয়ানাকে ভালোবাসে। মাঝে মাঝে বিচ্ছেদমিলনকে মধুর করে।

মধ্যবয়সী পুরুষদের নানারকম বদ অভ্যাসের একটি অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে গবেষণা করা। বেশিরভাগের ভালো লাগে কম বয়সীমেয়েদের সাথে ঠাট্টা ইয়ার্কি করতে। এমনই উপজীব্য “স্বামী সব করে রব” গল্পের। একজন বন্ধুর স্ত্রীর সৌন্দর্যে লোলুপ দৃষ্টি দেয়প্রতিযোগিতা করে তিনজন বন্ধু। গরীব বন্ধুর স্ত্রী এতো সুন্দর! ভীষণ লোভ হয় তাদের। তাদের আকাঙ্খা বন্ধু ফারুকের স্ত্রীঅবন্তিকে একবার কাছে পেতো! নিজেকে সামলাতে না পেরে একদিন কবির বন্ধু ফারুকের অনুপস্থিতিতে তার বাসায় যায়।অবন্তিকে অশালীন প্রস্তাব করে। অবন্তি ভয়ে বেডরুমের দরজা বন্ধ করে অপেক্ষা করে তার স্বামী ফারুক আসার জন্য। ফারুকআসার সাথে সাথে অবন্তি বলে তুমি আমার কাছে সবার চেয়ে বেশি দামি। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। দালানের ওইবিলাসিতা হার মানে ভালোবাসার কাছে, বিশ্বাসের কাছে।

অধিকাংশ মানুষ অন্যকে না দেখিয়ে, অন্যকে না জ্বালিয়ে নিজের আনন্দ ভোগ করতে পারে না। ভোগের উর্ধ্বে উঠে উপভোগেরঠিকানা জানে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। “রিরংসা” গল্পে এমনই একটি কথা বলেছেন গল্পকার।কোন একটি মেয়ে অপেক্ষা করছেদুই মাস আগে সহবাস করা স্বামীর সাথে পুনরায় বসবাসের জন্য। নিজের সংসারের জন্য। পুরুষ মানুষের প্রেমের জন্য। কামেরজন্য। অপেক্ষা করে থাকে সন্তান আর পারিবারিক কলহের জন্য। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে মেয়েটি ফ্রেন্ড সাজেশনে একটিইনাম দেখতে পায় প্রতিদিন। মনের অজান্তে প্রোফাইলে ঢুকে গল্পকারের একটি গল্প পড়তে পড়তে নিজেই হয়ে উঠে সেই গল্পেরনায়িকা। ভাবতে থাকে সেই মানুষটিই কি এই মানুষ, যাকে সে খুঁজছে এতদিন ধরে!

সুরেখার মুখের কথায় কাজ হয়। হাতের ছোঁয়ায় মানুষের মন বদলে যায়।এলাকা জুড়ে এই বিষয়ে সুরেখার সুনাম। যে কোন মেয়েসমস্যায় পড়লে সুরেখার কাছে আসে। ফুঁস মন্তরের মতো সব ঠিক হয়ে যায় তাতে। কত মেয়ের সংসার জোড়া লাগিয়েছে সে। কতস্বামীদের দ্বিতীয় বিয়ে থেকে আটকেছে সে। আজ তার নিজের ঘরেই তার স্বামীর গোপন প্রেম জানতে পারে। যে সবার জন্য এতকরে সে নিজের জন্য কিছুই করল না। একটিবার রিয়াজকে অনুনয় করে বলেনি, প্লিজ তুমি তমালিকাকে ভুলে যাও। কারণসুরেখা ভালো করে জেনে গেছে, একবার ভেঙে গেলে মন জোড়া দেওয়া যায় তারে কিন্তু সেই “ভাঙনের দাগ” থেকে যায় ভেতরেখুব গভীরে। কিছুতেই সে দাগ মোছে না সারাজীবন।

