ফিচার

শিক্ষণ পদ্ধতি শিশুমনস্তাত্বিক, বহুমুখী এবং বৈজ্ঞানিক হওয়া দরকার: তৃপ্তি পোদ্দার

একটি সাক্ষাৎকার
বিষয়: শিক্ষা বিষয়ক দেশ-বিদেশের প্রেক্ষাপটে।
স্কুল শিক্ষাকে সহজীকরণের প্রসঙ্গে কথা বলেছেন শিক্ষিকা তৃপ্তি পোদ্দার, লণ্ডন। সাক্ষাৎকার গ্রহণে শাহিদা রুমা, ঢাকা।

এস রুমা: স্কুল শিক্ষা সহজ করার ক্ষেত্রে পাঠ্যবই কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?
তৃপ্তি পোদ্দার: স্কুল শিক্ষাকে সহজ এবং কার্যকরী করার জন্য প্রয়োজন পাঠ্য বই এবং আনুষাঙ্গিক বই। শিশু শ্ৰেণীকক্ষে তার শিক্ষকের পাঠদানে অংশগ্রহন করবে। শিশুর বয়স উপযোগী ও শিশুর বই পড়ার যোগ্যতা অনুযায়ী বই পড়বে, এই বইগুলো হাতে পারে নানাধরনের গল্পের বই, এই পড়ার বই বা গল্পের বই যেমন শিশুর শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে অন্যদিকে পাঠ্যবই শিশুর উন্মুক্ত চিন্তাভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। যখনই পাঠ্যবই শিশুর বা অভিভাবকদের কাছে দিয়ে দেওয়া হবে তখন শিশুর শিক্ষাকে একটি গন্ডির মাঝে আটকে দিলেন। আর যদি শিশুর বয়স ভিত্তিক কতটুকু শিখবে এর একটি গাইডলাইন থাকে তাহলে শিশু তার বুদ্ধিমত্তা অনুযায়ী শিখবে। একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি, ক্লাস ওয়ানে পড়া শিশুর জন্য ভাষা শিক্ষার প্রান্তিক যোগ্যতা আছে, ” শিশুটি ৩ অথবা ৪ শব্দবিশিষ্ট গল্পের বই দেখে এবং অর্থ বুঝে পড়তে পারবে।” অর্থাৎ ৬ বছর বয়সী শিশু এই যোগ্যতা অর্জনের জন্য শিক্ষক তাকে প্রতিদিন ভাষা শিক্ষা দেবার সাথে সাথে শিশুর যোগ্যতা অনুযায়ী পড়ার বই বা গল্পের বই বাড়িতে দিয়ে দেবেন , শিশু এক সপ্তাহে তার ইচ্ছে মত অনেক বই পড়তে পারবে এবং সেই বইগুলোর রেকর্ড শিক্ষক রাখবেন। শিশুর এই পঠন ক্ষমতার উপর নির্ভর করে তার পঠন যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে, সেক্ষেত্রে মাপকাঠির কয়েকটি লেভেল করা যেতে পারে। যে শিক্ষার্থী সুস্পষ্ট ভাবে সঠিক উচ্চারনে পড়তে পারবে তার পঠন যোগ্যতা নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া হয়ে থাকে। আর যে শিক্ষার্থী সুস্পষ্ট ভাবে সঠিক উচ্চারনে পড়তে পারবে না, ধীরে ধীরে বা আধো আধো উচ্চারণে পড়বে, ওই শিক্ষার্থীর পাঠন যোগ্যতা অর্জনে অতিরিক্ত সাহায্য লাগবে।

এস রুমা: শিক্ষাকে সহজীকরণের ক্ষেত্রে সঠিক সিলেবাস কতটা জরুরি?
তৃপ্তি পোদ্দার: শিক্ষাকে সহজীকরণ করার থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উঠিত “কার্যকরী” শিক্ষা পদ্ধতির উপর। শিশুর যদি শৈশব থেকে সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করা যায় তাহলে শিশুকে বোঝা এবং শিখানো খুবই সহজ। সব শিশুর শিক্ষা গ্রহনের ধরন এক নয় তাই শিখন শিক্ষন পদ্ধতি শিশুমনস্তাত্বিক, বহুমুখী এবং বৈজ্ঞানিক হওয়া দরকার কারণ সব শিশু সহজভাবে শিখবে বিষয়টি তা নয়, কোন কোন শিশু শুনে শুনেও অনেক কঠিন বিষয়বস্তু তার মত করে সহজে শিখে ফেলে।

