নিউজ

আওয়ামী নেত্রী পাপিয়ার ফিল্মী উত্থান

সুরমা ডেস্ক
লণ্ডন, ২৭ ফেব্রুয়ারী – ক্ষমতাসীন আওয়ামী?যুবমহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার ফিল্মী উত্থান হতবাক করেছে সবাইকে। দেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বের বাংলাদেশী কমিউনিটির মুখে মুখে ছড়াচ্ছে পাপিয়ার কলঙ্কময় কাহিনী। গত ২২ ফেব্রæয়ারী, শনিবার বিদেশে পালিয়ে যাবার পথে বিমানবন্দর থেকে আটক হওয়ার পর একে একে প্রকাশ হতে থাকে তার সব দুষ্কর্ম। সরকারী দলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে চরম অনৈতিকতার মাধ্যমে পাপিয়ার বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া নিয়ে জনমনে দেখা দেয় নানা প্রশ্ন। রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ভাড়া নিয়ে দিনের পর দিন ননা অপকর্ম চালিয়ে যাওয়া পাপিয়ার নাটকীয় গ্রেফতার নিয়েও রয়েছে বহু কৌতুহল। বলাবলি হচ্ছে যে, পাপিয়ার এই উত্থানের পেছনে যাদের মদদ এবং তার রঙমহলে উপরতলার যাদের যাতায়াত তারা কি আদৌ ধরা পড়বে? নাকি সময়ের ব্যবধানে সব সব ঢাকা পড়ে যাবে। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে যুবলীগ নেতা সম্রাটসহ ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের ধরার পর একই প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছিলো জনমনে। সর্বত্র দাবী উঠেছিলো, তাদের গডফাদারদের খুঁজে বের করার। কিন্তু দীর্ঘদিন পরও জনমনের সেই প্রত্যাশার কোনো প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়নি।

পাপিয়ার কারণে অনেকে আতঙ্কিত, বিব্রত:
যুবলীগ নেত্রী পাপিয়া গ্রেফতারের পর অনেকে এখন আতঙ্কিত। আবার অনেকে বিব্রত। যারা পাপিয়ার খদ্দের ছিলেন তারা আতঙ্কে রয়েছেন। আর যাদের পাপিয়া নানা অপকর্ম করতে বাধ্য করেছেন, যাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েছেন বা অজান্তে পাপিয়ার দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছেন তারা বিব্রত। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, পাপিয়া অনেক নিরীহ তরুণীকে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করেছে। দিনের পর দিন আটকে তাদের মারধরসহ নানা নির্যাতন করেছে। পতিতা পল্লীর মক্ষীরানীরা নিরপরাধ নারীদের সাথে যে আচরণ করে, পাপিয়া তেমনই আচরণ করত তার ডেরার নিরপরাধ তরুণীদের। এই তরুণীদের মধ্যে অনেককে ভালো চাকরি দেয়ার নাম করে ওপরতলার মানুষদের কাছে পাঠাত পাপিয়া।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। সাথে তার তিন সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। যাদের মধ্যে পাপিয়ার স্বামী পরিচয়দানকারী মফিজুর রহমান সুমন ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমনও রয়েছে। তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশী টাকাসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা উদ্ধার করা হয়।

পাপিয়া গ্রেফতার হওয়ার পরই বেরিয়ে আসতে শুরু করে তার অন্ধকার জগৎ। তত সময়ের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায় তার কলঙ্কময় অধ্যায়ের কাহিনী। গত ২৪ ফেব্রæয়ারি হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট এবং ফার্মগেটের ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডের রওশনস ডমিনো রিলিভো নামের বিলাসবহুল ভবনে তাদের দু’টি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা, আগ্নেয়াস্ত্র, বিদেশী মদসহ অনেক অবৈধ সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।

