মুক্তচিন্তা

পহেলা বৈশাখ সংষ্কৃতি ও রাজনীতি

।। মাহফুজুর রহমান ।।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বাঙালির জীবনে এবছরও ইংরেজী ১৪ এপ্রিল এসছে পহেলা বৈশাখ। তবে এবারের পহেলা বৈশাখ লকডাউনের কারণে উৎসব বিহীন মলিন। চারিদিকে বাজছে মৃত্যুর বাজনা, হারিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রিয় মুখ, আত্মিয় পরিজন। করোনা মহামারি বিশ্ববাসির মতো বাঙালির জীবনও করেছে তছনছ। তবুও এবারের নতুন বাংলা বছর ১৪২৮ এ আরো একবার পুরনো বছরের জরা-জীর্ণকে পেছনে ফেলে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প নেবে বাঙালি। কিন্তু পহেলা বৈশাখ কবে প্রথম পালন করা হয়? কিভাবে এর প্রচলন হয়?

বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় নববর্ষ হিসাবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। সেহিসাবে এটি বাংলা ভাষাভাষিদের সর্বজনিন লোকউৎসব হিসাবে বিবেচিত। ভারতবর্ষে মুঘল স¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স¤্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে হত। এই সমস্যা সমাধানের জন্য মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। স¤্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌরসন ও আরবী হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন বিনির্মান করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় স¤্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিলো ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের প্রথম খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। সেই পহেলা বৈশাখে উৎসব হিসাবে পালন করা হত হালখাতা, নৌকাবাইচ, বউমেলা, ঘোড়ামেলা সহ নানারকম মেলা। পহেলা বৈশাখের উৎসবের সাথে কালের রুপান্তরে যোগ হয় রাজনৈতিক ও সংষ্কৃতিক আগ্রাসনের অনুসঙ্গ রমনার বটমূলে ছায়নটের বর্ষবরণ, মঙ্গল শোভাযাত্রা সহ নান কিছু।

১৯৬০-এর দশকে ভারতীয় “র” এর তৎপরতায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী জনমত গড়ে তোলার জন্য কিছু সাংষ্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৭ সালে ছায়ানট হিন্দুস্থানী ভাবধারার সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করে, যার অন্যতম হলো রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। যদিও বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান সেই মুঘল আকবরের সময়কাল থেকেই উদযাপিত হয়ে আসছিলো। কিন্তু ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে সূর্য উদয় হওয়ার সাথে ঢাকার রমনার বটমূলে হিন্দুস্থানীরা যেভাবে পূজা করে তার সাথে মিল রেখে গান গেয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। পহেলা বৈশাখে মেয়েদের বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়ারই প্রচলন ছিলো দীর্ঘকাল যাবৎ। এমনকি আমরা ছোট বেলায় পহেলা বৈশাখে মেয়েদরে বাসন্তী রঙের শাড়ি পড়তেই দেখেছি। বাংলা ব্যাণ্ড ফিডব্যাকের মেলায় যাইরে গানেও যার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ছায়ানটই প্রথম হিন্দুমেয়েদের পূজার পোশাক সাদা শাড়ি লালপাড় পড়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করে।

কালে ভদ্রে এই সাদা শাড়ি লালপাড়ই এখন পহেলা বৈশাখ উদযাপনের পোশাকে পরিনত হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনটা সাধারণ মানুষ টেরও পায়নি। ১৯৮৯ সাল থেকে পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনিস্টিটিউট থেকে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। যা এখন পরিনত হয়েছে হিন্দু বিভিন্ন দেব দেবীদের বাহনের মুখোশ নিয়ে শাভাযাত্রা। যা কিনা হিন্দুরা তাদের পূজার সময় করে থাকে। এই আওয়ামী লীগের আমলে তো বিভিন্ন স্কুলে ও কলেজে আওয়ামী মন্ত্রী এমপিদের তত্ত্বাবধানে মঙ্গল শোভাযাত্রা করতে বাধ্য করা হয়েছে। এ সবই হলো সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ।

