নিউজ

দুষ্টচক্রের কবলে বাংলাদেশ

ডলারের বাজারে আগুন, ডলার খোলাবাজারে ১৩২.৮০ টাকা
পেট্রোলের মজুত আছে ১৩ দিনের
অকটেন ১১ দিনলোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত
এলসি খোলা বন্ধ হচ্ছে ব্যাংকগুলোতে 

।। আরিক শামস ।।
লণ্ডন, ০১ আগস্ট : ডলার সংকটের কারণে ডিজেল কেনা যাচ্ছে না। ডিজেলের অভাবে অনেকগুলো বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এই গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহের সময়ে লোডশেডিং জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দলের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি গ্যাস নিয়মিত কেনা যাচ্ছেনা। সংকট বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাসে। বাড়িতে রান্নাবান্না বন্ধ হবার উপক্রম। লোডশেডিংয়ের জন্য ওয়াসার পানি সরবরাহ বিগ্নিত হচ্ছে। হাজার হাজার বহুতল ভবনে পানি উঠছেনা। অন্যদিকে দলের সংকটের জের ধরে ব্যাংকে ৯৪ টাকা ৪৫ পয়সার দলের খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে ১১২-১১৪ টাকায়। ১৮ টাকা বেবোধানের কারণে ব্যাঙ্কিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বন্ধ হয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হবে. এরফলে রিজার্ভে বড়ো সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এমনিভাবে এক দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশ। এতোদিন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফকে গালাগালি দিয়ে এখন ৪ বিলিয়ন ডলারের জন্য আইএমএফ’র দ্বারস্থ হয়ে আছে. রিজার্ভের হিসেবে নিয়ে আইএমএফ বারবার গোলমেলে হিসেব ঠিক করতে বললেও সরকার তাতে সায় দেয়নি। যারফলে আইএমএফ শেষ পর্যন্ত গোজামিলের হিসেবে দেয়া সরকারকে বিশ্বাস করতে পারছে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। বাংলাদেশ এরআগে  ফরেন কারেন্সী রিজার্ভ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার দেশীয় ব্যবসায়ীদের ঋণপত্রের বিপরীতে দিয়েছিলো, যার প্রায় পুরোটাই আর ফায়ার আসেনি। সেই ৮ বিলিয়ন কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই অবস্থা। সুতরাং দেশের মানুষকে নয়-ছয় বুঝানো সম্ভব হলেও আইএমএফ’কে চোখে ধুলা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হতে পারে। মেগা প্রকল্পের মেগা দুর্নীতি, ৪ লক্ষাধিক কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় পাচার, বিদ্যুৎ সেক্টরে ৫২ হাজার কোটি টাকার(সেটাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রায়) হরিলুট, দুর্নীতি আর চুরির টাকায় ডলার কিনে গচ্ছিত রাখার হিড়িক, আর এসবকিছুর জেরধরে সর্বশেষ ডলার সংকট অর্থনীতিতে তৈরী করেছে এক মহাদুষ্টচক্র। এই দুষ্টচক্রের খপ্পরে জনভোগান্তি এখন কতটা প্রকট হয় সেটাই দেখার বিষয়।  

ডলারের বাজারে মারাত্মক অস্থিরতা
ঢাকায় ডলারের বাজারে মারাত্মক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যাংকের রেটের সঙ্গে খোলাবাজারে পার্থক্য ১৮ টাকা। এই পার্থক্য ৮ থেকে ১০ টাকা হলেই ব্যাঙ্কিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হয় । সেখানে অভিজ্ঞ মহল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মনে করছেন। জানুয়ারী মাসে ব্যাংকে প্রতি ডলার ছিল ৮৫ টাকা, আর খোলাবাজারে ছিলো ৮৮/৮৯টাকা। আর ২৬ জুলাই মঙ্গলবার খোলাবাজারে ১৩২.৮০ টাকায় বিনিময় হতে দেখা গেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারের কৃচ্ছতা সাধনের সঙ্গে ডলারের বাজারে অস্থিরতার সম্পর্ক স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন একজন বিশ্লেষক। ঢাকায় অবস্থান করার কারণে নাম প্রকাশকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

