ফিচার

বিশ্ব মানবতাকে বাঁচানোর জন্য আসুন আমরা সকলে কোভিড ভ্যাকসিন নেই: ভ্যাকসিন ১০০% নিরাপদ

ডক্টর আব্দুর রশিদ

লেখক: প্রফেসর, ও,বি,ই,- ডি এল, – পি, এইচ, ডি – ডি, এস, সি – এফ, আর, সি , পিএফ, আর, সি, পি, সি, এইচ, প্রফেসর অফ পেডিআট্রিকস এন্ড চাইল্ড হেলথ কেন্টাকি ইউনিভারসিটি (ইউ, এস, এ), উল্ভারহ্যাম্পটন ( ইউকে ) এবং লাহোর (পাকিস্তান)
কন্সাল্টান্ট—পেডিআট্রিকসিয়ান, ম্যানর হাসপাতাল—ওয়ালশল, ওয়েস্ট মিডল্যাণ্ড, ইউকে

আমি নিজে কোভিড ভ্যাকসিন এর দুটো ইনজেকশনই নিয়েছি ইতিমধ্যে—কোন প্রকার  পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (সাইড এফেক্ট ) হয় নাই—আসুন, আমরা সবাই আমাদের সকলকে সাহায্য করি এবং আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে আমাদের বি, এ, এম,ই (এথনিক মাইনরিটি ) কম্যুনিটির জনগোষ্ঠীকেও এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে উৎসাহিত ও সহায়তা করি।

গত পঞ্চাশ বছর যাবত ”এন, এইচ, এস” এর সাথে আছি, এই বিশদ সময় যাবত থেকে কখনোই দেখি নাই এত অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্য কোন ব্যাধি বা সংক্রামণ আমাদের কম্যুনিটির জনবলকে এতটা প্রবল এবং প্রকট ভাবে আঘাত হানতে বা টার্গেট (নিশানা) বানাতে । প্রথম সংক্রামণের সময় কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান কম্যুনিটির মৃত্যুর হার ছিল ৬২ শতাংশ প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মাঝে—আর তা কিনা ছিল ১২ শতাংশ প্রতি ১ লক্ষ শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের মাঝে । বাংলাদেশীদের মাঝে প্রতি ১ লক্ষ তে ৬১ জন মৃত্যুবরন করেছে । অন্যান্যরা  খুব পিছনে নয় পরিসংখ্যানে । সহজ এবং সোজা বাংলায় এর মানে হচ্ছে—কোভিড এর আঘাত আমাদের জনগোষ্ঠীর জন্য ৬ (ছয়) গুন বেশী অন্যান্য সম্প্রদায়ের থেকে, যার কারণে আমাদের জনগোষ্ঠীতে,  আমাদের বাঙ্গালী সম্প্রদায়ের মানুষের মৃত্যুবরনের হার এত বেশি । আমরা দিব্যচক্ষে প্রকাশ্য দিবালোকের মত দেখতে পাচ্ছি চতুর্দিকে লাশের কাফেলা—অত্যন্ত বেদনাদায়ক, দুঃখ ভারাক্রান্ত, শোকে নিথর প্রায়—দুঃখজনকভাবে ওঁরা আমদেরকে  ছেড়ে চলে যাচ্ছে; পারছে না তাদের প্রিয়জনরা তাঁদের বিদায় দিতে ওঁইসব প্রিয়জনদের ইচ্ছানুযায়ী ।

আমাদের সম্প্রদায়ের এত বিশাল এবং ব্যাপক জীবন হারানোর কারণটা হয়তবা হতে পারে আমাদের একটি জন্ম-সম্বরীয় (জেনেটিক ) সংবেদনশীলতা / গ্রাহীতাও (সাসেপ্টিবিলিটি ); কিন্তু বিজ্ঞান আমাদেরকে বলছে অন্য কথা—বৈজ্ঞানিক উপাত্ত বলছে যে, এই কোভিড সংক্রামণ মহামারি যাদের কে বেশী করে আঘাত হানছে তারা হয়তো বহুমূত্র (ডাইবেটিস) রোগের রুগী, ধূমপান করার অভ্যাস যাদের আছে, যারা মেদবহুলতায় (ওবেশিটি ) আক্রান্ত, যাদের মূলগত বা নিম্নবসস্থিত (আণ্ডারলাইইং) মেডিক্যাল অবস্থা আছে এবং যারা ভিটামিন ডি’র স্বল্পতায় ভুগছে । আমরা  বি,এ, এম,ই সম্প্রদায়; স্বভাবতভাবেই ওভারওয়েট (মেদবহুলতা) এ ভুগী বেশ, আমাদের জীবনব্যাবস্থা অত্যন্ত সেডেন্টারি  জীবন ( শুয়ে, বসে সময় ব্যয় করা জীবনযাপন ) [সকলে নয়—উপযুক্ত পরিভাষা না পাবার জন্য দুঃখিত – কাউকে দুঃখ বা মনকষ্ট দিবার জন্য নয়] যাপনে অভ্যস্থ । আমরা খুব বেশি  শারীরিক ব্যায়াম এবং দৌড়, ঝাপ সচরাচর করা থেকে বিরত থাকি । যার ফলশ্রুতিতে আমাদের মাঝে বহুমূত্র (ডাইবেটিস) রোগে আক্রান্তের সংখ্যা অন্যান্য সম্প্রদায়ের চাইতে অনেক বেশী ।

