নিউজ

কাগজ জ্বালানি ও জীবিকার সংকট

● সব সেক্টরেই শ্রীলঙ্কার মত দেউলিয়াত্বের লক্ষণ
● পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বেতন কি হবে?
● বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে মুখোমুখি সরকার
● ডলার সংকটে কারখানা বন্ধের আশঙ্কা

।। বিশেষ প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৪ নভেম্বর : শেখ হাসিনার অবৈধ সরকার দেউলিয়া হতে চলেছে। শুধু মাত্র আনুষ্ঠানিক ঘোষণার বাকি। গত কয়েক মাসে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে গেছে। জ্বালানি ও কাঁচামালের সংকটে (ডলারের কারণে আমদানি করতে ব্যর্থতা) কল-কারখানার উৎপাদন ক্রমেই বন্ধ হওয়ার পথে। রিজার্ভের হিসাবে গরমিল। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) এর তথ্য অনুযায়ী গত ১০ বছরে ৯ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে ডলার নেই। তাই দেশের বাইরে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী ছাত্র/ছাত্রীদের টাকা পাঠাতে পারছেন না অভিভাবকেরা। লাগাম ছাড়া দুর্নীতিতে সরকারের ভাড়ারের হাল এমনই তলানিতে গেছে যে ব্যাংকগুলো এখন অফিশিয়ালি দেউলিয়া ঘোষণা করার অপেক্ষায় আছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সরকার এখন সব দেশের কাছে  ঋণ চাইছে। বিদেশে ডলার খুঁজছে। সৌদি আরবের কাছে বাকিতে তেল চাওয়ার পাশাপাশি নতুন করে এখন মোটা অংকের ঋণও চাইছে। কাগজ, জ্বালানী আর খাদ্যের চড়ামূল্যের কারণে সব সেক্টরেই  শ্রীলঙ্কার মত দেউলিয়াত্বের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এদিকে আইএমএফ বা অন্য কোন দেশ থেকে ঋণ না পেলে সরকার আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের বেতন ভাতা স্বাভাবিকভাবে দিতে পারবে না বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। সরকারের কাছে শুধুমাত্র নভেম্বর মাসের মাইনে দেওয়ার টাকা আছে। শেখ হাসিনার অবৈধ সরকার কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে । অবস্থা বুঝে অর্থমন্ত্রী কয়েক মাস আগে থেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন। শেখ হাসিনা সরকারের কংকাল সার চেহারা এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন ভাতা দিতে অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাতে করে সংকট আরও বাড়বে। অতিরিক্ত টাকা ছাপার ফলে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য আরও অনেক বেড়ে যাবে।

খাদ্য ও জীবিকার সংকটে মানুষ

ভয়াবহ দূর্নীতিতে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য পরিস্থিতি তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারির সময়ে দরিদ্র মানুষ ভিটে-মাটি, সহায়-সম্বল বিক্রি করে চলেছে। এরপর অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর ফলে খাদ্যের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশের মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার বৈষম্য এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে দেশের প্রায় দশ কোটি মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। দরিদ্র মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। তারা সারা দিনে এক বেলা খাবার জোগাড় করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছে। একমাত্র অবৈধ সরকারের লুটেরা শ্রেণী ও তাদের সুবিধাভোগীরা ভালো আছে। দেশের প্রায় দশ কোটি মানুষ এখন খাদ্য ও জীবিকার সংকটে আছে, সরকারি সহায়তা ছাড়া তারা টিকে থাকতে পারবে না বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

সব সেক্টরেই শ্রীলঙ্কার লক্ষণ

দেশের সব সেক্টরেই এখন শ্রীলঙ্কার মত দেউলিয়া হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার মত দেউলিয়ার হওয়ার সব লক্ষণ আস্তে আস্তে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের সরকারের মত বিভিন্ন সেক্টরে শেখ হাসিনা সরকারের লুটপাট, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে সকল পণ্যের দাম জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে সরকারের মত তথাকথিত উন্নয়নের নামে যখন যেভাবে খুশি সরকার ঋণ এনেছে। রেকর্ডমাত্রায় মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য হয়ে পড়ায় দেউলিয়া হওয়ার এমন আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে উচ্চ ব্যয় ও করের ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব কমেছে। কয়েক দশকের মধ্যে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। দেশি ঋণ ও বন্ডের টাকা শোধ করতে সরকার টাকা ছাপানোর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সরকার দেশকে একটি নিরব দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে, যা শেখ হাসিনা নিজেও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের জনগণকে সাহায্য করার বদলে উল্টো বিপদে ফেলেছে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক দৈন্যদশা যেভাবে প্রথমে কাগজ সংকটের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাও কাগজ সংকটের মাধ্যমেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কার কাগজ সংকটের ছায়া এবার বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে। দেশজুড়ে কাগজের সংকট শুরু হয়েছে। অল্প যা আছে তার দাম এত বেশি যে, তা কিনতে ব্যবসায়ীরাই হিমশিম খাচ্ছে। যার প্রভাব সরাসরি বইয়ের উপর পড়ছে। বাইরে থেকে কাগজ কেনার মতো ডলার দেশে না থাকায় শ্রীলঙ্কার মতই সারাদেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। শ্রীলঙ্কার মতই বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংকট কাটাতে শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা যেমন করে আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে, বাংলাদেশও তেমন করে আইএমএফ’র দ্বারস্থ হয়েছে।