পরিস্থিতি যে নিয়ন্ত্রণের তার প্রমাণ পাওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ও সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত আরিফ আর হোসেনের স্ট্যাটাসের উল্লেখ করা যায়. নিজের ভেরিফাইড পেইজে বিকাল ৫টায় তিনি লিখেন- “সকাল ১১ টায় ডলার ছিল ১০৬ টাকা। ফোন রাখার সাথে সাথে টেক্সট করলেন উনি, “ভাই ১০৬ না ১০৯… আমিতাভ বচ্চন সাহেবের যেমন ‘আখেরি রাস্তা’ মুভিতে ৬ আর ৯ নিয়ে গোলমাল লাগসিলো, তেমনি আমারও লাগসে” কিনতে পাঠালাম যখন, তখন শুনি ১১০। আমার লোক যখন দোকানে পৌছালো, তখন ১১২। ডলার নিয়ে আমার লোক যখন আমার অফিসে পৌছালো, তখন মানি এক্সচেইঞ্জের মালিকের টেক্সট; “ভাই ডলার ফেরত দিলে আমি ১১৩ তে কিনতে রাজি আপনার কাছ থেকে কারণ আমার সামনে লোক দাড়িয়ে আছে যে কিনা ১১৪ তে কিনতে রাজি। আইজ ভাই ‘আখেরি রাস্তা’ অবস্থা না, পুরা আখেরি পাস্তা”… SAVE THE DATE, something is not right today.
আরিফ আর হোসেনের এই স্ট্যাটাসের নিচে মন্তব্যগুলো থেকে সাধারণ জনতার উদ্বেগের চিত্র আরও স্পষ্ট: সরকার পন্থী অবসরপ্রাপ্ত আমলা মাহবুব কবির মিলন, যাঁকে হাইকোর্ট (হয়তো সরকারের ইচ্ছায়)প্রতারণার মাস্টারমাইন্ড ডুবন্ত টাইটানিক
কেলেঙ্কারী উদ্ধারের দায়িত্ব দিয়েছেন, তিনি চরম হতাশায় লিখেন-“সমস্যা তাহলে আসছে”। মুসলিমউজ্জামান লিখেছেন-
“সরকার বলে দেশ “সিংগাপুর” হবে, বিরোধীরা বলে “লংকা”, জিনিসের দরে রুদ্ধশ্বাসে, চিপায় শুধু আমজনতা!”মীর জুনায়েদ বলছেন- “সবকিছুর দাম বেড়ে যাচ্ছে এই ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে। বিপদ সংকেত দেশের জন্য!!”
বিদেশ থেকে ফেসবুক/ ইউটিউব ও নানারকমের ডিজিটাল সার্ভিসের মাধ্যমে আয়কৃত ডলার বাংলাদেশের গ্রহীতারা পাচ্ছেন বেঁকে রেটে। এরকম একজন শাহীনসহ মঈদ লিখেছেন— “আর এদিকে আমাদের ইউটিউব থেকে আনা রেমিটেন্সে আমরা পাই ৯২-৯৪ টাকা … এখন বুঝলাম প্রবাসিরা কেনো হুণ্ডিতে যায়… ”পিয়ারুল ইসলাম বলেছেন— “ডলারের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রত্যেকটা কারেন্সি এমনই ,এখন থেকে দুই/তিন মাস পূর্বেও কাতারের ১রিয়াল সমান বাংলাদেশি টাকায় ২৩.৫ ছিলো আজকের রেট ২৮.৫০ টাকা, প্রিয় স্বদেশ” মোহাম্মদ আলী জাভেদ লিখেছেন- ” উন্নয়নের নমুনা মাত্র শুরু। জয় বাংলা।”

