মুক্তচিন্তা

সিলেটের বিয়ের গীতে আচার অনুষ্ঠান

|| প্রফেসার জাহান আরা খাতুন ||

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ, হবিগঞ্জ

সাহিত্যের অন্যান্য শাখারমত লোক- সাহিত্যে সিলেটের অবদান বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় ঋদ্ধ। এ সাহিত্যের দীপ্র বৈভব লোক সংগীতের একটা চিত্তরঞ্জন অংশ হল মুসলিম সমাজের বিয়ের গীত। এ গীতে লোকসমাজের বিচিত্র আচার অনুষ্ঠান শতধারায় উৎসারিত।

“স্মার্ত্তভাবনায় বিবাহ,সংসারজীবন যাপন করার উদ্দেশ্যে দু’টি নরনারীর চুক্তি মাত্র নয়, এটি একটি পবিত্র সংস্কার।৩ বিবাহের দ্বারা সংস্কৃত হয়ে পতি ও পত্নী গার্হস্থ্যধর্ম পালনের যোগ্যতা অর্জন করেন। যেহেতু গার্হস্থ্য আশ্রমকে অবলম্বন করে অন্য তিনটি আশ্রম জীবন আবর্তিত হয়, সুতরাং গৃহস্থকে সকল আশ্রমীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া হয়েছে।৪ কেবল তাই নয়, ঋষি ঋণ, দেব ঋণ ও পিতৃ ঋণ নামে যে তিনটি ঋণ নিয়ে মানুষমাত্রেই জন্মায় তার মধ্যে পিতৃঋণ মোচনের জন্য চাই পুত্র।৫ পুত্রলাভ হয় বলেও গার্হস্থ্যধর্মের প্রয়োজনীয়তা। পুত্রের মাধ্যমে কেবল যে বংশধারা অবিচ্ছিন্ন রাখা যায় তাই নয়, অব্যাহত রাখা যায়, গৃহস্থের পক্ষে অবশ্যকৃত্য পঞ্চ মহাযজ্ঞ। এই পাঁচটি যজ্ঞ হল- অধ্যয়ন, পিতৃ তর্পণ, হোম, ভূতবলি বা প্রাণিসেবা ও অতিথি সৎকার।

বিবাহ শব্দের উৎপত্তি ‘বহ্’ ধাতু থেকে, যার অর্থ হল বহন করা। বিবাহের পর স্বামী তার পতœীর যাবতীয় দায়িত্ব ভার বহন করবেন— বিবাহ শব্দের এই হল সর্বজনবোধ্য সাধারণ অর্থ। ষোড়শ শতকের নিবন্ধকার মিত্রমিশ্র বিবাহ শব্দের একটি বিশেষ অর্থ আমাদের উপহার দিয়েছেন। তার মতে বি উপসর্গের সঙ্গে বহ্ ধাতু ও ঘঞ্ প্রত্যয়ের সংযোগে নিষ্পন্ন বিবাহ শব্দের বি উপসর্গের অর্থ হল বিশিষ্ট ভাবে, আর বহ্ ধাতুর অর্থ প্রাপণ বা পাইয়া দেয়া। বিশিষ্টভাবে যা বধূ পাইয়ে দেয় তাই বিবাহ। এই পারিভাষিক অর্থ গ্রহণ করে মিত্রমিশ্র বলেছেন, বিশেষভাবে বধূ লাভ করার অর্থই হল শাস্ত্রোক্ত বিবাহ পদ্ধতির অন্যতমের দ্বারা বধূকে স্বীকার করে হোম থেকে সপ্তপদীগমন পর্যন্ত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তার সংস্কার করিয়ে নেয়া।”১

এবার বিবাহের সংজ্ঞা নির্ণয়নে আমরা তৎপর হব। “শাস্ত্রকারগণ বিবাহের বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। সংস্কৃত ন্যায়বিদ রঘুনন্দনের মতে, ‘ভার্যাত্ব সম্পাদকং গ্রহণং বিবাহ’।১ বর কর্তৃক কন্যার ভার্যাত্ব গ্রহণের নাম বিবাহ। সংস্কৃত স্মৃতিকার গোপালের মতে, পিত্রাদি কর্তৃক কন্যোৎ সর্গানন্তরং বরস্বীকারো বিবাহ২। পিতা কর্তৃক কন্যা সম্প্রদান এবং কন্যা কর্তৃক বর বরণের নাম বিবাহ।

উপরের সংজ্ঞা দুটি বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা হয়েছে। প্রথমটি পুরুষ কর্তৃক ‘কন্যা গ্রহণ।’ দ্বিতীয়টি নারী কর্তৃক ‘বরবরণ’। এই উভয় মতকে একত্র করে বলা যায়, স্বেচ্ছানুসারে স্বামী-স্ত্রী রূপে নর-নারীর মিলন-বন্ধনই বিবাহ। বস্তুত, বিবাহ অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে পরস্পরের সম্মতিক্রমে দুটি নরনারী একত্র বসবাসের নৈতিক ও সামাজিক সমর্থন লাভ করে।

বিবাহের সংজ্ঞা নিরূপণে পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ মিলন কথাটির উপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, Marriage may be defined…. as a physical, legal and moral union between man and woman in complete community of life for the establishment of a family. পরিবার প্রতিষ্ঠাকল্পে দুইজন নরনারীর নৈতিক, দৈহিক ও বৈধ মিলন বিবাহের মাধ্যমে সমাজ কর্তৃক সমর্থিত হয়।
দৈহিক মিলন তথা যৌনসম্ভোগ বৈবাহিক সূত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সমর্থিত হলেও জৈব প্রয়োজনীয়তা বিবাহের একমাত্র লক্ষ্য নয়। এতে নরনারীর জীবন নিরাপত্তার ও বংশরক্ষার অন্তরালশায়ী বাসনাও নিহিত আছে। এজন্য সন্তান কামনা বিবাহের চরমতম লক্ষ্য। সংস্কৃত পণ্ডিত বলেছেন, ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্য্যা।”২
“মহাভারতের শ্বেতকেতু-উদ্দালক কথোপকথনে জানা যায়, তৎকালীন ভারতবর্ষে নরনারীর দাম্পত্য বন্ধন থাকলেও বিবাহ বহির্ভূত স্বচ্ছন্দ বিহারে কোন প্রতিবন্ধকতা ছিলনা। শ্বেতকেতু তাদের বিবাহ বহির্ভুত যৌনাচার নিষিদ্ধ করে দাম্পত্য জীবনে পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে বিধান দেন। শ্বেতকেতু বিবাহ প্রবর্তন করেন বলে একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি বিবাহকে বিধিবদ্ধ করে নরনারীর যৌন-জীবন দাম্পত্য-সীমায় আবদ্ধ করেন। শুধু তিনিই নন, চীন সম্রাট ফাউ হি, প্রাচীন মিশরের মেনেস, গ্রীসের কেক্রুপস এবং ল্যাপল্যান্ডের নজারভিস ও আটজিস বিবাহ ব্যপারে একই দায়িত্ব পালন করে ছিলেন।”৩

বিবাহের প্রকার ভেদে দেখা যায়, “আট প্রকার বিবাহের পূর্ণাঙ্গ লক্ষণ ও স্বরূপ বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত আমরা পাই মনু সংহিতায়। এ বিষয়ে মনুই সর্বাপেক্ষা আলোচিত ও সর্বজনমান্য প্রবক্তা অতএব মনুর আলোকেই আমরা বিভিন্ন বিবাহ পদ্ধতির লক্ষণ ও গুণাগুণ বিচারে প্রবৃত্ত হব।

১. বিদ্বান ও সচ্চরিত্র বরকে সাদরে আহ্বান করে এনে বরকন্যাকে (নব বস্ত্রে) সজ্জিত করে ঐ বরের হাতে স্বয়ং কন্যাদান করার যে রীতি তাই ব্রাহ্মবিবাহ।১৭
২. যজ্ঞ চলাকালে কর্মরত ঋত্বিককে সালংকারা কন্যাদানের রীতি দৈববিবাহ।১৮
৩. ধর্মানুসারে একটি বা দুইটি গো মিথুন (একটি গাভী ও একটি বৃষ= একটি গো মিথুন) বরের নিকট থেকে গ্রহণ করে বিধিমত তাকে কন্যাদান করার নাম আর্যবিবাহ।১৯
৪. তোমরা দুজন একসঙ্গে ধর্মাচরণ করবে এই বাক্য উচ্চারণপূর্বক বরকে যথাবিধি অর্চনা করে যেখানে কন্যাদান করা হয় তাকে প্রাজাপত্য বিবাহ বলে। ২০
৫. কন্যার জ্ঞাতিদের ও স্বয়ং কন্যাকে স্বেচ্ছায় যথাশক্তি ধনদান করে কন্যা গ্রহণ করা হলে তাকে আসুর বিবাহ বলে। ২১
৬. বর ও কন্যা উভয়ের অনুরাগবশতঃ পারস্পরিক যোগাযোগে যে কামজ বিবাহ হয় তার নাম গান্ধর্ব।২২
৭. (কন্যাপক্ষ প্রতিকূলহলে) কন্যাপক্ষের লোকজনদের হত্যা করে তাদের বাঁধা ছিন্নভিন্ন করে ক্রন্দনরতা ও সাহায্যের জন্য উচ্চৈ:স্বরে আর্তনাদকারিণী কন্যাকে বল পূর্বক হরণের নাম রাক্ষস বিবাহ।২৩
৮. সুপ্ত বা উন্মত্ত কন্যাকে গোপনে দূষিত করার নাম পৈশাচ বিবাহ। এই অষ্টম বিবাহটি বিবাহ সমূহের মধ্যে পাপিষ্ট ও অধম।”২৪ ৪
“ইসলামে বিবাহ হচ্ছে একটি পবিত্র বন্ধন এবং দেওয়ানী চুক্তি। এটা কোন সাময়িক বা অস্থায়ী কোন ব্যবস্থা নয় বরং বিয়ে হল একটি পবিত্র চুক্তি।

ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষের যেমন স্বতন্ত্র সত্তা এবং তার নৈতিক জীবন স্বীকৃত তেমনি নারীরও। আল্লাহর নামে শপথ করে পুরুষ তাকে জীবনসঙ্গিনীরূপে গ্রহণ করে থাকে। আল-কুরানে বিবাহকে মিছাকান গালিজন (দৃঢ় প্রতিশ্রুতি) স্থায়ী বন্দন রূপে অভিহিত করা হয়েছে।” ”২৪ ৫

