ফিচার

গ্রন্থ আলোচনা::. নবাব শামসুল হুদা: জীবন ও সমকাল

ইতিহাস গবেষণায় আগ্রহীদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য


।। ফারুক আহমদ।।

সৈয়দ শামসুল হুদা: জীবন ও সমকাল
লেখক: তাবেদার রসুল বকুল
প্রকাশক: নাগরী, সিলেট
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২২
মূল্য: ৮৫০ টাকা।
অনলাইন পরিবেশক: রকমারি ডটকম

১৮৫৭ সালের বিফল সিপাহি বিদ্রোহের ১০৯ বছর এবং ভারতবর্ষে ফার্সির বদলে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা ঘোষণা করার ৩১ বছর পরের কথা। ১৮৬৬ সালের ২১ মে মওলানা ক্বাসিম নানতুভি ও মওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহি ভারতের উত্তর প্রদেশের শাহরানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইসলামি শিক্ষাদানের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা সহকারে ব্রিটিশ আধিপত্য-বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে।

ভারতের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা

দেওবন্দ মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে গড়েওঠা শিক্ষা-আন্দোলনের ঢেউ ক্রমান্বয়ে পুরো উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রভাবিত করে। প্রাচীন সংস্কারবিহীন মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার্থীরা তখন দেওবন্দকেই তাদের আদর্শস্থানীয় সর্বপ্রধান বিদ্যাপীঠ হিসেবে গ্রহণ করে। দেওবন্দ থেকে উচ্চশিক্ষালাভ শেষে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে তারা মসজিদে ইমামতি এবং স্থানীয় মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করে দেওবন্দের আদলে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাদান ইত্যাদিকে জীবন ও জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নেন। এভাবে বাঙালি মুসলমান-সম্প্রদায় ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করতে গিয়ে, আধুনিক ও ইংরেজি শিক্ষাকে বর্জনের মধ্য দিয়ে নিজেদেরকে কূপমন্ডুকতার অচলায়তনে বন্দি করতে শুরু করেন।

বাংলার মুসলমানদের তখন এই অচলায়তন থেকে বের করে নিয়ে আসার নানা প্রচেষ্টা চালান নবাব আবদুল লতিফ, হাজি মোহাম্মদ মুহসিন, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব আলী চৌধুরি, নবাব শামসুল হুদা প্রমুখ। এই নবাব শামসুল হুদাকে নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে বই লিখেছেন তাবেদার রসুল বকুল। নবাব, স্যার ইত্যাদি ঔপনিবেশিক আমলে উপাধিগুলো কেন জানি আমার খুব একটা পছন্দ না। তাই নবাব শামসুল হুদা বা ইংরেজ আমলে পাওয়া নবাবদের কাহিনি খুব একটা পড়া হয়নি। ২০২২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির বইমেলা উপলক্ষে বইটি প্রকাশ করেছেন সিলেটের খ্যাতিমান প্রকাশনা সংস্থা নাগরী। আমিও তখন দেশে। তাবেদার রসুল বকুলের সংগে গত প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে টেলিফোনে যোগাযোগ। আমরা উভয়ে বিলাতের বাসিন্দা হলেও তিনি থাকেন ম্যানচেস্টারে আর আমি রাজধানী শহর লন্ডনে। নানা বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়। পেশা ও নেশার দিক থেকেও আমরা সমগোত্রিয়। তার আরও দুই অথবা তিনটি বইয়ের সমালোচনাও লিখেছি। কিন্তু সরাসরি দেখা-সাক্ষাত কখনো হয়নি। এ বছর দেশে গিয়ে প্রথম দেখা। দেশ থেকে ফিরে এসে তিনি এ বইটি পাঠিয়েছেন। আমার একটি বাতিক হচ্ছে ইতিহাস এবং সমাজ-সংস্কৃতিবিষয়ক কোনো বই পেলে তা গ্রোগ্রাসে পড়ে বইটি সম্পর্কে নিজের পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখা অথবা লেখকের ব্যক্ত করা। এ ধরনের একটি বই পড়তে আমার বেশি হলে দুই দিন সময় লাগে। কিন্তু এই বইটি পড়তে আমার প্রায় দুই মাস লেগেছে। কারণ, এটির বিষয়বস্তু ভেতরে প্রবেশ করতে আমাকে প্রতিটি লাইন ধরে ধীরে ধীরে এগুতে হয়েছে। এর পরেও কী লিখবো? কোথা থেকে শুরু করবো তা বুঝতে পারিনি। এর কারণ, প্রথমত বইয়ের ব্যাপ্তি অনেক বড়। দ্বিতীয়ত বইয়ের মানুষটি সম্পর্কে আমার খুব একটা জানা নেই, এবং তৃতীয়ত বইটির মানুষ ও তার কর্মযজ্ঞের সঙ্গে উপমহাদেশের জাতীয় জাগরণের ইতিহাসটাও জড়িত। কিন্তু আমার জানার পরিধি ততো বড় নয়।
সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত বইটিতে রয়েছে নবাব শামসুল হুদার জন্ম, বংশ, বেড়েওঠা, শিক্ষাজীবন, সমাজকর্ম ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিষয় লেখক তথ্য-প্রমাণ-সহ অর্থাৎ শুধু তথ্যসূত্রই নয় একই সংেগে তথ্যগুলোর ফ্যাক্সিমিলিও ব্যবহার করে বইটিকে পাঠকের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তুলে ধরেছেন। প্রায় চারশ পৃষ্ঠার এই বইটি থেকে শুধু নবাব শামসুল হুদা সম্পর্কেই নয় একই সংগে জানা যাবে তার সমকাল অর্থাৎ সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, সহকর্মীদের কর্মকা- ইত্যাদি অনেক অনেক বিষয়। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে যারা গবেষণা করবেন তাদের কাছে বইটি অবশ্যপাঠ্য বলেই মনেকরি। এছাড়াও বইটি লেখক-সাংবাদিক-সাহিত্যিকদের লেখার অনেক উপাদান যোগাবে। আমি বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close