সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ সরকারের গুম এবং বিনাবিচারে হত্যা

সম্পাদকীয় ।। ইস্যু ২২৬৮

ভিন্নমতকে দমনের জন্য হুমকি, হামলা, মামলা, আটক, গুম এবং বিনাবিচারে হত্যার জন্য বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন তাদের প্রিয়জনদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছে, সভা-সমাবেশও করেছে বহুবার। এ সকল সমাবেশে গুম হওয়া বিভিন্ন ব্যক্তির সন্তানদের উপস্থিতি ও ক্রন্দন বহু শ্রোতাকে আবেগাপ্লূত হয়ে পড়তে দেখা গেছে। সরকারকে তারা বলেছে, ‘আমাদের স্বজনদের হত্যা করা হয়ে থাকলে অন্ততঃ তাদের কবর কোথায় তা আমাদের বলে দিন। তাদের কবর জিয়ারত করে আমরা একটু শান্তি লাভের চেষ্টা করবো।’

বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশের গুম-খুনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানিয়েছে। অনেক দেশের রাজনীতিবিদও এ ব্যাপারে কথা বলছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা করেছে। কিন্তু সরকার সব সময় গুম-খুনের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিতাপের বিষয় হলো কোনো কোনো সরকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তি দাবি করেছেন, নিখোঁজরা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে আত্মগোপনে আছে।
আনন্দের বিষয় যে সম্প্রতি জাতিসংঘ বিষয়টি যাচাই করে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। একই সঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের বর্তমান ও প্রাক্তন ৭ কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদানের পর সরকারের টনক নড়েছে বলে মনে হচ্ছে। এরপর থেকে দেশে ক্রসফায়ার ও গুম প্রায় বন্ধ রয়েছে। তবে বিনাবিচারে আটক অব্যাহত রয়েছে। গুম বন্ধ হলেও আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে দেশের যেখানে সেখানে অজ্ঞাত লোকের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের কে খুন করছে এর কোনো সদুত্তর মিলছে না।

হংকং ভিত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের মতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালে চলতি বছর জুন পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশার ৬১৯ জন মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটকের পর নিখোঁজ হয়েছেন এবং কমপক্ষে ২৬৫৮ জন মানুষকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ পর্যন্ত এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি রিপোর্টও প্রকাশ করেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেটের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে গত আগস্ট মাসে (২০২২)। এ সময় গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাকে’র পক্ষ থেকে মিশেলের কাছে ৬১৯ জন গুম হওয়া ব্যক্তির একটি তালিকা দিয়ে এ ব্যাপারে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রকৃত চিত্র উদঘাটনের দাবি জানানো হয়েছে। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়টাকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বলে আমাদের প্রতীয়মান হচ্ছে।

গুম ও বিনাবিচারে হত্যার মত মানবতা বিরোধী অপরাধ সমূহ চিরস্থায়ীভাবে বন্ধের একমাত্র পথ হচ্ছে দেশে সত্যিকার জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। রাতের অন্ধকারে ভোট ডাকাতি করে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে সরকারের নিকট থেকে সেটা কখনো আশা করা যায় না। তাই আমাদের স্বৈরাচারকে না বলতে হবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের সকল মত ও পথের মানুষকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close