আরেকজন লিখেছেন- “WELCOME TO SRILANKA”
গত রোববার(২৪জুলাই) খোলাবাজারে মার্কিন ডলার ১০৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হয়েছে। অন্যদিকে ডলারের দাম আনুষ্ঠানিক ৯৪ টাকা ৪৫ পয়সা হলেও  ব্যাংকিং চ্যানেলেও মুদ্রাটির দর ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে। এভাবে ডলারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অন্য বিদেশি মুদ্রা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মুদ্রার দাম বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুয়েতি দিনার, সৌদি রিয়াল, আরব আমিরাতের দিরহাম, কাতারি রিয়াল এবং ওমানি রিয়াল। এতে আমদানি পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করেন তারা।  জানা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে কুয়েতি দিনারের দাম বেড়েছে প্রায় ৫৩ টাকা। রোববার প্রতি কুয়েতি দিনারের বিনিময় হার ৩৩৩ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এক মাস আগে এক দিনারের বিপরীতে ২৮০ টাকা ছিল।

পেট্রোলের মজুত আছে ১৩ দিনের, অকটেন ১১ দিন

জ্বালানী তেলের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিপিসি। এরই মধ্যে পেট্রোল ও অকটেনের মজুত দিন দিন কমে আসছে। বর্তমান মজুত দিয়ে পেট্রোলের চাহিদা পূরণ হবে মাত্র ১৩ দিন আর অকটেন ১১ দিন।ডলার সংকটের কারণে চলতি সপ্তাহে এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক টেন্ডার থেকে বাংলাদেশ পেট্রোল ও ডিজেল কিনতে পারেনি বলেই জ্বালানীর মজুত আশংকাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে এই ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া না হলেও ডেইলি স্টারকে খবরটি তুলে নেয়ার পেছনে দুই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। একপক্ষ বলছে, বিপিসির মহৎ ব্যবস্থাপনায় এটাই সর্বোচ্চ। ১২-১৫ দিনের বেশি  মজুত রাখার কোনো ব্যবস্থা নাই। তবে বিপিসি সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তথ্য উড়িয়ে দেন. তার ভাষায়, ন্যূনতম ৪৫-৬০দিনের তেলের মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে এবং গত ৩০ বছর যাবৎ এটাই হচ্ছে সাধারণ চাহিদা ও যোগানের সাধারণ চিত্র। ৩০ দিনের নিচে মজুত থাকা মানে সংকট ঘনীভূত হওয়ার স্পষ্ট আলামত।এটাকে হলুদ লাইটও বলা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ২/৩টি চালান মিস করলেই আর সেটা সামাল দেয়া যাবেনা। পরে “জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে চিন্তিত নয় বিপিসি” শিরোনামে সংশোধিত খবর ছাপে পত্রিকাটি।

ডেইলি স্টারের ওই খবরে বলা হয়েছে, চলতি মাসের ২৫ দিনের জ্বালানি তেল বিক্রির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার ৪৫৩ মেট্রিক টন। ফার্নেস অয়েলের চাহিদা দৈনিক ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। অকটেন চাহিদা ১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন।  আর পেট্রোলের চাহিদা ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। জেট ফুয়েলের চাহিদা দৈনিক ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। এই হিসাবে, দেশে ১৩ দিনের পেট্রল, ১১ দিনের অকটেন ও ৩০ দিনের ডিজেল মজুদ আছে।

এলসি খোলা বন্ধ হচ্ছে ব্যাংকগুলোতে

ডলার সংকটের কারণে এলসি খোলা বন্ধ হচ্ছে ব্যাংকগুলোতে। বাংলাদেশ ব্যাংকার নির্দেশে জনতা বব্যাঙ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট(মতিঝিল)  বৈদেশিক বাণিজ্য শাখাসহ প্রধান ৫টি শাখা এখন আর এলসি খুলতে পারছেনা। ৫০ লক্ষ ডলারের উর্ধে এলসি খোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক থেকে অনুমতি নেয়ার নির্দেশনা(যা ডলার সংকটের কারণে জারি করা হয়েছিলো) অমান্য করায়  বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক জনতার ৫টি শাখাকে এলসি খোলার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।এদিকে একই কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক এলসি খোলার অধিকার হারাতে পারে বলে জানা গেছে।

নিউজ

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close