নিউজ

১ লাখ ছাড়িয়ে মৃত্যু, আরো অর্ধলক্ষ প্রাণহানীর আশঙ্কা, অসহায় বৃটেন

  • নতমুখে দুঃখ প্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর
  • সরকারের দুর্বল সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদরা
  • মার্চের আগে খুলছে না স্কুল/কলেজ

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৯ জানুয়ারী – করোনার কাছে চরম অসহায় বৃটেন। সরকারী হিসাব মতে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবার সংবাদ জানিয়ে জাতির সম্মুখে নতমুখে দুঃখ প্রকাশ করছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। ২৮ জানুয়ারী, মঙ্গলবার ডাউনিং স্ট্রিটের প্রেস ব্রিফিংয়ের শুরুতে ১ লক্ষ ১শ’ ৬২ জনের মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে বরিস জনসন বলেন, আমি গভীরভাবে দুঃখিত প্রতিটি জীবনের জন্য যাদের আমরা হারিয়েছি। একই সাথে তিনি প্রত্যেকের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান যারা তাদের পিতা, মাতা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়েসহ প্রিয়জনদের হারিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এও বলেন যে, আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এর সম্পূর্ণ দায়ও আমি নিচ্ছি। তবুও রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কঠোর সমালোচনা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বরিস জনসন। এতো এতো প্রাণহানীর জন্য সরকারের দুর্বল সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন তারা। বৃটেনে কেন এতো অধিক প্রাণহানী এবং এর জন্য তিনি এবং তাঁর সরকার কী করেছে? — সাংবাদিকদের বারংবার এমন প্রশ্নে লা জবাবই ছিলেন বরিস। শুধু বলার চেষ্টা করেছেন সম্ভাব্য সবকিছুই আমরা করেছি।
তবে বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা অনেক বেশী হতে পারে এবং অনেক আগেই মৃত্যু এক লাখ ছাড়ানোর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ মিডিয়ায়। গত ১৩ জানুয়ারী গার্ডিয়ানে করোনা শুরুর পর মৃত্যু ১ লাখ ছাড়ানোর সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটেস্টিক্স (ওএনএস) জানিয়েছে লিপিবদ্ধ ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী গত ৭ জানুয়ারী ১ লাখ ছাড়িয়েছে মৃত্যু।

এদিকে, এই লক্ষাধিক মৃত্যুর মিছিলে ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছেন শত শত ব্রিটিশ-বাংলাদেশী। কোনো কোনো পরিবারের দু/তিনজন করে মারা যাচ্ছেন। মৃত্যু আর আক্রান্তের সংবাদে বিষাদভারাক্রান্ত পুরো কমিউনিটি। প্রথম তরঙ্গের চেয়ে দ্বিতীয় তরঙ্গে আরো বেশী মৃত্যু ও আক্রান্তের শিকার ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা। প্রতিদিনকার প্রিয়জন হারানোর সংবাদে ভারী হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। প্রায় প্রতিদিনই চলে ভার্চুয়াল দোয়ার আয়োজন। জাতির কঠিন সময় উপলব্ধি করে ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি এবং ইয়র্কের আর্চবিশপ স্টিফেন বলেছেন, করোনা ভাইরাসে মারা গেছেন কমপক্ষে এক লাখ মানুষ। এটা শুধু একটি বিমূর্ত সংখ্যা নয়। এর প্রতিটি সংখ্যা এক একজন মানুষের কথা বলে। এর প্রতিটি সংখ্যা সেইসব মানুষের কথা বলে, যাদেরকে আমরা ভালবাসি, যারা আমাদেরকে ভালবাসতেন। ধর্মে কারো বিশ্বাস থাক বা না থাক, তবু সব মানুষের প্রতি এই দুই আর্চবিশপ আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন আগামী ১ ফেব্রুয়ারী থেকে প্রতিদিন গ্রিনিচ মান সময় সন্ধ্যা ৬টায় জাতির উদ্দেশে প্রার্থনায় যোগ দেয়। চিঠিতে তারা আরো উল্লেখ করেন, দরিদ্র স¤প্রদায়গুলো, জাতিগত সংখ্যালঘু স¤প্রদায় এবং যেসব বিকলাঙ্গ রয়েছেন তারা মহামারিতে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে যে বৈষম্য তা পূরণ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

