সম্পাদকীয়

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দেউলিয়া কূটনীতিক সমাচার

সুরমার এ সপ্তাহের সম্পাদকীয় ।। ইস‍্যু ২১৯৯

ইউরোপ ভিত্তিক গণমাধ্যম গবেষণা ও পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের ২০২১ সালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার তালিকা প্রকাশ করেছে। এবার বাংলাদেশের অবস্থান আরও একধাপ নেমেছে। আগের বার ছিলো ১৫১; আর চলতি বছর একধাপ নেমে হয়েছে ১৫২ । বাংলাদেশ যথারীতি উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব আর সুদানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তালিকার নিন্ম পর্যায়ে অবস্থানের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটা নতুন কিছু নয় । কিন্তু নতুন হচ্ছে, আগে এইসব তালিকার লজ্জা ঢাকতে ঢাকার গোয়েবলস (তথ্যমন্ত্রী) প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিতেন। আর এখন যোগ হয়েছে কূটনীতিক নামধারী কিছু পেশাজীবীর দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য।

গত সপ্তাহে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কমনওয়েলথ দেশগুলোর কূটনীতিকদের এক ভার্চুয়াল সভায় লন্ডনে লিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি যা বলেছেন তা তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকেও হার মানিয়েছে। একটা কার্টুনের ক্যাপশন লেখার অপরাধে যেখানে একজন মেধাবী মানুষকে জেলখানায় পিটিয়ে মারা হয় । মামলা-হামলা আর ভয়ের সংস্কৃতি যেখানে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরেছে। টকশোতে কথা বলার জন্য মামলা-জেল-জরিমানা আর চরম হেনস্তা যেখানে নিত্যদিনের চিত্র। ডিজিটাল আইনের নামে ১৪ বছরের কিশোর তার মত প্রকাশের জন্য নির্যাতিত হয়-জেলে যায়! শ’ শ’ সাংবাদিক ডিজিটাল আইনের মামলায় ঝুলে আছে বছরের পর বছর, কথা বললেই মামলা আর হামলা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা শত অনুরোধ করেও এইসব নির্যাতন বন্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ দেখতে পায়নি। সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ এবং সেই অঙ্গীকার পূরণ করে চলেছে, এরকম ডাহা মিথ্যা দাবি একজন কূটনীতিকের কাছ থেকে খুবই অপ্রত্যাশিত। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও মানুষ কথা বলতে ভয় পায় । কারণ, বিদেশে কথা বলার জন্য দেশে অনেকের নামে জামিন অযোগ্য ধারায় অসংখ্য মামলা হয়েছে, দেশের বাড়িঘরে হামলা-হুমকি আর আত্মীয় স্বজনের নামে ভুরি ভুরি মামলা হয়েছে। দেশের এসব সাধারণ চিত্র না জানা একটা অপরাধ আর না জেনেও শুধু চেয়ার হারানোর ভয়ে অসত্য দাবি করা মস্ত বড় অপরাধ। চাকুরীর স্বার্থে বলার অনেক কিছুই আছে এবং বলার মুন্সিয়ানা মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পররাষ্ট্র বিভাগে যোগ দেয়া কূটনীতিকদের খুব ভালোই জানা থাকার কথা । কিন্তু শুধু চাকুরী রক্ষা নয় বরং বিচিত্র প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা ধরে রাখা সরকারের সুনজর পেতে দিনমজুর অথবা ভৃত্যের মতো আচরণ বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছু নয় ।

চোখ থাকতে অনেকেই অন্ধের অভিনয় করে ভিক্ষাবৃত্তির সুবিধার্থে। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের এই আচরণকে অপরাধ মনে না করার সঙ্গত কারণ আছে । কিন্তু সুশিক্ষিত ও মেধাবী কর্মকর্তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বকে শুধু অপরাধ নয়, বরং জ্ঞানপাপ মনে করা কোনোভাবেই অসঙ্গত নয় । দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা সমাজের জন্য যতটা সমস্যা বিবেক প্রতিবন্ধী এইসব দেউলিয়া শ্রেণীর জ্ঞানপাপীরা সহস্রগুণ ক্ষতিকর। অন্ধজনে দেহ আলো যেমন একটা জরুরি কার্যক্রম, তেমনি এইসব বিবেক প্রতিবন্ধী কূটনীতিকদের জন্যেও দেউলিয়াত্ব অবসায়ন কর্মসূচি অতি জরুরি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল পর্যায়ে দেউলিয়াত্ব সীমা অতিক্রমের আগেই বিবেকবান সুধীসমাজ এই জরুরি উদ্যোগ নিতে পারেন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close