মুক্তচিন্তা

মোদির হিন্দুত্ববাদ: ইংরেজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ

।। হাসনাত খান।।
লেখক: সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার ইংরেজিকে ‘দাস মানসিকতা’ বেষ্টিত একটি ‘ঔপনিবেশিক’ ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে যুদ্ধে হিন্দি মেডিকেল ডিগ্রিকে নতুন হাতিয়ার হিসেবে নরেন্দ্র মোদী সরকার ব্যবহার করছে। পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা ব্যবহারে জোর দিয়েছে। হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, তামিল-সহ আরও ছ’টি ভাষায় ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে উদ্যোগী হয়েছে মোদীর বিজেপি সরকার।

আট বছর আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং ভারতীয় জনতা পার্টি হিন্দিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষা দেওয়ার জন্য মধ্যপ্রদেশ সরকারের প্রকল্পের অংশ হিসেবে এমবিবিএস ছাত্রছাত্রীদের জন্য তিনটি পাঠ্যপুস্তক চালু করেছিলেন। তারপরেই তামিলনাড়ু, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলি থেকে স্থানীয় ভাষায় প্রচারের জন্য চাপ এসেছে। ভোপালে এমবিবিএস-এর জন্য বিন্দিতে মেডিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি, অ্যানাটমি, মেডিক্যাল ফিজিওলজির পাঠ্যপুস্তক চালু করেছিলেন অমিত শাহ। অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, মধ্যপ্রদেশ এমবিবিএস শুরু করার জন্য দেশের প্রথম রাজ্য হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই ১০টি রাজ্য তামিল, তেলুগু, মরাঠি, বাংলা, মালয়ালম ও গুজরাতি ভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের বই অনুবাদের কাজ শুরু করা হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, গুজরাতি, বাংলার মতো আঞ্চলিক ভাষায় মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর ডাক দিয়েছেন। শিবরাজ সিংহ চৌহানের নেতৃত্বে মধ্যপ্রদেশ সরকার তাঁর ইচ্ছা প্রথম পূরণ করেছেন। ইতিহাসে আজকের দিনটি সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। এ দিন এমবিবিএস প্রথম বর্ষের অ্যানাটমি, মেডিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি ও মেডিক্যাল ফিজ়িওলজির হিন্দিতে অনুবাদ করা বই উদ্বোধন করেন অমিত শাহ।  ৯৭ জন বিশেষজ্ঞ গত ২৩২ দিন ধরে গান্ধী মেডিক্যাল কলেজে জাতীয় শিক্ষানীতির অনুসরণে বইগুলি অনুবাদের কাজ করেছেন। সেই অনুবাদকদের এক জন দাবি করেন, খুবই সহজ-সরল ভাষায় লেখা হয়েছে। বোঝানোর জন্য অতিরিক্ত ছবি, চার্ট প্রভৃতিরও ব্যবহার করা হয়েছে।

জানা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য পড়াশোনা ইংরেজির বদলে হিন্দিতে চালু করা-সহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে সরকারি ভাষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুরিয়ে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার জন্যই অন্য ভারতীয় ভাষার কথা বলা হচ্ছে। বাংলা, হিন্দি বা ভারতীয় কোনও ভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া ভারতীয় ছাত্রদের পক্ষে এখনই সম্ভব নয়। এর ফলে ভারতীয় ছাত্ররা কেবল কারিগরিবিদ্যার বিশাল জ্ঞানভান্ডার থেকে শুধু বঞ্চিতই হবেন না, উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হবে। হিন্দিতে অনূদিত বইয়ের উপরে নির্ভর করে পড়াশোনা করতে গিয়ে ছাত্রদের চিকিৎসাবিদ্যা অর্জনের পরিসর কতটা সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মধ্যপ্রদেশ রাজ্য সরকারের হিন্দিতে মেডিকেল ডিগ্রি দেওয়ার সিদ্ধান্তের পরে চিকিত্সকরা হতবাক হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাজে হিন্দি ভাষার ব্যবহার বাড়ানো নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে তামিলনাড়ু।