র্যাব ও পুলিশ সূত্র জানায়, পাপিয়ার উপার্জনের প্রায় সব সোর্সই অবৈধ। তার মূল উপার্জন ছিল ওপর তলার লোকদের মনোরঞ্জন করে অর্থ বা সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেয়া। আর এভাবেই গড়ে তোলে সে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি-গাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিত্ত-বৈভব। মাসের বেশির ভাগ দিনই তার কাটত পাঁচ তারকা হোটেলে। মাসে কোটি টাকার ওপরে ভাড়া আসত সেসব হোটেল কক্ষের। এমনও দিন গেছে যেদিন পাপিয়ার মদের বিলই এসেছে দুই লাখ টাকার ওপরে।

একাধিক সূত্র জানায়, মনোরঞ্জনের জন্য পাপিয়ার নির্দিষ্ট কিছু তরুণী ছিল, যারা পাপিয়ার চাকরি করত। পাপিয়া তাদের মাসিক বেতন দিত। আনুষঙ্গিক খরচও তাদের দিত পাপিয়া। আর তারা মনোরঞ্জন করে যে টাকা কামাত তা সরাসরি পাপিয়ার অ্যাকাউন্টে জমা হতো। এর বাইরেও অনেক তরুণী পাপিয়ার নেটওয়ার্কে কাজ করত। যাদের মধ্যে বিদেশী তরুণীরাও ছিল।

একটি সূত্র বলেছে, পাপিয়া অনেক তরুণীরই সর্বনাশ করেছে। ভালো চাকরি বা সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলে অনেক তরুণীকে বাধ্য করেছে পতিতাবৃত্তিতে। সে ক্ষেত্রে তরুণীদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে পাপিয়া ও তার সহযোগীরা। অনৈতিক যৌনাচারের জন্য পাপিয়ার কাছে অনেকেই যেতেন। যাদের কাছে ওই তরুণীদের পাঠানো হতো। এই খদ্দেরদের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ছিল। ক্ষমতাবান, টাকাওয়ালাসহ অনেকেই নিয়মিত খদ্দের ছিলেন এই পাপিয়া নেটওয়ার্কের।

অস্ত্র ও মাদকের তিনটি মামলায় শামীমা নূর পাপিয়াকে ১৫ দিনের রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, পাপিয়া ছিল নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয় নেতাদের অনিচ্ছা সত্তে¡ও কেন্দ্রের কিছু নেতাকে ম্যানেজ করে ওই পদ বাগায় সে। পাপিয়া কাদের হাত ধরে নেত্রী হয়েছে, কাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলোতে যাতায়াত করেছে, কাদের হাত ধরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে তা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রভাবশালী ওই ব্যক্তিরা এখন আতঙ্কে রয়েছেন। ইতোমধ্যে অনেকের নাম জানাজানি হয়ে গেছে। পাপিয়ার কাছ থেকে কিছু ছবি আর ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে; যাতে অনেককে দেখা গেছে। আবার পদ-পদবি বা অর্থের ও যোগাযোগের ভয় দেখিয়ে অনেক মানুষকে দিয়ে নানা কাজ করিয়ে নিয়েছে পাপিয়া। অনেককে অনেক কাজ করতে বাধ্য করেছে ভয়ভীতি দেখিয়ে। আবার অনেকের অজান্তেই পাপিয়া তাদের সাথে ছবি তুলেছে, ভিডিও করেছে। এসব ব্যক্তি এখন বিব্রত ও লজ্জিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক নেতা গতকাল বলেছেন, এই নারী যে এতটাই খারাপ তার কোনো ধারণা ছিল না। যুব মহিলা লীগের শীর্ষ নেত্রীদের সাথে তার কাছে কয়েকবার এসেছে। ছবিও তুলেছে। তিনি কিছুই মনে করেননি। এখন তিনি খুবই বিব্রত।

পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, পাপিয়ার সাথে কাদের যোগাযোগ ছিল, কাদের ক্ষমতায় পাপিয়া এত দূর এসেছে তাদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। শিগগিরই এই নেটওয়ার্কের অন্যরাও গ্রেফতার হবে বলে পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান।

তিন নেত্রীর প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন পাপিয়া
যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষস্থানীয় দুই নেত্রী এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এক সাংসদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শামীমা নূর ওরফে পাপিয়া। ওই তিনজনের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। ১৫ দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া এসব তথ্য দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

