নিউজ

সিলেটে রায়হান হত‍্যা: সর্বত্র ক্ষোভ

* পাশবিকতার শেষ কোথায়?
* লণ্ডনের সামাবেশে ভাই হত‍্যার বিচার চাইলেন বোন

রায়হান: এখন কেবলই ছবি

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ১৬ অক্টোরব – সিলেটে সম্প্রতি পুলিশী বর্বরতায় নতুন করে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। মাত্র দু’সপ্তাহ আগে এমসি কলেজে সরকার দলীয় ক্যাডারদের দ্বারা স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় জনমনের ক্ষোভ ও ঘৃণার রেশ কাটতে না কাটতেই মানুষের রক্ষক নামক সরকারী বাহিনী পুলিশের হাতে এক যুবক খুনের অভিযোগ ওঠেছে। এই খুনের নির্মম ঘটনায় জনমনে নুতন করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রায়হানের মৃত শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন দেখে শিহরিত হয়েছেন দেশ-বিদেশের বাংলাদেশীরা। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন সব অঞ্চলের মানুষসহ অভিবাসী বাংলাদেশীরাও। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল সিলেট সদরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন সিলেটের প্রতিবাদী জনতা। গত ১৪ অক্টোবর, বুধবার বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী অধ্যুষিত পূর্ব ল-নের আলতাব আলী পার্কে রায়হান হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে ভয়েস ফর বাংলাদেশীর ব্যানারে মানবন্ধন করেছেন বৃটেনপ্রবাসী বাংলাদেশীরা। তারা অবিলম্বে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে রায়হান উদ্দিন (৩৩) নামের এক যুবককে মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যার অভিযোগ করেছেন তার পরিবার। ঘটনটি ঘটেছে গত ১১ অক্টোবর রোববার। ওইদিন ভোররাতে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে এনে টাকার জন্য নির্যাতন করার পর মৃত্যুবরণ করেন ওই যুবক। নিহত রায়হান উদ্দিন নগরীর নেহারি পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তার মাত্র তিন মাস বয়সী শিশু কন্যার কান্নার ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করছেন প্রতিবাদী মানুষ।
ইতোমধ্যে এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে থানায়। নিহতের স্ত্রীর দায়েরকৃত মামলায় পুলিশী নির্যাতনে তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবী করেছেন। মামলার প্রেক্ষিতে পুলিশের ৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩ জনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে কেন অভিযুক্ত গ্রেফতার করা হলো না তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন খুনীকে পারপার পাইয়ে দেবার জন্য এমন কালবিলম্ব করা হচ্ছে।
মামলায় উল্লেখ্য করা হয় — সেদিন বিকালে ডাক্তারের চেম্বারের কম্পাউণ্ডার হিসেবে কর্মরত তার স্বামী কাজে বের হয়ে যাওয়ার পর রাত ১০টা থেকে তার মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। রাত ৪টা ৩৩ মিনিটে একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে রায়হান তার মাকে কল করে কথা বলেন। ওই কলে রায়হান কাঁদতে কাঁদতে জানান যে, তাকে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে আটকে রেখেছে এবং টাকা না দিলে ছাড়বে না। এরপরই ভোর সাড়ে ৫টায় চার হাজার টাকা নিয়ে রায়হানের চাচা হাবিব উল্লাহ ফাঁড়িতে গেলে কর্তব্যরত ব্যক্তিরা তাকে ১০টার সময় ১০ হাজার টাকা নিয়ে যেতে বলেন। তিনি ১০টায় টাকা নিয়ে গেলে তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজে যেতে বলা হয় এবং সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, ৭টা ৪০ মিনিটে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে।
প্রথমে ছিনতাইকালে গণপিটুনীতে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে বলে চালানোর চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু পুলিশ যে এলাকায় গণপিটুনী হয়েছে বলে দাবী করেছিলো সেখানকার সিসিটিভির ফুটেজ খতিয়ে দেখা যায় যে, সেখানে কোনো ধরণের ছিনতাই কিংবা গণপিটুনীর ঘটনা ঘটেনি এবং পুলিশও পরবর্তীতে তাদের বক্তব্য পরিবর্তন করে।
এ ঘটনাটি সুষ্ট তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবী জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেট শাখা। সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রেরিত বিবৃতিতে রায়হান অন্যায়ভাবে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
এদিকে, ইদানিং যে বেশকটি চাঞ্চল্যকর খুন ও ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে Ñ দেখা গেছে যে, এসবের প্রায়টি সংঘটিত হয়েছে সরকারী দলের ক্যাডার কিংবা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা। সাবেক সেনা কর্মকর্তার মেজর (অব.) সিনহা হত্যা থেকে শুরু করে নোয়াখালীর বেগম গঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে অত্যাচারের ভিডিচিত্র ধারণ, সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের গৃহবধুকে গণধর্ষণ এবং সম্প্রতি পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান হত্যা জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রতিবাদ সভা ও মানবন্ধন থেকে মানুষকে প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে Ñ সরকারী দল ও সরকারী আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে একের পর এক ঘটে যাওয় এসব পাশবিকতার শেষ কোথায়?

লণ্ডনের সামাবেশে ভাই হত‍্যার বিচার চাইলেন বোন
সিলেটে পুলিশ ফাড়িতে নির্যাতনে রায়হান নামে এক যুবকের মৃত্যুর প্রতিবাদে পূর্ব লণ্ডনের আলতাব আলী পার্কে বুধবার যৌথভাবে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে ভয়েস ফর জাস্টিস ও ইকুয়াল রাইটস ইন্টারন্যাশনাল। সাংবাদিক কেএম আবু তাহের চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে দুই সংগঠনের মানবাধিকার কর্মীরা ছাড়াও কয়েকশত ব্রিটিশ বাংলাদেশী নাগরিক অংশ নেয়।
ভয়েস ফর জাস্টিসের শফিকুল ইসলামের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নিহত রায়হানের বোন রুবা আক্তার, তার স্বামী মোফাজ্জের রাহমান, রায়হানের ভাগনি এবং তার দুই খালাত ভাই, রোহিঙ্গা সলিডিরাটি ফোরামের শেখ রামজি, ইকুয়াল রাইটস ইন্টারন্যাশনাল চেয়ারম্যান মাহবুব আলী খানশূর, ভাইস চেয়ারম্যান নউসিন মোস্তারী মিয়া সাহেব, রাইহান চৌধুরী, অনলাইন সেক্রেটারী আবু জাফর আব্দুল্লাহ, সায়েদ জাকারিয়া, আল আমিন, শাহেদ রহমান, জিয়াউর রহমান, মাসুদুজ্জামান, ফজলে রহমান পিনাক, ইউনিভার্সাল ভয়েস ফর হিউম্যান রাইটসের জয়নাল আবেদিনসহ আরো অনেকে।
সমাবেশে বক্তারা রায়হান হত্যায় জড়িত বন্দরবাজার পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ আকবরসহ চার পুলিশের ফাসিঁ দাবী করেন। এছাড়া তারা বলেন, আওয়ামী আমলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হওয়ায় কোন অপরাধের বিচার হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। আর একারনে দেশে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটলেও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অপরাধীদের বিচার না হওয়ায় দেশের সাধারণ অনেক নাগরিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close