গত ২৬ জানুয়ারী, মঙ্গলবার বৃটেনে করোনা ভাইরাসে নতুন করে মারা গেছেন ১৬৩১ জন। এ অবস্থায় এদিন ডাউনিং স্ট্রিটে সংবাদ সম্মেলন করেছেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি বলেছেন, এই বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে পরিসংখ্যানটা দেয়া কষ্টকর। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পাশাপাশি বক্তব্য রাখেন ইংল্যা-ের প্রধান মেডিকেল অফিসার প্রফেসর ক্রিস হুইটি। তিনি বলেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের দিন। আরো কতজন মারা যেতে পারে সামগ্রিকভাবে তা বলা অসম্ভব। দুর্ভাগ্যক্রমে আগামী কয়েক সপ্তাহ আমাদের আরো অনেক বেশী মৃত্যু দেখতে হতে পারে। তবে তিনি এও জানান, আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামুলকভাবে কম হওয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যাও বর্তমান উর্ধ্বমুখী থেকে নামতে পারে। কিন্তু সরকারকে পরামর্শ দেয় এমন একজন বিজ্ঞানী প্রফেসর ক্যালাম সেম্পল বলেছেন, বৃটেনে এই ভাইরাসে আরো কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ মারা যেতে পারেন।

বৃটেনে করোনা মহামারিকে একটি ‘জাতীয় দুর্যোগ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বিরোধী দল লেবার নেতা স্যার কিয়ার স্টারমার। তিনি সরকারের কঠোর সমালোচনাও করেছেন। বলেছেন, সামারে সরকার কোনো কিছুই শিক্ষা নেয়নি।

মঙ্গলবার ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়া করোনা মৃত্যুই ছিলো সবকটি ব্রিটিশ মিডিয়ার প্রধান সংবাদ শিরোনাম। মিডিয়া আউটলেটগুলো প্রধানমন্ত্রীর নতমুখে দুঃখ প্রকাশকেই প্রাধান্য দিয়েছে। দ্য টাইমস এবং ‘দ্য আই’ পত্রিকার প্রচ্ছদে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের কিছু সংখ্যকের ছবি প্রকাশ করেছে। দ্য আই তার রিপোর্টে বলেছে, করোনা ভাইরাসে মাত্র ১০ মাসের মধ্যে এক লাখ মানুষ মারা যাবেন। বিষয়টি অকল্পনীয়। দ্য ডেইলি মিরর তার প্রতিবেদনে লিখেছে, মৃতদের এই সংখ্যা হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে। আমরা কখনো ভাবিনি এতো বড় সংখ্যায় পৌঁছে যাব। দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, এটা এক বিয়োগান্তক সংখ্যা। দ্য ই-িপে-েন্ট অনলাইন লিখেছে, হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। এ এক ধারণাতীত সংখ্যা। তবু এ সংখ্যা চলমান। এই মহামারি বৃটেনকে কিভাবে বিকলাঙ্গ করে দিয়েছে, তারই বাস্তব প্রকাশ এই সংখ্যা। যারা মারা গেছেন, তারা হয়তো কারো মা, না হয় পিতা, না হয় সন্তান, না হয় বন্ধু, না হয় প্রতিবেশী, না হয় সহকর্মী। অনেকের কাছে তারা পরিচিত ছিলেন এবং তাদেরকে ভালবাসতেন অনেকে। দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফে জুডিথ উডস লিখেছেন, সমাধিক্ষেত্রের নামফলক দেখে যতটা কান্না আসে, এই সংখ্যা তার চেয়েও বেশি।
দ্য টাইম-এর বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক টম হুইপল বলেছেন, যখনই এই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে, তখন এর পরিণতি অনতিক্রম্য। কিছু একটা খুব বাজেভাবে ভুল হয়েছে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close