৭ নভেম্বর: আত্মপরিচয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম

নিউজ

মন্তব‍্যকথা:
।। শামসুল আলম লিটন ।।
মাত্র ৪৪ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ আরেকবার আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে পড়বে, এই আশঙ্কা কেউ কখনো হয়তো দেখেননি । এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আর হাজারো মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাংলাদেশ হারাতে থাকে একের পর এক তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আর অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন। একদলীয় স্বৈরাচার, দুর্ভিক্ষ আর ভয়াবহ দুঃশাসন স্বাধীনতার স্বপ্নকে মলিন করে দেয়। আর রক্তে কেনা স্বাধীনতা বিলীন হয়ে যেতে থাকে সম্প্রসারণবাদের করাল থাবায়।

৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আমরা সকলেই কমবেশি অবগত।‌ তবে সংক্ষেপে এটুকু না বললেই নয় ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের সিপাহী-জনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা যদি রাজপথে নেমে না আসতো তাহলে বাংলাদেশ আজ অবধি হয়তো প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হতো। 

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্রের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের কারণেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে পড়ে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পরপরই জনগণের সেই স্বপ্নের গণতন্ত্র আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কুক্ষিগত হয়ে পড়ে একটি স্বেচ্ছাচারী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং তাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভুদের খপ্পরে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে জাতীয় ঐক্যের বদলে চাপিয়ে দেয়া হয় দলীয় দুঃশাসন।‌ এই ইতিহাস শুধু বাংলাদেশের নয় তৃতীয় বিশ্বের কোন কোন দেশে স্বাধীনতা লাভের পর স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক শক্তি গণতন্ত্রের পথে না গিয়ে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কায়েম এর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। 

এক্ষেত্রে সমসাময়িক কালে জাম্বিয়ার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । স্বাধীনতা লাভের পর জাম্বিয়ার মুক্তি সংগ্রামের নেতা ডক্টর কেনেথ কাউন্ডা ইউনাইটেড ন্যাশনাল ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টির নেতা হিসেবে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিপুল আন্দোলন-সংগ্রাম আর কারাভোগের পর এই জাতীয়তাবাদী নেতার হাত ধরে জাম্বিয়ার নির্যাতিত মানুষ যে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল তা কয়েক বছর না যেতেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ডক্টর কেনেথ কাউন্ডা জাম্বিয়াতে একদলীয় শাসন এবং তার ২৭ বছর টানা দুঃশাসনের যে রেকর্ড তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশ সৃষ্টির পরেও এদেশে একই ঘটনা ঘটেছিল। ডক্টর কেনেথ কাউন্ডার একদলীয় শাসনকে পাকাপোক্ত করতে ক্ষমতা গ্রহণের দুই বছর না যেতেই ৬৮ সালে গণবিক্ষোভের মুখে  জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং এর পর পরই বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় শাসন কায়েম করে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিভাবে এমন হলো এ নিয়ে দৃষ্টান্ত খোঁজার জন্য খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। জাম্বিয়ার ঘটনাক্রমের একেবারেই কার্বন কপি ছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ। প্রথমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি বিরোধী প্রতি দমন-পীড়ন সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ এবং চূড়ান্তভাবে ৭৪ সালে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সংসদে আইন পাশ করে একদলীয় শাসন কায়েম। জাম্বিয়ার মুক্তিকামী জনগণ আর সেনাবাহিনী কেনেথ কাউন্ডার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার সেনা অভ্যুত্থান ও গণ-অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু কেনেথ কাউন্ডার দুধর্ষ গেস্টাপো বাহিনীর কাছে জনতা এবং জনতার মুক্তিকামী সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। পরিণামে কেনেথ কাউন্ডা নিজেকে রাষ্ট্রপতির স্থলে আজীবন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সংবিধান সংশোধন  করেন । এক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং দর্শনগত ভূমিকা প্রসঙ্গে আমি পরে আসবো।

বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ দেখুন। ৭৩-এ একই রকম বিতর্কিত এবং ভোট ডাকাতির নির্বাচনের পর বিরোধীদের দমনের মুখে আর দুঃশাসনের কারণে একদিকে দুর্ভিক্ষ অন্যদিকে, গণবিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ একদলীয় শাসন অভিমুখী সরকার প্রথমে চারটি বাদে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করে। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত সংসদে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিরোধী সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল কায়েম এবং শেখ মুজিবুর রহমান নিজেকে আজীবন রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত রাখার বিধান জাতির উপর চাপিয়ে দেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিলেই একজন রাজনৈতিক নেতা যে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে পারেন না সেটা জাম্বিয়ায় ডক্টর কেনেথ কাউন্ডা আর বাংলাদেশ শেখ মুজিবুর রহমান যেন দুই মহাদেশে ২ প্রবাদ পুরুষ। বছরের ক্রমিক হিসেব করলে দেখা যাবে ডক্টর কেনেথ কাউন্ডা ৭২ সালে তার জাতির উপর চাপিয়ে দিয়েছিল এক দলীয় শাসন ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিব একই কাজ করেছিলেন বাংলাদেশ। ৭৩ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জাম্বিয়ার এই জাতীয়তাবাদী নেতা তার নিজের এবং দলের আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথকে পাকাপোক্ত করেন সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। বছর না ঘুরতে স্বৈরশাসক কেনেথ কাউন্ডার অনুগত ভক্তের মতই বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তার আজীবন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার রাস্তা পরিষ্কার করে নেন। যারা শেখ মুজিবকে আফ্রো-এশীয় নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন তারা বোধ করি জাম্বিয়ার একনায়ক স্বৈরশাসক এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক কেনেথ কাউন্ডার কথাই হয়তো বুঝিয়ে থাকেন।

আফ্রিকার ইতিহাস সর্বজন স্বীকৃত এবং গণতন্ত্র হত্যাকারী হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসের স্বীকৃত ড. ক্যানেথ কাউন্ডা ৭৫ বছর বয়সে এখনো গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক কলঙ্কের  প্রতীক হয়ে বেঁচে আছেন। বাংলাদেশে পট পরিবর্তন না হলে একই ভাবে হয়তো একদলীয় শাসন তথা রাজতন্ত্রের আদলে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর উত্তরসূরীরা  ধারাবাহিক ভাবে দেশ শাসন করতো এবং এর ভয়াবহ পরিণতি কি হতে পারতো সেটা আজকের আওয়ামী শাসনের স্বৈর চেহারা ও বাস্তবতা দেখে যে কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন।

বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ আর অর্থনৈতিক মুক্তির স্লোগান কে নিয়ে মুজিববাদ নামে এক নতুন তত্ত্ব সে সময়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম এর ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। খেয়াল করলে দেখবেন, আফ্রিকার দেশগুলোতে একইভাবে পঞ্চাশ ও ষাটের দশক জুড়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নামে ব্যক্তির দেবত্ব বা মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নানান তত্ত্ব হাজির করা হয় । এরমধ্যে জাম্বিয়াতে মিস্টার কাউন্ডা’র “জাম্বিয়ান হিউম্যানিজম” বা  জাম্বিয়ান মানবতাবাদ, ঘানাায় কোয়ামে নক্রুমা চাপিয়ে দেন বিবেকবাদ(Consciencism), তানজানিয়ায় জুলিয়াস নিয়েরে তার নতুন তত্ত্ব হাজির করেন  উজামা (UJAMA) আর জায়ারে  মবুতু ইজম (MOBUTUISM) ইত্যাদি নামে নতুন তত্ত্ব নিয়ে হাজির হন ষাট আর সত্তর দশকের মহান স্বৈরশাসকগন। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে স্বৈরশাসকদের এইসব তাণ্ডবের মধ্যে বাংলাদেশে শুরু হয় মুজিববাদের ঘনঘটা। রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীকে এই তথাকথিত মুজিববাদের পদতলে সমবেত হতে বাধ্য করা হয়। এই তথাকথিত মতবাদের সমর্থন আদায়ে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ এবং পর্যায়ক্রমে বাকশালের সদস্য হতে প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্য করা হয়। অথচ গণতন্ত্র ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রধান ভিত্তি। আর এভাবেই রাষ্ট্র এবং জনগণ হারিয়ে ফেলে তার সকল মৌলিক আকাঙ্ক্ষা এবং অধিকারের প্রতিটি স্তম্ভ। যেখানে জনগণের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের ন্যূনতম সুযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়। রাস্ট্র মানে এক ব্যক্তি এক দেবতা এবং তার অনুসারী গোষ্ঠী। এই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাজ হচ্ছে গণতন্ত্র স্বাধীনতা আর মুজিববাদের কথা বলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার নির্যাতন লুটপাট খুন রাহাজানি আর জনগণের সকল অধিকার কেড়ে নিয়ে দুঃশাসনের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার অব্যাহত প্রয়াস। এইসব মতবাদ এবং কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ৭১’র মুক্তি সংগ্রাম এবং মুক্তিযোদ্ধাদের শাহাদাত বরণ আর মা-বোনের সম্ভ্রমহানির ত্যাগের মহিমার কোন সম্পর্ক কখনো ছিলনা। রাষ্ট্রক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার লুটপাটের মাধ্যমে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়ে শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় রক্ষীবাহিনীর মতো প্যারামিলিটারি তৈরি করে বাংলাদেশের গর্ব এবং স্বাধীনতার ফসল গৌরবের সেনাবাহিনীকে পরিণত করে একটি সাবসিডিয়ারি বাহিনীতে। এই সেনাবাহিনীর থাকত না পরার বুট, ছিল না দুবেলা খাবার। রক্ষীবাহিনীর পেছনে প্রতিরক্ষা বাজেট খরচ করার ফলে সেনাবাহিনীর প্রতি চরম অবহেলা সাড়ে সাত কোটি মানুষের কাছে স্পষ্ট করে দেয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রতি মুজিব সরকারের কোন আগ্রহী ছিল না সেনাবাহিনীতে লঞ্চগুলো কিছু ছিল না যার ফলে নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে শত শত হাজার হাজার নতুন অফিসার তৈরীর উদ্যোগ এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতি সরকারের ছিল সীমাহীন উদাসীনতা। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও তাদের বাকস্বাধীনতাকে যেমন উপেক্ষা করা হচ্ছিল ঠিক তেমনি ভাবে সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তৎকালীন সরকার নিজেদের মর্যাদাহীন অবস্থান এবং পরমুখাপেক্ষী নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিল।

হাজার বছর ধরে বাঙালি বারবার স্বাধীনতা হারিয়েছে কিন্তু বর্গীরা বেশিদিন দেশকে বাংলা অঞ্চলকে শাসন করতে পারেনি সেই অনেক ইতিহাস। তবে ৭ই নভেম্বরের প্রেক্ষাপটে একথা স্পষ্টভাবে বলা চলে বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যারা ব্যর্থতায় পর্যবসিত করতে বসেছিল তাদের একটা অপশন সবসময়ই সামনে ছিল সেটি হচ্ছে ২৫ বছরের গোলামী। চুক্তি যে চুক্তি বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ কোনদিন মেনে নেয়নি। সেই কারণেই পরমুখাপেক্ষী এবং আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় সচেতন ও দেশপ্রেমিক সকল শক্তি ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন মোহনা থেকে মিলিত হয় ৭ নভেম্বর। যা বাংলার ইতিহাসে সিপাহী-জনতার বিপ্লব দিবস হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এই ৭নভেম্বর সরকারি ভাবে পালিত হলো, কি হলো না তাতে জাতির কিছুই যায় আসে না। কারণ বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি যেমন পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর জন্য ছিল এক পরাজয়ের গ্লানি এবং তাদের দুঃশাসনের বিপক্ষে একটি জাতির রক্তাক্ত প্রতিবাদের ইতিহাস, সুতরাং সেই দিবস পাকিস্তান সরকার যথাযোগ্য পালন করার ঘটনা যেমন হত স্ববিরোধী, তেমনি বাংলাদেশের স্বকীয়তা স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের শক্তি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে সাতই নভেম্বরের মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং পালনের নৈতিক অধিকার না থাকাটাই স্বাভাবিক। ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে ৭ নভেম্বর সরকারি পর্যায় থেকে বিলোপের যে সিদ্ধান্ত তাতে জাতি হিসেবে বাংলাদেশ অবশ্যই বিস্মিত হতে পারেনা। কারণ বাংলাদেশের প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষ এবং সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রক্ষাকারী শক্তি ছাড়া কারো পক্ষেই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই মানচিত্র ও স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার এই দিবস পালন সম্ভব নয়।