এবার মূল প্রসঙ্গ। “শাস্ত্রীয় বিধিনমতে বিবাহ অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত। ইসলামী রীতিতে কবুল, সাক্ষী, খোতবা, কাবিন নামা ইত্যাদি এবং হিন্দু রীতিতে মন্ত্রপাঠ, সম্প্রদান, মালাবদল ইত্যাদি সম্পন্ন হলে বর কনে দাম্পত্য জীবনযাপনের অধিকার পায়। লৌকিক জীবনে বিবাহের এগুলি অবশ্য পালনীয় বিধি হলেও এর সাথে অনেক লোকাচার জড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিনের চর্চায় মানুষ এ সম্বন্ধে নানাভাবে নানা আচার পদ্ধতি গড়ে তুলেছে, যার অধিকাংশ সংস্কারগত শাস্ত্রাগত নয়। এসব লোকাচার পালন না করলে বিবাহ অশুদ্ধ হওয়ার কারণ নেই, তথাপি আনুষ্ঠানিক পরিপূর্ণতাবোধে লোকে তা পালন করে থাকে। সংস্কৃত পণ্ডিতরা বলেছেন, লোকাচার শাস্ত্রাচার থেকে বলবান, অতএব তা অপরিত্যাজ্য। ‘বলবান লৌকিকঃ শাস্ত্রাৎ, লোকাচার ন ত্যজেৎ’।
বাংলার গ্রাম সমাজে বিবাহানুষ্ঠানে যেসব লোকাচার দেখা যায় সেগুলির উৎসমূল দুটি, সংস্কারবোধ ও আমোদ প্রিয়তা। বিবাহ একটি শুভ অনুষ্ঠান। পাছে কোন বিপদ ঘটে কোন অকল্যাণ হয় বা অপদেবতার কোপ পড়ে এমনটি কেউ চায় না, সকলের শুভেচ্ছা নিয়ে সুখী দাম্পত্য জীবনের সূচনা হোক তাই কাম্য। প্রধানত এরূপ শুভকামনা এবং বিপদমুক্তির আকাক্সক্ষা থেকে গ্রামজীবনের লোকাচারগুলি গড়ে উঠেছে। আচারগুলির কোন কোনটি কেবল বরের গৃহে পালিত হয়। কোন কোনটি কনের গৃহে পালিত হয়। কতক আচার উভয় গৃহে উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। বিয়ের কোন কোনটিতে ম্যাজিক, ট্যাবু ইত্যাদি আদিম সংস্কারের প্রভাব আছে… বিবাহের অধিকাংশ অনুষ্ঠানে শুভাশুভ বিধিনিষেধের বাচবিছার মানা হয়। এগুলি ট্যাবু লক্ষণাক্রান্ত।”৬

আচার বিষয়ক কথাগুলো সিলেট অঞ্চলের বিবাহের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বলাই বাহুল্য, নানাবিধ আচার অনুষ্ঠানের স্বত:স্ফূর্ত উৎসারে সিলেটের গীতাঞ্চল লক্ষণীয়ভাবে অভিসিঞ্চিত। বৈচিত্রম-িত অনুষ্ঠানের ফুলঝুরি বর্ণ-বিভঙ্গে গীতাঙ্গন দীপকোজ্জ্বল ও মনোরম।
“তেরশো খ্রিস্টাব্দের পর থেকে সিলেটে যে মুসলমান সভ্যতা দিনে দিনে গড়ে উঠে তা ছিল আরব ও স্থানীয় হিন্দু স¤প্রদায়ের সংমিশ্রণে গঠিত। এদেশে যারা ইসলাম প্রচার করতে আসেন তাদের প্রায় সকলেই ছিলেন আরবদেশীয়। হযরত শাহজালালের (রহ:) অনুষঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ারাই এদেশে প্রথম ধর্ম প্রচার করে হাজার হাজার স্থানীয় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোককে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় প্রদান করেছিলেন।

এদেশে হিন্দুদের মুসলমান ধর্মান্তরের মাধ্যমে যে মহামিলন তা বিবাহ অনুষ্ঠানেও নতুনত্ব আনয়ন করে আনুষ্ঠানিকতায়। আরবিরীতি ও এদেশের রীতিনীতির সংমিশ্রণে রূপ পায় এক ধরনের নতুন মুসলিম বিবাহ রীতি। ধর্মান্তরিত স¤প্রদায়ও তাদের অতীত বিবাহ রীতি ত্যাগ করে মুসলমানী রীতি নীতি গ্রহণ করে। এই পর্যায়ে যে মিশ্র বিবাহ রীতি দেখা দেয় তা আজো বহুলাংশে বর্তমান রয়েছে।
বর্তমানে আধুনিক সভ্যতা ও পাশ্চাত্য রীতিনীতিকে বাঙালিরা অনুকরণ করতে গিয়ে আমাদের অতীত ঐতিহ্যের অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। এখন শহুরে সভ্যতার আমেজে গ্রামের বিবাহ শাদিতেও আগের সেই সমারোহ ও আনন্দ লোপ পেয়ে যাচ্ছে। আমরা নিজস্ব সংস্কৃতি ত্যাগ করে দ্রুত অপসংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছি।”৭

আগেকার দিনে বিবাহ সংসৃষ্ট বিষয়াদির মধ্যে ‘কইন্যা দেখা’ ছিল অন্যতম। কোনো বাড়িতে বিবাহযোগ্যা মেয়ের সন্ধান পেলে অনেকক্ষেত্রে বরের বাড়ির মহিলারা ছদ্মবেশে ঐ বাড়িতে আসতেন। এসে কেউ কেউ খাবার পানি চাইতেন। স্বাভাবিক ভাবেই মেয়ে পানি এনে দেবে। এ ফাঁকে ঘরের ভেতর, আশপাশ, পানির গ্লাস ইত্যাদি পরিষ্কার কিনা গভীর অভিনিবেশের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হত। কেউ বলতেন, ‘তোমাদের ঘরের কলসির নীচে পানির গাদ আছে কি ? থাকলে আমাকে একটু দাওনা মা আমি একটা ওষুধ বানাব।’ সত্যিই যদি কলসির পানির নীচে গাদ থাকত (অনেক দিন কলসি পরিষ্কার না করার কারণে সঞ্চিত ময়লা) এবং মেয়ে এনে দিত তখন মহিলারা হতাশ হতেন, আর যাই হোক এরা পরিষ্কার না এ ঘরের মেয়ে নেয়া যাবেনা। কোনো কোনো সময় মেয়েকে মাথার উকুন এনে দিতে বলতেন, এটাও এক প্রকার পরীক্ষা। মেয়ে যদি ধীরে সুস্থে বিলি কেটে উকুন খুঁজে এবং এতে আরাম বোধ হত, তাতে মনে করা হত এই মেয়ে শান্ত স্বভাবের হবে। ভাল বউ হবে। (সূত্র রুমিনা আক্তার পারুল রোল-১২৬ শিক্ষাবর্ষ ২০০৫-২০০৬, জালালাবাদ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ সিলেট)। কনে দেখতে আসা মহিলারা চুল বড় কিনা দেখতেন। বলাবাহুল্য বড় চুল যোগ্যতার একটা অন্যতম নিয়ামক। কন্যার পা দেখা হত। গোড়ালির ওপরের অংশ চিকণ হলে সুলক্ষণা গণ্য করা হত। এ দেখাদেখির মধ্যে আরো থাকত হাঁটা, আঙুল, দাঁত, হাসি ইত্যাদি ইত্যাদি। কলসি রাখার জায়গাটা সুন্দর কিনা, চুলা লেপা কিনা এসব বিশেষ ভাবে দেখা হত। কন্যা মাটি দিয়ে ঘর লেপতে পারে কিনা এবং লেপায় শিল্প সংশ্লেষ আছে কিনা তাও পরখ করা হত। মরিচ মিহি করে বাটা হয়েছে দেখলে পরম পরিতুষ্টির সাথে তারা বলতেন,
‘মরিচ বাটা ছাবা ছাবা,
হুন বেডির খাবা খাবা,
মসলা অইছে চন্দন,
দেখ বেডির রান্দন।’
(সূত্র: মনোয়ারা বেগম, ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারি, হবিগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, হবিগঞ্জ)।

আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, অনেক সময় বরের বাড়ির মুরুব্বিরা বিশেষ করে দাদা, নানা, দুলাভাই, ছোট ভাই বোন দল বেঁধে কনে দেখতে আসতেন। এটাকে বলা হত ‘জামাই গোষ্ঠী’ আসা। হবিগঞ্জের লাখাই অঞ্চলে এ রীতি বিদ্যমান ছিল। অবস্থাপন্ন অভিজাত পরিবারে খাসি জবাই করে ‘জামাইর গোষ্ঠী’ খাওয়ানো হত। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, একই কন্যার জন্য কয়েকটি গোষ্ঠীকে খাসি জবাই করে খাওয়ানো হয়েছে। খাসির সাথে আরো কত পদযে রান্না হত তার ইয়ত্তা নেই। পিঠা, পায়েস, মিষ্টি, ফল ইত্যাদি থাকত। এগুলো কনের বাড়ির আভিজাত্যের পরিচায়ক বলে গণ্য হত। খাওয়া দাওয়ার পর সাজিয়ে গুজিয়ে ঘোমটাটানা ব্রৗড়াবনতা কন্যাকে মুরুব্বিদের সামনে আনা হত। কেউ একজন ধীর পদবিক্ষেপে হেঁটে আসা কন্যাকে ধরে এনে বসাতেন। অধোমুখী কন্যাকে নানাবিধ প্রশ্ন করা হত। নামাজ পড়ে কিনা, কোরান শরীফ পড়েছে কিনা, সেলাই,রান্না প্রভৃতি জানে কিনা তাও জিজ্ঞাসা করা হত। একটা কিছু লেখতে দিয়ে হাতের লেখা সহ অন্যান্য বিষয় পরখ করা হত। নত নেত্রে কম্পিতবক্ষে এসব কাজ করার পর মেয়েকে অন্দরে পাঠিয়ে দেয়া হত। তখন মেয়েকে ছালামি দেয়া হত। সোনার আংটি, নগদ টাকা, শাড়ি প্রভৃতি এ পর্যায়ভুক্ত।

অনুরূপভাবে কনের মুরুব্বিরা জামাইর বাড়িতেও যেতেন। উভয় পক্ষের দেখাদেখি সন্তোষ জনক হলে বিয়ের তারিখ ঠিক করা হত। ঐ দিনটাকে হবিগঞ্জের কোনো কোনো অঞ্চলে ‘ছাইতের দিন’ বলে। ছাইত অনুষ্ঠান কনের বাড়িতে হত। প্রচুর খাওয়া দাওয়া সহ আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হত। বরপক্ষ মিষ্টি পান আনতেন। ঐ দিন মেয়েকে স্বর্ণ ও কাপড় দেয়া হত বলে অনুষ্ঠানটি ‘সুনা কাপড়া’ বলেও অভিহিত হত। সিলেটে এ অনুষ্ঠানের নাম ‘চিনিপান’। এ বিষয়ে আবদুল মতিন চৌধুরী বলেন, “দূর অতীত থেকে এদেশে বরপক্ষ কনের সন্ধান করে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আলাপে বসে, সেটাকে চিনি পান বলা হয়ে থাকে। এদিন বর পক্ষের কতিপয় মুরুব্বিয়ান কনের বাড়িতে আগমন করেন। তাদের সাথে থাকে মিষ্টি ও সাজানো কয়েকটি পানদান। এই পানদানেরও বৈশিষ্ট্য থাকে। বরপক্ষের মেয়েরা বেশ কয়েকদিন পরিশ্রম করে সুপারির জিরা কেটে পানদানের তলদেশে রেখে এরপর বড় ও নিখুঁত দেখে বাছাই করা পান চিরে জোড়া করে তাতে জালা লাগান। এ জালা লাগানোরও নির্ধারিত পদ্ধতি আছে। সেমতে না হলে ভুল হয়ে আর জালা লাগবে না। এভাবে জিরাকাটা সুপারির উপরে নানা রঙের কিছু ফুল রেখে রঙিন কাগজের ঝালর কেটে পানদান আচ্ছাদিত করে আবার রঙিন ফুলের রুমাল দিয়া বেঁধে দেন। এ ধরনের ৫/৭ টা পানদান সাথে নিতে হয়। চিনিপানের দিন কনেপক্ষ নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও গ্রামের মুরুব্বিদের দাওয়াত দিয়ে রাখে। সকলের উপস্থিতিতে বিবাহের দেন মোহর ও অন্যান্য শর্ত সাব্যস্ত হলে উভয় পক্ষ লিখিত স্মরণলিপি করে তাতে দস্তখত দিয়ে নিজেদের মধ্যে সংরক্ষিত রাখেন।” ৮