জাল টাকা সরবরাহ, মাদক ব্যবসা, অনৈতিক কাজ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক রাখার অভিযোগে পাপিয়া, তাঁর স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে মতি সুমনসহ চারজনকে গতকাল মঙ্গলবার থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে রাজধানীর বিমানবন্দর থানার পুলিশ।

পাপিয়া নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকা অবস্থায় বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় ২২ ফেব্রæয়ারি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হন। ধরা পড়ার পর তাঁকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

পাপিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় অর্থ পাচার ও জাল টাকা রাখার ঘটনায় একটি মামলা এবং শেরেবাংলা নগর থানায় মাদক ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা হয়। মামলার অপর দুই আসামি পাপিয়ার সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবা।

এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল রাজধানীর মহাখালীর সেতু ভবনে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করতে এবং তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাদের বলেন, দলের মধ্যে যাঁরা অপকর্ম করছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করতে এবং তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক ও পাপিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ কাজী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়ার অপরাধজগৎ সম্পর্কে চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসছে। মূলত যুব মহিলা লীগের শীর্ষস্থানীয় দুই নেত্রী ও ঢাকার একজন সাবেক নারী সাংসদের আশ্রয়-প্রশ্রয় থেকে মাদক ব্যবসা, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজি করতেন। এ ছাড়া চাকরি দেওয়ার কথা বলে কিংবা বিদেশে পাঠানোর নামে অনেকের কাছ থেকে তিনি বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, নরসিংদীর এক ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে পাপিয়া তাঁর কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা নেন। শেষ পর্যন্ত বিদেশে পাঠাতে না পারায় ওই ব্যক্তি টাকা ফেরত চাইলে তাঁকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তি থানায় মামলা করতে ২৫ ফেব্রæয়ারী, মঙ্গলবার এসেছিলেন। তাঁকে নরসিংদীতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

র‌্যাব জানায়, ২২ ফেব্রæয়ারী আটক করার সময় পাপিয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বলে ক্ষমতার দাপট দেখানোর চেষ্টা করেন।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সালের অক্টোবরে নরসিংদী শহরের বাসাইল এলাকায় নিজ বাসার সামনে তাঁর স্বামীর ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি পাপিয়ার পেটে বিদ্ধ হয়। এরপর তাঁরা নরসিংদী ছেড়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। ঢাকায় যুব মহিলা লীগের নেত্রী ও সংরক্ষিত আসনের এক নারী সাংসদের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা হয়। একপর্যায়ে ওই নারী সাংসদসহ যুব মহিলা লীগের শীর্ষস্থানীয় দুই নেত্রীর প্রশ্রয়ে এই দম্পতি অপরাধ চক্র গড়ে তোলেন।

শীর্ষ এক নেতার ছত্রছায়ায় পদপদবি পান পাপিয়া, ওপরওয়ালাদের মনোরঞ্জনে ছিল বিদেশী রমণী; তিন মামলায় ১৫ দিনের রিমাণ্ড:
এক শীর্ষ নেতার ছত্রছায়ায় থেকে পদপদবি ভাগিয়ে নেন বহিষ্কৃত মহিলা যুবলীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া। সেই শীর্ষ নেতার হাত ধরেই দীর্ঘদিন ধরে দেহব্যবসা, অস্ত্র-মাদক ব্যবসা করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। হোটেল ওয়েস্টিনে ‘প্রেসিডেন্ট স্যুট’ ভাড়া নিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতেন পাপিয়া। তার বিডি স্কট সার্ভিস লিমিটেড নামে একটি নেটওয়ার্ক আছে। তাতে বিদেশী সুন্দরী তরুণীরাও আছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদের দিয়ে মনোরঞ্জন করে মন যুগিয়েছেন ওপরওয়ালাদের। সরকারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও ব্যবসায়ীর সাথে যোগাযোগ ছিল তার।