অভাব অনটনে বড় হয়ে ওঠা শকুন্তলার জীবনের গল্প “কিছুটা পলাশের মতো যে জীবন” – শিক্ষা দীক্ষায় মার্জিত চমৎকারদেখতে শকুন্তলার বিয়ে হয় অনুপমের সাথে। সহজ সরল শকুন্তলা ঘরকন্না করতে স্বামীর সাথে পাড়ি জমায় নিউইয়র্কের একটিসাজানো গোছানো ফ্ল্যাটে। বিয়ের বছর দুই ভালোই কাটে। তারপর যেন শকুন্তলা পুরনো হয়ে যায় যায় অনুপমের কাছে। ধরাপড়ে অনুপমের আসল চেহারা। শকুন্তলার সামনে প্রতি রাতে ফিয়নাকে নিয়ে বাড়িতে আসে। বন্ধ দরজার বাইরে শকুন্তলা একাপড়ে থাকে। অজানা, অচেনা বিদেশের শহরে কাউকে চেনে না সে। একদিন শকুন্তলার সাথে পরিচয় হয় স্নেহময়ী মায়ের বয়সীএক মহিলার। তাকে বলে নিজের জীবনের গল্প। ভদ্রমহিলার সহযোগিতায় শকুন্তলা অনুপমকে আইনের আওতায় আনে। তারমার্কিন নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। জেল হয় অনুপমের। শকুন্তলা ফিরে আসে দেশে। চাকরি নেয় ব্যাংকের জুনিয়র ক্যাশিয়ারহিসেবে।

মানব জীবন দীর্ঘ ও রহস্যময়। সরল হাঁটা পথের মাঝেও প্রহেলিকা লুকিয়ে থাকে। ক্যাপ্টেন সাইফের সাথে অনিন্দিতার প্রেমগড়ে ওঠে নিঃশব্দে, কেমন যেন স্বপ্নের মতো। তারা ভুলে গিয়েছিল জাত-পাত-ধর্ম। সাইফের সাথে কাটানো প্রতিটি দিনঅনিন্দিতার জন্য ছিল অন্য রকম। গভীর ভালোবাসা সত্ত্বেও ধর্মের বেড়াজালে, সমাজের আচার প্রথার কাছে পরাজিত হয়সাইফ অনিন্দিতার প্রেম। তবুও শেষ হয় না তাদের প্রেম। হঠাৎ দেখা হয় তাদের।প্রথম দিনের মতোই তরঙ্গ খেলে যায় দুটি প্রাণে।প্রথম দিনের মতো চব্বিশ বছর পরেও যখন আবার দেখা হয় তাদের তখনও অনিন্দিতা টিস্যু পেপারের উপর যত্নে লিখে দেয়, “আমার লতার একটি মুকুল…..”

একজন পাঠক হিসেবে গল্পের বিষয়বস্তুগুলো জীবনের সাথে সমান্তরাল।শব্দ, রস, ভাষার সাবলীলতা যেন নারীবৃক্ষ গল্পকেপ্রাণিত করেছে। প্রতিটি গল্পের করুণ বীণা যেন নিজেরই বুকে এসে বিঁধেছে। এমন ঘটনা আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটছে। তবেসৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমরা মানুষ মানুষের জন্য।সময় এসেছে নারী পুরুষের সমান্তলে দাঁড়ানোর। তাই একপাক্ষিকপুরুষদের ত্রুটি বিচ্যুতি যেমন এই বইতে ধরা পড়েছে লেখকের কাছে প্রত্যাশা থাকবে আগামী কোন লেখায় আমরা শুনবোআশার বাণী। “নারীবৃক্ষ” – বইটি আমাদের জীবনের জন্য শিক্ষণীয়। আমাদের সমাজের জন্য সচেতনতা বয়ে আনবে। তাইবই প্রেমী পাঠকদের কাছে নারীবৃক্ষ গল্পগ্রন্থটি একটি ব্যতিক্রমী তবে ভালো লাগার একটি বই হিসেবে স্থান পাবে বলে আমি মনেকরি।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close