মুক্তচিন্তা

মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে জিয়ার সাহসিকতার খেতাব বাতিল কার স্বার্থে?

দ্বিতীয় পর্ব: জিয়ার রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং রাজনীতিই তাঁকে প্রতিপক্ষের আসনে বসিয়েছে

।। ডক্টর এম মুজিবুর রহমান ।।

লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক। সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

এক:
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রয়াত অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ তাঁর একটি গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ করেন, ”বাংলাদেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য করুন, দেখবেন, যে যে ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমান ব্যর্থ হয়েছেন ওই সব ক্ষেত্রেই জিয়াউর রহমানের সাফল্য আকাশচুম্বী। এই ঐতিহাসিক সত্যই বাংলাদেশের রাজনীতিকে করে তুলেছে সংঘাতময়। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতা নেত্রীর নিকট এই সত্য দুঃসহ এক বোঝার মতো হয়ে রয়েছে। তারা না পারছেন এটা ভুলতে, না পারছেন ফেলতে। তাই তারা জিয়ার সকল সৃষ্ঠির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন। … লক্ষ্য একটাই শেখ মুজিবকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে হবে হবে। এদেশে তার মতো অন্য কোনো নেতার জন্ম হয়নি – একথা যেন তারা শতমুখে বলতে পারেন, তার উপর দেবত্ব আরোপ করে এরই মধ্যে শেখ মুজিবকে মাটি থেকে আকাশে তোলা হয়েছে। ”

ব্যক্তিগতভাবে জিয়া কারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নন। তাঁর রাজনীতিই তাঁকে প্রতিপক্ষের আসনে বসিয়েছে। বাকসর্বস্ব ও মেধাহীন রাজনীতির বিপরীতে জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতা ও সততার সমন্বয়ে জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেন । জাতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জায়গায় তিনি রাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। রাষ্ট্রভিত্তিক জাতিয়তাবাদের দর্শন দেশের ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নৃ গোষ্ঠী তথা আপামর সকল মানুষকে অভিন্ন প্লাটফরমে এনে দাঁড় করায় । ফলে বাংলাদেশ বিভেদ ও হানাহানির বাইরে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি তৈরির জন্য একটা সুনির্দিষ্ট পাটাতন লাভ করে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শনেই জাতিসত্ত্বার সঠিক স্বরূপটি মূল্যায়িত হয়, যা আমাদের ভৌগলিক জাতিসত্ত্বার সুনির্দিষ্ট পরিচয় দান করে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশীদের আত্মপরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। রাষ্ট্রভিত্তিক জাতিয়তাবাদের দর্শন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখারও সাহসী অঙ্গীকার।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় মেধা, দক্ষতা ও সততার সমন্বয় ছাড়া জাতি গঠনের রাজনীতির সফলতা মানুষের দ্বারগোড়ায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সততার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্বে জিয়াউর রহমান ছিলেন সোচ্চার। মেধাবী ও দক্ষ লোকদের রাষ্ট্র গঠনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাছে টেনেছিলেন । রাজনীতিতে স্ব স্ব ধর্মের একটা অবদান থাকতে পারে । তাই ধর্মের আবেগকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল নয় বরং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আধুনিক ও সৃষ্টিশীল চিন্তা-চেতনার সমন্বয়ে গণমুখী ও কল্যাণকর রাজনীতির ধারা সূচনা করেন তিনি। যা দেশে হয় সমাদৃত । বিশ্ব রাজনীতি বিশেষ করে গণতান্ত্রিক মুসলিম দেশসমূহের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে চার দশক পূর্বে ঘোষিত জিয়াউর রহমানের রাজনীতির চিন্তা-চেতনা ছিল কতটা বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন । ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে বিকশিত করার পাশাপাশি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর রাজনীতির ভিতকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে একটি আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের রাজনীতির প্রবক্তা শহীদ জিয়া।

জিয়া রাজনীতিতে ডান, বাম এবং মধ্যপন্থার চিন্তাশীল মানুষদের গণতন্ত্রের বিকাশ এবং দেশ গঠনে একত্রিত করে উজ্জীবিত করেছিলেন। স্বাধীনতার পর নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র এবং পরবর্তীতে একদলীয় বাকশালের বিপরীতে বহুদলীয় রাজনৈতিক চর্চা বিকশিত হয় তাঁর শাসনামলে । অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির পাশাপাশি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিকরণের স্বার্থে সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। বহুদলীয় রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দানে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে ভারতে প্রেরণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনেন।