১৯৭৩ এর নির্বাচন দেখেছেন, এমন কোটি কোটি মানুষ এখনো বেঁচে আছেন। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী আমাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলেও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়নি। অর্থাৎ জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশে জনগনের  ভোটাধিকার হরণের প্রথম মহড়া দেখা যায় ১৯৭৩ সালে। গণতন্ত্র আর সংবিধানের সঙ্গে সেই উপহাস গত এক যুগে আবারো জাতির বুকে জেঁকে বসেছে। জনগণের সরকারের মূলে আঘাত করছে অনির্বাচিত সরকার।জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা পুলিশ আর প্রশাসন জনগণের পক্ষে থাকতে পারছে না। স্বাধীন দেশের জনগণের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল হওয়া পুলিশের জন্যই অপমানজনক। জনগণকে সর্বক্ষণ ভয়ভীতির মধ্যে অসহায় করে রাখার জন্য দেশব্যাপী দুর্নীতির দানবীয় শক্তির বিস্তার আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। বর্তমানে  সরকারের এমন কোনো বিভাগ নেই, যেখানে দুর্নীতি ঢোকেনি। সরকারি অর্থসম্পদ অবাধে ব্যয় করা হচ্ছে, যাতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এভাবে জনগণের ভোটাধিকারের ক্ষমতার জায়গাটি দখল করে নিয়েছে দুর্নীতির ক্ষমতা।

দুর্নীতি ও অপরাধের রাজনীতি সবচেয়ে অমানবিক রূপ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করার নিষ্ঠুর আচরণে। আবাসিক হলগুলোর মধ্যে ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে ‘টর্চার সেল’। সম্প্রতি বুয়েটের একজন মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে সহপাঠীরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। শুধু বুয়েটেই ছাত্রলীগের ৫০টির মতো নির্যাতন কেন্দ্র পাওয়া গেছে। ব্যাপারটা এ রকম দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন কোনো উন্নয়ন নয়। তরুণদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টির কথা ভাবা হচ্ছে না। সরকারের কাছে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের নামই হচ্ছে উন্নয়ন। এসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু সম্পন্ন করার প্রশ্ন নেই, যাতে অর্থের প্রবাহ সচল থাকে এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য যাদের সমর্থন দরকার তারা খুশি থাকে। তাই বছরের পর বছর ধরে প্রজেক্টের কাজ চলছে।চার লক্ষের কোটিরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার আর তার বিপরীতে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ছাপিয়ে দেশে ফানুস অর্থনীতির ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যে ব্যাপক মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করতে শুরু করেছে।

