নিউজবাংলাদেশমুক্তচিন্তা
চলমান

ফিনল্যান্ডে শেখ হাসিনার  ব্যক্তিগত সফরের ব্যয় রাষ্ট্র কেন দিবে?

।। শামসুল আলম লিটন।।

লন্ডন, ১৯ সেপ্টেম্বর।। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবার পূর্বে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে বোন রেহানার ছেলে ববির সাথে দেখা করতে সেখানে দুইদিন যাত্রা বিরতি করলেন।

খবরে বলা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে শুক্রবার বিকেলে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকি-ভান্তা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের উদ্ধৃতি দিয়ে সরকারি বার্তা সংস্থা শুক্রবার এ খবর নিশ্চিত করে। প্রেস সচিব জানান, ফিনল্যান্ডে বাংলাদেশের অনাবাসী রাষ্ট্রদূত মোঃ নাজমুল ইসলাম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছিলেন। এর আগে, প্রধানমন্ত্রী এবং তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী ফ্লাইটটি শুক্রবার সকালে ঢাকার  হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এইচএসআইএ) থেকে ছেড়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এর উপরোক্ত বিবরণে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি ব্যক্তিগত সফর । কারণ ফিনল্যান্ডের কোন সরকারি কর্মকর্তা এমনকি প্রটোকল বিভাগের একজন কর্মচারী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর অভ্যর্থনায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। 

বাংলাদেশ বিমান সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে সরাসরি ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক যাত্রা না করে ফিনল্যান্ডে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এই ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট অবতরণ ও ও সেখানে দুদিনের ল্যান্ডিং চার্জ সহ সফরসঙ্গীদের যাবতীয় খরচ বহন করতে খরচ হবে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। দু’বছর আগেও লন্ডনে চোখের চিকিৎসা করাতে এসে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের কাটিয়েছিলেন এবং সাইড ভিজিট হিসেবে ব্যক্তিগত সফরে ফিনল্যান্ডে তাঁর বোন শেখ রেহানার ছেলে ববির শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে এবারও তিনি সেখানে বেয়াইবাড়িতে বেড়াতে গেছেন এবং কোনো কোনো সূত্র বলছে ভাগ্নে রিদওয়ান মুজিব ববির মান ভাঙাতে তিনি সেখানে গেছেন।  গত ক’বছর রিদওয়ান মুজিব ঢাকায় থেকে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। কোন বিশেষ বিরোধের জের ধরে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন । গত কয়েক মাস ববি আর ঢাকা যাননি। এ কারণেই ভাগ্নের মান ভাঙাতে প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘ যাবার পথে ফিনল্যান্ডে তার সফরসঙ্গী দলবলসহ এই ব্যয়বহুল সফরে যেতে হয়েছে। তিনি সেখানে দুদিন থেকে রবিবার নিউইয়র্ক যাবার কথা। রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য করে প্রধানমন্ত্রীর এইসব ব্যয়বহুল ব্যক্তিগত সফর নিয়ে ঢাকার কোনো গণমাধ্যমকে অতীতের ন্যায় এবারও কোন প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়নি।  এ ব্যাপারে সাপ্তাহিক  সুরমার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বহিঃপ্রচার বিভাগের মহাপরিচালককে রবিবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাপারে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করবেন বলে সাপ্তাহিক সুরমা আশা প্রকাশ করে।

এদিকে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও বিলাসী সফরের এই ঘটনা আলোচিত হওয়ার প্রাসঙ্গিকতায় বর্তমান সরকারের সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এখনও সবার মুখে মুখে। দুই দশক আগে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দুই কোটি টাকা ব্যবস্থাপনায় “অনিয়মে”র কথিত অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ইতিপূর্বে দুই বছর কারাবরণ করতে হয়েছে এবং আরো অন্তত আট বছর জেল-জরিমানা মাথায় নিয়ে কার্যত গৃহবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। এছাড়া সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের একটি ঘটনা কাকতালীয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বিলাসী সফরের সঙ্গে আলোচনায় পাবলিক ডোমেইনে উঠে এসেছে। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর ব্রেকফাস্টের বিল মাসে ৮শ’ ইউরো গ্রহণের বৈধতার প্রশ্নে বিতর্ক এমনকি বিতরকের জের ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করার মত দাবি পর্যন্ত উঠতে শুরু করেছে সেখানে।  সম্প্রতি ফিনিশ অর্থমন্ত্রীকে সরকারি অর্থে তার সহকারীদের মিডিয়া ট্রেইনিং দেওয়ার অভিযোগে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

 দুই দেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর  কি অদ্ভুত বৈপরীত্য! যে দেশটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় অর্ধ মিলিয়ন ইউরো বা পাঁচ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় করছেন ব্যক্তিগত সফরের অজুহাতে;  ঠিক সেই দেশেরই(ফিনল্যান্ড) জনগণের অর্থের ব্যবহার নিয়ে সভ্য আচরণের নিদর্শন দুই দেশের মানুষকে রীতিমতো হতবাক করবে।  সেলুকাস এখানে সম্ভবত লজ্জায় মুখ লুকাবে। অর্থ অপচয়, বিলাসিতা আর গরিব জনগণের অর্থে গড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপচয়ে নির্লজ্জ বেহায়াপনা তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে অসংখ্য উদাহরণ থাকলেও এই চরম বিপরীত দুটি ঘটনা সম্ভবত অতীতের অনেক উদাহরনকে ছাপিয়ে বেহায়াপনার এক নতুন বিশ্বরেকর্ড হয়ে থাকতে থাকতে পারে। 

এ প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। স্বাধীনতার পর সম্ভবত ৭৪ সালের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বিমানের চার্টার ফ্লাইট নিয়ে যান। সেখানে জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে কয়েকদিন বিমানটি পড়ে থাকতে দেখে আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা মি. লি কুয়ান তাঁর বইয়ে গরিব দেশের প্রধানমন্ত্রীর অপচয় প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে দুঃখ প্রকাশ করে ওই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।  সম্ভবত একেই বলে- বাপকা বেটা!!

ট্যাগ

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close