ফিচার

লণ্ডনে এক ভাবসন্ধ্যা: মৌসুমী ভৌমিকের কণ্ঠে মরমী সাধক পীর মজিরের গান

'খেনেবা তারে চিনিলাম'

|| কাইয়ূম আবদুল্লাহ ||
লেখক: কবি, সাপ্তাহিক সুরমার বার্তা সম্পাদক

এ এমন এক সন্ধ্যা! যা প্রকাশের মতো ভাব, শব্দ, বাক্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবু যে তা প্রকশের দায় ঘুচাতে হবে! অনন্য সেই মুহূর্তটি মুঠোফোনে ভিডিও করার কারণে আরো কাল হলো যে — বার বার ভিডিওটি শুনছি, আর ভাবনায় ডুবে যাচ্ছি …, লেখার সময় ফুরাচ্ছে। যেভাবে মন দিয়ে লেখার দরকার তা আর হচ্ছে না। তবু দেরীতে হলেও সেই সন্ধ্যাটির কথাই বলার চেষ্টা করছি। অপার এক মুগ্ধতায় সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হয়ে কখন যে মধ্যরাত হয়ে গেলো, তা কারোরই খেয়াল ছিলো না। “ … খেনেবা তারে চিনিলাম”! ভাব সায়রের এমন প্রশ্নবানের আধারিত ঢেউ যখন তীরে এসে অছড়ে পড়ে তখন জীবনের বেলাভূমে দাঁড়িয়ে অন্যকিছুরই কথা আর মনে থাকে না। ফানাফিল্লাহ হয়ে সেই “তারে” চিনতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে বিবাগী মন। বলা যায়, এমন সেই সন্ধ্যা ছিলো সেদিন …! জীবনের ফেরারী উৎসবে প্রশান্তিময় সেরকম সন্ধ্যা আর কি ফিরে আসবে কখনো — এমনই ভাবনা মনে অনুরণন তুলে অনুক্ষণ। যদি আরো কিছুটা সময় বসা যেতো, যদি আরো কিছু গান হতো, ভাব-ভবিতব্যের কথা হতো প্রণজ পরিবেশে!

সুরমা অফিসে গল্পসন্ধ্যা

সঙ্গীত সাধক মৌসুমী ভৌমিক এবং …
“আমি শুনেছি তোমরা নাকি এখনো স্বপ্ন দেখো/এখনো গল্প লেখো গান গাও প্রাণ ভরে” অপূর্ব সুর-তালে গাওয়া কিংবা ঐতিহাসিক “যশোর রোড” বা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাওয়া “বাড়ি কোথায়?” গানগুলির সাথে যার অন্তরাত্মা, আবহ-সুর মিশে একাকার তাঁর নাম না বললেই চলে। তবু বলছি, তিনি সেই সঙ্গীত সাধক মৌসুমী ভৌমিক। প্রায়ই তিনি বিলেত সফরে এসে থাকেন। তবে কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নয়। একান্তই সঙ্গীতের সন্ধানে। এই গুণী শিল্পী যতোটা না গান গেয়ে, শুনিয়ে, তারও চেয়ে বেশী এর সাধনা করে চলেছেন। গবেষণা কাজেই মূলতঃ তিনি বিলেতে আসেন বেশী। তবে এলে যে গান করেন না তাও কিন্তু নয়। এখানকার অনেকগুলো সঙ্গীত দলের সাথে তাঁর সখ্যতা ও সম্পর্ক। খুঁজে বেড়ান সঙ্গীতের সব মণি-মুক্তো, বিশেষ করে মরমী ও বাউল ঘরানার সব গান এবং সেসবের ইতিহাস। বলা যায়, বিপুল ব্যস্ততায় কাটে তাঁর বিলেতের দিনগুলি। এসব সন্ধানের সূত্র ধরে আরেক ভাবুক কবি, মরমী পরিবারের সন্তান আহমদ ময়েজের সাথে পরিচয় ঘটে এই খ্যাতিমান সঙ্গীত সাধকের। সময় সুযোগ পেলেই দুজনের মধ্যে চলে ভাব বিনিময়, মরমী বা বাউল সঙ্গীতের স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলাপ-আলোচনা এবং এসবের মর্মকথার নিগূঢ় রহস্য ভেদের চেষ্টা। কবি আহমদ ময়েজের মাধ্যমেই এই আমারও কয়েকবার এই গুণী শিল্পীর সান্নিধ্যে যাবার সুযোগ হয়েছে। যতোটুকু মনে পড়ে, একবার সেন্ট্রাল লণ্ডনে পারাপার’র একটি সঙ্গীত সন্ধ্যায়, আরেকবার মৌসুমী ভৌমিকের শর্ডিচের একটি অবস্থানে এবং এইবার সুরমা অফিসের আড্ডায়। এছাড়া ২০১৫ সালে পূর্ব লণ্ডনের বাঙালি পাড়া বেথনাল গ্রীনের রিচমিক্সে একটি সঙ্গীত বিষয়ক ণ্টদ্যা ট্রাভেলিং’ আর্কাইভ প্রদর্শনীতে দেখা হয়। উক্ত প্রদর্শনীতে বাংলার মাঠপর্যায়ের বাউল ও লোকসঙ্গীতের সাউণ্ড, টেক্স, ইমেজ ও পারফরমেন্স স্থান পায়।