প্রবৃদ্ধি গালগল্প আর উন্নয়নের কথকথা জাতিকে বিভ্রান্ত করলেও সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধির  উৎকট চিত্র সমাজের সকল পর্যায়ে বিদ্যমান। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, শুধু জিডিপি জনজীবনে আর্থিক সচ্ছলতা আনে না। সাধারণভাবে বলা যায়, জনগণের কল্যাণ, তাদের নিরাপত্তা কিংবা পুলিশের কাছে অসহায়ত্ব সরকারের কাছে মোটেই গুরুত্ব পাচ্ছে না এবং সরকারও সেসব সমস্যার সমাধান করার তাগিদ অনুভব করছে না। শিক্ষিত তরুণদের দুর্বৃত্ত হিসেবে ব্যবহার করেই খুশি। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তোলাই উন্নয়ন কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। যেহেতু সরকার জনগণের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না, তাই সর্বক্ষেত্রে পুলিশ-আমলারাই সরকারের ক্ষমতার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি। জনগণের সেবক হিসেবে তাদেরকে জনস্বার্থে কোনো কাজ করার তাগিদ নেই জনগণের ভোটের ক্ষমতা না থাকায় জনগণের সরকারের গোটা ধারণাই উল্টে গেছে। সরকার গঠনে জনগণের ভোটের প্রয়োজন হচ্ছে না বলেই জনগণ উপেক্ষিত হচ্ছে।

রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের অর্থ গোটা সরকারি ব্যবস্থার দুর্বৃত্তায়ন। আইনের অপব্যবহার বন্ধের ব্যবস্থা না থাকায় কঠিন আইন করার অর্থ আইনের অপব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি করা। জনগণের জন্য অধিকতর বিপত্তি ডেকে আনা। পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করা সম্ভব হলে পুলিশ নিজ স্বার্থেও তার ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার করবে। সরকারের নির্বাচনী জয়-পরাজয় নির্ধারণে যখন পুলিশি শক্তির ব্যবহার করা হয় তখন পুলিশও বুঝে যায় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারবে। যখন সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায় তখন পুলিশও নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে পারে। তাই হচ্ছে দেশব্যাপী। সে জন্য পুলিশকে দোষী করাই যথেষ্ট হবে না। কারণ, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় জনগণের অসহায়ত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। দীর্ঘ দিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে সরকার একটা মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছে গেছে অনেক আগেই এবং আমলাতান্ত্রিক নিষ্ক্রিয়তাও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিরাট বিরাট সাফল্যের মিথ্যা কাহিনী অসার প্রমাণিত হচ্ছে। সরকার নিজেই আর্থিক সঙ্কটে আছে।

৭ নভেম্বর বিশৃঙ্খলার বিপরীতে শৃঙ্খলার ডাক, একদলের বিপরীতে বহু দলের দর্শন। রাষ্ট্রীয় নৈরাজ্যের বিপরীতে জনগণের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। ধ্বংসের বিপরীতে সৃষ্টি সুখের উল্লাস। ৭ নভেম্বর সকল রাষ্ট্রীয় শক্তিকে একদলে যোগদানের বিপরীতে জাতীয় ঐক্য ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংহতির ডাক। ৭ নভেম্বর জাতিকে উপহার দিয়েছিলো স্বৈরশাসনের সমাধির উপর জনগণের শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর। আজকের এই অন্ধকার ও জাতীয় অনৈক্য আর চরম অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক নৈরাজ্যের সময়ে ৭ নভেম্বরই দেশ ও জাতিকে পথ দেখাতে পারে, যদি বাংলাদেশকে আপনি আত্মমর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান। যদি আপনি আপনার সকল জাতীয় নেতৃত্ব আর অর্জনকে সমুন্নত করতে চান। যদি আপনি প্রকৃত মানবিক মর্যাদায় আপনার নিজেকে আর সকল নাগরিককে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। ৭ নভেম্বর জাতির সকল সদস্যকে তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।  যে যেখানে আছেন সেখান থেকেই জাতির চরম দুর্দিনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান। এই আহ্বান কেউ জানাতে পারেন, আবার নাও জানাতে পারেন। তবে কোনো আহ্বানের তোয়াক্কা না করে বিবেকের সংগ্রামে আর বিবেকের নেতৃত্বে এগিয়ে গেলে আবারো ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি সত্যিকার অর্থে মুক্তির বার্তা নিয়ে জয়যুক্ত হবে, এই আশাবাদ প্রকাশ করতে চাই আজকের এই মহান দিনে। ৭ নভেম্বরের সকল সিপাহী জনতার আত্মত্যাগের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
১৮ নভেম্বর ২০১৯
লেখক: সাংবাদিক।