নিউজবাংলাদেশ

বাসস এখন গুজবের ফ্যাক্টরি!

  • আনন্দবাজারের গুজবের পেছনেও বাসস

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।

লণ্ডন, ২৩ আগস্ট:  গত ১৮ আগস্ট আনন্দবাজার পত্রিকা ‘হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে’ এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সম্পূর্ণ সূত্রহীন এই প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলে আনন্দবাজারেরই আরেক পত্রিকা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে খবর দিয়েছে। আনন্দবাজারের রিপোর্টের সঙ্গে যে খবরের আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। ঢাকার বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো মিলই নেই। আনন্দ বাজারের ওই ফরমায়েশি প্রতিবেদনের পেছনে বাসসের হাত আছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) বাংলাদেশের একটি জাতীয় সংবাদ সংস্থা যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে জানুয়ারি ১, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি)-এর ঢাকা ব্যুরো অফিসকে এই নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় সংবাদ সংস্থা হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছিল। শুরুতে স্বল্প পরিসরে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে ব্যুরো নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে রাজশাহী, রাঙামাটি এবং সিলেটে বাসসের ব্যুরো অফিস রয়েছে। দেশের সকল ৬৪ প্রশাসনিক জেলাতেই জাতীয় সংবাদ সংস্থার সংবাদদাতা রয়েছেন। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার গুজবের ফ্যাক্টরিতে পরিণত করেছে।

এর আগে গত ২২জুলাই ‘পলিসি ওয়াচারে নিবন্ধ, বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেস স্টাডি’ শিরোনামে একটি সংবাদ (গুজব) বাসস দেশের সকল মিডিয়া হাউজকে সরবরাহ করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন অনলাইন সংবাদপত্র ‘পলিসি ওয়াচার’ এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেস স্টাডিতে পরিণত হয়েছে।

পলিসি ওয়াচারে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি কি সত্যিই দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে?’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, সামষ্টিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৫০ বছরে ২৭১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পলিসি ওয়াচারের সম্পাদকীয় বাছাই বিভাগে নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধের লেখক সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ড. এমিলিয়া ফার্নান্দেজ দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

নিবন্ধে এমিলিয়া ফার্নান্দেজ লিখেছেন, অনেক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেস স্টাডিতে পরিণত হয়েছে, যা খুব কম অর্থনীতিবিদই ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিলেন।

তিনি লিখেছেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল একেবারে তলানিতে এবং অযোগ্য ওয়ান-ইলেভেনের কল্যাণে অর্থনীতি ছিল ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে, কিন্তু সেই থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই মহামন্দার সময়েও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বের সবচেয়েও ধনী ও সেরা অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে বিশ্ব তোলপাড় শুরু করেছে।

এমিলিয়া ফার্নান্দেজ লিখেছেন, কীভাবে এই দেশকে থামানো যায়, তা নিয়ে বিশ্বনেতাদের কারসাজি শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশকে যে হারানো যাবে না, তা গোল্ডম্যান শ্যাক্স রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে,  ২০৭৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ১৬তম অর্থনীতি।

লেখাটা পড়ে বাংলাদেশি পাঠকদের খুব ভালো লেগেছিলো যে, খুবই নিন্মমানের ভুলবাল ইংরেজিতে লিখলেও লেখিকা এমিলিয়া ফার্নান্দেজ বাংলাদেশকে বেশ আপন করে নিয়েছেন, নিবন্ধে কয়েকবার তিনি লিখেছেন ‘This is our big achievement’. প্রথম প্যারাতেই এটার উল্লেখ করেছেন। এরপর আবার কিছুদূর গিয়ে বলেছেন ‘Today after 50 years they (মানে ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান) are lagging behind Bangladesh in almost every index. This is the great achievement of our independence. Human resource is considered the most important factor in the development of any country, so we are ahead not only of Pakistan but also India in many fields’.  এরপর ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে ২০৭৫ সালে আমাদের অর্থনীতি দাঁড়াবে ৬.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এক ট্রিলিয়ন ডলার ঠিক কত বড় এটা তার পাঠকরা নাও বুঝতে পারে সেজন্যে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, ‘1 trillion dollars equals 1 trillion dollars.’   ঠিক এর পরের লাইনেই বলেছেন ‘According to that, the GDP of Bangladesh will be 6.3 trillion dollars. GDP in local currency will be Tk 686.7 lakh crore. This is Tk 636 lakh crore more than the government’s estimated GDP in the current financial year’. ২০৭৫ সাল থেকে কেন হঠাৎ কারেন্ট ফাইন্যান্সিয়াল ইয়ারে আসলেন? আবার আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ‘Crore’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার না হলেও তিনি সাবলীলভাবে সেটা ব্যবহার করলেন। এবং বেশ আশা জাগিয়ে নিবন্ধটা তিনি শেষ করলেন,  The economy of Bangladesh will surpass Saudi Arabia, Canada, Australia, Turkey, Italy, Malaysia and South Korea. The world will look at Bangladesh in amazement. কিন্তু এই জায়গায় এসে পাঠক একটু বেশি ধাক্কা খেয়েছেন। ‘The world will look’ কেন হবে, এটা ফিউচার টেন্স নয়, The world is already looking at Bangladesh in GREAT amazement.

যাইহোক, সুরমা’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, বাসস যেটাকে মার্কিন অনলাইন সংবাদপত্র বলে চালিয়ে দিয়েছে সেটা মোটেও মার্কিন কোন অনলাইন সংবাদপত্র নয়। এই লেখাটা প্রকাশের মাত্র তিনমাস আগে বাংলাদেশ থেকে ‘পলিসি ওয়াচার’ নামে উক্ত ডোমেইনটি কেনা হয়েছে। ডোমেইনটি মো: আসলাম হোসাইন নামে একজনের নামে নিবন্ধন করা হয়েছে। উক্ত পোর্টালে মাত্র ৭টি নিবন্ধ রয়েছে। এর বাইরে আর কিছুই নেই।  অথচ বাসস এই এমিলিয়া ফার্নান্দেজের নিবন্ধ নামে ভিত্তিহীন ভূয়া প্রোপাগান্ডা একযোগে ঢাকার সকল কাগজে কয়েক কলাম জুড়ে ছাপার ব্যবস্থা করেছে! টিভিতেও সংবাদ শিরোনাম করেছে। সেই থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাসসকে নিয়ে নেটিজেনদের হাসাহাসি চলছে। নেটিজেনরা বলছেন, দেশ থেকে ডোমেইন কিনে ‘মার্কিন অনলাইন সংবাদপত্র’ নাম দিয়ে এই ভূয়া প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে নিশ্চয় অনৈতিক সরকারের কাছ থেকে অনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

Sheikhsbay

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close