নিউজ

ইংলিশ না জানা ও অদক্ষরা ভিসা পাবেন না, ব্রেক্সিটের পর কঠোর ইমিগ্রেশন নীতি

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২০ ফেব্রুয়ারী – ব্রেক্সিটের পর কঠোর ইমিগ্রেশন নীতি ঘোষণার পাশাপাশি বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বর্ডার নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিচ্ছে বৃটেন। অস্ট্রেলিয় আদলে পয়েণ্টভিত্তিক ইমিগ্রেশন নীতির বাস্তবায়নের ফলে অদক্ষ বা কম দক্ষ এবং ইংরেজী ভাষায় কথা বলতে অক্ষমরা ব্রিটিশ ভিসা পাবে না। ১৯ ফেব্রুয়ারী, বুধবার এমন একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে বর্তমান টোরি সরকার। নতুন ইমিগ্রেশন নীতিকে বৃটেনের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত উল্লেখ করে সরকার বলছে, এর মাধ্যমে আমরা ফ্রী মুভমেণ্ট বা মুক্ত চলাচল বন্ধ করে বর্ডারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছি এবং মানুষের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তা প্রদান করা হচ্ছে — যার সামগ্রিকভাবে লক্ষ্যস্থিত মাইগ্রেশন বা অভিবাসন সংখ্যা কমিয়ে আনবে। হোম সেক্রেটারি প্রীতি প্যাটেল বলেছেন, নতুন ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় যেসব সেক্টরে সংকট রয়েছে সেসব খাতে অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশরা কাজ করতে পারেন। এছাড়া তিনি নিয়োগকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, শূন্যস্থান পূরণে কোম্পানিগুলোকে অনেক ব্রিটিশ ওয়ার্কারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্যতা এবং ইংরেজী বলার দক্ষতা অর্জনে ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে সরকারের এই নতুন ইমিগ্রেশন সিস্টেমের সমালোচনা করে বিেেরাধীদল লেবার, লিবডেমসহ ইণ্ডাস্ট্রি খাতের নেতারা। তাদের মতে, বর্ডারসমূহের পূর্ণ?নিয়ন্ত্রণ নিতে সরকারের এমন পরিকল্পনা অর্থনৈতিক ও কর্মক্ষেত্রে বিপর্যয় বয়ে আনবে। লেবার পার্টি বলছে, এর ফলে তৈরি হওয়া প্রতিক‚ল পরিস্থিতির কারণে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হবে। নতুন এই ইমিগ্রেশন সিস্টেমে বিভিন্ন খাতে মারাত“ক সমস্যার সৃষ্টি করবে অনেকে মনে করছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে নার্র্সিং, কেয়ারার এবং ফার্ম, রেস্টুরেণ্ট ও হোটেল ব্যবসায় প্রয়োজনীয় লোকবল পেতে মারাত“ক সমস্যা হবে।

উল্লেখ্য, সরকার এর আগে ব্রেক্সিটোত্তর ইইউ এবং নন-ইইউ সবার জন্য সমান ইমিগ্রেশন নীতির ঘোষণা দেয়। যাতে কম দক্ষ ওয়ার্কাররা আর বৃটেনের ভিসা পাবেন না। সেই আলোকে এবছরের ৩১ ডিসেম্বর ইউকে-ইইউ ফ্রি মুভমেন্ট বন্ধ হওয়ার পর ইইউ এবং নন-ইইউ থেকে যারাই বৃটেনে আসবেন তাদের একই মাপকাঠিতে যাচাই করা হবে।

বরিস জনসনের নেতৃত্বাধিন টোরি সরকারের নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী একটি ’পয়েন্টভিত্তিক’ অভিবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় তারা। নতুন এই ব্যবস্থা অনুযায়ী, যেসব বিদেশী কর্মী বৃটেনে আসতে চায় তাদের ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা থাকতে হবে। এছাড়া ’অনুমোদিত স্পন্সরের’ অধীনে দক্ষতাসম্পন্ন কোনও চাকরিতে নিয়োগ পেতে হবে। তা নিশ্চিত করতে পারলে তারা ৫০ পয়েন্ট পাবে।

বৃটেনে কাজ করার অনুমতি পেতে হলে সব মিলিয়ে অভিবাসীদের ৭০ পয়েন্ট নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে যোগ্যতা, বেতন ও যে খাতে কর্মীর অভাব রয়েছে এমন কোনও খাতে কাজ করলেও পয়েন্ট পাওয়া যাবে। তবে সরকার জানিয়েছে, তারা কম দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকদের অভিবাসনের জন্য পথ তৈরি করবে না।

ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহবান জানানো হয়েছে, তারা যেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বাধাহীন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলে।

সরকার জানিয়েছে, নিয়োগকর্তারা যেন অভিবাসন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল না থেকে যেন কর্মী ধরে রাখা, উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ করে। এটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সরকার মনে করে, নতুন কর্মী না বাড়িয়ে যেই ৩২ লাখ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নাগরিক যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি চেয়েছে তাদের দিয়েই শ্রমজাবারের চাহিদা মেটানো যেতে পারে। পাশাপাশি, কৃষিখাতে মৌসুমি শ্রমিক আসার অনুমোদিত পরিমাণ চার গুণ বাড়িয়ে ১০ হাজার করতে যাচ্ছে সরকার। এছাড়া ’ইয়ুথ মোবিলিটি অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর অধীনে প্রতি বছর ২০ হাজার তরুণ যুক্তরাজ্যে আসার সুযোগ পাবে। সিবিআই এই প্রস্তাবের অনেকগুলোর সমর্থন করলেও তারা মনে করে কিছু প্রতিষ্ঠান ’তাদের ব্যবসা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী কীভাবে পাওয়া যাবে, তা চিন্তা করতে তারা হিমশিম খাবে।’ এই প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব ক্যারোলিন ফেয়ারবেয়ার্ন বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো জানে যে বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দেওয়া এবং কর্মীদের দক্ষতা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগের মধ্যে কোনও একটি করলে হবে না। অর্থনীতির উন্নয়নে দুটিই একাধারে চালাতে হবে।

রয়েল কলেজ অব নার্সিং-এর আশঙ্কা, এই প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে ’জনগণের স্বাস্থ্য ও সেবার চাহিদা পূরণ হবে না।’ সেবা খাতের সঙ্গে জড়িত ইউনিসনের সহ সম্পাদক ক্রিস্টিনা ম্যাকেনা বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব ’সেবা খাতের জন্য বিধ্বংসী।’ যুক্তরাজ্যের হোমকেয়ার অ্যাসোসিয়েশন কম দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য সুযোগ কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবকে ’দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।

রেস্টুরেন্ট, হোটেল, সেবা খাত এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় দক্ষতাহীন কোনও অভিবাসী চাকরি করতে পারবে না। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সব অভিবাসী অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত আয় সংক্রান্ত সুবিধা ছাড়া অন্য কোনও সুবিধা পাবে না। বর্তমানে ইউরেপীয় ইউনিয়নের নাগরিকরা যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সুবিধা চাইতে পারেন যতদিন তারা ’অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়’ থাকেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের নাগরিকরা সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হন যখন তাদের যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়। এটি সাধারণত পাঁচ বছরের মধ্যেই হয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যে যেতে আগ্রহী দক্ষ শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন ৩০ হাজার পাউণ্ড থেকে নামিয়ে ২৫ হাজার ৬০০ পাউণ্ড করা হবে।

অভিবাসন বিষয়ক পরামর্শ দেওয়া সংস্থা মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজরি কমিটি-র তালিকায় এ মুহুর্তে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, মেডিক্যাল র্প্যাকটিশনার, নার্স, সাইকোলজিস্ট ও ব্যালে নৃত্যশিল্পীদের চাকরির সুযোগ রয়েছে। নতুন প্রস্তাবের অধীনে যুক্তরাজ্যে আসা দক্ষ কর্মীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার বিষয়টি থাকবে না।

শ্রমিকদের দক্ষতার সংজ্ঞাও পরিবর্তন করা হবে। যারা এ-লেভেল পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হবে, যেটি আগে স্নাতক পর্যায়ে দেওয়া হতো। তবে দক্ষ শ্রমিকের তালিকা থেকে হোটেল ও রেস্টুরেন্টের ওয়েটারের চাকরি বাদ গিয়ে কাঠমিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রী ও দক্ষ শিশু অভিভাবকের পদ যুক্ত হবে।

যুক্তরাজ্যে পড়ালেখা করতে চাইলে বিদেশি ছাত্রদের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়া লাগবে। ইংরেজি জানতে হবে এবং আর্থিক সক্ষমতা দেখাতে হবে। সূত্র: গার্ডিয়ান ও বিবিসি।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close