সংস্কৃতিকে নিয়েও  এখন মনে হয়  ভাবার সময়ও এসেছে  এখন , কি  এতটা মহান এই সংস্কৃতি?  যাহা কিনা আমদেরকে বিরত রাখে না – একটা জগতজোড়া বিপদের সময়ও পারিবারিকভাবে একে ওপরের সাথে মিলিত হওয়া থেকে বা ধর্মীও প্রতিষ্ঠানে যাওয়া থেকে বিরত না করার কারণে এই সোঁয়াচে রোগের  সংক্রামণের জীবাণু এক জন থেকে আরেকজনকে দেয়া থেকে এবং এই সব অনভিপ্রেত মেকি এবং সময়োপযোগীনয় এমন বিধি লঙ্ঘন করার মাধ্যমে  আমরা হয়তবা নিজেদের অজান্তেই ছড়িয়ে  দিয়েছি এই মহাব্যাধি  আমাদের এই  বিশাল জনগোষ্ঠীতে । অকারণে হারিয়ে গেছে অগণিত প্রাণ, হারিয়ে যাচ্ছে প্রত্যহ শত শত জীবন,  শুধু এক মেকি সংস্কৃতির মহাত্বতা প্রমাণ করতে  যেয়ে । যেগুলো করা থেকে বিরত থাকলে হয়ত আরও কম জীবনানাস হতো আমাদের বাঙ্গালী সম্প্রদায়ের । ঐ সব সামাজিক মিলন মেলা গুলোই হচ্ছে ভাইরাস এ সংক্রমিত হবার  সবচে’ উর্বর জায়গা । এটাও আরেকটা প্রধান কারণ – আমাদের কম্যুনিটির প্রচুর কর্মজীবী জনবল এই দেশের ফ্রন্টলাইন সার্ভিসে নিয়োজিত ওখান থেকেও সংক্রামিত হয়েছেন অনেক অনেক  সম্প্রদায়ের সদস্যরা ।

এখন যখন, আমাদের সম্মুখে অন্ধকার সুরঙ্গের শেষ প্রান্তে দেখা দিয়েছে এক আলোকবর্তিকা – এক ভ্যাকসিন এর প্রদীপের শিখা । কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেই প্রজ্বলিত আলো  এই জীবননাশের মহাপ্রলয় থেকে উত্তরণের এক মাত্র আশা ‘’ভ্যাকসিন” নিয়ে  রটছে অনেক গুজব, অনেক ভুল তথ্য, গননাবিহীন প্রপাগাণ্ড—যাদের নেই কোন চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞান এবং অনেকেই আবার  ধর্মের নামের পর্দার অন্তরাল থেকে ছড়াচ্ছে এই সব কুকর্মকাণ্ড । যাহা কিনা সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য নয়,  আর এই গুজবের ফলশ্রুতিতে  আমরা হারাবো আরও অনেক জীবন । অনেক শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছে যে, তারা এই মিথ্যা প্রচারণার কারণে ভ্যাকসিন গ্রহণ থেকে বিরত থাকার ফলেই তাদের পরিবারের মাঝে নেমে এসেছে মৃত্যুর ছোবল। হারিয়েছে তারা প্রিয়জনকে বা হয়ত ভবিষ্যতে হারাবে অনেক প্রাণ—এক মিথ্যা প্রচারণার কারণে !