সেদিন থেকেই গীতের নির্ঝরিণী উৎসারিত হত শত ধারায়। বিচিত্র বিপুল ঝিলিমিলি ধারা সিঞ্চনে উভয় বাড়ি অভিসিঞ্চিত, প্রসিক্ত হত। আর নিরব অঙ্গন সুরের তরঙ্গবিভঙ্গে সিঞ্জিত হয়ে ওঠত। বিয়ে ঠিক হলে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে মেয়েকে দাওয়াত দেয়া হত যাতে বিবাহজনিত দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে পারে (মনোয়ারা)। শুরু হয় ঘর বাড়ি পরিষ্কার করা, লেপা, নানারকম পিঠা বানানো, রাস্তাঘাট ঠিক করা, বাংলা ঘরে জামাই বসার আলাদা ব্যবস্থা করা। বসার জায়গাটাকে রঙিন কাগজ, রাংচা, ফিতা ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হত।

আমরা দেখেছি, বাংলা ঘরের এক কোণায় বাহারি শিল্পকর্মে গ্রামীণ শিল্পীরা সহজাত প্রতিভার আলোকে প্রথমে বাঁশের কঞ্চি, তার ইত্যাদি দিয়ে একটা কুঞ্জ বানিয়েছেন। এরওপর লাগানো হয়েছে রঙিন ফিতা ও কাগজের ফুলের কারুকাজ। ফুলের ভেতরে একটা করে টর্চের ছোট বাল্ব লাগানো হত। ব্যাটারি সহযোগে জ্বলে উঠা বাতিগুলোর বর্ণিল চিত্রধর্মিতা আজো হৃদয়াকাশে সমুদ্ভাসিত। শিশুমনের নিতল আগ্রহ, কৌতূহল আর অপার বিস্ময়ের সে-ই হিরণ্য স্মৃতি আজো দীপকোজ্জ্বল। (খালার বিয়ে, এ চারুকর্মের প্রধান শিল্পীর নামটা মনে আছে, মোঃ জৌলুস মিয়া )

সাধারণত দুদিকে দুটো কলাগাছ, রঙিন কাগজের ঝালর ইত্যাদি দিয়ে বরের গেইট সাজানো হত। ব্যতিক্রমও ছিল। সেই দৃষ্টি নন্দন বসার জায়গার মত গেইটেও থাকত অলঙ্করণের বিভাসিত কারুকাজ।

বিয়ের দু’চারদিন আগে থেকেই নাইওরিরা দূর দূরান্ত থেকে আসতে থাকেন। বর্ষাকালে ভাটি অঞ্চলে নৌকাই একমাত্র ভরসা। রঙ বেরংয়ের পালের নায়ে নাইওরিরা আসছেন। নৌকার সেদৃশ্য বড় মনোরঞ্জক বড় চিত্তচমোৎকারী।

বিয়ের ৩/৪ দিন আগে ঘরের এক কোণে শাড়ি বা পর্দা দিয়ে কনে থাকার জন্য একটা আড়াল তৈরি করা হত। কনে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া পর্দার বাইরে আসত না। ঘরের বাইরে গেলে সাথে একজন মুরুব্বি থাকবেন। নইলে কাঁচা বয়সের কন্যার উপর ‘নজর’ লাগবে। যা লোক সমাজে ‘নজর লাগা’, ‘উপরি দোষ’ বলে অভিহিত। অর্থাৎ কোন অপদেবতার অপশক্তি বা দুষ্টু অশরীরী শক্তি। লোকায়ত সমাজে এ বিশ^াসের শেকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। লোকসমাজ বিশ্বাস করে ‘বাও-বাতাস’ ‘উপরি দোষ’ অর্থাৎ ভূত-প্রেত, জ্বিন-পরীর অশুভ তৎপরতা, প্রভাব এবং কুদৃষ্টি মানুষের ক্ষতি সাধনে সদাসর্বদাতৎপর। আর কাঞ্চা বয়সের বিয়ার কইন্যা হলেত কথাই নেই। কনেকে ঘরের ভেতর পর্দার আড়ালে রাখার যে আচার বা নিয়ম, এর নাম ‘ছিরি লামা’ (শ্রী নামা)। বসানোর আগে কনের গায়ের সমস্ত গহনাপত্র এমনকি নাকফুল পর্যন্ত খুলে ফেলা হবে। ঐ দিন থেকে মাথায় বড় ঘোমটা থাকবে। কোন অবস্থাতেই কোন পুরুষ কন্যার মুখ দেখতে পারবেনা। দেখলে শ্রী নামবে না অর্থাৎ কন্যার রূপ লাবণ্য ঝলমলিয়ে ওঠবেনা। বিয়ের পর বর কন্যার মুখ দেখার আগে কোনো পুরুষ দেখতে পারবেনা। ‘ছিরি লামার’ সময় মেয়ের হাতে সোনা, রূপা, কাঁচাহলুদ, সরিষা প্রভৃতির পুটলি সুতা দিয়ে বেঁধে দেয়া হত, এর নাম ‘কাঙ্কেনা বান্দা’। ছিরি লামার নিভৃত কুঞ্জে কন্যার দিবস রজনী অতিবাহিত হত। তখন তার মনপানসি কোন ভাবসাগরে ভেসে বেড়াত কেজানে। স্বপ্ননদীতে কোন ঢেউ উঠত তাও কেউ জানতনা। তবে ঐ কুঞ্জের আলো-আঁধারি অঙন ভরে উঠত গীতের নান্দনিক বিভাসায়। বিয়ে বাড়ির সমস্ত আঁধার ছাপিয়ে দীপ্র হয়ে উঠত নারী মনের স্বত:স্ফূর্ত গুঞ্জরণ। বাড়ি যত সাদামাটা আর নিরাভরণই হোক সুরের দীপিত উদ্ভাস তনু-মনে এনে দিত এক অনির্বচনীয় পুলক সাচ্ছল্য।

কাঙ্কেনা বেঁধে মা, দাদি, নানি, চাচি, এরা বলতেন, একই পান চূণে যেন মেয়ের জীবন অতিবাহিত হয়, অর্থাৎ এই একটা বিয়েই যেন থাকে। একাধিক বিয়ে কাম্য নয় (মনোয়ারা)।

বিয়ের আগের দিন সারাদিন সারা পাড়া জুড়ে কইন্যা গোসলের দাওয়াত দেয়া হত। গোসল এবং পানি আনা বিষয়ক গীতের সুর-মূর্ছনায় আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেত। পানি তোলায় বিশেষ বিশেষত্ব ছিল। একটা কুলায় পাখা, দেশলাই, চাকু রাখা হত। একই কুলায় কলাপাতায় করে নিয়ে যাওয়া হত ধান, দূর্বা, সরিষা, কাঁচা হলুদ প্রভৃতি। ছাতা মাথায় দিয়ে কলসি কাঁখে নিয়ে মহিলারা কইন্যার গোসলের পানি তুলতে যেতেন। গীতের ফুলঝুরি ছুটতেই থাকত। ঘাটে গিয়ে দুজন পানিতে নামতেন। একজন কলাপাতায় উপর ন্যাকড়া দিয়ে তৈরিকৃত প্রদীপে আগুন দিয়ে ছালাম করতেন। পরে খুব সন্তর্পণে কলাপাতা পানিতে ভাসিয়ে দিতেন (পূর্বে রাখা দ্রবাদি সহ)। এরপর একজন চাকু দিয়ে পানিতে একটা দাগ দেবেন। সঙ্গিনীরা জিজ্ঞেস করবেন, ‘কার বিয়ার পানি কাটগ?’ বলতে হবে কনের নাম। (উত্তর দেবেন চাকু হাতে মহিলা)। এভাবে সাতবার দাগ কাটা ও প্রশ্নোত্তর চলবে। এরপর সব কলসিতে পানি ভরে পাখা পানিতে ভিজিয়ে সকলের গায়ে ছিটানোর মাধ্যমে পানি তোলার কাজ শেষ হলে গীতের সুরে ভেসে ভেসে পানি বাড়িতে আসবে।
কলসি রেখে আবার গীত।‘জলে ঢাকনি দেগ কইন্যার মা
তর জল কেনে উদাম?’
কইন্যার মা নতুন গামছা দিয়ে সব কলসি ঢেকে দেবেন।
এবার গোসল। পূর্বে তৈরিকৃত কলাগাছের কুঞ্জ বা পর্দা দিয়ে ঘেরা অংশের মাঝখানে একটা জলচৌকি থাকবে। কনেকে কোলে করে এনে এর ওপর বসান হবে। গোসলের আগে কনের হাতে সাতরঙের সুতা বেঁধে দেয়া হয়। এই সুতা বাঁধা ‘জাত’ নামে পরিচিত। (মাকসুদা ফয়জুন্নেসা, প্রভাষক আইডিয়াল কলেজ, বানিয়াচঙ্গ)
কনে অজু করে পশ্চিমমুখি হয়ে বসবে। এসময় ৫/৭ জন ডান হাতে ধান দূর্বা রেখে কনের চারদিক পাঁচবার ঘুরবে । সাবান মাখিয়ে গোসল করানোর পর সারা শরীরে ভালভাবে হলুদ, মেথি, গিলা, সুন্দা বাটা মাখানো হবে। গোসলের পর বিধবাদের দেখতে মানা। গোসলের পানি গায়ে লাগলে আর বিয়ে হত না-এই প্রচ- প্রবল লোকবিশ্বাসের সূত্র ধরে আবিয়াতা (কুমারী) মেয়েরা সতর্ক থাকত।
পেক (কাদা) খেইল লোক সমাজে পরিচিত একটি অনুষ্ঠান। ঐ দিন শুরু হত ছুটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি। তখন কলসি কলসি পানি এনে উঠানে কাদা করা হত। মহিলারা একে অপরকে টেনে এনে কাদায় ফেলে গড়াগড়ি যেতেন (এই কাদা খেলা আমরাও দেখেছি)। বদনায় মাটি গুলে একে অপরের গায়ে ঢেলে দেয়া এমনকি গোবর গোলা পানি গায়ে ঢেলে দেয়া হত। একে অপরের মুখে হলুদ মাখিয়ে দিতেন। লুকিয়েও পরিত্রাণ পাওয়া যেতনা (মনোয়ারা বেগম)। এভাবেই এগিয়ে আসত বিয়ের হিরণ¥য় লগ্ন। আর নিরূপম আনন্দ-বৈভবে আকাশ-বাতাস সমাকুল হয়ে উঠত।
এবার আমরা ‘গাইলঅবাড়া’ নামীয় অনুষ্ঠান পরিচায়নে তৎপর হব। এ অনুষ্ঠান কোথাও ‘ছুবের বাড়া’, ‘হুমের বাড়া’ নামে পরিচিত। বানিয়াচঙ্গ অঞ্চলে এর নাম ‘আইয়ার বাড়া’ (বাড়া অর্থ ভানা)। আমাদের দেখা এ অনুষ্ঠানটি কষ্ঠসাধ্য, কঠোর শ্রম এবং ধৈর্যেই এর পূর্ণতা। ঐদিন গোবর ও মাটি দিয়ে লেপা উঠানে (বড় থেকে ছোট) এক সারি গাইল ছিয়া রাখা হবে। আমপাতায় রঙ লাগিয়ে গাইল সাজানো থাকত। ছিয়ায়ও রঙ দেয়া হত। সব গাইলে ধান রাখা হলে শুরু হত ভানা। বড় গাইলের বাড়াটাই ছিল অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ। সব গাইলেই একসাথে ভানা শুরু হত। সব গাইলেই দু’জন করে থাকতেন। সিঙ্গাপুরি গুয়া দাঁতের ফাঁকে চাপা দিয়ে বড় গাইলের নিপুণারা ধান ভানতেন। সকলেই সর্তক থাকতেন ছিয়ায় ছিয়ায় লেগে শব্দ না হয়। শব্দ হলে এটা খারাপ। বর-বধূর ঝগড়া হবে। ধান ঝাড়ার সময় এলে অন্য একটা গাইল বড় গাইলের দু জনকে ছেড়ে দেয়া হত। তারা ঐ গাইলে ‘বাড়া’ দিতেন। এর অর্থ হল, চূড়ান্তভাবে চাউল প্রস্তুত নাহলে থামা যাবেনা, এটাই ‘গাইলবাড়ার’ মূল বিশেষত্ব। অন্যরা যাই করুন বড় গাইলের দু’জনের বাড়ায় বিরতি দেয়া যাবেনা। ঝাড়া শেষে আবার বড় গাইলে ফিরে আসা। ভানতে-ভানতে চাউল যখন একেবারে ‘কাড়া’ (সাদা) হবে তখনই দু’জন থামবেন। কলাপাতায় রাখা গুড় খেয়ে তারা পানি খাবেন। চেহারায় প্রকট হয়ে উঠত কঠোর শ্রমজনিত ক্লান্তি।
গাইলবাড়ার চাল দিয়ে তৎকালে মেয়ের বাড়িতে শিন্নি রান্নার প্রচলন ছিল। কিছু চাল ছেলের বাড়িতে “বিবি শিন্নি” রান্নার জন্য পাঠানো হত। কনের বাড়িতে রান্না করা বিবিশিন্নি শুধুমাত্র ছোট বাচ্চারা খেতে পারত। তাও আবার নির্ধারিত জায়গায় বসে। জায়গায়টা হল, ঘরের ছেইচ। চাল বেয়ে মাটিতে যেখানে বৃষ্টির পানি পড়ে ঐ জায়গা লোক সমাজে ছেইচ নামে চিহ্নিত বা পরিচিত। ছাত্র মিজানুর রহমানের প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বিয়ের দিন বর-কনে উভয় বাড়িতে কচুশাক ডাল দিয়ে রেঁধে কনের বাড়িতে সাতজন মেয়ে এবং ছেলের বাড়িতে সাতজন ছেলেকে খাত্তয়ানো হত। এর নাম বিবি শিন্নি।