এতক্ষণ যে মৌসুমী ভৌমিকের কথা বললাম তাঁর সম্পর্কে এই স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। তারপরও সংক্ষেপে যদি বলিÑ জীবনমূখী বাংলা গানের যে ধারা রয়েছে তাতে মৌসুমী ভৌমিক এক অনন্য পরিচিত নাম। মৌসুমী ভৌমিকের বেশীরভাগ গানে লেপ্টে আছে শূন্যতা, তীব্র বিষাদ ও একাকিত্ব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর দুঃখবোধের খতিয়ান হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে স্বপ্নসারথি। মানুষকে তা স্বপ্ন দেখতে শেখায়, স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতেও শেখায়। নিজের একাকিত্ব ঘুচাতে অনেকে নির্জনে তাঁর গানই বেছে নেয়। শ্রোতার হৃদয়ে অনন্য আসন নেয়া সেই মৌসুমী ভৌমিকের পরিচয়ও শুধু গানের শিল্পী নয়। তাঁর পরিচয় একাধিক। তিনি একধারে একজন সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার, লেখক, অনুবাদক, সম্পাদক, লোকসঙ্গীত সংরক্ষক, ফিল্ড রেকর্ডিস্ট ও গবেষক। ২০০০ সালে প্রকাশিত “এখনো গল্প লেখো” অ্যালবামে মৌসুমীর গাওয়া “স্বপ্ন দেখব বলে” গানটি সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি এই গানটির গীতিকার এবং সুরকারও। এর আগে ১৯৯৯ সালে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে সৃষ্টি করেছিলেন “যশোর রোড” গানটি। কোনো একটি গানের মাধ্যমে গোটা একাত্তরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তুলতে তাঁর এই গানটিকেই মনে করা হয় সবচেয়ে বেশী প্রণিধানযোগ্য। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বশেষ অ্যালবাম Songs from 26H
গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি সঙ্গীতবিষয়ক গবেষণাও করে চলেছেন। পশ্বিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, আসাম, ল§নের নানা প্রান্তের মানুষের লোকগানের সংগ্রাহক মৌসুমী ভৌমিক প্রতিষ্ঠা করেছেন (www.thetravelingarchive.org) ট্রাভেলিং আর্কাইভ। সবশেষে বলতে চাই, যে মৌসুমী কলকাতার শিল্পী হিসেবে পরিচিত তাঁর শেকড় জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সাথে। তাঁর বাবা ও মায়ের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিলো অধুনা বাংলাদেশের পাবনা ও বরিশালে। সাতচল্লিশে দেশভাগের আগে তাঁদের পরিবার চাকরিসূত্রে স্থিত হয়ে ভারতে। আর তাই মৌসুমীর জন্ম ভারতের জলপাইগুঁড়িতে এবং বেড়ে ওঠা মেঘলায়ের শিলংয়ে।

