নিউজ

আর্থিক খাতের মাফিয়ারা কে কোথায়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্তা এসকে সুর ও শাহ আলমের ব্যাংক হিসাব তলব

বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল আলোচিত-বিতর্কিত সাবেক ডেপুটি গভর্ণর এস কে সুর চৌধুরী ও জি এম শাহ আলম।

।। সুরমা ডেস্ক ।।
লণ্ডন, ২৩ ফেব্রুয়ারী – গত কয়েক বছরে ব্যাঙ্কিং খাতে ব্যাপক দুর্নীতি আর বিদেশে টাকা পাচারের ঘটনায় সমালোচিত এসকে সুর চৌধুরী অবশেষে আদালতের চোখে পড়েছেন। তাও আবার পি কে হালদার কেলেঙ্কারির মামলায় এক সহযোগী নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে অপর সহযোগীদের নাম প্রকাশের কারণেই। আর্থিক খাতের রেগুলেটরদের ঘুম হয়তো এখনো ভাঙেনি। একজন সাবেক ব্যাংকার এর কারণ হিসেবে বলেন, বিদেশে টাকা পাচার আর আর্থিক খাতের মাফিয়াদের নামগুলো মতিঝিল ব্যাংকপাড়া, দুদক আর পাবলিক ডোমেইনে ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হয়েছে শত শতবার. কিন্তু এইসব মাফিয়াদেও যেনো দেখার কেউ নেই। শক্তিশালী মাফিয়ারা বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টার পদও যখন ভাগিয়ে নেয়, তখন তাদের দাপটে গণমাধ্যমে নাম উচ্চারণ পর্যন্ত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পি কে হালদারের কেলেঙ্কারিতে নাম আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর এস কে সুর চৌধুরী এবং বর্তমান নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একইসঙ্গে এস কে সুর চৌধুরীর স্ত্রী সুপর্ণা সুর চৌধুরী এবং মো. শাহ আলমের দুই স্ত্রী শাহীন আক্তার শেলী ও নাসরিন বেগমের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে সব ব্যাংকের কাছে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারী, বৃহস্পতিবার সব ব্যাংকে পাঠানো ওই চিঠিতে ২০১৩ সালের জুলাই মাস থেকে ওই পাঁচজনের সকল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লেনদেনের তথ্য দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ওই দুই পরিবারের অন্যান্য সদস্য — স্ত্রী সন্তানের একক বা যৌথ নামে অথবা তাদের আংশিক মালিকানাধীন অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো মেয়াদী আমানতের হিসাব, বা যে কোনো ধরনের মেয়াদী সঞ্চয়ী হিসাব, চলতি হিসাব, ঋণ হিসাব, ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড, লকার বা ব-, সঞ্চয়পত্র বা অন্য কোনও ধরনের সেইভিংস ইন্সট্রোমেন্ট, ইনভেস্টমেন্ট স্কিম বা ডিপোজিট স্কিম, শেয়ার হিসাব বা অন্য যে কোনো ধরনের বা নামের হিসাব পরিচালিত বা রক্ষিত হয়ে থাকলে তার বিবরণী পত্র সাত দিনের মধ্যে এনবিআরে পাঠাতে হবে। আগে ছিল, কিন্তু বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে, এমন অ্যাকাউন্টের তথ্যও ওই চিঠিতে চাওয়া হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ পেয়েছি। তার ভিত্তিতেই সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের ও তাদের স্ত্রীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য জানতে চেয়েছি।

পলাতক প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদারের দুই সহযোগী ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হক ও পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, সেখানে এস কে সুর ও শাহ আলমের নাম আসে। পিপলস লিজিংয়ের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই দুই সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলে আসছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ আমানতকারীর আবেদনে হাইকোর্ট গত ৫ জানুয়ারী ২৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যাদের মধ্যে এস কে সুর চৌধুরীর নামও ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্তকমিটি গঠন করেছে।
অভিযোগ ওঠার পর গত ৪ ফেব্রুয়ারী নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে তিনি অন্য বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। আর এস কে সুর চৌধুরী ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি অবসরে রয়েছেন।

পি কে হালদার নানা কৌশলে নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলে শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনেন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে নিজের আত্মীয়, বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে পর্ষদে বসিয়ে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেন। এসব কোম্পানি থেকে তিনি ঋণের নামে বিপুল অংকের টাকা সরিয়ে বিদেশে পাচার করেছেন এবং এ কাজে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার ‘যোগসাজশ’ ছিল বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য। বিদেশে পালিয়ে থাকা পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারে ইতোমধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। ভুয়া ও কাগুজে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৫১ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ও আত্মসাতের অভিযোগে পি কে হালদারসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছে দুদক।

জবানবন্দিতে কী বলেছেন উজ্জ্বল?
ডপ কে হালদারের সহযোগী উজ্জ্বল কুমার নন্দী দুদকের মামলায় আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতে পিপলস লিজিং অ্যা- ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্মকর্তার নাম এসেছে বলে জানিয়েছে দুদক।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ঢাকার মহানগর হাকিম মো. আতিকুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় ওই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আনান কেমিক্যাল লিমিটেডের পরিচালক উজ্জ্বল কুমার নন্দী।
দুদকের উপ পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি (উজ্জ্বল) তার দোষ স্বীকার করে অনিয়মের সাথে জড়িত অন্যান্যদের বিষয়ে সম্পৃক্ততার কথাও স্বীকার করেছেন। যোগ্যতা না থাকার পরও পিপলস লিজিংয়ের চেয়ারম্যান হওয়া এবং পওে কোম্পানিতে পি কে হালদারের নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক অনিয়মের সাথে বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথা জবানবন্দিতে তুলে ধরেছেন উজ্জ্বল।
তিনি বলেছেন, এসব অনিয়ম ঢাকতে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর অডিটের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর এস কে সুর ও নির্বাহী পরিচালক (সাবেক জিএম) শাহ আলমসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও অনেককে ‘সাড়ে ছয় কোটি টাকা’ ঘুষ দেওয়া হয়।

এছাড়া, পিপলস লিজিংয়ের জমি বিক্রি এবং চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার জন্য ক্যাপ্টেন (অব.) মোয়াজ্জেম হোসেনকে ‘১৮ কোটি টাকা ঘুষ’ দেওয়া; আর্থিক নানা অনিয়মের সাথে সামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেটর পরিচালক সামসুল আরেফিন আলামিন সম্পৃক্ত থাকা এবং পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে সিমটেক্সের সিদ্দিকুর রহমান, জেড এ এপারেলস এ মো. জাহাঙ্গীর আলম, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক শহীদ রেজার নামে ঋণ নিয়ে ‘বিদেশে পাচার করার’ কথাও বলা হয়েছে জবানবন্দিতে। উজ্জ্বল দাবি করেছেন, পিপলস লিজিংয়ের অবসায়নের জন্য কেবল তার পর্ষদই দায়ী নয়, আগের পর্ষদও দায়ী। কোম্পানি থেকে কোন সময়ে কত টাকা কীভাবে লোপাট হয়েছে, তাতে কার কী ভূমিকা ছিল Ñ সেসব নিয়েও তিনি বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন জবানবন্দিতে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close