নিউজ

বিশিষ্ট সমাজহিতৈষী ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমানের ইন্তেকাল, বিভিন্ন মহলের শোক

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ০১ নভেম্বর – সিলেট ও বিলেতের সুপরিচিত সমাজহিতৈষী প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের সাহসী পুরুষ, সমাজসেবী ও শিক্ষানুরাগী এবং বিলেতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আলহাজ সৈয়দ আতাউর রহমান আর নেই। গত ২৪ অক্টোবর, শনিবার সকাল ৭টায় নগরীর আখালিয়াস্থ মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ওইদিন বাদ আসর মরহুমের গ্রামের বাড়ী জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর দরগাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মহিলা মাদ্রাসার পাশে মরহুমের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয় উলামা, মাশায়েখদের ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে সুপরিচিত এবং ইসলাম ও সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সর্বদা উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদী পুরুষ সৈয়দ আতাউর রহমানের মরদেহ। জানাজায় ইমামতি করেন মরহুমের বড় ছেলে বিশিষ্ট লেখক-গবেষক সৈয়দ মবনু। জানাজা ও দাফনে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সমাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলীসহ কেন্দ্রীয় অনেক নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমান বেশ কিছুদিন যাবত বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগছিলেন। গত ১৯ অক্টোবর, হঠাৎ করে তাঁর শারীরিক অবনতি হলে পরদিনই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় শনিবার সকলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৫ বছর। তিনি স্ত্রী, চার পুত্র ও চার কন্যা সন্তান, নাতী-নাতনিসহ দেশে-বিদেশে অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
হাসপাতাল থেকে মরহুমের লাশ প্রথমে তাঁর শাহী ঈদগাহস্থ সৈয়দপুর হাউসের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে মরহুমের দলীয় নেতাকর্মী ও উলামায়ে কেরামসহ নগরীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁকে একনজর দেখার জন্য ভীড় করেন। জানাজা ও দাফনের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে মরদেহ সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে এক বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া পরিচালনা করেন খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর প্রিন্সিপাল হাফিজ মাওলানা মজদুদ্দিন আহমদ। তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা মুহিবুল হক গাছবাড়ি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. আখলাক আহমেদ, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা হাফিজ মাওলানা নুরুজ্জামান, সিলেট মহানগরী সভাপতি অধ্যাপক বজলুর রহমান, সহসভাপতি মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান, জেলা সহসভাপতি মাওলানা শামসুদ্দিন মুহাম্মদ ইলয়াছ, জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদরাসার মুহাদদিস মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদ এবং ইকরা ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার পরিচালক মুফতি মাওলানা রশিদ আহমদ প্রমুখ।
মরহুমের ইন্তেকালে তাঁর বড় ছেলে বর্তমানে বাংলাদেশে বসবাসরত লেখক-গবেষক সৈয়দ মবনু, অপর ছেলে বার্মিংহাম থেকে প্রকাশিত বাংলামেইল সম্পাদক সৈয়দ নাসির আহমদ, মরহুমের বড় শ্যালক বিশিষ্ট কবি ও কলামিস্ট ফরীদ আহমদ রেজা এবং জামাতা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রী যুগ্ম-মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল কাদের সালেহ মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন।