পক্ষান্তরে, এই ভ্যাকসিনে নাই কোন প্রকার অবৈধ দ্রব্য, নাই কোন শূকর বা মদ ( এলকোহল ) জাতীয় উপাদান । আমি নিজে একজন ডাক্তার এবং স্পেশালিষ্ট হিসাবে কর্মরত আছি বহুদিন ধরে এবং সেই সুবাদে কোন প্রকার দ্ধিধা বাত্যিরেকেই  বলতে পারি যে, এই ভ্যাকসিন গুলো সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ । এই যে, এই দুর্দিনে মানবজাতিকে কোভিড এর মহা প্রলয়ঙ্করী ছোবল থেকে পরিত্রাণ দিবার জন্য আমাদেরকে অতীব দ্রুত এই ইনজেকশন টি আবিষ্কার করতে হয়েছে। ভ্যাকসিন যদি কেউ নিয়ে থাকে তারপরও তাকে মৌলিক নির্দেশনা সমূহ পালন করতে হবে—যেমন; রেগুলারলি হস্ত ধৌত করতে হবে, ২ মিটার বা ৬ ফুট দুরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং সর্বশেষে সব সময় বাইরে গেলেই মুখোস বা মাস্ক পরিধান করতে হবে ।

ব্রিটিশ সরকারের জরুরী বিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা দল (সে,এ,জী,ই) তাঁদের এক রিপোর্টে উত্থাপন করেছে যে, গবেষণা দেখাচ্ছে যে, ৭২ শতাংশ এথনিক মাইনরিটির সদস্যরা এই ভ্যাকসিন নিতে অনুচ্ছুক কিংবা অতিঅন্নুচ্ছুক । যে কোন ভ্যাকসিন এমনকি প্রতি বছর নেওয়া হয় যে ফ্লু ভ্যাকসিন তারও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ( সাইড এফেক্ট ) থাকা স্বাভাবিক যেমন জ্বর, মাথাব্যথা, মাংসপেশীতে বেদনা বা ব্যাথা দেখা দিতে পারে, যাহা কিনা ৪৮ ঘণ্টার ভিতর দূরীভূত হয়ে যেয়ে থাকে । যদি আপনার  শরীরে ভ্যাকসিনের প্রথম নেবার প্রকার  কোন প্রকার সাময়িক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (সাইড এফেক্ট) দেখা দেয় তারপরও  ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করা আপনার জন্য আবশ্যক । এই ভ্যাকসিন গ্রহন করলে গুরুতর কোন প্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ( সাইড এফেক্ট ) হবার সম্ভাবনা মাত্র ০.৫ শতাংশের ও নিচে ।

আমাদের কে ভুললে চলবে না, এই দেশ আমাদেরকে সাদরে গ্রহণ করেছে অনেক বছর ধরে এবং আমাদের মাঝে অনেকেই আজ তিন পুরুষ যাবত ব্রিটেনে  বসবাস করছি—এটাই আমাদের দেশ ! আমরা ব্রিটেনের সমাজের বুননে গাথা । তাই এই সমাজের সকল  জনগণকে নিরাপদ রাখা এবং নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের নৈতিক কর্তব্য । সত্যিকার অর্থে, সকলে ততক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ হবে না এই সংক্রামণ থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবীর সকল মানুষ এই ভ্যাকসিন না গ্রহণ করবে । তাই চলুন, আমরা যাতে  করে দোষের ভাগীদার না হই এই ভ্যাকসিন না নেবার জন্য  এবং আসুন আমারা যাতে বদনামের দোষে দোসগ্রস্থ না হয় এই ব্যাধি /সংক্রামণের ব্যাপ্তি বৃদ্ধি করার জন্য । যা কিনা আমাদের সম্প্রদায়ভুক্তদের কে দাঁড় করিয়ে দিবে ভাঙ্গনের মুখোমুখি, জেগে উঠবে আমাদের প্রতি অবিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মনোভাবাপন্ন দল বা গোস্টী  মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে বা উঠবে – যে গুলো হয়ে দাঁড়াবে আমাদের কম্যুনিটির বা সম্প্রদায়ের জন্য অনভিপ্রেত । সর্বোপরি, অনেকই অপ্রয়োজনীয়ভাবে হারাতে পারে জীবন । অতএব, আসুন আমরা সকলে এই ভ্যাকসিন গ্রহণ করি এবং আমরা আমাদের দায়িত্বপালন করি মানবিকতাকে বাঁচানোর নিমিত্তে ।

মনে রাখবেন অনুগ্রহ করতঃ ভ্যাকসিন নেবার পরও বজায় রাখুন সামাজিক দূরত্ব, মুখোস (মাস্ক) পরিধান  করুন এবং বার বার ঘন গন হাত ধৌত করুন । কারণ, ভ্যাকসিন এর প্রয়োজন পর্যাপ্ত  সময় আপনাকে সম্পূর্ণ ভাবে রক্ষা করতে – আমরা হয়ত জানবো না  কবে এবং কখন আমরা সম্পূর্ণ ভাবে শঙ্কা মুক্ত  হয়েছি  এবং আমরা করছি কিনা অন্য কাউকে সংক্রামিত ।

অনুবাদ: ইমরান চৌধুরী

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close