সম্পাদকীয়

মহররম: ‘শির দেগা, নেহি দেগা আমামা

সম্পাদকীয় ।। ইস‍্যু ২১৬৫

নজরুলের কালজয়ী কবিতা ‘মহররম’ এখনো বাঙালির মনকে আবেগাপ্লূত করে তুলে। অবশ্য কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনাই একটা মহাকাব্য। জীবন দেবো কিন্তু দুরর্নীতিবাজ জালিমশাহীর কাছে মাথা নোয়াবো না, এ বিপ্লবী আহবান নিয়ে হিজরী সনের ১০ মহররম বছর ঘুরে আবার আমাদের সামনে এসে হাজির হয়েছে। ১০ মহররম মুসলামদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন এবং এ সময় রোজা রাখা একটি ধর্মীয় আচার। সাথে সাথে এ দিনে কারবালার প্রান্তরে এজিদ বাহিনীর হাতে মহানবী (স)’র প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেনের নৃশংস শাহাদত এখনো সারা বিশ্বের মুসলমানরা অশ্রুসজল চোখে স্মরণ করে এবং জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এ ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে। ইতিহাস থেকে আমরা জানি, মুসলমানদের সকল প্রকার ধর্মীয় বিরোধের উসৎ রাজনীতি হলেও নিরাপদ জীবন ও অগ্রগতির জন্য আমাদের বার বার রাজনীতির কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনাও রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয়েছিলো।

চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা) একটি চরমপন্থী ইসলামিস্টদের হাতে শাহাদত বরণ করলে তাঁর বড় ছেলে ইমাম হাসান খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু সিরিয়ার শাসনকর্তা হজরত মুয়াবিয়া (রা) তা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে ইমাম হাসান খেলাফতের দাবি ত্যাগ করে হজরত মুয়াবিয়া (রা)’র সাথে এ শর্তে সন্ধি করেন যে মুয়াবিয়ার পর ইমাম হোসেনকে খেলাফতের দায়িত্ব প্রদান করা হবে। মুয়াবিয়া (রা)’র ইন্তেকালের পর এজিদ পিতার অঙ্গীকার রক্ষা না করে নিজেই খলিফার পদ দখল করে নেয়। ইমাম হোসেন (রা) তখন মক্কায় ছিলেন। কুফার অধিবাসীরা তাঁকে কুফায় গিয়ে মুসলিম জাহানের নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ করে। এর প্রেক্ষিতে ইমাম হোসেন (রা) নিজ পরিবারের ৭০ জন লোকসহ মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু কারবালার প্রান্তরে এজিদ বাহিনী ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে ইমাম হোসেন (রা)’র পথ রোধ করে দাঁড়ায়। তারা তাঁকে মদীনায় ফিরে যেতেও বাঁধা দেয় এবং এজিদের আনুগত্য অথবা লড়াই বেছে নেয়ার আহ্বান জানায়। একমাত্র পানির উৎস ফোরাত নদীর পথও তারা অবরুদ্ধ করে রাখে। ইমাম হোসেন স্বৈরশাসকের আনুগত্য অস্বীকার করে একাকী এজিদের বিশাল বাহিনীর সাথে লড়াই করে শাহাদত বরণ করেন।ইমাম হোসেন (রা) মহানবী’র পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত। পরাজিত হয়েও পৃথিবীর সকল নির্যাতিত মানুষের রাজা হয়ে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। পক্ষান্তরে এজিদ বিজয়ী হয়েও মানুষের কাছে ঘৃণিত ও নিন্দিত।এজিদের মৃত্যু হলেও তাঁর প্রেতাত্মারা যুগে যুগে দেশে দেশে জন্ম নিয়েছে। এজিদের মতো জোর করে ক্ষমতা দখল এবং বিরোধীদের নির্যাতন ও নৃশংসভাবে হত্যার দৃষ্টান্ত আজকের পৃথিবীতেও চলছে। তবে একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে হোসেনের অনুসারীদের লড়াইও বিশ্বব্যাপী একটি চলমান প্রক্রিয়া। যে দৃষ্টান্ত ইমাম হোসেন স্থাপন করেছেন তা অনুসরণ করে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই আজকের পৃথিবীর বহু দেশে চলছে এবং চলবে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close