মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফর ও কিছু কথা

ফিচার

মুক্তচিন্তা:

।। মুহাম্মাদ শরীফুজ্জামান ।।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফর এখন নিশ্চিত। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে গেছেন। দুই দিনের সফর শেষে গত মঙ্গলবার ঢাকা ত্যাগের পূর্বে তিনি বলেছেন, ১৭ মার্চের অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্ন হবে, ভারত এমনটাই প্রত্যাশা করে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিবকে বাংলাদেশ আশ্বস্ত করেছে, অতিথি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদিকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হবে, কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে ওই সময়ে না হয়, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার সতর্ক রয়েছে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মোদির অংশগ্রহণ নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।  এসব প্রতিক্রিয়ার খবরাখবর নিত্য আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাই। তাই এটা পরিস্কার বাংলাদেশের জনগণের এসব প্রতিক্রিয়াকে আমলে না নিয়ে সরকার মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফর নিশ্চিত করেছে। এমতাবস্থায় সরকারের মোদির প্রতি এই অগাধ ভালোবাসা স্বাভাবিক ভাবেই জনমনে শত প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে অবাধ তথ্য প্রবাহের এ যুগে দেশ-বিদেশের খবরাখবর জানা এখন বেশ সহজতর অন্য যে কোন সময়ের তুলনায়। আর বেশ সহজতর হওয়ার পরও আরেকটি খারাপ দিক আছে যা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা খবরের ছড়াছড়ির প্রাদুর্ভাব। তাই সোশ্যাল মিডিয়া এমনকি নামকা ওয়াস্তে বিভিন্ন অনলাইন নিউজপোর্টালের সকল খবরাখবর সকল সময় বিশ্বাস করতে বাধাগ্রস্ত হতে হয়। মোদির ব্যাপারে ও আমি সেই বাঁধা দূর করতে বিলেত প্রবাসী ভারতীয় কিছু নাগরিকের দ্বারস্থ হই, যাদের সাথে অনেকদিন থেকে আমার পরিচয়। ভারতে ঘটে যাওয়া ইদানিংকালের বিভিন্ন ঘটনাবলি নিয়ে তাঁদের সাথে কথা বলি ও সত্যতা যাচাই করি। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর আর তাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে তেমন কোন অমিল পাইনি। যে কয়জনের সাথে কথা হয় তাঁদের সবার বক্তব্যে মোদির হিন্দুত্ববাদ ভারত প্রতিষ্ঠার জোরালো পদক্ষেপই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। অবশ্য তাঁদের কেউই এমন ভারত চান না।

 তাঁদের একজন আমাকে এমন করে বললেন — দেখুন, সারাবিশ্বের প্রত্যেকটি দেশে কম বেশি মানুষের মধ্যে ধর্মান্ধতা আছে। যাকে আমরা সহজ ভাষায় ধর্মীয় গোঁড়ামি বলি। ধর্ম একটি স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এই ধর্মান্ধ লোকদের বর্তমান সময়ে রাজনীতিবিদরা ভালোই ব্যবহার করছে। এসব লোকদের নিয়ে ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতিবিদরা রাজনীতিরগুটিচাল ভালোই চালছে।  এসব ধর্মান্ধ লোকদের তারা বেছে নিয়েছে রাজনীতির মাঠ দখলের জন্য অগ্রগামী সৈনিক হিসেবে।  আপনি দেখবেন আজকের এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গোঁড়াধার্মিকরাই অগ্রগামী সৈনিক।  রাজনীতিবিদদের ধারা তারা ব্যবহার হচ্ছেন। আর তাদের এই ব্যবহারের ফলে মানবিকতা পদদলিত হচ্ছে, নতুন করে হিংসাত্মক সমাজ ব্যবস্থার জন্ম হচ্ছে।  তাদের কাছ থেকে উত্থিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা একটি দেশের শত শত বছরের অসাম্প্রদায়িক শান্ত সমাজ ব্যবস্থা নিমিষে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। চতুর এই রাজনীতিবিদরা নিজে ধর্মকর্মে এমন বিশ্বাসী না হলেও রাজনীতির ফায়দা হাসিলের স্বার্থে আর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য এই ধর্মান্ধ লোকদের যে কোন দাবিদাওয়া পূরণে তারা সব সময় সচেষ্ট থাকেন। এমনকি মানবিক বিবর্জিত দাবিদাওয়া গুলোও।  তাদের পক্ষে রাখতে রাজনীতিবিদদের যে এমনটা তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বর্তমান সময়ে এই তালের রাজনীতি বেশ ফলপ্রসু। তাই ক্ষমতা ঠিকিয়ে রাখতে মানবিক বিবর্জিত দুষ্ট ঘৃণিত এমন রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছেন আজকের সময়ের অনেক রাজীতিবিদরা। তারা ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে সংস্কার নয়, বরং সমাজব্যবস্থাকে আরো ঘুণে ধরার ব্যবস্থা করে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে তারা বদ্ধ পরিকর।

