ফিচার

গণহত্যার অভিশাপ ও মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান

মন্তব‍্যকথা:

।। ডক্টর মুজিবুর রহমান ।।
লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক। সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

হাই স্কুলে পড়ার সময় ইংরেজি ক্লাসে ‘ম্যান ইজ মরটাল’ এর নেগেটিভ ‘ম্যান ইজ নোট মরটাল’ এর পরিবর্তে ‘ম্যান ইজ নট ইমমর্টাল’ শেখানো হতো। অনেক ক্ষেত্রে বাক্যে শুধু একটি ‘নট’ যোগ করে আফার্মেটিভ বাক্যকে নেগেটিভ বাক্য করা গেলেও এক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম। কারণ নেগেটিভ করতে গিয়ে চিরায়ত সত্যকে অস্বীকার করা যায় না । তবে ‘আই এম হ্যাপি’ বাক্যের নেগেটিভ ফর্ম ‘আই এম নট হ্যাপি’ নাকি ‘আই এম নট আনহ্যাপি’ তা একটা প্রশ্ন বটে। এ নিয়ে চিন্তাবিদরা হয়তো সঠিক ব্যখ্যা দিতে পারবেন। আমার লেখার বিষয় সেটি নয়।

‘আই এম নট আনহ্যাপি’ বাক্যটির সাথে রাজনৈতিকভাবে বিশদভাবে পরিচয় ঘটে যখন সেনাবাহিনী প্রধান থাকা অবস্থায় হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। বলা হয়ে থাকে এরশাদ সাহেবের ক্ষমতাগ্রহণের পর তৎকালীন একটি বৃহৎ দলের প্রধান তাঁর অভিব্যক্তি এই বাক্যটির মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। লেখার মূল প্রতিপাদ্যও সেটি নয়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি সোমবার মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে। দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি ও প্রেসিডেন্ট উ উইন মিন্টসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আটক করা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম আল-জাজিরা আজকে জানিয়েছে সামরিক অভ্যুত্থানের একদিন পরও কয়েকশ পার্লামেন্ট সদস্যদের ন্যাপপিডায় একটি সরকারী আবাসন কমপ্লেক্সে খোলা আকাশের নীচে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে । মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক পনেরো লাখের অধিক  রোহিঙ্গা মানব সন্তানদের নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত করার পক্ষে দাঁড়ানো নেত্রী অং সান সুচিকে আটক করে সেনাবাহিনী কোথায় রেখেছে তা এখনো জানা যায়নি।

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এর বিরুদ্বে সোচ্চার ভূমিকা দেখাচ্ছে। ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে এবং সু চিকে মুক্তি না দিলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অবরোধের হুমকি দিয়েছেন বিশ্বের সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত ও ইউরোপের নেতৃবৃন্দ। তবে সারা দুনিয়া যদি এর ছিটেফোঁটা সোচ্চার ভূমিকা দেখাতো তাহলে শিশু, মহিলা, বয়োবৃদ্বসহ পনেরো লক্ষ মানুষ আজ খোলা আকাশের নিচে হয়তো আহাজারি করতে হতো না। জাতিসঙ্গের বিভিন্ন উদ্যেগকে কিছু রাষ্ট্রের দুমুখী নীতির কারণে কার্যত কোনো পদক্ষেপ চোখে পরে নাই। ঢিলেঢালাভাবে হলেও আন্তর্জাতিক আদালতে পর্যন্ত রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠিত করার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু বিশ্ব মোড়লদের পক্ষপাতিত্বের কারণে এর বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তাতে বিরাট সন্দেহ রয়েছে।

অনেকে মনে করেছিলেন করোনা পরিস্থিতিতে অন্তত ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের অধিপতিরা কিছুটা শিক্ষা নেবেন যে, অন্যকে অশান্তিতে রেখে নিজের জন্য শান্তি খোঁজা নৈতিকভাবে দূরে থাক বৈজ্ঞানিকভাবেও সম্ভব না। কিন্তু বাস্তবে মনে হচ্ছে, করোনা পরিস্থিতি এবং অসম অর্থনীতির কারনে বিশ্বে সৃষ্ট অরাজকতা থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ দূরের কথা বরং এ থেকে ফায়দা হাসিলে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নতুন করে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। কয়েকদিন পূর্বে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, বিশ্বে এখন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের পূর্বেকার অবস্থা বিরাজমান। এর মাধ্যমে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মেরুকরণের যে আভাস মিলছে তা পৃথিবী নামক গ্রহের জন্য মোটেই সুখকর নয়।

বর্তমান বিশ্বে যেসব রাষ্ট্রগুলো এখন অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রযুক্তিতে এগিয়ে রয়েছে তারাও এক ভয়াবহ যুদ্ব এমনকি গৃহযুদ্ব পার করিয়ে শেষে এসে নিজেদের স্বার্থেই সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু দুখঃজনক হলো যে, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করলেও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর প্রতি তারা আগ্রাসী ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এটাই বর্তমান বিশ্বকে অস্থীতিশীলতার অন্যতম কারণ  বলে অনেকে মনে করে থাকেন। বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস এবং ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতিগত কারণে নানা ধরণের জাতি ও রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলেও মহাবিশ্বে পৃথিবী নামক গ্রহটি এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিজেদের আরাম আয়েস ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে শক্তিমত্তার প্রতিযোগিতার কারণে পৃথিবী নামক পুরো গ্রহটাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে। তাই বিগত কয়েক দশকের সেরা বিজ্ঞানীদের অন্যতম স্টিফেন হকিংস অনাগত বিভিন্ন ভাইরাস, জলবায়ু এবং পারমাণবিক যুদ্ব পৃথিবী নামক গ্রহের তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন। এর বাস্তব প্রমান আমরা ইতিমধ্যে পেতে শুরু করেছি। কিন্তু এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ হবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং এর হিংস্র থাবা আরো বিস্তৃত হচ্ছে।

