নিউজ

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ৪২ বিশিষ্ট নাগরিকের চিঠি: ‘দুর্নীতি ও অসদাচরণে’ লিপ্ত নির্বাচন কমিশন

।। সুরমা ডেস্ক ।।
লণ্ডন, ২৭ ডিসেম্বর – বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের দুর্নীতি ও অসদাচরণ নিয়ে মুখ খুলেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। রাষ্ট্রপতি বরাবরে দেওয়া এক চিঠিতে তারা কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ এনে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’- গঠনের আবেদন জানিয়েছেন। চিটি প্রেরণকারীদের মধ্যে রয়েছেন দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদ বরাবর আবেদন করেছেন তারা। একইসঙ্গে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও চাওয়া হয়েছে । সম্প্রতি এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন করে নাগরিকদের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। এতে প্রেসিডেন্ট বরাবর দেয়া আবেদনের বিস্তারিত উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। সংবাদ সম্মেলনে আবেদনকারীরা আলোচনায় অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে নিজ নিজ বক্তব্য তুলে ধরেন। তাদেও কেউ কেউ বলেছেন, নৈতিক দায় থেকে কমিশনকে নিজ থেকেই সরে দাঁড়ানো উচিত।

প্রেসিডেন্ট বরাবর আবেদনে বলা হয়, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্নভাবে গুরুতর অসদাচরণ করে আসছেন।
কমিশনের সদস্যরা একদিকে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যা অভিশংসনযোগ্য অপরাধ। একইভাবে তারা বিভিন্নভাবে আইন ও বিধিবিধানের লঙ্ঘন করে গুরুতর অসদাচরণ করে চলেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়।
ওই আবেদনে বলা হয়, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম ও শুভেচ্ছা নেবেন। আপনি অবগত আছেন যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৬(৩) অনুচ্ছেদে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (কাউন্সিল) গঠনের বিধান রয়েছে। সংবিধানের ৯৬(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘যে ক্ষেত্রে কাউন্সিল অথবা অন্য কোনো সূত্র হইতে প্রাপ্ত তথ্যে রাষ্ট্রপতির এইরূপ বুঝিবার কারণ থাকে যে কোনো বিচারক-…(খ) গুরুতর অসদাচারণের জন্য দোষী হইতে পারেন, সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করিতে ও উহার তদন্ত ফল জ্ঞাপন করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।’ আপনি আরো অবগত আছেন যে, আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। ১১৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “সংসদ কর্তৃক প্রণীত যে কোনো আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারদের কর্মের শর্তাবলী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করিবেন, সেইরূপ হইবে: তবে শর্ত থাকে যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হইতে পারেন, সেইরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত কোনো নির্বাচন কমিশনার অপসারিত হইবেন না।” কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যগণ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্নভাবে গুরুতর অসদাচরণে লিপ্ত হয়েছেন। কমিশনের সদস্যগণ একদিকে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যা অভিশংসনযোগ্য অপরাধ। একইভাবে তারা বিভিন্নভাবে আইন ও বিধিবিধানের লঙ্ঘন করে গুরুতর অসদাচরণ করে চলেছেন বলে আমরা মনে করি। আমরা আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মসহ কমিশনের গুরুতর অসদাচরণের অন্য কয়েকটি ক্ষেত্র আপনার সদয় অবগতির জন্য চিহ্নিত করছি, যার আরো বিস্তারিত বিবরণ এই আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত হলো—
এতে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র।” নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয়। নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে একটি ‘স্বাধীন’ নির্বাচন কমিশন গঠনের নির্দেশনা দেয়া আছে। সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের সংবিধানে কমিশনকে অগাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ বেশকিছু আইনও প্রণয়ন করেছে। নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কাজে লাগানোর এবং এসব আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগের ওপরেই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তথা গণতান্ত্রিক শাসন নির্ভর করে। পক্ষান্তরে, বিতর্কিত ও ভোটারবিহীন নির্বাচন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আরো নির্ভর করে কমিশনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত থাকার ওপর। এর ব্যত্যয় ঘটলে অর্থাৎ কমিশন অসততায় লিপ্ত হলে ও আইনের লঙ্ঘন করলে বা আইন প্রয়োগে উদাসীনতা দেখালে, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করলে এবং জালিয়াতির আশ্রয় নিলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে; বর্তমান নির্বাচন কমিশন যা বার বার করে আসছে এবং দেশে একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি হিসেবে নির্বাচনের ওপর জনগণ সমপূর্ণভাবে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, যার প্রতিফলন ঘটছে ভোটারদের ভোট প্রদানে অনীহা প্রদর্শনে।