এদিকে, জাল টাকা উদ্ধার, অস্ত্র ও মাদকের পৃথক তিন মামলায় গ্রেফতার নরসিংদীর জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক পাপিয়ার ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তার স্বামী মফিজুর রহমানেরও ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদুর রহমান ও মোহাম্মদ জসীম এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর মধ্যে বিমানবন্দর থানার জাল টাকা উদ্ধারের মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদুর রহমান পাঁচ দিন, শেরেবাংলা নগর থানার অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা মামলায় ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসীম পাঁচ দিন করে মোট ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিমানবন্দর থানার মামলায় গ্রেফতার চারজন আসামি হলেও শেরেবাংলা নগর থানার মামলার আসামি কেবল পাপিয়া দম্পতি।

এর আগে তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ। সেখানে জাল টাকা উদ্ধারের মামলায় ১০ দিন, অস্ত্র ও মাদক মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো পূর্বক ১০ দিন করে ২০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। ঢাকা মহানগর হাকিম শাহীনুর রহমান তাদের গ্রেফতার দেখান ও আবেদন মঞ্জুর করেন।

অন্যদিকে, তিন মামলায়ই রিমাণ্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী। আদালত তা মঞ্জুর করেননি। শুনানি শেষে আসামিদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

এ দিকে রিমান্ড আবেদনের প্রতিবেদনে পুলিশ উল্লেখ করে, পাপিয়াসহ চার আসামি সঙ্ঘবদ্ধভাবে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জাল নোটের ব্যবসা, চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্য, জমি দখল-বেদখল, অনৈতিক ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে এবং আসামিদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত বৈদেশিক মুদ্রার উৎস ও জাল টাকা তৈরি চক্রের সক্রিয় সদস্যসহ মূল হোতাকে গ্রেফতার, আসামিদের নিয়ে পুলিশ অভিযান পরিচালনা এবং ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ রিমান্ড একান্ত প্রয়োজন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যুব মহিলা লীগের বিতর্কিত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। এই দম্পতি ঢাকা ও নরসিংদীতে অবৈধ কাজ-কারবারের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তাদের এই অবৈধ কাজ-কারবারের পরিধি থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। জানা গেছে, ওয়েস্টিনে সরকারের এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার যোগসাজশে বিভিন্ন মন্ত্রী, কর্তাব্যক্তিদের মনোরঞ্জন

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাপিয়া ওরফে পিউ র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। জানা গেছে, ওই শীর্ষ কর্মকর্তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল ওয়েস্টিনে। নিয়মিত সকালের নাশতা ও মধ্য রাত পর্যন্ত তিনি থাকতেন ওয়েস্টিনে। পাপিয়া বেশ কিছু দিন আগে রাশিয়া থেকে ১২ নারীকে ঢাকায় এনেছিলেন। যাদের বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয়। কিন্তু ওই শীর্ষ কর্মকর্তা তাদের ছেড়ে দেন। তিনি নিয়মিত পাপিয়ার মাধ্যমে বেশ কয়েকজন সরকারদলীয় নেতা, কয়েকজন মন্ত্রীকে নারী সরবরাহ করতেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে অবস্থান করে সুন্দরী যুবতীদের দিয়ে পাপিয়া পরিচালনা করতেন অবৈধ দেহব্যবসা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ও তার স্বামী অনেক অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। কারো মাধ্যমে কোনো কাজ হাসিল করতে চাইলে সুন্দরী যুবতীদের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে পাপিয়া কৌশলে তার ডেরায় নিয়ে আসতেন। পরে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ক্লিপসের ভয় দেখিয়ে টার্গেট পূরণ করতেন তিনি। মানসম্মানের ভয়ে ওই ব্যক্তিরাও পাপিয়ার নির্দেশের বাইরে যাওয়ার সাহস দেখাতেন না। এরই মধ্যে পাপিয়া-সুমন দম্পতি তাদের ব্যবসার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছেন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও। উদ্ধার করা হয়েছে শতাধিক ভিডিও ক্লিপসের একটি টিকটক ভিডিও। ওই ক্লিপসে দেখা যায়, পিস্তল হাতে পাপিয়া এক যুবককে টার্গেটে রেখে গুলি করার অভিনয় করছেন। এ ছাড়া তার অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির ভিডিও রয়েছে, যা তদন্ত কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন। অভিজাত হোটেলের সুইমিংপুলে ৫-৬ যুবতী নিয়ে পাপিয়ার নাচ দেখা গেছে একটি ভিডিও ক্লিপে। এসব কিছুই খতিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