এস রুমা: যথাযথ শিক্ষা প্রদান করার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের ভূমিকা কতটুকু জরুরি?
তৃপ্তি পোদ্দার: শিক্ষন পদ্ধতির প্রয়োগ করার দ্বায়িত্ব নিশ্চিত করে একজন শিক্ষক, শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ক সুসম্পর্ক হবে, শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক বন্ধুর মত হবে কিন্তু বন্ধু হবে না। শিশুকে শিক্ষকদের নিয়ে ভয়ের মনোভাব সৃষ্টি করা যাবে না। বাংলাদেশে অধিকাংশ মা বাবা তাদের শিশু কে শাসনের হাতিয়ার হিসেবে স্কুল শিক্ষক বা ব্যক্তিগত শিক্ষককে বাছাই করেন কিন্তু এতে শিশু মনে মানসিক চাপ পরে কারন শিশুর কোন আশ্রয় থাকে না, সবার কাছ থেকে শিশুকে সর্বদা “এটা করো, ওটা করো” শুনতে হয়, তাছাড়া শারীরিক শাস্তি আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হবার স্বত্তে ও এই শাস্তি এখনও বাংলাদেশে প্রচলিত। শিশুর শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষক শিশুর সাথে সুসম্পর্ক রাখবে এবং শিশুর মনে একটি পজিটিভ স্থান করবে যাতে শিশু শিক্ষককে ভয় না পায়, ভয় পেয়ে যে শিক্ষা শিশু শিখবে তা ততটা কার্যকরী হবে না এবং শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা শিশুর ভবিষৎ জীবনে চলার পথে বাঁধার সম্মুখীন হবে।

এস রুমা: শিক্ষার পরিবেশ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণে কি ধরনের প্রভাব বিস্তার করে?
তৃপ্তি পোদ্দার: শিক্ষার পরিবেশ শুধুমাত্র স্কুল নয়, বাড়িতেও ভালো হতে হবে কারন শিশু তার প্রথম ৫টি বছর পরিবার থেকে বেশি শিক্ষা গ্রহন করে। শিশু বসতে পারার সাথে সাথে শিশুর উচ্চতা অনুযায়ী টেবিল চেয়ার দিয়ে দিতে হবে যাতে করে শিশু তার টেবিল চেয়ারে বসার অভ্যাস একদম চ্ছোট্টবেলা থেকে করতে পারে, টেবিল চেয়ারকে ভয় পেয়ে নয় ভালোবেসে বসবে কারন পরিবার এই টেবিল চেয়ার এ বসে শিশুর সাথে নানা ধরনের খেলা খেলবে, শিশুর মনযোগ বাড়বে এবং শিশুর ভয় সৃষ্টি হবে না। স্কুল পরিবেশও হতে হবে শিশুর উচ্চতা অনুযায়ী, একটু বিস্তারিত বলি : যদি শিশুর উচ্চতার বেশি উপরে অর্থাৎ চোখের দৃষ্টির উপরে আপনি কোন ছড়া বা ছবি এঁকে রাখেন তাহলে শিশু কিন্তু প্রতিনিয়ত ঘাড় বাঁকা করে উপরে তাকিয়ে দেখতে পারবে না অথবা পারলেও তার ধীরে ধীরে অনাগ্রহ সৃষ্টি হবে তাই শিশু শিক্ষা পরিবেশ হতে হবে শিশুর উচ্চতা এবং শিশু কেন্দ্রিক। শিশুকে আমাদের চোখে নয়, শিশুদের শিশুদের মত করে পৃথিবীকে জানতে দিতে হবে কারণ আমরা যা জানি তা তো জানি কিন্তু ওরা যা জানে বা সৃষ্টি করবে তা আমরা জানি না।

