ফিচার

স্মরণ: বীর মুক্তিযোদ্ধা ম আ মুক্তাদীর

।। মো. গয়াছুর রহমান গয়াছ ।।

লেখক: রাজনীতিক ও সমাজসেবক।

সত্তর ও আশির দশকের আপোসহীন ছাত্রনেতা, সিলেটও জাতীয় দাবী-দাওয়া আদায়ে সোচ্চার,গরীব মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথের লড়াকু সৈনিক। একই সাথে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী কমিউনিটির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ম. আ. মুক্তাদিরের ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৪ সেপ্টেম্বর। ম আ মুক্তাদির স্মৃতি কল্যাণ ট্রাষ্ট প্রত্যেক বৎসর বাংলাদেশ, লণ্ডন, আমেরিকায় এই দিবস উদযাপন করে থাকে। মুক্তাদিরের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা সরকারি মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ও (বাসদ) ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি শাহাব উদ্দিনের বিশেষ উদ্যোগে দেরিতে হলেও তাঁর শুভানুধ্যায়িরা ট্রাষ্ট গঠন করেন। এ বছর করোনার কারণে সীমিত পরিসরেও এবং লেখনির মাধ্যমে তাকে স্মরণ করা হচ্ছে। মুক্তাদির ভাইর স্মৃতি আমাকে সবসময় তাড়া করে এবং প্রেরণা যোগায় — সে নিয়েই আমার আজকের নিবেদন।

মুক্তাদির ভাইয়ের সঙ্গে আমার এমন কিছু স্মৃতি রয়েছে যা তাঁকে আমার মনের মনিকোঠায় চির-অম্লান করে রেখেছে। ১৯৮০-৮১ সালে সরকারী মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সময় তাঁর খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ হয়েছিলো। শাহাব ভাই যখন ভিপি প্রার্থী ছিলেন আমি তখন ছাত্রলীগ (মান্না-আক্তার ) মদনমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখার সভাপতি ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রার্থী ছিলাম। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদ যখন সামরিক শাসন জারী করেন সেই আন্দোলনের একজন অগ্রসৈনিক ছিলেন মুক্তাদির। তখন প্রায় রাত্রে মুক্তাদির ভাই, আমি ও শামীম সিদ্দিকীকে একসঙ্গে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। আজকের মধুবন মার্কেট এটাছিল সিলেট সরকারী পাইলট হাইস্কুলের ছাত্রাবাস। তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান গোপনে তা বিক্রি করে দেন। এর প্রতিবাদে সিলেটের ছাত্র-জনতা কঠোর আন্দোলনে ফেটে পড়েন। সেই আন্দোলনেরও প্রথম সারির নেতা ছিলেন মুক্তাদির ভাই। সিলেট বিভাগ আন্দোলন, সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ তেল, গ্যাস অবৈধভাবে বিদেশেী কোম্পানি নাইকোর কাছে চুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে মুক্তাদীর ভাই ছিলেন আপোসহীন নেতা। সেসব আন্দোলনে মুক্তাদির ভাইয়ের সাথে মিছিলে থাকার সুযোগ আমারও হয়েছিল। সেই যে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কের সুত্রপাত ঘটে এর সমাপ্তি ঘটে তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে। ল-নে আসার পরও সবসময়ই তাঁর কাছাকাছি ছিলাম। তিনি ছিলেন একজন সাদা মনের মানুষ এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঙালি মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা, দেশমাতৃকাকে মুক্ত ও একটি স্বাধীন লাল সবুজের পতাকার জন্য নিজের জীবন বাজী রেখে যাঁরা মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদেরই এক বীর সন্তান সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কদমতলী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম ম আ মুক্তাদির। তিনি মেজর সি আর দত্তের নেতৃত্বে ৪নং সেক্টরে একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।

ম আ মুক্তাদির রাজনীতি করতেন মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সমাজের আমূল পরিবর্তন ও অগ্রসর চিন্তার মানুষের বিপ্লব ঘটানোর লক্ষ্যে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। নির্যাতন আর জেল-জুলুমকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিলেন নতুন সূর্যোদয়ের আশায়। তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একজন নিবেদিত সমাজকর্মী হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি আমৃত্যু স্বপ্ন দেখেছেন একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণহীন বাংলাদেশের।

আপোসহীন এই ছাত্রনেতা, বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের জন্মলগ্নে জাসদ ছাত্রলীগে যোগ দেন এবং জাসদের বলিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে ১৯৭৩ সালে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের (জাসদ) সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি এমসি কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষা দেন। ১৯৭৬ সালের ৯ জুন জাসদ রাজনীতির চরম দুর্দিনে জেলা জাসদ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মনোনীত হন তিনি। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ জাসদ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে তিনি দ্বিতীয় বার ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালে বাসদ প্রতিষ্ঠা হলে তিনি বাসদের কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেট জেলা বাসদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব গ্রহণে তিনি কিছুদিন বাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এক কথায় সিলেটে বাসদের জন্মদাতা ম. আ. মুক্তাদির। বাসদ এবং ছাত্রলীগ যতদিন থাকবে মুক্তাদিরও ততোদিন প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বেঁচে থাকবেন।

১৯৮৪ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮৬ সালে তিনি লণ্ডনে পাড়ি জমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি যেমন সক্রিয় ভূমিকা রাখেন ঠিক তেমনি ল-নে প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে বাসদকে সংগঠিত করেন এবং পরবর্তীকালে যুক্তারাজ্যে লেবার পার্টিতে যোগ দেন। বিলেতের মাটিতে তিনি শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। সামাজিক ও সংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল। ২১শে ফেব্রুয়ারী — শহীদ দিবস, বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ল-নে প্রবাসী সিলেটী ও বাঙালিদের দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নের আন্দোলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, প্রবাসী বাঙালিদের হয়রানি, নারী নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠা আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধী ও সা¤প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি ঘোষিত আন্দোলনে প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করেন এবং স্বৈরাচার-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে ল-নে বলিষ্ঠ সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ল-নে মুক্তিযুদ্ধেও চেতনা মঞ্চের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

ম. আ. মুক্তাদির ১৯৯৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রয়েল লণ্ডন হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও ১ মেয়েসহ বহু আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে যান। তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে নিয়ে সিলেট শহরতলীর কদমতলীতে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

২৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দেখানোর মধ্য দিয়ে নিজের দেশ ও জাতির প্রতিই সম্মান দেখানো হয়। তাই আমারা আশা করি সরকার এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে স্মরণ রাখার জন্য সিলেটের যেকোনো একটি রাস্তার নাম তাঁর নামে নামকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। ম আ মুক্তাদিরের স্মৃতি অমর হউক।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close