দুই:
মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসন ও বিরোধী দলগুলোর প্রতি তাঁর উপলব্দি সম্পর্কে যদ্যপি আমার গুরু বইয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক আহমদ ছফা প্রখ্যাত দার্শনিক জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ”স্যারের শিক্ষাসম্পর্কিত আলোচনা শেষ হলে আমি শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে স্যারের মতামত জানতে চাইলাম। তখনও শেখ সাহেব বেঁচে আছেন। স্যার, একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন নাইন্টিন সিক্সটি নাইন থ্যাইকা সেভেন্টি ওয়ান পর্যন্ত সময়ে শেখ সাহেব যারেই স্পর্শ করছেন, তার মধ্যে আগুন জ্বালাইয়া দিছেন। হের পরের কথা আমি বলবার পারুম না। আমি গভর্নমেন্টের কারও লগে দেখাসাক্ষাৎ করি না। সেভেন্টি টুতে একবার ইউনিভার্সিটির কাজে তার লগে দেখা করতে গেছিলাম। শেখ সাহেব জীবনে অনেক মানুষের লগে মিশছেন ত আদব লেহাজ আছিল খুব ভালা। অনেক খাতির করলেন। কথায়-কথায় আমি জিগাইলাম, আপনের হাতে ত অখন দেশ চালাইবার ভার, আপনে অপজিশনের কী করবেন। অপজিশন ছাড়া দেশ চালাইবেন কেমনে। জওহরলাল নেহেরু ক্ষমতায় বইস্যাই জয়প্রকাশ নারায়ণরে কইলেন, তোমরা অপজিশন পার্টি গইড়া তোল। শেখ সাহেব বললেন, আগামী ইলেকশানে অপজিশান পার্টিগুলো ম্যাক্সিমাম পাঁচটার বেশি সীট পাইব না। আমি একটু আহত অইলাম, কইলাম, আপনে অপজিশনরে একশো সিট ছাইড়া দেবেন না? শেখ সাহেব হাসলেন, আমি চইল্যা আইলাম। ইতিহাস শেখ সাহেবরে স্টেটসম্যান অইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।”

মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জনমনে তুলে ধরেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং দেশ পরিচালনায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অন্য সবার থেকে আলাদা । বিশ্বনন্দিত রাষ্ট্র চিন্তক এবং বাংলাদেশের সক্রেটিস খ্যাত অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক যে সংশয় ও আফসোস করেছিলেন জিয়াউর রহমান তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। আর এটাই অন্য পক্ষের মনোক্ষুন্নের কারণ।

লেখক ও গবেষক প্রয়াত মাহফুজ উল্লাহ ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণামূলক গ্রন্থে জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেছেন, জেনারেল বা রাজনীতিবিদের কোনোটাই জিয়ার সঠিক পরিচয় নয়। ইতিহাসে জিয়া অভিহিত হবেন একজন স্টেটসম্যান বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। রাষ্ট্রনায়কের বিভিন্ন সংজ্ঞা আছে। প্রথমেই যেটা বলা হয়, তা হচ্ছে একজন রাজনীতিবিদ শুধু পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন। আর রাষ্ট্রনায়কের থাকে ভিশন, স্বপ্ন এবং তিনি ভাবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। একজন রাজনীতিবিদ একটি প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে তর্ক করেন আর রাষ্ট্রনায়ক আলোচনা করেন প্রকল্পের উপযোগিতা।

ঢাকায় একসময় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্দূত উইলিয়াম বি বাইলাম লিখেছেন, জিয়া যদি ১৯৮১ এর পরিবর্তে ১৯৭৫ সালে নিহত হতেন তাহলে বাংলাদেশ আফগানিস্তান অথবা লাইবেরিয়ার মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারত। মাইলাম লিখেছেন, ‘অবশ্য সেনা শাসকদের মতো কঠোর পদ্বতিতে নয়, গণতান্ত্রিক পদ্বতিতে জিয়া বাংলাদেশকে ওই অবস্থা থেকে রক্ষা করেছেন।‘ রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাতের পর ১৯৮১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট আয়োজিত এক সভায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কমনওয়েলথের তদানীন্তন মহাসচিব স্যার সিদ্ধার্থ রামফাল বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়া বাংলাদেশে শুধু একদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠা করেননি; এ উন্নয়নকর্মী দেশকে সার্বিক উন্নয়নের রাজপথে পরিচালিত করেছিলেন।‘

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আমাদের যে জাতীয় অঙ্গীকারগুলো ছিল দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আজ তা সুদূর পরাহত। আগে যারা আত্মস্বার্থ ত্যাগ করে জাতীয় স্বার্থের জন্য লড়াই করেছেন, তাদের জায়গায় এখন আত্মস্বার্থ কায়েমকারীরা জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু জিয়া তাঁর স্বল্পকালীন শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি যে গভীর দেশপ্রেম, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা আজও কেউ অতিক্রম করতে পারেননি। রাজনৈতিক বিরোধীরাও তাঁর সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেনি। বাকসর্বস্ব কথার ফুলঝুরি নয় শহীদ জিয়া তাঁর কর্মদক্ষতার মাধ্যমে পেয়েছেন রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদা আর বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের অন্তরে তাঁকে দিয়েছে অমরত্ব । তাই জিয়াউর রহমানের রাজনীতিকে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে কাগুজে ফরমান জারির মাধ্যমে তাঁকে মুছে ফেলার বিকৃত মানসিকতা রাজনৌতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ বৈ অন্য কিছু নয়। (চলবে)
লন্ডন, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close