কূটনীতিকদের সাথে মুখোমুখি

সরকারের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের সম্পর্কের টানাপোড়ন চলছে। সরকারের সাথে কূটনীতিকপাড়ার সম্পর্ক ভালো না এমন গুঞ্জন বেশ জোরেশোরেই চাউর হয়েছে। বিশেষ করে জাপানের মত নিরুত্তাপ এবং নিরুপদ্রব দেশের রাষ্ট্রদূত যখন বাংলাদেশের নৈশ ভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তখন এই গুঞ্জন নানাদিকে ডালপালা মেলেছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার জেরে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস, জাপানের রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা এখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে  হরহামেশাই কথাবার্তা বলছেন। ইত্যাদি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন কূটনীতিকদের একহাত নিয়েছেন। শুধু কূটনীতিকদের নয়, কূটনীতিকদের পাশাপাশি তিনি ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট বা কূটনীতিক রিপোর্টারদেরও সমালোচনা করছেন। বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে সরকার মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চলতি সপ্তাহে ঢাকা সফরসূচি বাতিল করায় ইটা এখন স্পষ্ট তারাও এখন আর পক্ষে নেই।

জ্বালানি ও ডলার সংকটে কারখানা বন্ধের শঙ্কা

গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের শিল্প খাত। দাম কমে গেলেও ডলার সংকট ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত না থাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজির) আমদানির এলসি খুলতে পারছে না পেট্রোবাংলা। প্রতিষ্ঠানটি আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করবে। এরপর এর দাম আরও কমলে আমদানির জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সুপারিশ পাঠাবে। অথচ শিল্প-কলকারখানার মালিকরা প্রয়োজনে বাড়তি দাম দিয়ে হলেও গ্যাস ক্রয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারকে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি নীতিনির্ধারকরা। শিল্প খাতের নেতারা বলেছেন, বর্তমানে গ্যাসের যে তীব্র সংকট চলছে মোট কর্মসময়ের ৪০-৪৫ শতাংশও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শ্রমিকদের বসিয়েই বেতন দিতে হচ্ছে। গত এক বছরে উৎপাদন ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। হাজার হাজার শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের মোট শিল্প-কারখানার প্রায় ৭০ ভাগই এখন হুমকির মুখে। বেকার হয়ে গেছেন কয়েক লাখ শ্রমিক। বিশ্বমন্দার মধ্যে রপ্তানি আয় ধরে রাখার পরিকল্পনা জ্বালানি সংকটের কারণে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। এ অবস্থা আর কয়েকমাস চললে শিল্পে বড় বিপর্যয় ঘটবে। হাজার হাজার শিল্প কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। 

কাগজ সংকটে নতুন বই ও পড়াশোনা নিয়ে আশঙ্কা

কাগজ সংকটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর অর্থের অভাবে বার্ষিক পরীক্ষার খাতা সরবরাহ করতে পারছে না। এমনকি প্রশ্নও না ছাপিয়ে দেয়া হবে ব্ল্যাক বোর্ডে। অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকলে ফটোকপি করে প্রশ্ন সরবরাহ করবে সংশ্লিষ্ট স্কুল। অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশের অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কাগজ সংকটের কারণে নতুন বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বইও সময়মতো যাবে কিনা সংশয় রয়েছে। দেশের মুদ্রণশিল্পের আকাশে কালো মেঘ, শিক্ষার্থীদের জীবনে দুর্যোগের ঘনঘটা।

কোথায় আশ্রয় পাবেন শেখ হাসিনা?

এদিকে যদি চলমান গণ অসন্তোষ ও বিরোধীদের আন্দোলনে সরকারের পতন হয় তাহলে শেখ হাসিনা কোথায় যাবেন, এই প্রশ্ন এখন নানাভাবে ঘুরেফিরে আসছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা কোন মুসলিম দেশে আশ্রয় পাবেন না। শাপলা চত্বরে হেফাজতের কর্মীদের উপর আক্রমণ ও গণহত্যা এবং যুদ্ধপরাধের বিচারের নামে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেওয়ার কারণে মুসলিম দেশগুলো তাকে আশ্রয় দিবে না। তিনি নিজেও হয়তো মুসলিম দেশগুলোতে থাকতে নিরাপদবোধ করবেন না।  প্রতিবেশি হিন্দু রাষ্ট্র তাকে সাময়িকভাবে আশ্রয় দিলেও দীর্ঘসময় তাকে রেখে বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক খারাপ করতে চাইবে না। আমেরিকায় তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় থাকলেও আমেরিকার সঙ্গে তাঁর সর্ম্পক ভালো না। একারণে আমেরিকা তাঁকে আশ্রয় নাও দিতে পারে। তিনি নিজেও সেখানে স্বাচ্ছন্দবোধ করবেন না। একমাত্র যুক্তরাজ্য তাঁকে আশ্রয় দিতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। শর্ত হিসেবে তাঁর সম্পদ স্থানান্তরের শর্ত থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে তাঁকে শেখ রেহানার সাথে আপোস করতে হবে।  জয়কে নিয়ে শেখ রেহানার সাথে তাঁর যে শীতল দ্বন্দ্ব’র কথা শোনা যায়, যে দ্বন্দের কারণে পদ্মা সেতু উদ্ভোধনের সময় রেহানা তাঁর সাথে যাননি, যে দ্বন্দের কারণে জয় রাগ করে আমেরিকায় চলে গেছেন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক সেই দ্বন্দ্ব তাকে মিটিয়ে ফেলতে হবে। ধারণা করা যায়,শেষ পর্যন্ত নিজের নির্বাসনের প্রশ্নে তা তিনি করতেই পারেন।

নিউজ

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close