 তবে কথা হচ্ছে মোদি যদি তাঁর এমন ঘৃণিত কুটচালের রাজনীতিতে সফল হন আর হিন্দুত্ববাদ ভারত প্রতিষ্ঠা করতে সফল হন তাহলে বিশ্বে আরেক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ সৃষ্ট হবে। তাঁর সাম্প্রদায়িক এই রাজনীতির প্রভাব দ্রুত অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ভারতে সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়ে দেশ ত্যাগ করা নাগরিকদের তো বাংলাদেশে প্রবেশের খবর ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচার হতেও দেখেছি। আর মঙ্গলবার (০৪ মার্চ) বাংলাদেশের যুগান্তর পত্রিকার অনলাইল সংস্করে ‘দিল্লির নর্দমায় মিলল পচা গলা ১১ মরদেহ’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে পড়লাম — ভারতের দিল্লিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডবের পর থেকে রাজধানীর নর্দমায় মঙ্গলবার পর্যন্ত গত পাঁচ দিনে ১১টি পচা গলা লাশ ভেসে উঠেছে। সব মিলিয়ে কয়েক দিনের ওই সহিংসতায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাড়ে ৩০০ জন। হিন্দুস্তান টাইমসের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি আরো বলেছে, প্রতিদিনই হাসপাতালে স্বজনদের খোঁজে মানুষের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই সারা দিন বসে থেকে দিন শেষে নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন ঘিরে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা রাজধানী দিল্লিতে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই বাংলাদেশর জনগণ ভারতের বর্তমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে উদ্বিঘ্ন। কারণ বাংলাদেশের মানুষ কোন ধরণের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে সমর্থন করেনা। তারা শুধু মুসলমান না এমন নির্বিচারে হিন্দু হত্যাকেও সমর্থন করে না। তাই যার প্রকাশ্য মদদে এমন হত্যাযজ্ঞ ভারতে হচ্ছে তাকে কোন ভাবেই শান্তিকামী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মানুষ নিজ দেশে স্বাগত জানাতে চাইবেনা এটাই স্বাভাবিক।

 কিন্তু কথা হচ্ছে মোদিকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে সরকার বার বার মুক্তিযুদ্ধকে সামনে নিয়ে আসছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মোদির কি অবদান? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের যাঁদের অবদান তাঁদের সব সময় বাংলার মাটিতে এদেশের জনগণ স্বাগত জানায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন ও সাহায্য প্রদানের জন্য ভারত ও তাঁর দেশের জনগণের কাছে বাংলাদেশ সব সময় কৃতজ্ঞ। কিন্তু মোদি তো নিজ দেশেই বিতর্কিত! একজন বর্ণবাদী নেতা হিসেবে ইতোমধ্যে নিজেকে বেশ ভালোই জানান দিয়েছেন তিনি। ধর্মকে পুঁজো করে তার রাজনীতির গুটিচালে একটি বিশেষ ধর্ম তাঁর কাছে মূখ্য, অন্য সব যে গৌণ তা সাম্প্রতিককালের মুসলিম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞে পরিস্কার হয়ে গেছে। তিনি ভবিষ্যতে কি ভারত প্রতিষ্টা করতে চান তা এখন আর লুকায়িত নয়।

 যদিও আশ্চর্যজনক ভাবে বাংলাদেশ সরকার তা বুঝেও না বুঝার ভান করছে! আবার সরকার শুধু ভান করেই থেমে থাকেনি। মোদিকে  বাংলাদেশে মুজিব বর্ষের অতিথি করেছে! যদিও বঙ্গবন্ধু নিজেকে গর্ব করে মুসলমান বলে পরিচয় দিতেন।  আর নির্বিচারে মুসলমান হত্যায় যে নেতা আনন্দ পান তাকে এমন একজন মুসলিম নেতার জন্মবার্ষিকীতে অতিথি করছে সরকার।  তবে বঙ্গবন্ধু নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দিলেও অন্য ধর্মের লোকদের তিনি অসম্ভব ভালোবাসতেন। নিজ রাষ্ট্রে তাদের নিরাপত্তাদানে তাঁর কোন গাফিলতি ছিল না। বঙ্গবন্ধুর সংবিধানে ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ।  তাই যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করেন তাঁরা কিভাবে বর্ণবাদী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠা একজন নেতাকে মুজিব বর্ষের অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাবেন?