নিউজ

ডোনাল্ড লু’র সফরকে ঘিরে নানা গুঞ্জন: আবারও নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় ঢাকা

* এক সিদ্ধান্তে বেচে গেলো সরকার * পররাষ্ট্র সচিবের নজিরবিহীন চিঠি * কূটনৈতিক মিশনকে দিয়ে শেষ রক্ষার চেষ্টা * রুশ জাহাজ প্রশ্নে হাসিনার ডিগবাজি * ডোনাল্ড লু-র সফরকে ঘিরে নানা শঙ্কা

।। বিশেষ প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ১৬ জানুয়ারী – মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ জাহাজ রং ও নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশে গিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে বড় বিপদে ফেলেছিল। একটুর জন্য রক্ষা পেয়েছে সরকার। দশ দিন জাহাজটি খালাসের অপেক্ষায় থেকে সরকারের পাঁচ লাইনের একটি সিদ্ধান্ত বাঁচিয়ে দিয়েছে হাসিনা সরকারকে।
বড় ধরনের অবরোধ থেকে (বাণিজ্যিক অথবা সামরিক)‌‌। ওই সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘোষিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটনে আমাদের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের গভীর উদ্বেগ প্রকাশের পর পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে পড়ে। রাশিয়া প্রকাশ্যে হাসিনা সরকারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক যুদ্ধে নেমে পড়ে। সেই ‘বন্ধু’ রাশিয়াকে ৪৮ ঘন্টা না যেতেই অবৈধ জাহাজ ফিরিয়ে নিতে বলে হাসিনা সরকার চরমভাবে অপমান করে। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এবং প্রায় নিশ্চিত  নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ কিংবা সকল ধরনের সামরিক সহযোগিতা (এমনকি জাতিসংঘের শান্তি মিশনে সেনা নিয়োগের মত বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চরম অবস্থান নেওয়ার মতো আশঙ্কাকে) বন্ধের হুমকি কে কোন রকমের সামলে নিয়েছে সরকার। কিন্তু কত কয়েক বছরের বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান, নিষেধাজ্ঞের আওতায় থাকা কর্মকর্তাদের তদন্ত না করে নিয়োগ অব্যাহত রাখা এবং বারবার নিয়োগ প্রদান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক যে তলানিতে পৌঁছেছে, তার কোনও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হবে বলে কূটনীতি অভিজ্ঞ সূত্রগুলো মনে করেন না।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অস্বস্তি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মহাবিতর্কিত ভাবমূর্তি নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে চলতে হচ্ছে। অর্থনীতি ও রাজনীতির সংকটে আগাগোড়া নিমজ্জিত সরকারকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে আরো অনেক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। নতুন করে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় প্রতিমুহূর্তে তটস্থ শেখ হাসিনা ও তার প্রভাবশালী মন্ত্রীরা সম্প্রতি প্রসূচিবের একটি নির্দেশনা সরকারের এই তটস্থ অবস্থাকে তুলে ধরেছে। নতুন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির আশঙ্কা প্রকাশ করে তা ঠেকাতে এখনই যথাসম্ভব পদক্ষেপ নিতে বিদেশস্থ বাংলাদেশ দূতদের জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এ সংক্রান্ত দীর্ঘ এক চিঠিতে পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, আমাদের একটি বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তার সিনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সরকার ও তার প্রতিষ্ঠানগুলোর “ক্ষতিসাধনের” উদ্দেশ্যে সরকারি সংস্থা-ব্যক্তির ওপর একই প্রেক্ষাপটে বা অন্য কারণে আরও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে প্রস্তুত থাকার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি সময় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আপনাদের (দূতদের) প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সময়ে সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হালনাগাদ তথ্য ও নির্দেশনা দেবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।
 গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বাহিনীটির সাবেক-বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ফের একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের বাড়তি সতর্কতামূলক ওই চিঠি দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র।

কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা!!

গত এক দশকে বিদেশে বাংলাদেশের মিশন গুলো কূটনৈতিক কার্যক্রম বাদ দিয়ে একেকটির দলীয় কার্যালয় পরিণত হয়েছে। তাতেও সরকার সন্তুষ্ট হতে পারছে না। এখন কূটনীতিকদের দলীয় ক্যাডার হিসেবে কাজে লাগাতে উঠে পড়ে লেগেছে। নানা হাস্যকর ও অকূটনৈতিক বক্তব্যের জন্য সমালোচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইম্যাচিউর প্লেবয় হিসেবে পরিচিত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় পদবী ব্যবহার করে নজিরবিহীন চিঠি ইস্যু করিয়েছেন জেন্টলম্যান সচিব হিসেবে পরিচিত মিস্টার মাসুদ বিন মোমিনকে দিয়ে। 
কূটনৈতিক ক্যাডার থেকে দলীয় ক্যাডারে নামিয়ে এনে মিশনগুলোকে চিঠি দেয়া হচ্ছে।  বিদেশে  সরকার (পড়ুন সরকারি দলের) বিরোধী যে কোন কার্যক্রমের জন্য প্রবাসীদের কনসুলার সেবা দেয়া হবে না’-   বলে হুমকি দিয়ে দিয়েছে অনেক মিশন।  এরকম ভয়াবহ ও জেনেভা কনভেনশন বিরোধী তৎপরতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে প্রবাসীরা এখনো লবিং শুরু করেনি। এই এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রবাসী ব্যক্তিত্ব যারা এইসব দেশের সরকারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কাজ করে থাকেন, তারা বলছেন বাংলাদেশের স্বার্থে মিশরের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নেননি। এখন সরকারের পেশীশক্তির  আচরণের কারণে কোন কোন মিশনের হাই কমিশনার বা দূতাবাস প্রদানের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তারা এইসব দেশগুলোতে রিপোর্ট করবেন এবং প্রয়োজনে এইসব দেশের নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এসব  কূটনীতিকদের বহিষ্কারের দাবিও জানাবেন। মিশন গুলোকে গোয়েন্দা কার্যালয় ও দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করায় ইতিমধ্যে বেশিরভাগ দেশে বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ প্রবাসী্র দূরত্ব হয়েছে। প্রবাসী কূটনীতি নামে সরকারের আরেক বেআইনি ও মানবাধিকার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এইসব আশঙ্কায় তাদের নাম প্রকাশে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ  বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির স্বার্থে সরকারকে কূটনীতির নামে সকল ধরনের ফটোকারী তৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। 

ডোনাল্ড লু’র সফর ও শান্তিপূর্ণ প্রস্থান

ঘনঘন মার্কিন মন্ত্রীরা আসছেন ঢাকায়। রোহিঙ্গা ইস্যু, আঞ্চলিক শান্তি ইত্যাদির আবরণে আসা-যাওয়া হলেও মূল উদ্দেশ্য নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা চলছে সর্বত্র। ইমরান খানের মতো জনপ্রিয় সরকারকে হটিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক এই মন্ত্রী ডোনাল্ড লু। যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করেই জানতো ইমরান খান খুবই জনপ্রিয়, আর ঢাকায় শেখ হাসিনা সরকারের জনপ্রিয়তা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান এসময়ে আলোচনাযর মুখ্য বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে কোনো কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করা হাসিনা সরকারের পক্ষে এখন প্রায় অসম্ভব। তবে বিরোধী সকল দল ঐক্যবদ্ধ হলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি কিছুটা সমঝোতার পথে হাঁটার কারণে নির্বাচন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার ও আঞ্চলিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সকল চুক্তিতে সমর্থন যোগানোর শর্তে শেখ হাসিনা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারে বলে ঢাকায় আমাদের সূত্রগুলো জানাচ্ছেন। তবে সরকারের কূটনৈতিক বিশ্বস্ততাও তার রাজনৈতিক নির্ভরযোগ্যতার মতোই এখন সকল শক্তির কাছে শূন্যের কোথায়। তাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার সকল চেষ্টা ভেতরে বাইরে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে সূত্রগুলো মতামত দিচ্ছেন। একা হয়ে পড়া সরকার এতগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবেলা তো দূরের কথা শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ প্রস্থানের রাস্তাও তার জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এই সূত্রগুলো।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close