এস রুমা: যেসব শিক্ষাঙ্গনে উত্যক্ত করা বা উৎপীড়নের শিকার হয় শিক্ষার্থীদের প্রতিকারের উপায় কী?
তৃপ্তি পোদ্দার: শিশুর শিক্ষা ক্ষেত্রে কার্যকরী করার লক্ষ্যে শিশুর নিরাপত্তা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে, শিশু কোন ভাবেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী অথবা পরিবার থেকে অযত্ন, অবজ্ঞা বা নির্যাতনের স্বীকার না হয়। শিশুর অযত্নের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় শিশুর শারীরিক গঠনে। শারীরিক গঠনের পাশাপাশি এসব শিশুর মানসিক বৃদ্ধিও বয়স উপযোগী হয় না। সমবয়সী শিশুদের সাথে খেলাধুলা কিংবা মেলামেশা করতে সাধারণভাবে পারে না। অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। চোখে চোখ রেখে উত্তর দাও, সাধারণ জ্ঞানের বিষয়গুলো কোনটাতেই তারা অন্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতো করতে পারে না। যার ফলশ্রুতিতে তারা অমনোযোগী হয়ে বেড়ে উঠে এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকে। একাকী পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতে এসকল শিশুরা শিক্ষার অভাবে বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয়মূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পরে। নিজেরদের ভবিষ্যৎ তারা নষ্ট করেই পাশাপাশি অন্যদের ও এই অন্ধকার জগতের মধ্যে নিয়ে আসে।

শারীরিক অপব্যবহারের চেয়েও সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হলো আবেগিক অপব্যবহার। কারণ শারীরিক অপব্যবহার এর ক্ষতিকারক প্রভাব বাইরে থেকে বোঝা গেলেও আবেগিক প্রভাব কোনোভাবেই বোঝা যায় না। একটি শিশু আবেগিক ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিজের পরিবার থেকেই। বাড়ন্ত বয়সে তার মূল্যবোধকে প্ৰাধান্য না দেওয়া, তার মানসিক সমস্যা বা অসুবিধাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে না নেওয়া এই সবই আবেগিক অপব্যহারের লক্ষণ। আবেগিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুরা খুব অল্প সময়ের মাঝেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং তাদের মানসিক বিকাশ ও বৃদ্ধি পায় না। ফলে শারীরিক দিক থেকে কিংবা বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের সুস্থ মনে হলেও সমাজের উন্নয়মূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এভাবে আস্তে আস্তে তারা সমাজের জন্য বোঝা হয়ে যায়। কিছু শিশুদের মাঝে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে।

এস রুমা: শিক্ষাকে কিভাবে আনন্দময় করা যায়?
তৃপ্তি পোদ্দার: শিক্ষাকে আনন্দময় তখনই করা যাবে, যখন পরিবার, সমাজ, স্কুল পরিবেশ এবং প্রতিটি মানুষ শিশুর মনস্তাত্বিক বিষয় গুলো বুঝতে সক্ষম হবে। শিশুকে ভালোবেসে ফোন দিয়ে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো, দামী খেলনা কিনে দেওয়া এই ধরনের আচরনগুলো শিশুর আনন্দলাভের কারণ বলে অনেক অভিভাবক মনে করেন। অনেক মা বাবা অথবা অভিভাবক ধরে নেন শিশুকে ফোন দিয়ে বসিয়ে দিলে সে ভালো শিখবে । শিশু তার প্রথম ২টি বছর অনুকরণের মাধ্যমে শেখে যা আমরা বলি দেখে দেখে শেখা, শিশুর ভাষা শিক্ষা হোক বা শিশুর কোন সাইন্স প্রজেক্টই হোক পরিবেশ থেকে শিশু বেশি শেখে এবং শিশুকে তার প্রকৃতির মাধ্যমে শেখালে শিশু তার পাঁচটি বেসিক সেন্স কে ব্যবহার করে দ্রুত শিখতে পারবে এবং অন্যান্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারবে।

আমি শুরুতে বলেছিলাম শিশুর শিক্ষা শিখন শিক্ষন পদ্ধতি হতে হবে শিশুমনস্তাত্বিক, বহুমুখী এবং বৈজ্ঞানিক। যা শিশুর জন্য, শিশুর মত করে এবং কার্যকরী হবে সেই প্রচেষ্টা করা, আমরা যদি আমাদের চিন্তাকে শিশুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করিয়ে দেই তাহলে শিশুর চিন্তা ভাবনাকে আমরা আমাদের ছকে আটকে দিলাম, তাহলে তবে আর এটা শিশুর জন্য শিক্ষাব্যবস্থা আনন্দদায়ক হবে না, শিশুর শিখন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে এবং শিশুর সঠিক মেধার বিকাশ বাধার সম্মুখীন হবে।

এস রুমা: আপনার সময়ের জন্য ধন্যবাদ।
তৃপ্তি পোদ্দার: আপনােকেও ধন্যবাদ।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close