… খেনেবা তারে চিনিলাম:
এমন চিরায়ত চিন্তা জাগানিয়া প্রশ্নকারী হচ্ছেন আঠারা শতকের অন্যতম সুফি চিন্তক পীর মজীর। মরমীধারার অন্যতম এই সাধক নিজেকে ফকির হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ অনুভব করতেন। তাই তাঁর প্রায় গানের ভনিতায় এই পরিচয়ই পাওয়া যায়। উপরোল্লেখিত গান ছাড়াও তাঁর অনেকগুলো নিগুঢ় মরমী গান রয়েছে। নাগরি হরফে রচিত তাঁর ছয়টি গ্রন্থও রয়েছে এই মরমী সাধকের। তাঁর গানগুলো ধ্রুপদী ও গভীর অর্থবোধক। “আমি নগরে নগরে ঘুরিলাম”, “গুরুর কাছে মর্ম জানতে হয়”, “কে বানাইলো সাউধের লাঠি”, “তন রাধা মন কানু ভাইবা দেখো মনে” ইত্যাদি অনেকগুলো গভীর অর্থবোধক আধ্যাত্মিক গানের রচযি়তা তিনি। তবে প্রচারের অভাবে এই আধ্যাত্মিক গানগুলো সাধারণ্যে পরিচিত হতে পারেনি। “কে বানাইলো সাউধের লাঠি” গানটি অবশ্য স¤প্রতি বাউল শাহাবুদ্দিনের কণ্ঠে গীত হয়েছে, যা ইউটিউবে চ্যানেলে সার্চ করে শোনা যায়।

একটি গবেষণা প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ফকির মজীর উদ্দীন আহমদের জীবতকাল ১৮৬৩ থেকে ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁর রচিত ভেদ জহুর পা§ুলিপি ঘেঁটে “ভেদ জহুরের ভেদ ও অভেদকথা” শীর্ষক প্রবন্ধে মরমী ও লোকসাহিত্য গবেষক মোস্তাক আহমদ দীন লিখেছেন, “যে অঞ্চলে বসে বহু আঞ্চলিক শব্দসংবলিত গান ও পয়ারের সমন্বয়ে এই পাণ্ডুলিপি তৈরী করেছেন, সেই অঞ্চলেই আমাদের বেড়ে ওঠা; তাঁর গানে যে আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা থেকে অনেক শব্দ যুক্ত হয়েছে, সেই তিন ভাষার শব্দ সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকা সত্ত্বেও লিপ্যন্তরিত ভেদ জহুর-এর পয়ার ও নানা পদের কিছু শব্দের অর্থোদ্ধার করতে আমাদেরকে যারপরনাই নাকাল হতে হয়েছে। আমাদের ধারণা, এর কারণ, ভেদ জহুর রচয়িতা ফকির মজির উদ্দিন আহমদ ফকিরি ভেদ জহুর বা প্রকাশ করবার জন্য আম পাঠকের কথা মাথায় না রেখে তাঁর খাস ভক্ত পাঠককুলের কথাই মনে রেখেছেন আর তাদের উপলব্ধির জন্য দরকারমতো স্থানীয় শব্দ ও আরবি-ফারসি শব্দের অপভ্রংশ এবং কখনো পারিভাষিক শব্দের বর্ণান্তরিত প্রচলিত রূপও গ্রহণ করেছেন।”