এদিকে, এ দম্পতি গ্রেফতারের পরপরই নরসিংদীজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল বাইজি সর্দারনী বেশে পাপিয়ার ভিডিও। বেরিয়ে আসছে নারী নেত্রীর বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের কথা। মুখ খুলতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। পাপিয়া ও সুমনের নেপথ্যের কাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এই সন্ত্রাসী দম্পতি এখন ‘টক অব দ্য টাউন’। জানা গেছে, পাপিয়ার বাবা সাইফুল বারী একজন সাধারণ লোক। তার স্বামী সুমনের বাবা মতিউর রহমান চৌধুরী গানের শিক্ষক। সুমনের উত্থান শুরু ২০০০ সালে, কৈশোর থেকেই যার প্রধান পেশা ছিল চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বø্যাকমেইল। একপর্যায়ে সুমন রাজনীতিবিদদের সাথে সখ্য গড়ে তোলেন। ২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে করেন পাপিয়াকে। তাদের ঘরে মাদহাত চৌধুরী ইসাব নামে আট বছরের একটি সন্তান আছে। বিয়ের পরপরই পাপিয়াকে রাজনীতিতে ব্যবহার শুরু করেন সুমন। ২০১২ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নরসিংদী শহরের বাসাইল এলাকায় ভাড়া বাসার সামনে শহর ছাত্রলীগের আহŸায়ক থাকা অবস্থায় সুমনের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন পাপিয়া। পরে তারা নরসিংদী ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে তৌহিদা সরকার রুনা সভাপতি ও পাপিয়া সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এলাকায় তাদের বিশাল ‘কর্মী বাহিনী’ রয়েছে। শত শত লোকজন নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিটি মিছিল, সভায় তারা যোগ দেন। তাদের অনুসারীরা ‘কিউ অ্যান্ড সি’ ট্যাটু ব্যবহার করেন।

গত ২৩ ফেব্রæয়ারী, রোববার হোটেল ওয়েস্টিনে পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীর নামে বুকিংকৃত বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট রুম এবং ফার্মগেটের ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডের রওশন’স ডমিনো রিলিভো নামের বিলাসবহুল ভবনে তাদের দু’টি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে বিদেশী পিস্তল, দু’টি পিস্তলের ম্যাগজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও বিদেশী মদ ও নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক ও কিছু বিদেশী মুদ্রাসহ ১০টি ব্যাংকের ভিসা ও এটিএম কার্ড জব্দ করে র্যাব। এর আগে গত শনিবার গোপনে দেশত্যাগের সময় পাপিয়াকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করে র্যাব। গ্রেফতার অন্য তিনজন হলেনÐ পাপিয়ার স্বামী ও তার অবৈধ আয়ের হিসাবরক্ষক মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন, পাপিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী শেখ তায়্যিবা ও সাব্বির খন্দকার। এ সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ জাল নোট, ৩১০ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলঙ্কান মুদ্রা, ১১ হাজার ৯১ মার্কিন ডলার ও সাতটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। র্যাব জানায়, পাপিয়ার প্রকাশ্য আয়ের উৎস গাড়ি বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা। তবে এর আড়ালে জাল মুদ্রা সরবরাহ, বিদেশে অর্থপাচার এবং অবৈধ অস্ত্র রাখাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পাপিয়ার অন্ধকার জগতের ইতিবৃত্তি:
রাজনীতির অঙ্গনে পা দিয়েই নানা অপরাধ কাণ্ডের হাতেখড়ি। রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ছবি তুলে তা প্রচারের মাধ্যমে নিজের অবস্থান জানান দেয়ার কৌশল। ক্রমে নেতাকর্মীদের মাঝে পরিচিতি পাওয়ার সঙ্গে বাড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। প্রভাব খাটিয়ে বনে যান যুব মহিলা লীগ নরসিংদী জেলার সাধারণ সম্পাদক। মাস ছয়েক আগে গুরুত্বপূর্ণ এই পদ পাওয়ার পর যেন আলাদীনের চেরাগ হাতে মিলে। কয়েক মাসে অন্ধকার জগতে বিশাল সম্রাজ্য গড়ে তুলে কামিয়েছে কোটি কোটি টাকা। তিনি শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। যুব মহিলা লীগ নেত্রীর পরিচয়ে অভিজাত ব্যক্তি ও  রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে হেন অপরাধ নেই যা পাপিয়া করেননি।