বানিয়াচঙ্গ অঞ্চলে এই চাউল দিয়ে খিচুড়ি কিংবা গুড় দিয়ে নরম জাউ রান্না করে কন্যাসহ সকলেই খায়। একটা বিষয় আমাদের পর্যবেক্ষণে সুস্পষ্ট হয়েছে যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব চিত্তচমোৎকারী রীতি-নীতি আজো বিদ্যমান। এখনো একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় নি।

বিয়ের আগের দিন উঠানের এক কোনায় চারটা কলা গাছ পুঁতে মাঝে মেয়েকে বসিয়ে দু’জনে মাথার উপর কাপড় ধরে রাখত। মেয়েকে মাখানো হত তেল হলুদ। এ আচারের নাম ‘তেলাই’ । বরের বাড়িতে কমবেশি এসব আচার পালিত হত।
 বিয়ের আগের রাতে বর কনে উভয়কে মেন্দি পরানোর রীতি প্রচলিত। এ মেন্দি পরানোর বিশেষত্ব হল, কোন ফুল, লতা, পাতা, বা জ্যামিতিক নকসার বিন্যাস নয়- দু’হাত ভরে মেহদির লেপ দেয়া হত। আঙ্গুলের অগ্রভাগ মেহদির আস্তরণে ঢাকা থাকত। 

পরদিন আনন্দের অমল কমল সৌরভে সারাবাড়ি সারাপাড়া মেতে ওঠত। আজ বিয়ে। আগেকার দিনে রাতে বিয়ে হত। কনের জিনিসপত্র আগের দিন পাঠিয়ে দেয়া হত। বরযাত্রীসহ বর এসে উপস্থিত হলে কনেরবাড়ির উৎকণ্ঠার অবসান হয়। বর এসেই বাড়িতে ঢোকার নিয়ম ছিলনা। বাড়ির বাইরে তাকে(বরযাত্রী সহ) বসিয়ে রাখা হত। শিশু মনের নির্মল আনন্দ গুঞ্জরিত হত ছড়ায়-
            ‘জলদি আইয়া দেখরে।
            বুয়াইর জামাই আইছেরে।
            পালকির ভিতরে হাজিয়া বইছে
            পাগড়ি মাথাত দিয়া-
            কাইল বুয়াইরে লইয়া যাইব
            কান্দাইয়া কান্দাইয়া।’

বাড়ির অন্দর মহলে খবর পৌছত এভাবে-
‘ঝেংগার ফুল ফুটিছে
দামান আইয়া উঠিছে।
কইন্যার মা নি ঘরগ
মুরগার ঠ্যাংগ ধর গ।’
ইতোমধ্যেই বর ও কনেপক্ষের মধ্যে ছন্দ-তরঙ্গে কথোপকথন শুরু হয়ে গেছে। কনেপক্ষের জিজ্ঞাসা-
‘আচ্ছালামু আলাইকুম
ভাই জনে জনে-
দামান আইছইন শ্বশুরবাড়ি
তুমরা আইছ কেনে?’
বরপক্ষের তড়িৎজবাব-
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম
ভাইসব উবা (দাঁড়ানো)
দামান আইছইন বিয়া করতা
আমরা আইছি শোভা।’

আমরা দেখেছি হবিগঞ্জ অঞ্চলে বর আসার সাথে সাথে দু’জন লোক (কনে পক্ষের) সারাগ্রামে ‘জামাই তুলা’র দাওয়াত দেবার জন্যে বের হতেন। একজন বলতেন, ‘জামাই তুলার জিয়াফত দিয়া যাই’। অন্যজন বলতেন, ‘জামাই তুলার তল্ফি দিয়া যাই’। এই ছন্দিত দোলায় শিশুমন হত আপ্লত, পরিপ্লুত। এভাবে গ্রামের মুরুব্বিদের নিয়ে জামাই তোলা হত। বর্তমানকালের মত সেকালেও গেইট ধরা হত।

সিলেট অঞ্চলে বিষয়টা এরকম-“কনের বাড়িতে গ্রামের মুরুব্বিয়ানগণ বরকে বিবাহবাসরে আগমনের অনুমতি প্রদান করেন। অবশ্য পূর্বাহ্নে বরপক্ষের একজন দূত একটা সাজানো পানদান নিয়ে এসে সমবেত মুরুব্বিয়ানগণকে ছালাম করে পানদান হস্তান্তর করে। এটাকে ‘খবরি পানদান’ বলে। কনেপক্ষের শালা ও ভায়রা ভাই সম্পর্কীয় দু’চার জন বরযাত্রীর সামনে ছাতি মাথায় দিয়ে ছালাম জানায়। এর অর্থ হল বিবাহ বাসরে প্রবেশের অনুমতি। বরযাত্রীগণ এগিয়ে যান”৯। 

এমন সময় কনে পক্ষ বলে, ‘আচ্ছালামু আলাইকুম ভাই
আথারে পাথারে।’ (এদিক-ওদিক )
বরপক্ষের মুচকি হাসির জবাব – ‘আমরা ওঠলাম ভাই
কাতারে কাতারে’।
অত:পর আসন গ্রহণ। শরবৎ খাওয়ানো প্রভৃতি। ছড়ার ঝংকারে প্রশ্নোত্তর চলতেই থাকত,
‘কার নাতি কার গিয়াতি?
লগে আইছে কোন জাতি?
কার লগে খাইছ ভাত ?
কে ধুয়াইতো তুমার হাত?’
মুখের উপর বরপক্ষের উত্তর – ‘তুমার নাতি তুমার গিয়াতি।
দশ ভাই আমার জাতি আথি।
দশ ভাই লগে খাইছি ভাত ।
তুমার গুলামে ধওয়াইতো হাত’।

ইত্যকার বাক নৈপুণের মাঝেই খাওয়া দাওয়া। বিয়ে বাড়িতে সর্বকালে সর্বদেশেই আহার একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। সামর্থানুসারে নানাবিধ উপাদেয় খাদ্যের আয়োজন করা হত, এটা বলাই বাহুল্য। এর মাঝে বড় বড় খঞ্চায় (বড় থালা) নওশা, তার বাবা, চাচা, দাদা, বোনের জামাই, ভাই এদের জন্য আস্ত রোস্ট (এটাকে বলা হত আস্তা বিরান।) পরিবেশন করা হত। একেকটা থালাকে সাগরানা বলা হত। দশটা থালা থাকলে দশটা সাগরানা এরকম। এ বিষয়টাকে কনেপক্ষ আভিজাত্য এবং বরপক্ষ সম্মান প্রদর্শন বলে গণ্য করতেন।
আমাদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্যত্র শুনি “দেওয়া হত আস্ত মোরগের কাবাব। এটাকে বলা হত সাগরানা। থালা সাজানো হত দশ বারজনের উপযোগী করে। এতে দামান্দের শালা, শালি সর্ম্পকের ছেলেমেয়েরা শরিক হত। দই, বিরুন ভাত,ও গুড় ছিল বিয়ের থালায় অন্যতম আকর্ষণ। চিনি ছিল দুই প্রকার, লাল ও সাদারঙ্গের ।”১০
বরের সাগরানা দেখে ঠাট্টাসম্পর্কীয়রা বলে ওঠতেন, ‘খাইতা বইছুইন নয়া জামাই
মুখে নাই তার রাও-
ভাবে সাবে বুঝা যায়
মাংস খাইবার চাও।’

ইতোমধ্যে কনে সাজানোও চলছে। সাধারণত দু’টিতে (একটা স্যুটকেস, একটা ট্রাংক) স্যুটকেসে থাকত, শাড়ি, ব্লাউজ, সেমিজ, রুমাল, পেটিকোট, নাইওরির কাপড় (বেভার), বাচ্চাদের কাপড় ইত্যাদি। ট্রাংকে থাকত লক্ষ্মীবিলাস তেল, গন্ধরাজ তেল, মহাভৃঙ্গরাজ তেল. হিমকবরী তেল,  কাপড় ধোয়ার গোলা সাবান, জবাকুসুম তেল, কদুর তেল, চুলের ফিতা, কাঁটা, টার্সেল, আলগাখোঁপা, ক্লিপ, আলতা, তিব্বত ¯েœা, পাউডার, কাজলদানি, সুরমাদানি, চিরুণী, কসকো সাবান, লাক্স সাবান, পামরোজ সাবান, মোজা, জুতা, সেন্ডেল, নখ পালিস, আয়না, ইত্যাদি ইত্যাদি। অভিজাত পরিবারে এক ধরনের স্যু জুতা দেয় হত। অভিজাত সমাজের চেয়ে লোকসমাজে কইন্যার সাজানি ছিল ভিন্নতর। এ সমাজে কন্যার চুলে খুব বেশি করে তেল দেওয়া হত। আমরা দেখেছি, চুলের তেলে যাতে শাড়ি নষ্ট না হয়ে যায় এজন্য মাথায় একটা রুমাল রেখে এর ওপর ঘোমটা দেয় হত। এরপরও বড়শাড়ির মাথার অংশ তেলে ভিজে যেত।      (বিবাহের প্রধান শাড়িকে বড় শাড়ি বলা হত)।

চুলে নানারকম বেণী করে চুল বাঁধা হত। একটা বেণীর নাম মনে আছে- খেজুর বেণী-অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন।
অন্দরমহল ছেড়ে এবার আমরা বহির্মহলে আসি। আসরে একজন ‘ফরসি’ বা ‘বিন্দাবনি’ হুক্কা এগিয়ে ধরতে ধরতে বললেন, 