প্রথমে উদর পূর্তি অতঃপর মরমী মজমা:
তিনি যে উঁচুমাপের সেলিব্রেটি শিল্পী, চাইলে “মৌসুমী ভৌমিকের সাথে আড্ডা” শিরোনামে বিশাল ব্যানার টাঙিয়ে বেশ ঘটা করে একটি অনুষ্ঠান করা যেতো। কিন্তু একান্তে, সচেতন স্বজ্জন সান্নিধ্যে খোলামেলা যে কথাবার্তার উদ্দেশ্য, সেটি আর হতো না। মৌসুমী ভৌমিকও চাননি অকারণ হইহুল্লোড়। আর আমরা যারা এধরনের আড্ডায় বসে অভ্যস্ত আমরাও কখনো ব্যানার-ফেস্টুন টানিয়ে প্রপাগাণ্ডা ছাড়া প্রকৃত আড্ডা হয় বলে বিশ্বাস করি না। তাই স্বাভাবিকভাবেই কবি আহমদ ময়েজের ডাকে যে যার মতো করে আমরা পেঁৗছলুম সুরমা অফিসে। আমরা বলতে সুরমা সম্পাদক শামসুল আলম লিটন, লেখক-গবেষক ফারুক আহমদ, সুরমার বিভাগীয় সম্পাদক কবি ডরিনা লাইজু, বিলেতের সুপরিচিত সঙ্গীতশিল্পী ও আবৃত্তিকার সোমা দাস, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী সোহা চক্রবর্তী ও সংস্কৃতিকর্মী রিয়াদ হায়দার খান। নানা বিষয়ে একথা, সেকথা, চা-নাস্তা, পেটভর্তি খাবার আর বিভিন্ন গানের মরমী মূর্ছনায় কাটলো এক অনন্য সন্ধ্যা। আড্ডায় নিমগ্ন হবার আগে সামান্য হইহুল্লোড়ও হয়ে গেলো। সঙ্গীত বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার কাজে বৃটেনের স্বনামধন্য সোয়াস ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত বুধাদিত্য ভট্টাচার্যের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে কেক কাটা, মিষ্টিমুখ এবং ফুলের শুভেচ্ছা ও উপহার প্রদানের মধ্যদিয়ে প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। একই সাথে চলে নানা পদের সুস্বাদু হোম মেইড খাবার গ্রহণ। সবাইকে আপ্যায়িত করতে সঙ্গীতশিল্পী সোহা চক্রবর্তী সুদূর এজওয়ার থেকে খাবার সাথে নিয়ে এসেছিলেন।

আর আড্ডায় শুধু গানই বা উদরপূর্তি করে খাওয়া-দাওয়াই ছিলো না, ছিলো সঙ্গীত বিষয়ক নানা আলোচনা, যুক্তিতর্কের যৌক্তিক উপস্থাপনা। মৌসুমী ভৌমিকের সঙ্গে সঙ্গীতবিষয়ক যুক্তিতর্কে অংশ নেন কবি আহমদ ময়েজ, সুরমা সম্পাদক শামসুল আলম লিটন ও গবেষক ফারুক আহমদ। তাদের আলোচনায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক গানের সুর, কথা এবং সামাজে এর প্রভাব সম্পর্কিত বিষয় ওঠে আসে।

লালন রহস্য, একজন নাকি অনেক:
মরমী বলি কিংবা বাউল সঙ্গীত। ফকির লালন ছাড়া এই ধারার সঙ্গীতের কোনো আলোচনাই জমে না। কিংবা বলা যায়, লালনকে বাদ দিয়ে এধারার গানের আলোচনাই শুরু করা যায় না। মৌসুমীও সেই রহস্য দীঘির জলে ঢিল মারলেন প্রথমেই। প্রশ্ন রাখলেন— কে সেই লালন? একজন না অনেকজন! কারণ, লালনের যে সময়কাল ছিলো তখন লিখিত রেকর্ডের সময় শুরু হয়ে গেছে। কাগজ আছে, কলম আছে। বহু আগে থেকে বই ছাপাও শুরু হয়ে গেছে। তবু লালনের গানের হাতে লেখা কোনো পাণ্ডুলিপি নেই, নেই কোনো মুদ্রিত স্ক্রিপ্টও। যে গানগুলো লালনের নামে পরিচিত সেই গানগুলোইবা আদৌ লালন করেছিলেন কীনা? নাকি লালন কোনো কাল্পনিক নির্মাণ — তা নিয়েও সন্দেহ ও প্রশ্নের তীর ছুড়ে দেন আড্ডার মধ্যমনি মৌসুমী ভৌমিক। মধ্যখানে আরো যোগ করলেন আহমদ ময়েজ। তিনি বলেন, অনেক সময় শিষ্যরাও তাদের গান মুর্শিদের নামে ছেড়ে দেয়। তিনি তাঁর দাদা পীর মজিরের দুটি গানের কথা উল্লেখ করে বললেন, তিনি গানগুলো শুনেছিলেন তাঁর দাদার একজন শিষ্যের মুখে। অথচ খুঁজতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তিত। এই গানগুলোই তাঁর দাদার গান হিসেবেই লিপিবদ্ধ পেয়েছেন গবেষক অধ্যাপক মুস্তাক আহমদ দীন। ওই গবেষক তাঁর স্মরণাপন্ন হলে তিনি আসল সত্যটি প্রকাশ করেন। মৌসুমীই প্রশ্ন করেন — আপনি জানলেন কী করে যে এটা আপনার দাদার গান নয়? উত্তরে ময়েজ জানান, তিনি গানগুলো তার দাদার শিষ্যদের ভনিতাসহ শুনেছেন। কিন্তু অনেক সময় শিষ্যরা যখন তার মুর্শিদের সামনে গায় তখন তাদের নিজের নামের বদলে মুর্শিদের নামেই গায়। এবার কথায় যুক্ত হলেন আড্ডার আরেক বোদ্ধাজন গবেষক ফারুক আহমদ। তিনি তখনকার সময়ের ঘেটু গান, মালজুরা গানের আসর ইত্যাদির প্রেক্ষাপট বর্ণনা দিয়ে বলেন, “একদিন তর হইবরে মরণ” বিখ্যাত সেই কালজয়ী গানটি আসলেই হাসন রাজার কীনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তিনি। হাসন রাজার সব গান যেমন হাসন রাজার নয়, তেমনি যতই “ভাইবে রাধা রমণ বলে” উল্লেখ থাকলেও তাও যে রাধা রমণের সেটিও শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। কারণ, গানের মল্লযুদ্ধে মজলিস পরিবেষ্টিত শিষ্যরা তাদের গুরুকে খুশি করতেই তাদের নামে ভনিতা দিতো বা কর্তার নাম নিয়ে গান করতো।
কথা প্রসঙ্গে জাতীয় সঙ্গীতের বিষয়ে আলোচনা গড়ালো। এর মৌলিকত্ব নিয়েও অনেক কথা হলো।