গ্রেপ্তারের পর দুই দফা সংবাদ ব্রিফিং এ পাপিয়ার অন্ধকার জগতের বøু প্রিন্ট প্রকাশ করে র‌্যাব। ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে এই অপরাধ সম্রাজ্ঞীর নানা অপরাধ কাণ্ডের তথ্য মিলেছে। রাজনীতিতে নাম লেখানোর আগে অনেকটা সাধারণ ঘরের সন্তান পাপিয়া সাধারণ জীবনেই অভ্যস্ত ছিলেন। বিয়ের পর স্বামী মফিজুর রহমান সুমনের হাত ধরে রাজনীতি ও অপরাধকাণ্ডে জড়ান পাপিয়া। কয়েক বছর আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে স্বামীকে নিয়ে এলাকা ছাড়েন। ঢাকায় এসে গড়ে তোলেন নিরাপদ আস্তানা। মাসের পর মাস ব্যবহার করেছেন পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। চলাফেরা করেন সামনে পিছনে গাড়ির বহর নিয়ে। প্রভাবশালী অনেক রাজনীতিকের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগে তাদের সঙ্গে ছবি তোলে প্রকাশ করেছেন নানা মাধ্যমে। এখন কি নেই তার? বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট। আছে দেশে বিদেশে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, অপরাধ জগতের ষোলকলাই পূর্ণ করেছেন। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, জাল নোটের ব্যবসা, তদবিরবাজি, চাঁদাবাজি, জিম্মি করে টাকা আদায়, নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা, অশ্লীল ভিডিও দিয়ে বø্যাকমেইলিং, অন্ধকার জগতের সব পথেই পা দিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন অপরাধ জগতের রানী। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

শনিবার দিল্লী যাবার সময় র‌্যাবের একটি টিম শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন ও তাদের সহকারী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করেছে। এসময় তাদের কাছ থেকে ৭টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট, ৭টি মোবাইল, বাংলাদেশি নগদ ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ভারতীয় রুপি ৩১০, শ্রীলংকান মুদ্রা ৪২০ ও ১১ হাজার ৯১ ইউএস ডলার পাওয়া যায়। আর গতকাল তাদের দেয়া তথ্যমতে, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড ও হোটেল ওয়েস্টিনের বুকিং করা প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ, নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, আরও ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক বই, কিছু বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা/এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, পাপিয়ার প্রধান ব্যবসাই ছিল এসকর্ট সার্ভিস। চাকরি দেবার প্রলোভন দেখিয়ে সে দেশের বিভিন্ন স্থানের নারীদের ঢাকায় নিয়ে আসতো। তাদের কখনও তার বাসায় আবার কখনও পাঁচ তারকা হোটেলে রেখে অনৈতিক কাজে বাধ্য করতেন। র‌্যাব জানায়, চাকরির নাম করে আনা কম বয়সী তরুণীদের চাকরি সে ঠিকই দিত তবে সেটি এসকর্ট সার্ভিসে। চাহিদা বুঝে সর্বনিম্ন ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু  করে ৩০ হাজার টাকা বেতন দিত সে। বিনিময়ে এদেরকে দিয়ে কামিয়ে নিত লাখ লাখ টাকা। যেসব তরুনীরা অনৈতিক কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাতো তাদের সে বেধড়ক মারধর করতো। অমানষিক নির্যাতনের জন্য অনেক তরুণী এখন ট্রমার মধ্যে আছে। ঢাকায় তার হেফাজতে নিয়ে আসার পরপরই তরুণীদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বন্ধ করে দিত। ইচ্ছা না থাকলেও অনেক তরুণীকে বাধ্য করা হতো এসব কাজে।