সাংষ্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে আমাদের মূল্যবোধ, নীতি, নৈতিকতা ও ধর্মীয় বিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। ধর্ম পালনে ধর্মীয় সংষ্কৃতি অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। শুধু পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন। সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন চালানো হচ্ছে সর্বোত ভাবে। দেশের সিনেমা ও নাটক গুলোতে খারাপ লোক বা রাজাকার হিসাবে দেখানো হয় টুপি ও দাড়িওয়ালা লোককে। আমি নিজে কয়েকজন রাজাকারকে দেখেছি যাদের টুপি ও দাড়ি নাই। তাহলে নাটক সিনেমা গুলোতে রাজাকার বুঝাতে কিংবা সমাজের খারাপ মানুষ বোঝাতে টুপি ও দাড়ি ওয়ালাদের কেনো দেখানো হয় ? এখানেও ব্যবহৃত হয়েছে সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন। যাতে দেশের মানুষ ইসলামিক সংষ্কৃতি থেকে দুরে সরে যায়।

দেশের নাটক সিনেমা গুলোর মূল কাহিনী কি? একটা ছেলে একটা মেয়ে প্রেম করে। এটাই হলো নাটক সিনেমা গুলোর মূল কাহিনী। যেনো মানুষের এম ইন লাইফ হলো প্রেম করা। প্রতিনিয়ত দেশের কোমলমতি শিশু কিশোররা টিভিতে প্রেমকরা দেখেই বড় হচ্ছে। বড় হয়ে তারা তাই করছে। ফলে দেশের যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নারী পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক বাড়ছে, অনৈতীক সম্পর্কও বাড়ছে। অথচ হলিউডে কিংবা ইরানী মুভিগুলো নির্মিত হয় সামাজিক, অ্যাডভেঞ্চার, গোয়েন্দা, অনুপ্রেরণামুলক ও নানা জীবনমুখি কাহিনী নির্ভর।

দেশের নাটক কিংবা সিনেমা কেনো বিকোশিত হচ্ছে না? আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় এসেছে দেশের চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস করে দিয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডর ডাইরেক্টর কবরি সারোয়ারকে বসিয়ে একচেটিয়া অশ্লীল সিনেমা নির্মাণে সহযোগিতা করে চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপান্তে নিয়ে গিয়েছিলো। আর এবার ক্ষমতায় এসে পিযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কট্টর ভারত পন্থীদের বিএফডিসির এমডি পদে বসিয়ে চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র শিল্প এখন প্রায় ধ্বংসের পথে। দেশে এখন কলকাতার মেরা মার্কা বাংলা সিনেমা চলে। দেশের দুই একজন নায়ক কিংবা সি-গ্রেডের নাইকাকে নিয়ে কলকাতার দাদাবাবুরা সিনোমা বানিয়ে বাংলাদেশে চালায়। সুগার কোটড তেতো বড়ি।
দেশের অধিকাংশ থিয়েটার গ্রুপ বা নাট্য চর্চা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র” এর তত্ত্বাবধানে। এই সব নাট্য চর্চা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছেলে মেয়েদের নাট্য চর্চার নামে ইসলাম বিরোধীতা শেখানো হয়। স্বাধীনতার পর থেকে এরাই মূলত ভারতীয় ভাবধারা বাংলাদেশে টিকিয়ে রেখেছে । কখনো মুক্তিযুদ্ধের নাম দিয়ে কখনো প্রগতিশিলতার নাম দিয়ে ইসলাম বিরোধী বিভিন্ন সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন এরা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের মিডিয়াগুলো এখন এই ইসলাম বিরোধীদের দখলে। একই সাথে ভারতীয় “র” এর প্রচুর এজেন্ট এখন দেশের বিভিন্ন মিডিয়া গুলোতে কাজ করছে । যাদের প্রধান কাজ হলো ভারতীয় প্রভাব বাংলাদেশে টিকিয়ে রাখা আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করা ও ইসলামের বিরোধীতা করা। ভারতীয় “র”, আওয়ামী লীগ ও ইসলাম বিরোধীরা একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে কাজ করছে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close