এছাড়াও বিভিন্ন ভাষাভাষীর রাজ্যগুলি এবং বিভিন্ন সংগঠনের তরফে এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদী স্থানীয় ভাষার ব্যবহারে জোর দিয়ে বলেছেন, ইংরেজি কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম। তা কখনও বুদ্ধিজীবী হওয়ার মানদন্ড নয়। আগে ইংরেজিকে বুদ্ধিজীবী হওয়ার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হত। বাস্তবে ইংরেজি যোগাযোগের একটি মাধ্যম মাত্র। যারা হিন্দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন কিন্তু ইংরেজিতে নয়, তাঁরা যেন পিছিয়ে না পড়েন, তা দেখতে হবে। ইংরেজি ভাষায় প্রতিবন্ধকতার কারণে গ্রামের অনেক তরুণ প্রতিভা চিকিৎসক এবং ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেনি। নতুন শিক্ষা নীতি ইংরেজিভাষাকে ঘিরে থাকা মানসিকতা থেকে দেশকে বের করে আনবে। তিনি আরও বলেছেন, সরকার নিশ্চিত করতে চায়, দরিদ্র বাবা-মায়ের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত না হলেও চিকিৎসক কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে উঠবে। তিনি বলেছেন, সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে ইংরেজি ভাষার কারণে কেউ যেন মিছিয়ে না থাকে।

ভারতীয় মেডিকেল কাউন্সিলের প্রাক্তন প্রধান অর্থোপেডিক সার্জন ডাঃ রাজন শর্মা বলেন,  এই গ্র্যাজুয়েটরা মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করবে। এবং পাঠ্যপুস্তক চিকিৎসা কোর্সের একটি অংশ মাত্র। এখানে শত শত রেফারেন্স বই, ম্যানুয়াল এবং মেডিকেল প্রোটোকল রয়েছে, যা বেশিরভাগই ইংরেজিতে এবং একজন ডাক্তারের প্রশিক্ষণ এবং কার্যকারিতার জন্য অত্যাবশ্যক। আগেও স্থানীয় ভাষায় চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। যাঁরা পাশ করেছিলেন, তাঁদের উচ্চশিক্ষায় অসুবিধা হয়েছিল। কেননা চিকিৎসা বিজ্ঞানে বহু শব্দের স্থানীয় পরিভাষা পাওয়া যায় না। আর এব্যাপারে যে পরিমাণ বিদেশি বইয়ের সাহায্য নিতে হয়, সেখানে স্থানীয় ভাষা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিকে ওষুধে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া উচিত নয়। হিন্দিতে কীভাবে “হার্ট অ্যাটাক” বলতে হবে তার কোনও ধারণা নেই। তিনি সন্দেহ করেন যে, এমন অনেক রসায়নবিদ আছেন যারা হিন্দিতে একটি প্রেসক্রিপশন পড়তে পারবেন না। এই উদ্যেগকে তিনি পশ্চাদগামী, পশ্চাদমুখী, করুণ, শোচনীয় উল্লেখ করে বলেন, “চিকিৎসা পড়াতে হিন্দিভাষী শিক্ষকরা কোথায়? অনুবাদগুলি কতটা ভাল হয়েছে? গত নয় মাস ধরে, বায়োপসি, নিউরোব্লাস্টোমা এবং হেমোরয়েডস-এর মতো শব্দের জন্য শব্দ খুঁজে বের করতে ৯৭ জন অনুবাদকের একটি দল হিন্দি অভিধানগুলি ঘাটছে। মধ্যপ্রদেশের অনুবাদকরা ইতিমধ্যেই বলেছেন যে সহজ হিন্দি বিকল্প না থাকলে অনেক ইংরেজি পদ বজায় থাকবে। বিজেপি সরকারের এই নীতি ব্যর্থ হবে।

উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রে সরকারি কর্মকর্তাদের জনসাধারণকে শুভেচ্ছা জানানোর সময় “হ্যালো” বলা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরিবর্তে তাদেরকে “বন্দে মাতরম” বা “আমি তোমাকে প্রণাম করি, হে মাতৃভূমি” বলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো।

সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close