‘উক্কার ভিতরে কাটুয়ার ছাও
হারাম হালাল চিনি খাও।’
হুক্কায় হাত এগিয়ে দিয়েও অনেকে পিছিয়ে নিলেন। কারণ উত্তরে কী বলবেন ? কিন্তু কেউ একজন হাত এগিয়ে দিতে দিতে মোক্ষম জবাবটা দিয়ে দিলেন,
‘উপরে আইন তলে পানি
হারাম হালাল আমি চিনি।’
“বলিয়া টান দিয়া সেবায় রত হইলেন। বাক্য যুদ্ধে বিজিত তামাক ছিলিম তার নিজের অধিকার বর্তাইয়া একেবারে ছাই পর্যায়ে নিয়া হাত হইতে নল রাখিলেন। অপর তামাকখোর, তামাক জ¦লা গন্ধে এতক্ষণ মনমরা ছিলেন। ইনি নল ছাড়িতেই তিনি খপ করিয়া নল ধরিয়া-
‘আছলাম দূরে আইলাম কাছে।
ওই উক্কাতনি কিছু আছে।’
বলিয়া পুড়–ৎ পাড়–ৎ তিন টান দিয়া আবারÑ
‘উক্কা গুড়গুড় ছিলিম ছাই
ওই উক্কাত কিছু নাই।’
বলিয়া স্বগত উক্তি করিয়া নল ছাড়িবেন।”১১
হুক্কার আসরের মত পানের আসরও নানা রকম রঙ্গ-তামাসা, চাতুর্যপূর্ণ বাক্যমালায় শ্রীম-িত ছিল। পান, চূণ, জর্দা, সাদাপাতা সহ আরো নানাবিধ মশলাসহযোগে সমৃদ্ধ পানদান আসরে পৌঁছলে শুরু হত কথার মারপ্যাচ। এ যেন ‘কেহ কারে নাহি জিনে সমানে সমান’। পান দেখেই সকলে উল্লসিত। এবার ভুরিভোজনটা ষোলকলায় পূর্ণ হবে। এর মাঝেই কেউ মুখে পুরে দিয়েছেন। কেউ উদ্যোগ করছেন। তখনি ছড়ার বাক্য-বাণ — ‘
‘পান খাও প-িত ভাই কথা কও ধীরে
পানের জনম অইল কোন অবতারে?
যদি না কইবায় পানের কথা
ছাগল অইয়া খাইবায় হেওরার পাতা।’
কী সাঙ্ঘাতিক কথা। প্রশ্নের উত্তর না দিয়েত আর পান খাওয়া যায়না, সকলেই ভাবিত চিন্তিত। এর মাঝেও বরপক্ষের বাক্পটু একজন বৈরাতি হার মানার পাত্র নন। কথা বাড়ানোর জন্য তাই তিনি বলেনÑ
‘আগে আন ন মন দই, ছ মন খই-
তেগি (তবে) পানের কথা কই।’
আরেক বৈরাতি দই-খই এর প্রত্যাশী নন। তার হাতে আছে বহ্ম্রাস্ত্র। তাই তিনি বীর দর্পে এগিয়ে এলেনÑ

‘লঙ্কায় জন্মিছিল পান-গুয়া রাবোণোর দেশে।
ছিরাম গেছলা যিবলা সীতার তাল্লাশে।
মহাবীর উলুমান গেছিল তান্ সাথে।
হুরিয়া আনছিল চারা রামের অজ্ঞাতে।
সাত আইল পর্বতো আনি ছাড়িয়া দিল
বারৈয়ে পাইয়া তারে যতন করিল ।
সোনার গাইয়া গুয়ারে বিক্রমপুরি পান
বারৈয়ে জানে তার পানের সন্ধান।
ছল বৈশাখে গুয়ায় ফালায় ছড়া
দিন শয়ানে পানে দেয় ধরা।
এখান করি ভাঙ্গে আ-লা করিয়া রাখে।
পানুয়ার ঘরো এই পান থাকে।
ছয় আনায় এক পাই, দুই পাইয়ে এক মুঠা
বাজারো আনিয়া পানুয়ায় পানি মারে ছিটা।’
ছন্দের এই সজল বর্ষার বারিসিঞ্চনে থরে বিথরে ফুটত হাসি-আনন্দের কদম-কেয়া। সাতসুরের দীপালিতে মনোতোষিণী রস কান্তিতে দীপিত হয়ে ওঠত বিবাহ-বাসর।

আগের দিনে উপহার বিতরণ ছিল একটা চিত্তাকর্ষক বিষয়। সকলেই এটা পাওয়ার জন্য উন্মুখ অধীর হয়ে থাকতেন। সাধারণত কনের ছোট ভাই-বোনদের পক্ষ থেকে বোনের বিয়ে উপলক্ষে প্রীতি- বা ভক্তি উপহার শীর্ষক ছাপানো যে হ্যান্ডবিল আসরে বণ্টন করা হত - তাই প্রীতি উপহার। পদ্যে বিন্যস্ত প্রীতি -উপহারে বর ও কনেকে ঘিরে নানারকম কথাবার্তা থাকত। (নমুনা দেয়া হয়েছে। যা আমার বাবা অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী ও মা মোছা: সহিদা খাতুনের বিয়ের।)

গভীর রাতে আকদ অনুষ্ঠানের পর অন্দরে জামাই নেয়া হত। সাথে থাকতেন দাদা, দুলাভাই ও অন্যরা।কনেকে এর আগেই পশ্চিমমুখি করে বসিয়ে রাখা হয়েছে। বর এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন, কারণ, তাকে বোকা বানানোর জন্য কনেকে নির্ধারিত জায়গায় না বসিয়ে বরের জায়গায় বসানো হয়েছে। অত:পর বরের জায়গা ছেড়ে দিলে বসার পালা । কিন্তু ওকী ? এ কিসের শব্দ? কলহাস্য, শব্দ মিলেমিশে একাকার। বরের বসার আসনের নীচে আগেই রাখা হয়েছে মাটির হাঁড়ি পাতিল ভাঙ্গার টুকরা। বর এগুলোর ওপর বসার সাথেসাথেই পট পট শব্দ এখানেই যত বিপত্তি। ঠাট্টা, মশকরা, শরবত, মিষ্টি খাওয়ানো, কনের মুখ দেখা, বর কর্তৃক মুরুব্বিদের ছালাম করা, বিনিময়ে ছালামি পাওয়া ইত্যাদি চলতেই থাকত। বর যখন ছালাম করার জন্য ওঠে দাঁড়াতেন দেখা যেত আরেক কা-। ছুটত হাসির ফোয়ারা। কে জানি পেছন থেকে খুব সন্তর্পণে সেপটিপিন দিয়ে বরের আচকান বসার আসনের বা বসার চাদরের সাথে আটকে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে...। এর মাঝে আবার মহাবিপদ। বরের জুতা চুরি হয়ে গেছে। বহু হাঙ্গামার পর অবশ্য জুতা ফেরৎ পাওয়া যেত।
আর একটা বিষয়। সিলেট অঞ্চলে বিবাহ বাসরে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিস নিয়ে বাদানুবাদ, ঝগড়াঝাঁটি হত। কনে পক্ষ ছেলে পক্ষের জিনিসে খুঁত ধরতেন। কখনো কখনো বিয়ে পর্যন্ত ভেঙ্গে যেত। ঝগড়াঝাঁটির বিষয় থেকে সাধারণ একটা পাটি বা পিতলের বদনাও বাদ দেওয়া যেত না। লোক বিশ^াসে ঝগড়া ঝাঁটি হলে বিয়ে সুখের হয়। এটা মঙ্গল জনক বিষয়। আমাদের জানামতে এক পাত্রকে (হবিগঞ্জ অঞ্চলে) সুন্দর তোয়ালে আনেনি-এ অপরাধে টানা তিন দিন বসিয়ে রাখা হয়েছিল।

যাক আবার ফিরে যাই জামাই ‘আন্দরে’ (অন্দর মহল) নিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে। “এটাকে ‘শা-নজর’, আবার কোন-কোন এলাকায় ‘মুখ দেখা’ বলা হয়ে থাকে। এটা বড়ই উপভোগ্য ও বৈশিষ্ট্য ম-িত। “অন্দর মহলে একটা বড় প্রকোষ্টে বিছানার উপর সাজানো কনে ঘোমটা দিয়ে বসে থাকেন। বর দরজার সামনে আসলে ‘দুয়ারধরা’ নামক বখশিস প্রদান করে ঘরে ঢুকে কনের পাশে আসন গ্রহণ করেন। এরপর নানি দাদি বর ও কনের মুখে মিষ্টি তুলে দেন। দুধের পায়েস চামচে তুলে খাওয়ানো, হয় এটাকে ‘ক্ষির চাটনি’ বলে। …ঘোমটা তুলে কনের মুখ দেখানো হয়।”১২

নানাভাবে দামানের বুদ্ধিমত্তা, বাকনৈপুণ্য, উপস্থিত বুদ্ধি এককথায় তার ব্যক্তিত্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যাচাই করা হত। নানারকম বাক্যবাণে জর্জরিত দামানকে কেউ হয়ত এক সুকঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন,
‘রুটি খাইলায়, পিঠা খাইলায়
আর খাইলায় চইÑ (এক প্রকার পিঠা)
বিয়া করি নিতা আইছ
মা – না – মই ?’ (খালা)
পর্বত প্রমাণ কঠিন প্রশ্ন, কিন্তু বুদ্ধিমত্তায় দামান সকলের সেরা। তাই প্রমাণিত হয় জবাবে Ñ
‘বাপ চাচায় দিয়া গেছৈন (গিয়েছেন)
হান্দেশর (এক প্রকার পিঠা) বইন্না (বায়না)-
বিয়া করি নিতাম আইছি
‘হড়ির’ (শাশুড়ী) ঘরের কইন্যা’।—
যথোপযুক্ত জবাবে সন্তুষ্টি আর আনন্দে আন্দর মহল রঙধনুর সাতরঙ্গে ঝিলমিলিয়ে ওঠে।

এবার অন্যপ্রসঙ্গ। জামাই ক’দিন শ^শুরবাড়ি থাকতে পারতেন এ বিষয়ে একটা চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। জামাই নাকি পরদিন খুব ভোরে চলে যেতেন। কারণ নতুন জামাই শ^শুরবাড়ির ‘টুল্লি’ (ঘরের সবচেয়ে ওপরের অংশ) দেখতে পারবেনা, এটা অমঙ্গল সূচক। ছাত্র মিজানুর রহমানের তথ্য অনুসারে পরদিন নাস্তা খেয়ে জামাই কন্যা নিয়া চলে যেতেন। রুমিনা আক্তার পারুলের তথ্য Ñ আগেকার সময়ে নতুন জামাই শ^শুর বাড়িতে তিন দিন থাকতেন। আত্মীয় বাড়িতে জামাই পানের বাটা পাঠাতেন। পরে এসব বাড়িতে দাওয়াত খেতেন। তখন পানের বাটায় জামাইকে ‘ছালামি দেওয়া হত। চতুর্থ দিন বর বধূ রওনা হতেন।
আমরা দেখেছি, পরদিন নাস্তা খেয়ে জামাই - কন্যা চলে যেতেন। হবিগঞ্জ অঞ্চলে বিয়ের আড়াই দিন পর দু’জনে কনের বাড়িতে আসতেন। এই আসার নাম ‘ফিরা যাত্রা’। সিলেটে এটাকে বলে ‘দজগন’। আমরা যথাস্থানে বিষয়টা ব্যক্ত করেছি।
বিয়ের ময়ূরকণ্ঠী রাতের শেষে ভোর আসে। পূরবী আর কলাবতীর বেদন- মধুর উদ্ভাসে বিশ^চরাচর পরিব্যাপ্ত হয়ে যেত। একটুপরেই কাঁদনঘন রসাল্পনায় বিয়েবাড়ি মুহ্যমান হয়ে ওঠবে। নানা আয়োজনে কনে বিদায়ের সেই বিষাদ-কাতর প্রতিচ্ছবি মূর্ত হয়ে ওঠত।
উঠানে একটা বড় পাটি বিছানো হত। কনেপক্ষের একজন একটা একটা করে দানসামগ্রী বা যৌতুকের উল্লেখ করতেন। সাথে সাথে তা পাটিতে রাখা হত। অন্যদিকে বরপক্ষের একজন তা লিখে রাখতেন। কনের সাথে গাই-বাছুর,বা খাসি, বা বকরি, বা মোরগ দেয়া হত। বরেরবাড়িতে বৌ-ভাতের ( লোকমাজে বৌ-ভাতা) দিন এগুলো রান্না হত।
কন্যা বিদায়ের সময় বাড়ির ধানের গোলা হতে কুলায় করে ধান আনার রীতি ছিল। কন্যা দু’হাতে দু মুঠ ধান নিত। ডান হাতের ধান বাপের বাড়ির গোলায় আবার ফেলে যেত। বাম হাতের ধান গামছায় বেঁধে দেয়া হত। এ ধান কন্যা শ^শুরবাড়ির ধানের গোলায় গিয়ে ফেলবে। কন্যার সাথে কলাগাছ দেওয়া হত। যাতে কলাগাছের মত বংশবৃদ্ধি ঘটে। 