জালিয়াতির নির্বাচনের ফলে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ হলে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের পথ প্রশস্ত হয়, যা কোনো শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিকের জন্যই কাম্য নয়। কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে এবং আমাদের আশঙ্কা যে, তারা দায়িত্বে বহাল থাকলে আমাদের নির্বাচন তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এ অবস্থায় কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়েছে বলে আমরা মনে করি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কিছু মিসকনডাক্ট বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ তুলে ধরা হয় আবেদনে।
বলা হয়, কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পেশাগত ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট প্রকাশিত প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কমিশনারগণ নির্বাচনী প্রশিক্ষণের জন্য বক্তৃতা না দিয়েই উক্ত কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নিয়েছেন। আর এই অর্থের পরিমাণ ২ কোটি টাকার বেশী। সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় প্রাপ্য বেতন-ভাতাদির বাইরে কোনো কিছুর বিনিময়ে অর্থ লাভ সংবিধানের ১৪৭(৩) অনুচ্ছেদের সুসপষ্ট লঙ্ঘন, যা একটি গুরুতর অসদাচরণ। তদুপরি উত্থাপিত অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা না করে অভিযোগটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
এরপর ২০১৯ সালের ২৫শে নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে কর্মচারী নিয়োগে ৪ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ তোলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। লিখিত বক্তব্যে কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় ৩৩৯টি শূন্যপদের বিপরীতে ৮৫ হাজার ৮৯৩ জন প্রার্থী অংশ নেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরী ও উত্তরপত্র যাচাইয়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষদকে ৪ কোটি ৮ লাখ টাকা দেয়া হয়। এই অর্থ প্রধান নির্বাচন কমিশনার অনুমোদন করলেও কতজন পরীক্ষককে কীভাবে প্রদান করা হয় সেই হিসাব কমিশনের কাছে নেই। এমনকি নিয়োগ কমিটির সদস্যবৃন্দও এ বিষয়ে জানেন না। ইসি সচিবালয় পরীক্ষা সমপর্কে কিছু জানে না এবং প্রশ্নপত্রের ধরণও প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও ইসি’র জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটা হানড্রেড পার্সেন্ট আইনসম্মত। সংবিধান, আইন, বিধি ও নিয়মকানুন ফলো করে করা হয়েছে। এ নিয়োগে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অর্থ ব্যয় সমপর্কে নির্বাচন কমিশন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে সংশ্লিষ্ট নথি তলবের মাধ্যমে উপযুক্ত তদন্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গুরুতর অসদাচরণ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
২০২০ সালের ৩রা অক্টোবর বাংলাদেশ প্রতিদিনের করা একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৩ জন নির্বাচন কমিশনার নিয়ম-বহির্ভূতভাবে ৩টি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন। সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা ২টি গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা একটি জিপ ও একটি প্রাইভেট কার ব্যবহার করতেন। তবে জুলাইয়ে সব নির্বাচন কমিশনারদের নতুন গাড়ি দেয়া হলেও ৩ নির্বাচন কমিশনার এখনো তাদের আগের ব্যবহৃত গাড়ি জমা দেননি। তারা বর্তমানে আগের জিপসহ ৩টি গাড়ি ব্যবহার করছেন। ইভিএম ক্রয়ে অনিয়মের বিষয়টিও উল্লেখ করেন বিশিষ্ট নাগরিকরা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়ম সম্পর্কে আবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম তফসিল (১২ই নভেম্বর পুনঃতফসিল ঘোষিত হয়) ঘোষণার মাত্র দু’দিন পর রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় নির্বাচনী সহিংসতায় দুই কিশোর নিহত হয়। এমন মর্মান্তিক ঘটনার পরও নির্বাচন কমিশন এই ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। নির্বাচনপূর্ব প্র্চারণা চালানোর পুরো সময়ই নানাধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ১৭(৩)তে এসব আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কমিশনকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হলেও এ ব্যাপারে কমিশনকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগ নিতেও দেখা যায়নি, যা আইন প্রয়োগে কমিশনের ইচ্ছাকৃত এবং অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যর্থতা বলে আমরা মনে করি।