এদিকে, মরহুমের সৈয়দ আতাউর রহমানের ইন্তেকালের সংবাদে দেশে ও বিলেতের বিশিষ্ট ব্যক্তবর্গের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শোকসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মরহুমের স্বীয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, যুক্তরাজ্য খেলাফত মজলিস এবং এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে। শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। মরহুমের ভাতিজী জামাই, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক শোক জানিয়ে তাঁর চাচা শশুড়ের রুহের মাগফেরাত কামনা করেছেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, শেষ বয়সের পুরো সময়টা জন্মভূমি বাংলাদেশে কাটালেও সৈয়দ আতাউর রহমান ছিলেন ৫০ দশকের বিলেত প্রবাসীদের অন্যতম। সেই হিসেবে পুত্র-কন্যাসহ, পুরো পরিবার ও আত্ময়ী-স্বজনের বেশীরভাগের বসবাস বিলেতের বিভিন্ন শহরে। মরহুমের আপন তিন ভাইয়ের মধ্যে সৈয়দ আতাউর রহমান ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বড় ভাই সৈয়দ আব্দুল হান্নান সিলেটের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ন্যাপ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন হিসেবে সুপরিচিত। অপর বড় ভাই বিলেতের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ও বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সংস্কৃতিপ্রিয় সৈয়দ আব্দুর রহমান।
বিলেত জীবনের শুরুর দিকে তিনি তাঁর বড় ভাই সৈয়দ আব্দুর রহমানের সাথে কিডিমিনিস্টার শহরে থাকতেন। ব্যবসায়িক কারণে পরবর্তীতে চলে আসেন বার্মিংহাম শহরে। সেখানে তারা দুই ভাই মিলে বৃটেনে প্রথম হালাল মিট-চিকিনের ব্যবসা শুরু করেন। সৈয়দ আব্দুর রহমানকে বিবিসি‘র অনুসন্ধানী তথ্যে বৃটেনে প্রথম হালাল খাদ্যের আবিস্কারক উল্লেখ করা হয়েছে। মরহুম সৈয়দ আতাউর রহমানের হালালের প্রতি আকর্ষণ এবং হারামের প্রতি ঘৃণা থেকেই মূলত তারা দুই ভাই আগ্রহী হন এই ব্যবসায়। ১৯৭১ সালের দিকে বার্মিংহামের বোলসালহিথ রোডের ১৪২ নাম্বার ছিলো তাদের হালাল গ্রোসারীর দোকান।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দোকানের উপর তলায় ছিলো বার্মিংহামে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের কেন্দ্র। তখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরির সাথে সৈয়দ আব্দুর রহমান গোটা বৃটেন সফর করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গণজাগরণ ও অর্থ সংগ্রহ করেন। এছাড়া তিনি ‘একশন কমিটি ফর বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট’ এর একজন সদস্য ছিলেন। এই সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বৃটেনে জনসমর্থন আদায় এবং অর্থ সংগ্রহ করে।
সৈয়দ আতাউর রহমান ১৯৬৮ সালে সিলেটী নাগরি ভাষার মহাকবি পীর মজির উদ্দিনের ছেলে মরমী কবি পীর মনফর উদ্দিনের বড় মেয়ে এবং বিশিষ্ট কবি ও কলামিস্ট ফরীদ আহমদ রেজা, কবি আহমদ ময়েজ ও কমিউনিটি নেতা পীর আহমদ কুতুবের বড় বোন বেগম ফৌজিয়া কামালকে বিয়ে করেন। স্ত্রী ফৌজিয়া কামালও একজন মেধাবী সাহিত্যিক। কৈশোরেই তাঁর কবিতা আমীনূর রশীদ চৌধূরী কর্তৃক সম্পাদিত এবং প্রকাশিত তৎকালিন যুগভেরী পত্রিকা এবং মুহাম্মদ নুরুল হক সম্পাদিত আল ইসলাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের ঔরশজাত ৪ ছেলে এবং ৪ মেয়েও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত। তম্মধ্যে বড় ছেলে কবি ও গবেষক সৈয়দ মবনু, দ্বিতীয় ছেলে বার্মিংহাম থেকে প্রকাশিত বাংলামেইল পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ নাসির আহমদ, তৃতীয় সৈয়দ ফখর উদ্দিন এবং চতুর্থ সৈয়দ সফির আহমদ। মেয়েরা হলেন, সৈয়দা সফুয়ানা বেগম শেফা, স্বামী হাফিজ মাওলানা সৈয়দ কফিল আহমদ। সৈয়দা তাসলিমা বেগম লিমা, স্বামী মাওলানা অধ্যাপক আব্দুল কাদির সালেহ। সৈয়দা তাহরিমা বেগম, স্বামী আব্দুল মোনাইম খান শাহান। কবি সৈয়দা তানজিনা বেগম, স্বামী সৈয়দ রিয়াদ আহমদ।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শোক প্রকাশ:
খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রী উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আলহাজ সৈয়দ আতাউর রহমানের ইন্তিকালে শোক কেন্দ্রীয় খেলাফত মজলিস কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ শোক প্রকাশ করা হয়েছে। প্রদত্ত শোকবানীতে খেলাফত মজলিসের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, আলহাজ সৈয়দ আতাউর রহমান বাতিলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রসৈনিক ছিলেন। খেলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে সৃষ্ট শূণ্যতা পূরণ হবার নয়।
এছাড়া আলহাজ সৈয়দ আতাউর রহমান সাহেবের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি প্রদান করেছেন খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর ও ভাষা সৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান, নায়েবে আমীর ও জামেয়া নূরীয়া ইসলামীয়া ভার্থখলা মাদরাসার প্রিন্সিপাল হাফিজ মাওলানা মজদুদ্দিন আহমদ, সিলেট জেলা সভাপতি মাওলানা মোশাহিদ আলী, সেক্রেটারি মাওলানা নেহাল আহমদ, সিলেট মহানগরী সভাপতি অধ্যাপক বজলুর রহমান, সেক্রেটারি কেএম আব্দুল্লাহ আল মামুন।
পৃথক পৃথক শোকবার্তায় খেলাফত মজলিস নেতৃবৃন্দ মরহুম সৈয়দ আতাউর রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের শোক:
ক্লাব সদস্য ও বার্মিংহাম থেকে প্রকাশিত বাংলামেইল সম্পাদক সৈয়দ নাসিরের পিতা সমাজসেবী, শিক্ষানুরাগী ও প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমানের ইন্তেকালে শোক প্রকাশ করেছেন ল-ন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী, সেক্রেটারি মুহাম্মদ জুবায়ের ও ট্রেজারার আ স ম মাসুম। তারা মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এক শোকবার্তায় ক্লাব নেতৃবৃন্দ বিলেত থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মরহুম সৈয়দ আতাউর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সংশ্লিষ্টতা এবং বাংলাদেশে বিশেষ করে তাঁর নিজ এলাকা জগন্নাথপুর ও সিলেট নগরী মসজিদ-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদানের কথা স্মরণ করেন।

সাপ্তাহিক সুরমার শোক:
বাংলাদেশ ও বিলেতের বিশিষ্ট সমাজহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমানের ইন্তেকালে সাপ্তাহিক সুরমা পরিবারের পক্ষ শোক প্রকাশ করা হয়েছে। সুরমা সম্পাদক শামসুল আলম লিটন, বার্তা সম্পাদক আবদুল কাইয়ূম ও ফাইন্যান্স এডিটর এমাদুর রহমান এমাদ মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের গভীর সবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। এক শোকবার্তায় তারা বাংলাদেশ ও বিলেতে মরহুমের কর্মময় সংগ্রামী জীবন বিশেষ করে বাংলদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সফলে বিলেতের অন্যতম একজন সংগঠক হিসেবে তাঁর অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।

বিভিন্ন স্থানে খতমে কুরআন, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল:
মরহুম আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমান স্মরণে বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে খতমে কুরআন, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। শোকসভা হয়েছে তাঁর জন্মস্থান সৈয়দপুর, জগন্নাথপুর এবং বিলেত জীবনের আবাসস্থল বার্মিংহামে। সৈয়দপুর গ্রাম ও জগন্নাথপুরের উপজেলা সদরে অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিল ও শোকসভাসমূহে উপস্থিত ছিলেন মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিক্ষকবৃন্দ এবং এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