মা-বাবা কন্যাকে বরের হাতে সঁপে দেবেন।

এবার কনে বিদায়। এতদিনের আলোকোজ্জ্বল দীপালি এ মাঝেই নিভে গেছে। নিঃসীম এক আঁধারে ছেয়ে গেছে সমস্ত বিশ^চরাচর। বেহাগ আর মেঘমল্লার রাগিণীতে শুধু একটাই আর্তি। মেঘান্ধ আকাশ। দিগন্ত ব্যাপী শুধু হৃদয়ভেদী হতাশ^াসে ব্যাকুলিত ক্রন্দন- ‘যেতে নাহি দিব’।
ওদিক বরপক্ষের তাড়া চলছেত চলছেই। কিন্তু কাকে উঠিয়ে দেবে ? কন্যা যে কাঁদতে কাঁদতে বারবার ‘ছান্তা’ (ফিট, নিশ্চেতন) মারছে। শুরু হল মাথায় পানি ঢালা। কন্যার সাথে দেয়া কাজের মেয়ের (তৎকালে বলা হত দাসি, বান্দি) চোখও অশ্রুসজল। চেতন পেয়ে আবার শুরু হল কান্না। এখন শহুরে সভ্যতার যান্ত্রিক অগ্রাসনে চোখের জলের সেই সজল বরষা আর নেই। বেদন মধুর কোমল আলিম্পনে অনুভবের আকাশ এখন আর অনুরঞ্জিত হয় না। 
এক সময় নির্মোঘ নিয়তির নির্দেশে নিকটাত্মীয় কেউ কন্যাকে পাঁজাকোলা করে পাল্কি বা নৌকায় উঠিয়ে দিলেন। “ নৌকা ছাড়িয়া দিল। বর্ষাবিস্ফারিত নদী ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশিরমত চারিদিকে ছলছল করিতে লাগিল। একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ^ব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্রকাশ করিতে লাগিল।”১৩ (রবি, পোষ্টমাষ্টার)

বিয়ের পরদিন কন্যার ভাই নিজেদের বাড়ি থেকে বেত নিয়ে বোনের বাড়ি যাবে। ঐবেত দিয়ে বোনের বাড়ির ঈশান কোণায় একটা থোকা বাঁধবে — যাতে সে বসতে পারে । (মিজানুর রহমান)

বিয়ে ঠিক হবার পর থেকেই নিরুপম আনন্দবৈভবে বরের বাড়ি ভরা বর্ষার কূলপ্লাবী নদীর মত পরিপূর্ণ হয়ে ওঠত। সর্বত্রই উৎসবের রঙ। যেন ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।’ আনন্দ নিকেতনের বসন্ত আর জয়জয়ন্তীরাগে বেজে ওঠত প্রাণের স্বত:স্ফূর্ত উৎসার। এক অনির্বাচ্য পুলক-সাচ্ছল্যে সারাবাড়ি হিল্লোলিয়া ওঠত। দু’দিন পরেই ভীনদেশি এক পরমা সুন্দরী কইন্যা ঘরে বউ হয়ে আসবে। সকলের মনই এ কারণে ফুল্ল, মুখর। নিশি-দিন অভিব্যক্ত গীতি-লালিত্য বুঝি সে বারতাই সকলের মনের দরোজায় পৌঁছে দিত।

কনের মত বরের হাতেও কাঙ্কেনা বাঁধার রীতি ছিল। ভাবিরা বিয়ের আগের রাতে মেহদি পরাতেন। পরদিন কন্যারমত বরেরও গোছলের আয়োজন। গায়ে হলুদ, সুন্দা, গিলা, মেথিবাটা দিয়ে প্রধানত ভাবিরাই গোছল করাতেন। গোছলের শেষে বর যাই পরতেন সব ছিল নতুন। লুঙ্গি, গেঞ্জি ইত্যাদি। এরমাঝে গীতের তরঙ্গিনী ছুটছেত ছুটছেই...।
বিয়ের দিন ভোর থেকেই দূর দূরান্ত থেকে বরযাত্রীরা আসতে থাকতেন। পান, তামাক, হাসি আনন্দের কলগুঞ্জনে বাড়ি মুখরিত হয়ে ওঠত।
আমরা দেখেছি, উঠানে একটা নতুন পাটি বিছিয়ে দেয়া হলে বর এর ওপর এসে দাঁড়াতেন। সবাইকে ছালাম জানাতেন। শুরু হত ‘জামাই হাজানি’ (সাজানি)। দাদা, নানা, দুলাভাইসহ মুরুব্বিরা একেকজন একেকটা পোশাক পরিয়ে দিতেন। পোশাক আশাকের মধ্যে ছিল, আচকান, পাজামা, শাল, মাথার মোরাসা হাতে রুমাল। সব ঋতুতেই দামান্দের গায় একটা আলোয়ান (চাদর) থাকত। হাতে রুপার আংটি, পায় মোজা সহ নাগরাই জুতা। কেউ কেউ চুড়িদার পাজামা পরতেন। হাতের রুমাল ছিল অত্যাবশ্যক। জামাইর জন্য নতুন ছাতি থাকত। বরের বাহন ছিল নৌকা, হাতি, ঘোড়া, চৌদল, পালকি। আমরা নানারঙের বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত বৈরাতি নিয়ে বরকে হেঁটে আসতেও দেখেছি। সে ক্ষেত্রে বরের মাথায় দৃষ্টিনন্দন একটা বড় ছাতা (সমুদ্র সৈকতের ছাতার মত বড়) থাকত। পড়ন্ত বেলায় গোধূলির ঝিলিমিলি রঙে মাটির সড়ক পথে অগ্রসরমান বর এবং বরযাত্রীকে দূর থেকে দেখতে কী-যে মনতোষিণী লাগত। হেঁটে আসা বরের জিনিসপত্র (মিষ্টি ট্রাংক ইত্যাদি) মাথায় করে কেউ আনত। বা ভারে করে আনা হত। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, জনশ্রুতি আছে বিবাহে গোলাম ছিল। নানারকম ফরমাস খাটা, বরের মাথায় ছাতাধরা, পা ধুইয়ে দেয়া, আসরে পান-তামাক পরিবেশন করা ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকে গোলাম বলা হত। শোনা যায়, অনেক বর নাকি গোলামের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে বিয়ে করতে যেতেন। (এ অনভিপ্রেত রীতি শরিয়ত মতে নিষিদ্ধ)
যাক্ বর রওনা হবার আগে মায়ের কোলে বসে দুধ-ভাত বা শুধু দুধ খেতেন। কেউ কেউ বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে বিয়ে করতে আসতেন। বাদ্যকরদের বলা হত নাগারছি। কোন বরের সাথে থাকত লাঠি খেলা। হেঁটে বা বাহনে চড়ে যে ভাবেই বর আসুন কোন কোন বরযাত্রীর আগে থাকত সাদাধুতি, লাল পাগড়ির লাঠি খেলার দল । লাঠির চিত্ত বিমোহন নানারকম অবিশ^াস্য ভঙিমা শিশুমনে বিস্ময় জাগাত। বিয়ের পরদিন উঠানে লাঠি খেলা চলছে - এক লোক পুরোমুখ গর্তে পুরে পা ওপরে তুলে নানা রকম কসরৎ দেখাচ্ছে এ দৃশ্য আমরা বিস্ময়-বিমুগ্ধ চিত্তে প্রত্যক্ষ করেছি। ঘুরন্ত লাঠি এক হাত থেকে অন্য হাতে নেয়া, শূন্যে ঘুরানো, দু’জন মিলে খেলা ইত্যাদি সমবেত শিশুদের পুলকে আকুল করত। কোনো বিয়েতে পটকা ফাটানো হত। লোক ভাষায় এর নাম ‘বনগোলা’। ‘বনগোলা’ ফাটিয়ে বরাগমনের সংবাদ জানানোর সাথে সাথে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও এর প্রচলন ছিল।
সিলেট অঞ্চলের বিবাহরীতি সম্পর্কে আমরা একটা চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছি। তাহল “বিয়েতে নারীকে বিজয় করে আনার দৃষ্টান্ত দিতে সিলেট অঞ্চলের বিবাহরীতির দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি, বৃহত্তর সিলেটের কোন কোন অঞ্চলে বরযাত্রীদের কন্যাপক্ষের সাথে লাঠি নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার রীতি প্রচলিত ছিল। যতক্ষণ বরপক্ষ কনে পক্ষকে পরাজিত করতে না পারতো, ততক্ষণ বরপক্ষ কন্যার গৃহে প্রবেশের অনুমোদনই পেতনা।”১৪ 
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে পানের ব্যবহার ও উপযোগিতা বিচিত্রমাত্রিক। আমরা দেখেছি, বিয়ে-শাদীতে সুসজ্জিত পানের বাটা একটা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। পানের বাটা ছেলে পক্ষ থেকে কনের বাড়িতে আনা হত। হবিগঞ্জ অঞ্চলে বহু সাধ্য সাধনায় আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে কয়েকজন মিলে বাটা সাজাতেন। দুর্বার কৌতূহল এবং আগ্রত বশতঃ বহু বাটা সাজানোর কাজে শৈশবে প্রবৃত্ত হয়েছি। সেসব হিরণ¥য় স্মৃতি হৃদয়াকাশে আজো অমলিন, ভাস্বর।
সে সময় খুব সুন্দর সুন্দর বড় বাটা পাওয়া যেত। অভিজাত ঘরে তা ব্যবহৃত হত। বাটার শিল্প-সৌকর্য বর্ণনা করা সহজ নয়। কী যে নকসা, সূক্ষ্ম কারুকাজ, বড়ই দৃষ্টি নন্দন।