২০১৮ সালের ৩রা ডিসেম্বর ভোট গ্রহণের দিন নানাধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। বিবিসি বাংলার এক সাংবাদিক চট্টগ্রম-১০ আসনের একটি কেন্দ্রে সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই ব্যালটবাক্স ভরা দেখতে পান বলে বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ভোটগ্রহণের সারাদিনই পত্রপত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাধরনের অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচনের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত এক জরিপেও আগের রাতে সিল মেরে রাখার অভিযোগ উঠে আসে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্বাচিত ৫০টি আসনের মধ্যে ৩৩টি আসনেই আগের রাতে সিল মেরে রাখার ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে টিআইবি।
প্রতিবেদনটিতে উঠে আসা প্রত্যেকটি ঘটনা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭৩-৯০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কমিশন কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে নূও হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম মামলার রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠলে তদন্ত সাপেক্ষে নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে ওই কারচুপির অভিযোগগুলোর ব্যাপারে কোনো তদন্তের উদ্যোগ নিতে এবং কারো বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আমরা দেখিনি। আইন প্রয়োগে এই অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিষ্ক্রিয়তা নিঃসন্দেহে গুরুতর অসদাচরণ, যা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আবেদনে আরো বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের ৬ মাস পর তথ্য অধিকার আইনের অধীনে বাধ্য হয়ে প্রকাশ করা কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে অনেক অস্বাভাবিকতা এবং অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়, যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রকমাশিত ফলাফল ছিল বহুলাংশে বানোয়াট। প্রকাশিত ফলাফল থেকে দেখা যায়, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক এবং সম্ভব নয়। কেননা তালিকাভুক্ত ভোটারের মৃত্যুবরণ, দেশের বাইরে অবস্থান, জরুরী কাজে এলাকার বাইরে অবস্থান, অসুস্থতা ইত্যাদি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তাই ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া যেকোনো যুক্তিতেই অস্বাভাবিক। এ ছাড়া ৭,৬৮৯টি (মোট কেন্দ্রের ১৯.১৫%) কেন্দ্রে ৯০ ভাগ থেকে ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে যাও কোনোভাবেই স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত নয়। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে আরো দেখা যায়, ৫৯০টি কেন্দ্রে বৈধ ভোটের শতভাগ অর্থাৎ প্রদত্ত ভোটের মধ্যে যে কয়টি ভোট বৈধ হয়েছে সব একটিমাত্র প্রতীকে পড়েছে। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীরা ১,১৭৭টি (মোট কেন্দ্রের ২.৯৩%) কেন্দ্রে, লাঙ্গল প্রতীক ৩,৩৮৮টি (মোট কেন্দ্রের ৮.৪৪%) কেন্দ্রে, হাতপাখা প্রতীক ২,৯৩৩টি (মোট কেন্দ্রের ৭.৩০%) কেন্দ্রে, এমনকি সরকার দলীয় প্রতীক নৌকা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থী ২টি কেন্দ্রে কোনো ভোট-ই পাননি, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলাফলের এমন অস্বাভাবিকতা নির্বাচন কমিশনের গুরুতর অসদাচরণের প্রতিফলন।

বিভিন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের অনিয়মের তথ্যও তুলে ধরা হয় আবেদনে। এসব ব্যাপারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্ত চাওয়া হয়।

আবেদন পাঠানো ৪২ বিশিষ্ট নাগরিক হচ্ছেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, ড. আকবর আলি খান, এডভোকেট সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী ড. হামিদা হোসেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, সেন্ট্রাল ইউমেন্স ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক পারভীন হাসান, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আহমেদ কামাল, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড. আই খান পান্না, ড. শাহদীন মালিক, আলোকচিত্রশিল্পী ড. শহিদুল আলম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদ ড. আহসান মনসুর, সাবেক সচিব আবদুল লতিফ, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যা- ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সি আর আবরার, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, লেখক অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ, সাধনার আর্টিস্টিক ডিরেক্টর লুবনা মরিয়ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আকমল হোসেন, সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লণ্ডন-এর অধ্যাপক, গবেষক স্বপন আদনান, ব্রতী’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুরশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম, সাবেক ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, গোলাম মোর্তুজা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ক্লিনিক্যাল নিউরোসায়েন্স সেন্টার, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউ-েশনের পরিচালক অধ্যাপক নায়লা জামান খান, নাগরিক উদ্যোগ-এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close