‘মিয়ানমারের পার্লামেন্ট সদস্যরা আটক কেন্দ্রে খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন’ বলে আলজাজিরাতে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে। খবরটি পড়ে রোহিঙ্গাদের করুন চেহারাগুলো আবার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকা স্বত্ত্বেও সেনাবাহিনী কেন এ ধরণের অভ্যুত্থান ঘটাতে গেলো ? এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত ব্যক্ত করছেন।  ‘মিয়ানমারের বর্তমান পদ্ধতি সেনাবাহিনীর জন্য খুবই সুবিধাজনক। তাদের কমান্ড কাঠামোর সম্পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন আছে, তাদের বাণিজ্যিক স্বার্ধসমূহে বেশ বড় পরিমাণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আছে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের হাত থেকে রাজনৈতিক সুরক্ষাও আছে’ – বিবিসিকে বলেছেন জেরার্ড ম্যাককার্থি, সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো। মিয়ানমারের সংবিধানই নিশ্চিত করছে, সেনাবাহিনীর ভূমিকা রাষ্ট্র পরিচালনায় সব সময়ে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। সংবিধানে বলা আছে, ২৫% সংসদ সদস্যপদ সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রনালয় সব সময় সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

তবে সেনা অভুত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং তার অবস্থান ও সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন অনেক বিশ্লেষক । আগামী জুলাই মাসে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান অবসরে যাচ্ছেন ।  পনেরো লক্ষ রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি থেকে থেকে বিতারণ এবং গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে বিচার চলছে। সেনাপ্রধানসহ কয়েকজন জেনারেল রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। বিশ্ব পরাশক্তি চীনকে ডিঙিয়ে  এসব বিচারের মাধ্যমে কতটুকু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে তাতে সন্দেহ থাকলেও এ নিয়ে কিছু জেনারেলদের শঙ্কার বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর এটাকে অভুত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে।  কারণ সেনাপ্রধান যদি অবসরে যাওয়ার পর ক্ষমতা নিয়ে নেন তখন হয়তো তাকে গণহত্যার জন্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো দুরূহ হবে। তাই অন্যান্য কিছু বিষয়ের পাশাপাশি আগে থেকেই রাস্তা পরিষ্কার করে রাখার জন্য মিয়ানমারের এই সামরিক অভ্যুত্থান।   তাই এ কথা বলা যায় অং স্যাং সূচি যদি মানবতা তথা ন্যায়ের পক্ষে থাকতেন তাহলে আজকে হয়তো তাঁকে এই করুন পরিণতির দিকে যেতে হতো না।  অথবা দেশের নিরীহ জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে এ ধরণের পরিণতি ভোগ করলেও নিজেকে শান্তনা দিতে পারতেন। তাই নিজেদের ক্ষমতা ঠিকিয়ে রাখতে যারা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন আখেরে এরা নিজেরাও এর থেকে রেহাই পান না।

ওয়ার্ল্ড অর্ডারকে ছিন্ন করে যারা ক্ষমতার মসনদে থাকতে চান তাদের জন্য এ এক বিরাট বার্তা। ভোগবাদী বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসকেরা এর থেকে শিক্ষা নেবে না। এটাই ইতিহাসের বড় শিক্ষা।  তবে যারা মানবতার কথা বলেন তাদেরকে বিষয়গুলো আরো বিবেচনা করার খোরাক দিতে পারে। আর এতে করে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’কে ঠিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও হতে পারে। অন্যথায় এর অশুভ পরিণতি ভোগ করতে হবে সবাইকে। যদিও গণতন্ত্র আর মানবতাকে  বিকশিত করতে জবাবদিহিতামূলক গণতন্ত্রের বিকল্প নাই। যে গণতন্ত্র রোহিঙ্গা জনগণকে গণহত্যা থেকে ফেরাতে পারে না, এমনকি যে নেত্রী গণহত্যার পক্ষে সাফাই দেয় সেখানে গণতন্ত্র বলতেই বা কি বুঝায় তাও এক বিরাট প্রশ্ন। সময়ের চাকা ঘূর্ণায়মান। আজকে যিনি উপরে সময়ের পরিক্রমায় কাল তিনি নিচে পরতে পারেন। কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে থাকলে নিচে থেকেও মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে জয়ী হওয়া যায়। অন্যথায় ঘৃণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে হয় অথবা মানব সভ্যতার কলংক হয়ে পরপারে চলে যেতে হয়।  

বিশ্ব মোড়লদের কায়েমী স্বার্থের ঢামাঢোলে মানবতা চাপা পরে গেলেও রোহিঙ্গাদের বুকফাঁটা আর্তনাদ বাতাস থেকে বিলীন হয়ে যাবে না । তাই মিয়ানমারের সামরিক অফিসারদের কর্মকান্ড এবং অভুত্থানের নিন্দা জানালেও মিয়ানমারের পার্লামেন্ট সদস্যদের আটক কেন্দ্রে খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করতে দেখে এবং অং সান সু চির পরিণতি দেখে যদি কেউ বলে থাকেন – ‘উই  আর নট আনহ্যাপি’ তাতে অবাক হওয়ার কথা নয়।

লন্ডন, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close