রাত জেগে বাটা সাজানোর কাজ চলত। বিভিন্ন ডিজাইনে সুপারি কাটা হত। (আমার মা সুতার মত মিহি করে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুপারি কাটতে পারতেন। সকলের মনেই এটা দারুণ বিস্ময় সৃষ্টি করত।) পানের খিলিত ছিলই। পান দিয়ে প্রজাপতি বানানো হত। প্রজাপতির মাঝখানে লবঙ্গ গাঁথা। কী যে দৃষ্টি নন্দন। এ ছাড়া পানকে দু’ ভাঁজ করে ছোট কাঁচি দিয়ে কিনারে নক্সা করা হত। নারিকেল বা সুপারির পাতা দিয়ে (মাঝে লবঙ্গ গেঁথে) ছোট ছোট ত্রিভূজ, হলুদ গোল বা ত্রিভূজ করে কেটে কিনারে নক্শা, সুপারি গোল করে কাটা, পানের ত্রিভূজ, রঙিন ফিতা ও কাগজের ছোট ছোট ফুল, রঙিন কাঠি ইত্যাদি সহযোগে সুতা দিয়ে মালা বানানো হত। পানের বাটার গুণ, শোভাও মানবর্ধক মালাটি আগ্রহ ভরে সকলেই দেখতেন। এ গুলো সহ চূণ, নানাবিধ মশলা,(এলাচি দারুচিনি, লবঙ্গ প্রভৃতি) সুগন্ধি জর্দা সহ আরো কত কী যে দেয়া হত। মালাসহ সবকিছু বাটার ভেতরে দেয়া হত। এত গেল অন্তরঙ্গ দিক। বাটার বহিরঙ্গ দিক নকসা কাটা রঙিন কাগজ, ‘রাংচা’ প্রভৃতি দিয়ে সাজানোর পর সুন্দর রুমাল দিয়ে বেঁধে বাটা বরের সাথে দেয়া হত। এখানে বলা বাহুল্য, বাটা সাজাত হাত কিন্তু পান খাওয়া লাল ঠোঁটে জোয়ার জলে উথলে উঠত গীতল সুরের মোহন মধুর ভঙিমা। সুরের পাখায় ওড়ে-ওড়ে শিশুমন চলে যেত রঙে-রূপে, বর্ণে, গন্ধে বর্ণিল রূপকথার দেশে।

যে ‘বাটা হাজানি’ বরের বাড়ির মেয়েদের সুরুচি, বর্ণজ্ঞান, শিল্পবোধ, আভিজাত্য, নান্দনিক অভিব্যক্তি সর্বোপরি শৈল্পিক মনোভঙ্গি তথা উৎকর্ষের আভিব্যঞ্জনার নিয়ামক, এ বাটা সম্পর্কে শুনি,  “বিয়ের সময় মিহি (বারিক) করে গুয়া কাটা হত। বিয়ের দিন দামান্দ পক্ষ আগেই চাইর বাটা পান কইন্যার বাড়িতে অগ্রিম সালামি হিসেবে পাঠাতেন। অধিকাংশ বিয়ে হতো রাতের বেলায়। ... ডে লাইট, হ্যাজাক বা পেট্রোমাক্স বাতি জ¦ালিয়ে বাড়ি আলোকিত করা হতো। মাইকের প্রচলন তখন তেমনটা হয় নাই। কলের গান বাজানো হত। গ্রামে না থাকলে অন্য কোনোখান থেকে সংগ্রহ করে আনা হত। দামান্দের পক্ষ থেকে কইন্যার আত্মীয়-স্বজনদের পৃথক পৃথক ভাবে পানের বাটা দেয়া হত। যারা পানের বাটা পেতেন তারা পান-গুয়া গ্রহণ করে বাটাতে ছালামি হিসেবে একটাকা, দু’টাকা আট আনা করে ছালামি দিতেন। নাইওরিগণ বাটার সেলামির টাকা আগে থেকেই নিয়ে আসতেন”। ১৫   

মিজানুর রহমান প্রদত্ত তথ্যানুসারে-কইন্যাকে আনার জন্য বরের বাড়ি থেকে একটা খালি মাওফা (পাল্কি জাতীয়) নেয়া হত। মাওফার ভেতর থাকত বাতাসা, মিষ্টি, কলা, নারিকেল সহ নানাবিধ খাদ্যদ্রব্য। এগুলো দেয়া হত কইন্যার মায়ের জন্যে। যাতে মায়ের মাথা ঠা-া থাকে। এই দ্রব্যসামগ্রিকে বলা হত ‘সুহাগ’।

এবার ভাটি অঞ্চলের (সুনামগঞ্জ সহ) দিকে একটু দৃকপাত করা যাক। “বর্ষাকাল ছিল ভাটি এলাকার বিয়ের মওসুম।... তখনকার সময়ে ভাটি এলাকায় ‘পানসি’ ও ‘ভাওয়ালি’ নামক বৃহদাকৃতির এবং অতি সুন্দর নৌকার প্রচলন ছিল। ধনী ব্যক্তিরা সখ করে এসব নৌকা তৈরি করতেন, এবং বর্ষা কালে তারা এসব নৌকায় ভ্রমণ করতেন। বিত্তবানরা বিয়ে শাদিতে এসব নৌকা ব্যবহার করতেন। গরিবরা ব্যবহার করতে পারতেন না। তারা বিয়ে শাদিতে ‘গস্তি’ নৌকা ব্যবহার করতেন। তখন সাধারণত রাতে অনুষ্ঠিত হত বিয়ে। ... রওয়ানা হওয়ার আগে বর পক্ষের কয়েকজন মুরুব্বি কনের শাড়ি-গহনা, মিষ্টি, ইত্যাদি নিয়ে একটি গস্তি নৌকায় কনের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দিতেন। তারা বরের আগেই কনের বাড়িতে পৌঁছে কনের সাজ-সরঞ্জাম, শাড়ি-গহনা ইত্যাদি কনে পক্ষের নিকট হস্তান্তর করতেন। বরের পক্ষের মুরুব্বিরা যে নৌকা নিয়ে কনের বাড়িতে যেতেন সেই নৌকাকে ‘কনের নৌকা’ বলা হত। কারণ বিয়ে শেষে এই নৌকায় কনেকে নিয়ে বর নিজ বাড়ি ফিরতেন। মুরুব্বিরা বরযাত্রীদের নৌকায় চলে যেতেন।

বর ‘পানসি’, ‘ভাওয়ালি’ ইত্যাদি যে নৌকায় করে কনের বাড়িতে যাত্রা করতেন সেই নৌকাকে চমৎকারভাবে সাজানো হত। বরের নৌকার সামনের দিকে ছোট খাটো গেইট তৈরি করে রঙ বেরঙের রঙিন কাগজ সুতায় এঁটে নিয়ে নৌকা সাজানো হত। বরের নৌকায় আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী বরযাত্রী হিসেবে থাকতেন। বরযাত্রীর সংখ্যা বেশি হলে বরের নৌকা ছাড়াও বরযাত্রীদের জন্য আরো একটি, দু’টি নৌকা থাকত।

 নৌকার সামনে ছইয়ের বাইরে রাখা চেয়ারে বর বসতেন এবং বরের পাশে আরেক চেয়ারে বরের দুলাভাই বরের মাথার ওপর ছাতা ধরতেন। বরের পরনে পাঞ্জাবী পাজামা এবং মাথায় পাগড়ি, গায়ে রেশমি শাল ও হাতে রুমাল থাকত। বর কনের বাড়িতে পৌঁছার পর সঙ্গীসাথিদের নিয়ে নৌকায় বসে থাকতেন। কনের বাড়ির পক্ষ থেকে যখন বরকে বাড়িতে ওঠার অনুমতি দেয়া হত তখন বর সঙ্গীদের নিয়ে বাড়ি উঠতেন। সাধারণত সন্ধ্যার পরই বরকে বাড়িতে উঠার অনুমতি দেয়া হত। ... কনের বাড়ির বাংলাঘরে বরযাত্রী বসতেন। ঘরের মেঝেতে চাদর, সতরঞ্চি ইত্যাদি বিছিয়ে দিয়ে বরযাত্রীদের বসার ব্যবস্থা করা হত। বাংলা ঘর ছোট হলে বরযাত্রীদের বাড়ির উঠানে বসানো হত। বরযাত্রীরা নির্দিষ্ট স্থানে বসে গেলে প্রথমে তাদের শরবৎ দেয়া হত। এরপর বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান আকদ।... আকদ শেষে বরের পক্ষ থেকে মু-া বা বাতেসা নামক মিষ্টি দ্রব্য উপস্থিত সকলের মধ্যে ছিটিয়ে দেয়া হত। যাদের কাছে এসব মিষ্টি পড়ত তারা হৈ-হুল্লোড় করে কুড়িয়ে খেতেন। এরকম মিষ্টি খাওয়ার মধ্যে ছিল বিরাট আনন্দ। 

খাওয়া দাওয়ার পর বরযাত্রীদের ঘুমানোর জন্য কয়েকটি বালিশ দেয়া হত। বরযাত্রীদের কেউ কেউ বালিশে মাথা রেখে ঘুমাতেন, আবার কেউ কেউ গল্পগুজবে মত্ত হতেন। এ সময়ে কনের বাড়ির লোকেরা এসে খোশ গল্প করতেন। রাতে বরযাত্রীদের দু’একবার চা পান করানো হত। আন্তরিক ও আনন্দময় পরিবেশে এভাবে সারারাত কেটে যেত। খুব সকালে বরযাত্রীদের নাস্তা দেয়া হত। প্রধানত দৃষ্টি নন্দন নানা রকম পিঠা দিয়ে নাস্তা দেয়া হত। বরযাত্রীরা নৌকায় উঠে যেতেন। বর বরযাত্রীদের নৌকায় না উঠে কনের নৌকায় উঠতেন। কনের সেবা করার জন্য কনের সাথে একজন কাজের মেয়ে দেয়া হত। এভাবে বর নববধূকে নিয়ে নিজ বাড়ির দিকে যাত্রা করতেন।১৬

ওদিকে বরের বাড়ির অঙন কলগুঞ্জনে শিঞ্জিত। অধীর উম্মুখ আগ্রহ। ঐ বুঝি বউ এল। বুঝি নৌকার মঞ্জুল পাল দেখা যায়। এদিকে লজ্জা জড়ানো ছন্দে কন্যার মন দুরুদুরু। ক্লান্তি, অবসাদ, আর ভয়ের সাথে স্বপ্ন সুখের মুকুলিত কথাকলির এক হিরণ¥য় সংশ্লেষ! হৃদি গগনে বিথারিত স্বপ্ন রাজি কাউকে কি বলা যায়? কিন্তু সঙ্গোপনে এরা শোনেÑ গলার রূপার আশ্লি ছড়া, সোনার সাত লহরি, কানের ঝুমকা, পায়ের বেহি কাঁওড়া (বাঁকা কাওড়া) গোলপাতা, পাওপাতা, গলার দোর ছড়া (পুঁতি দিয়ে তৈরি), হাতের বাজুবন্দ, রুলি।

পাড়ার বৌ-ঝি বাচ্চাদের ভীড়, হই চই। এর মাঝেই বধূবরণ। ওদূরে একটা খঞ্চার ওপর হিচা (হেলেঞ্চা) শাক রাখা। নয়া দামানকে ঘরে ঢোকার আগে শাকের ওপর পা রাখতে বলা হত। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাপধন, তুমার পাওর তলে (পায়ের নীচে) কিতা (কি)?’
দামান জবাব দিল ‘হিচা’।
মা বললেন, ‘হউর (শ^শুর) বাড়িত যেতা (যা) খাইচ
সব মিছা।’ (মনোয়ারা)
এরপর মুরুব্বিরা কন্যাকে মধু, শরবৎ, মিষ্টি খাইয়ে আলগোছে ধরে এনে নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে দেন। মুরুব্বিদের পরিচয় পর্ব ও ছালাম পর্ব চলে। সকলেই অধীর আগ্রহে কইন্যার মুখ দেখতে চান। কন্যা যতটুকু পারা যায় ততটুকু মাথা নুয়ে রাখেন। পাশে বসে থাকা একজন একহাত ঘোমটা সরিয়ে আগ্রহীদের কইন্যা দেখান। মুখ দেখানোর সময় কইন্যা লাজে শরমে দু চোখ বন্ধ করে রাখেন। প্রথম কিছুদিন কন্যাকে মেহমানের মত রাখা হয়। বাড়িতে ভালভাল পদ রান্নার ধুম লেগে যায়। বড় খঞ্চায় সাগরানা দেয়া হয়।