বুধাদিত্য’র জন্মদিনও ছিলো আড্ডার অন্যতম উপাদান (ছবিতে বাম থেকে ৪র্থ)

গান ও সুরের মৌলিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি, বিতর্ক:
মনে হয়েছিলো প্রিয় ও পছন্দের এই শিল্পীর সান্নিধ্য কাটবে শুধু গানে আর গানে। কিন্তু তা আর হলো না। গানের মৌলিকত্ব, সুর, সৃষ্টিকাল এসব নানা বিষয়ে শুরু হলো তুমুল তর্ক। আর সেই কারণেই খুব একটা গান হলো না। আসলে মানুষের কোনো সৃষ্টিই ষোল আনা যে খাঁটি বা মৌলিক নয় — সেই সত্যকেই মানতে হলো অবশেষে। সব গান বা সুর যে মৌলিক নয় সেই আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে ওঠে আসে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের কথা ও সুরের প্রসঙ্গ। সুরমা সম্পাদক শামসুল আলম লিটন স্মরণ করিয়ে দেন— সবচেয়ে বেশী বিতর্ক শোনা যায় মনে হয় “আমার সোনার বাংলা” গান নিয়ে। তখন মৌসুমি ভৌমিক তাঁর গবেষণালব্ধ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইউরোপ ভ্রমণের সময়কার দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যের উদাহরণ দিয়ে বলেন, না এবিষয়ে কোনো বিতর্কই নেই। কারণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সেকথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি গগন হরকরার নাম পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে বলেছেন, কীভাবে একজন পোস্টম্যান তথা সাধারণ মানুষও এতো সুন্দর গান রচনা করতে পারে তা ভেবে তিনি অবাক হয়েছিলেন। তিনি সেটিকে উপনিশদের বাণীর সাথে তুলনা করেছিলেন। আর শুধু কি গগন হরকরার গান? ‘আমার সোনার বাংলা’ রচনার সময়ে তাঁর মনের তলায় কোন্ শোনা বা শ্রবণ কাজ করেছিলো তাওতো বলা মুশকিল। আর গগন হরকরার গানও যে মৌলিক বা তাঁর নিজের সেটিরওতো কোনো নিশ্চিয়তা নেই! আলোচনা শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আসলে কোনো কিছুই মৌলিক নয়, সবকিছুই চলে আসছে পরম্পরা।

এক সময় এ অনন্য আড্ডা ভাঙ্গলো ঠিকই। কিন্তু এতে গীত হওয়া মরমী গানগুলোর অনুরণন বেজেই চললো অনেকদিন। চারপাশের প্রকৃতিও যেন সেই চিরন্তন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় — খেনেবা তারে চিনিলাম।

প্রিন্ট ভার্সন ১
প্রিন্ট পৃষ্ঠা ২

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close