সূত্র জানায়, পাপিয়ার টার্গেট থাকতো কম বয়সী শিক্ষার্থীদের। তাই সে বিভিন্ন কৌশলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীদের সংগ্রহ করতো। র‌্যাব পাপিয়াকে আটকের পর সাত তরুণীর তথ্য পেয়েছে। এসব তরুণীরা গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকার শিক্ষার্থী। পাপিয়া তার হেফাজতে থাকা তরুণীদের ভালো ছবি, বয়স, উচ্চতা, পেশা, শারীরিক গঠনের বর্ণনা দিয়ে প্রথমে অভিজাত ক্লায়েন্টের কাছে পাঠিয়ে দিত। এসব ছবি দেখে ক্লায়েন্ট আগ্রহ না দেখালে পরবর্তীতে তরুণীদের নগ্ন ছবি তুলে পাঠাতো। ক্লায়েন্টের পছন্দ হলে স্থান নির্ধারণ করতো পাপিয়া নিজেই। ক্লায়েন্ট পাপিয়ার আস্তানায় না আসতে চাইলে তাদের পছন্দমত স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হতো। ক্লায়েন্টের বাসায় বা হোটেলে তরুণীদের পৌঁছে দেবার কাজ করতো পাপিয়ার স্বামী সুমন ও তার সহকারী সাব্বির খন্দকার। র‌্যাব বলছে, পাপিয়ার আস্তানায় কেউ এসে  তরুণীদের সঙ্গে মেলামেশা করলে কৌশলে গোপণে ভিডিও ধারণ করা হতো। ক্লায়েন্ট চলে যাবার পর এসব অন্তরঙ্গ মূহুর্তের ভিডিও ও ছবি দিয়ে তাদের বø্যাকমেইল করা হতো। ভিডিও/ছবি প্রকাশ করার ভয় মাসের পর মাস দেখিয়ে হাতিয়ে নিত লাখ লাখ টাকা। একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে র‌্যাব জানতে পেরেছে।

র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, পাপিয়া ও সুমন চলাফেরা করতো অভিজাত লোকদের সঙ্গে। পাঁচতারকা হোটেলে বসেই তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতো তারা। গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত ওয়েস্টিন হোটেলের ২১তলার প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুুটের চারটি রুম ভাড়া করে পাপিয়া, সুমন ও তাদের সহযোগীরা অবস্থান করছিলো। ভিআইপি ক্লায়েন্টদের জন্য এসব কক্ষেই মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হতো। ভিআইপিদের জন্য পাপিয়া পুরো একটি বারই বুকিং দিয়ে রাখতো। প্রতিদিন শুধু বারের বিলই তিন লাখ টাকা পরিশোধ করতো সে। বারের আড্ডায় সমাজের বিভিন্ন স্থরের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন। র‌্যাব জানিয়েছে, তিন মাসে প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট, বার সব মিলিয়ে পাপিয়া অন্তত তিন কোটি টাকা হোটেল বিলই পরিশোধ করেছে।

সূত্র জানিয়েছে, সাত বছর আগে পাপিয়ার সঙ্গে সুমনের বিয়ে হয়। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। স্বামী স্ত্রী দুজনেই উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তিন বছর আগে পাপিয়ার স্বামী সুমন এক সময় নরসিংদী ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। সাবেক প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের হাত ধরেই তার ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ। তার পর থেকেই বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা ছিল। তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। লোকমানের পর মেয়র কামরুজ্জামানের ক্যাডার হিসেবে সুমন কাজ করতেন।