বিয়ের পরদিন নানারকম অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্যময় আবহ সৃষ্টি হয়। সানন্দ বাক্যালাপ আর কলহাস্যে সারাবাড়ি পরিম-িত হতে থাকে। লাস্যময় লীলা চাপল্যে বাতাস গান গেয়ে ওঠে।
ঐদিন কন্যাকে গোবর ছুয়ানো হয়। কৃষি নির্ভর সমাজে গরুযে বিশিষ্টতা জ্ঞাপক এবং বিশেষভাবে মর্যাদা সম্পন্ন সর্বোপরি বিশেষভাবে মূল্যায়িত গোবর ছোঁয়ায় তাই স্ফূটমান। নতুন মাটি দিয়ে চুলা লেপানোটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ আচার (মিজানুর রহমান)। কন্যাকে পাটায় মরিচ হলুদও পেষানো হয়। মিহি করে মশলা বাটা একটা অন্যতম গুণ বলে গণ্য করা হত আমরা এ বিষয়ে অন্যত্র বলেছি।

পরদিন বাসি গোসল করিয়ে কন্যাকে ঘরের বারান্দায় বসানো হয়। বরের মা একটা পিঁড়িতে বসে। তখন শুরু হয় এক অভিনব ও চিত্তরঞ্জন অনুষ্ঠান, এর নাম ‘বউ কোলা’। বর কনেকে কোলে নিয়ে মায়ের কোলে বসে। সামনে রাখা হয় মাটির সরা বা ‘মুছি’। (ছোট এক প্রকার ঢাকনা যা দিয়ে কলসি ঢাকা হয়)। তখন ছেলেকে ওগুলো পায়ের গোড়ালি দিয়ে ভাঙতে বলা হয়। মাত্র একবার ভাঙার নিয়ম। এক চেষ্টায় ভেঙে দামান থামলে তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘কয়টা ভাঙলে’? যে কটা টুকরা হবে সে সংখ্যক বাচ্চা হবে বলে লোক বিশ^াস। এরপর কনেকে দিয়ে নতুন চুলা লেপানো হয়।

ঘরে মরিচ, চাল, সুপারি, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি ছড়িয়ে দিয়ে কনেকে ঘর ঝাড়– দিতে বলা হয়। জিনিসগুলো কুড়িয়ে গুছিয়ে রাখতে পারলে কন্যা পয়মন্ত, গৃহ কর্মে নিপুণা বলে ধরে নেয়া হয়।

বাজার থেকে ঘন আঁশযুক্ত মাছ এনে কনেকে কাটতে বলা হয়। এটাও পরীক্ষা। ধৈর্য, শ্রম, নৈপুণ্য পরখ করা হয়। কনে মাছ কেটে সব্জি কুটে রান্না করে সকলকে পরিবেশন করে খাওয়ায়। ঐদিন বর বাজার থেকে ছিকর (পোড়ামাটি), বুট, বাদাম প্রভৃতি আনলে আনন্দ-নির্মল পরিবেশে সকলে মিলে খায়। তখন রূপ-কান্ত, রসকান্ত কথারা সুরের ডানা মেলে দেয়। (মাকসুদা ফয়জুন্নেসা)

বিবাহের তিনদিনের দিন বাপের বাড়ির লোকজন কন্যার বাড়িতে আসেন। তখন কন্যার মুখ এক অভূতপূর্ব মায়াবি অরুণিমায় অনুরঞ্জিত হয়ে ওঠে। বসন্তরাগিণীতে তার মন পেখম মেলে দেয়। সিলেট অঞ্চলে “বিবাহের তিনদিনের সময় কনের বাড়ি থেকে আত্মীয়রা আসে তত্ত্ব নিতে। এটাকে ‘দজগন’ বলে। তারা অনেক মিষ্টি ও অন্যান্য তত্ত্ব নিয়ে এসে মহাধুমধামে খানাপিনা খেয়ে নববধূ ও বরকে নিয়ে যান। ২/১ দিন পর পাত্রের আত্মীয় স্বজন কনের বাড়িতে যেয়ে আবার মহাধুমধাম করে খানাপিনা খেয়ে রঙের হুলি খেলেন। মেজেট রঙ পানির সাথে মিশ্রিত করে উভয়পক্ষ বাঁশের তৈরি পিচকারির মাধ্যমে একে অন্যের গায়ে রঙ ছিটিয়ে হুলি খেলায় মত্ত হন। এটা বড়বেশী কৌতুকপ্রদ। এ সময় মেয়েরা কৌতুকপূর্ণ গান পরিবেশন করেন।”১৭

আস্তে আস্তে আচার অনুষ্ঠানের জোয়ারে ভাটা পড়তে থাকে। নাইওরিদের বিদায় বাঁশি বেজে ওঠে। বের করা হয় বেভারের কাপড়। (বিয়ে উপলক্ষে আত্মীয় স্বজন ও ছোট বাচ্চাদের নতুন কাপড় দেয়া বৃহত্তর সিলেটের রীতি। এই কাপড়ের নাম বেভার।) বর কনে উভয় বাড়িতেই নাইওরিরা বেভার পেয়ে থাকেন। শুধু নাইওরিই নন। গ্রামের অন্যান্য নিকটাত্মীয়াও এ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হননা। বর বিবাহের সময় কনের কাপড়ের সাথে অনেক বেভারি কাপড় নিয়ে আসেন। বরের বাড়িতে বরপক্ষ কিনে ভেবার দেন। এ কাপড়ের একটা বিশেষত্ব আছে। কাপড় ভাঁজ না ভেঙ্গে নেয়া যাবে না। সকলকেই পরে যেতে হবে। ছোট বাচ্চারা কাপড় পেয়ে কতযে খুশি। উঠানে রঙ বেরঙের প্রজাপতির মেলা বসে যায়।

বন্ধ হয় সুরের ললিত মোহন জলপ্রপাত। কিন্তু গীতল মাধুরিমায় তনুমন কিছু দিন হলেও অভিসিঞ্চিত থাকে। এই অভিসিঞ্চনের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিব্যাপ্ত। “বিবাহের নানা উপকরণ নিয়ে, সংগীতের ব্যবহার একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া। ইউরোপের নানা অঞ্চলেও বিবাহ সংগীতের বহুল প্রচার দেখা যায়। বিবাহ উৎসব বাসরে বর কনে উপস্থিত হয়। গ্রামের যিনি Village elder বা অপেক্ষাকৃত বয়স্ক তিনি বরকে লক্ষ করে বলেন, ‘ ‘our young princes/ Rose up in the morning very early, / washed herself snowy white / prayed to god / from her father and her mother / She received the blessings’…
পাত্র পক্ষের লোক উত্তর দেয়, ‘Our young prince has a great many servants / He has bright falcons / swift eagles / Hunting dogs / Mounted cossacks’ … ইত্যাদি।” ১৮
বলা যায় সিলেটের বিবাহ অনুষ্ঠানে আমরা নানাজাতীয় রসালো উক্তি প্রত্যুক্তি শ্রবণ করেছি, সুদূর ইউরোপেও উপর্যুক্ত নানা রকম বাক্যালাপের রসদীপ্ত সমাহার বিবাহ অঙ্গনকে সুরভিত করে তোলে। উপর্যুক্ত উদাহরণে সে কথাই দিব্য রাগে স্ফুটমান।

আবার নাইওরিদের আসরে ফিরে যাই। নাইওরিরা বেভার পিন্দা একে একে বিদায় নিতে থাকেন। দূর দেশ থেকে আসা বোন পরম পরিতুষ্টির সাথে দোয়া করেন Ñ
‘খাইলাম পাইলাম
ভরলাম পেট,
সুবর্ণে ভরউক আমার
বান্ধ ভাইর খেত।’
বেভারি শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে আরেক বোন বলে Ñ
‘খাইলাম পেট ভরি
পাইলাম কাপড়-
সুখে ফসলে ভইরা যাউক
আমার ভাইর ঘর।’

সকলের মুখেই শুভকামনার ফুলঝুরি। আঙ্গুলের ডগা থেকে মুখে চূণ পুরতে পুরতে ফুফু বলেন,
‘খাইলাম দাইলাম
তুষ্ট হইল মন,
আল্লাতালা করইন যেনে
সাফল্য জীবন।’
আারো কত কথা, নিতল আকুতি। রসের চিত্র বিচিত্র উৎসারণ। কত সুর, কত গান, কত আচার অনুষ্ঠান। রতœাকরে থরে বিথরে সাজানো অঢেল মণি মুক্তা। আমরাত উর্মি মুখর সাগরের মাত্র কয়েকটি লহরিকে কলম বন্দী করতে পেরেছি মাত্র। রয়ে গেছে দিগন্ত বিথারি কল্লোলিত সমুদ্র। সোনার ফসলে ভরা অবারিত মাঠ। রয়ে গেছে বৃহত্তর সিলেটের মাঠে-ঘাটে, বনবীথির ছায়ায় ছায়ায়, এখানে ওখানে প্রতিটি আনাচে কানাচে লোকজ অনুষ্ঠান তথা বিবাহ কেন্দ্রিক আচার আচরণের কত রঙধনু রঙ পসরা। বসন্তের বর্ণ বিভাসায় দ্যুতিময় এসব আচার একান্তই মনুষ্যধর্মা। একান্তই গ্রাম বাংলার সমাজ জীবনের অতুল ভাষ্যকার।

তথ্যসূত্র :
১। সুব্রতা সেন, পণ প্রথা শাস্ত্রে ও সমাজে, আনন্দ পাবিলার্স প্রাইভেট লিঃ, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ-৫১-৫৩
২। ড. ওয়াকিল আহমদ, বাংলা লোক সংস্কৃতি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭৪, পৃ- ১৭২-১৭৩
৩। ড. মোমেন চৌধুরী, বাংলাদেশের লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান, জন্ম ও বিবাহ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃ- ১৪১
৪। সুব্রতা, পূর্বোক্ত, পৃ- ৫৩
৫। ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, জানুয়ারি-মার্চ ২০১০, পৃ- ১২৬
৬। ওয়াকিল, পূর্বোক্ত, পৃ- ১৭৩-১৭৭
৭। আবদুল মতিন চৌধুরী, লোক সাহিত্যে সিলেট (১ম খণ্ড) ১৯৮৬, পৃ- ১৪৬-১৪৭
৮। আবদুল, পূর্বোক্ত, পৃ- ১৪৮
৯। আবদুল, পূর্বোক্ত, পৃ- ১৫৫
১০। সৈয়দ মোস্তফা কামাল, অতীত দিনের সিলেট, রাগীব রাবেয়া ফাউন্ডেশন, ২০০৫ পৃ- ৫৮
১১। হারূন আকবর, সিলেটের লোক সংগীত ধামাইল, জালালাবাদ লোক সাহিত্য পরিষদ, ২০০৯, পৃ-২৪
১২। আবদুল, পূর্বোক্ত, পৃ- ১৫৭
১৩। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গল্পগুচ্ছ, সিটি লাইব্রেরী, ঢাকা, পৃ-২৩
১৪। বিবাহ, সম্পাদনায়; হাজেরা খানম, দেলোয়ার হাসান, আবিষ্কার, ঢাকা ২০১৪, ভূমিকা
১৫। সৈয়দ মোস্তফা কামাল, পূর্বোক্ত, পৃ- ৫৮
১৬। মোঃ রফিকুল ইসলাম, একাল সেকাল ভাটি এলাকার বিয়ে শাদি, (প্রবন্ধ) আলইসলাহ, পৃ- ৪১-৪৩
১৭। আবদুল, পূর্বোক্ত, পৃ-১৫৯
১৮। লোক সাহিত্য (২য় খ-) ড. আশরাফ সিদ্দিকী, মল্লিক ব্রাদার্স, ঢাকা, পৃ-১০২
১৯। ছড়ার সূত্র, আলইসলাহ, সূত্র, হারূন, পূর্বোক্ত।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close