খেলাফত মজলিস যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমান স্মরণে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৪ অক্টোবর ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া বার্মিংহাম বাংলা মিডিয়ার পক্ষ থেকে ২৫ অক্টোবর স্থানীয় মসজিদে বাদ জোহর এক দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ ও বিলেতে সৈয়দ আতাউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবন ও পারিবাকি পরিচিতি:
আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমানের জন্ম ১৯৩২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী। বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর গ্রামে। তিনি হযরত শাহ জালালের (র.) এর সাথী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত সৈয়দত শাহ শামসুদ্দিনের (র.) বংশধর। সৈয়দ আতাউর রহমানের পিতা মরহুম হাজী সৈয়দ শমসাদ আলী একজন দ্বিনদার ব্যবসায়ী ছিলেন এবং মা মরহুমা লালকাচাই খানম তৎকালিন সময়ে মহিলাদের মধ্যে দ্বীনি মাসআলা শিক্ষা দান করতেন।
সৈয়দ আতাউর রহমান কর্মজীবনের শুরুতে বৃটেনবাসী ছিলেন। তার বড় ভাই সৈয়দ আব্দুর রহমানের সাথে কিডিমিনিস্টার শহরে থাকতেন। ব্যবসায়িক কারণে চলে আসেন বার্মিংহাম শহরে। সেখানে তারা দুই ভাই মিলে বৃটেনে প্রথম হালাল মিট-চিকিনের ব্যবসা শুরু করেন। সৈয়দ আব্দুর রহমানকে বিবিসি‘র অনুসন্ধানী তথ্যে বৃটেনে প্রথম হালাল খাদ্যের আবিস্কারক উল্লেখ করা হয়েছে। মরহুম সৈয়দ আতাউর রহমানের হালালের প্রতি আকর্ষণ এবং হারামের প্রতি ঘৃণা থেকেই মূলত তারা দুই ভাই আগ্রহী হন এই ব্যবসায়। ১৯৭১ সালের দিকে বার্মিংহামের বোলসালহিথ রোডের ১৪২ নাম্বার ছিলো তাদের হালাল গ্রোসারীর দোকান।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দোকানের উপর তলায় ছিলো বার্মিংহামে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের কেন্দ্র। তখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরির সাথে সৈয়দ আব্দুর রহমান গোটা বৃটেন সফর করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গণজাগরণ ও অর্থ সংগ্রহ করেন।
১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ একশন কমিটির উদ্যোগে বার্মিংহামের স্মলহিথ পার্কে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এটা ছিলো বহির্বিশ্বে প্রথম খোলা আকাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়ানো। সেই জনসভায় সাহসী সংগ্রামীদের মধ্যে সৈয়দ আব্দুর রহমান ও সৈয়দ আতাউর রহমান ছিলেন। সেদিন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানীদের আক্রমণে ১৩ জন বাংলাদেশী আহত হন। তবে শক্তভাবে হামলাকারিদের প্রতিরোধ করা হয়।
সৈয়দ আতাউর রহমান ‘একশন কমিটি ফর বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট’ এর একজন সদস্য ছিলেন। এই সংগঠন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বৃটেনে জনসমর্থন আদায় এবং অর্থ সংগ্রহ করে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। জেনেভা থেকে ব্যারিস্টার নিয়োগ করতে মরহুমের বড় ভাই সৈয়দ আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে ১৬শ’ পাউ- সংগ্রহ করে তৎকালিন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলামের সেক্রেটারী রেজাউর রহমানের কাছে প্রদান করা হয়। এই টাকা দিয়েই বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য জেনেভা থেকে প্রথম ব্যারিস্টার নিয়োগ করা হয়। এরপর সৈয়দ আব্দুর রহমান সরাসরি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে ৫০৪ পাউ-ের একটি চেক হস্তান্তর করেন। তৎকালিন বাংলার বাণী পত্রিকায় তখন ছবিসহ সেই খবর প্রকাশিত হয়।
বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশে বড় হয়েছেন সৈয়দ আতাউর রহমান। যার ফলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানীর খলিফা মাওলানা লুৎফুর রহমান শায়খে বর্ণভীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আর শায়খে বর্ণভীর হেফাজতে ইসলামের মাধ্যমেই তিনি ইসলামী আন্দোলনের পথে যাত্রা শুরু করেন।
শায়খে বর্ণভীর ইন্তেকালের পর তিনি শাহ জালালের দরগাহ মাদ্রাসার ইমাম আরেফ বিল্লাহ হাফেজ মাওলানা আকবর আলীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি হাফেজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়ার সফর সঙ্গী হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন।
১৯৮১ সালে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হজরত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের নির্বাচনী প্রচার কাজে অংশগ্রহন করেন। এরপর থেকে তিনি বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে যান। তিনি খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শুরার সদস্যসহ সিলেট জেলা কমিটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
খেলাফত আন্দোলন থেকে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের নেতৃত্বে খেলাফত মজলিস গঠিত হলে তিনি প্রথমে সংগঠনের জেলা কমিটির সহ-সভাপতি, তারপর নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। খেলাফত মজলিস দু’ভাগ হলে তিনি খেলাফত মজলিস (ইসহাক-কাদের) গ্রুপে জেলা শাখার দায়িত্বের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শুরার সদস্য এবং কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন।
সৈয়দ আতাউর রহমান এনজিওদের অপতৎপরতা ও নাস্তিক মুরতাদ প্রতিরোধ আন্দোলনে সিলেট জেলা শাখার যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন। এই আন্দোলনে সভাপতি ছিলেন জামেয়া মাদানিয়া কাজিরবাজার মাদরাসার প্রিন্সিপাল মরহুম মাওলানা হাবিবুর রহমান।
আশির দশকে সিলেটের অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে গঠিত মুজাহিদ কমিটির তিনি ছিলেন সহ-সভাপতি। তখন সভাপতি ছিলেন খলিফায়ে মাদানী হাফেজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া।
এছাড়া সৈয়দ আতাউর রহমান জামেয়া কাসিমূল উলূম (দরগাহ মাদরাসা), জামেয়া নুরিয়া ভার্থখলা মাদরাসা, জামেয়া আরাবীয়া রানাপিং মাদরাসাসহ বৃহত্তর সিলেটের অসংখ্য মাদরাসার কার্যকরি কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন তিনি বৃহত্তর সিলেটের কাওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ‘আজাদ দ্বীনী এদারায়ে তালিম বাংলাদেশ’ এর কার্যকরি কমিটির সদস্যও ছিলেন।
বৃটেনে সৈয়দপুর শামসিয়া সমিতির প্রষ্ঠিাকাল থেকে তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৯০ সালে তাঁর প্রচেষ্টায় সৈয়দপুর গ্রামে শাহ সৈয়দ শামসুদ্দিন জামেয়া ইসলামিয়া হাফিজিয়া দারুল হাদিস বালিকা মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদরাসার জন্য তিনি এবং তাঁর ভাইয়েরা নিজ বাড়ীর কিছু অংশ এবং ছয় কেদার ক্ষেতের জমি ওয়াকফ করে দেন। এছাড়া বৃটেনের বার্মিংহাম শহরে প্রতিষ্ঠিত আল-আমিন ফাউ-েশন প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এটি বর্তমানে বার্মিংহামের প্রসিদ্ধ আল-আমিন প্রাইমারী এবং আল-আমিন জুনিয়র স্কুল হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
সৈয়দ আতাউর রহমান ১৯৬৮ সালে সিলেটী নাগরি ভাষার মহাকবি পীর মজির উদ্দিনের ছেলে মরমী কবি পীর মনফর উদ্দিনের বড় মেয়ে এবং বিশিষ্ট কবি ও কলামিস্ট ফরীদ আহমদ রেজার বড় বোন বেগম ফৌজিয়া কামালকে বিয়ে করেন। স্ত্রী ফৌজিয়া কামালও মেধাবী সাহিত্যিক। কৈশোরেই তাঁর কবিতা আমীনূর রশীদ চৌধূরী কর্তৃক সম্পাদিত এবং প্রকাশিত তৎকালিন যুগভেরী পত্রিকা এবং মুহাম্মদ নুরুল হক সম্পাদিত আল ইসলাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের ঔরশজাত ৪ ছেলে ও ৪ মেয়েও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close