র‌্যাব জানিয়েছে, পাপিয়া ও সুমন নরসিংদী এলাকায় তাদের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী কিউ এন্ড সি গড়ে তুলে। তাদের প্রত্যেকের হাতে কি এন্ড সি ট্যাটু করা  আছে। এই বাহিনীর প্রত্যেকের বাইক আছে। তারা মূলত পাপিয়া ও সুমনকে মোটরসাইকেলের বহর দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। এছাড়াও তারা পাপিয়া ও সুমনের নির্দেশে বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে। এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাকুরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা, জমির দালালি, দখল, সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স প্রদান, গ্যাস লাইনের সংযোগ স্থাপনের নামে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়েছে। কাজ না হলে কেউ টাকা ফেরৎ চাইলে তাদের তার টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করতো। এরকম শত শত ভুক্তভোগী রয়েছেন। র‌্যাব জানায়, পুলিশের এসআই পদে চাকুরি দেয়ার নাম করে পাপিয়া ১১ লাখ ও একটি কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা বলে ২৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

র‌্যাব পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনের নামে ঢাকা, নরসিংদী ও গাজীপুরে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পেয়েছে। কোনো সূনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পেশা ছাড়াই তারা এই বিপুল পরিমান সম্পদের মালিক হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে তাদের রয়েছে লাখ লাখ টাকা। ধারণা করা হচ্ছে দেশের বাইরেও তাদের বিপুল পরিমান সম্পদ ও ব্যবসা বাণিজ্য রয়েছে। র‌্যাব ইতিমধ্যে দেশের বাইরে পাপিয়ার স্বামী সুমনের একটি বার থাকার তথ্য পেয়েছে। দেশের সম্পদের মধ্যে রয়েছে ঢাকার ফার্মগেটের ২৮ ইন্দিরা রোডে ‘রওশন ডমিনো রিলিভো’ ভবনে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। নরসিংদী শহরে রয়েছে ২টি ফ্ল্যাট। রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি। নরসিংদীর বাগদী এলাকায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ৬ কাটা ও ১০ কাটার দুটি প্লট। তেজগাঁও এফডিসি এলাকায় কার একচেঞ্জ নামক একটি গাড়ির শো-রুমে প্রায় ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে। নরসিংদী জেলায় কেএমসি কার ওয়াস এন্ড অটো সলিউশন নামক প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ। তার শশুর বাড়ি বাহ্মণদীতে একটি দোতলা বাড়ি আছে। চলাফেরা করার জন্য তাদের কালো ও সাদা রঙ্গের দুটি হাইয়েস মাইক্রোবাস, ১টি হ্যারিয়ার, ১টি নোহা ও ১টি প্রাইভেট কার আছে। র‌্যাব সূত্র জানায়, থাইল্যান্ডে সুমনের একটি মদের বার রয়েছে। নরসিংদীর বাগদী মারকাজ মসজিদ এলাকায় একটি পাকা ও আরেকটি  সেমিপাকা টিনশেড বাড়ি রয়েছে। সেমিপাকা বাড়িটি টর্চার সেল নামেই পরিচিত। টর্চার সেলে পাপিয়া তার অবাধ্যদের নিয়ে শায়েস্তা করা হতো। এদিকে হঠাৎ করে পাপিয়াকে গ্রেপ্তার নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। পাপিয়া গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে র‌্যাব একের পর এক অভিযোগ সামনে তুলে আনছে। তবে সূনির্দিষ্ট কি অভিযোগে এই দম্পত্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এ বিষয়ে র‌্যাব সঠিক কোনো জবাব দিতে পারে নাই। পাপিয়াকে নিয়ে গতকাল দ্বিতীয় বারের মত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১ অধিনায়ক শাফী উল্লাহ বুলবুল জানান, অর্থপাচার ও জাল টাকা বহনের অপরাধে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল জাল বহনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাদেরকে এয়ারপোর্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক মামলায় তেজগাঁ থানায় পৃথক মামলার প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ জানিয়ে আজ তাদেরকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে। এদিকে গতকাল পাপিয়াকে নরসিংদী যুব মহিলা লীগ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close