নিউজ

ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে জলমগ্ন সিলেট ও সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকা

সিলেট প্রতিনিধি : গত দু’দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বেশিরভাগ এলাকা। আতঙ্কিত লোকজন নতুন করে আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটছেন। ইতোমধ্যে কিছু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। ফলে ওই সব এলাকার বাসিন্দারা ফের দুর্ভোগে পড়েছেন। শিশু, বৃদ্ধ ও গৃহপালিত পশু নিয়ে মানুষ বিপাকে পড়েছেন। গবাদিপশু নিয়েও দুশ্চিন্তায় বানভাসি মানুষ। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার কানাইঘাটে বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন।

দক্ষিণ সুরমায় এক সপ্তাহ ধরে উপজেলার অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দী। ঘরে ও রাস্তায় এখনো পানি রয়েছে। উপজেলার ৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১ হাজার ৯ পরিবারের ৪ হাজার ৫৮৯ জন বন্যার্ত আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। এরই মধ্যে নতুন করে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় লোকজন বিপাকে পড়েছেন। সরকারি ও বেসরকারিভাবে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও দুর্গম স্থানে বসবাসকারী পানিবন্দী মানুষ ত্রাণ পাচ্ছে না। উপজেলার মোগলাবাজার, দাউদপুর, জালালপুর, সিলাম, লালাবাজার, তেতলী ইউনিয়ন বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুশরাত লায়লা মীরা জানিয়েছেন, বন্যার্তদের সহযোগিতায় সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে কোম্পানীগঞ্জে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। গত ২৪ ঘন্টায় অন্তত এক ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। অনেকে নতুন করে আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটছেন। ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে গত মঙ্গলবার থেকে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা। গ্রামীণ রাস্তাঘাট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কিছু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। ফলে ওই সব এলাকার বাসিন্দারা ফের দুর্ভোগে পড়েছেন। শিশু, বৃদ্ধ ও গৃহপালিত পশু নিয়ে মানুষ বিপাকে পড়েছেন। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কোম্পানীগঞ্জ থানা সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে দুটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আশ্রয়ে থাকা আব্দুল হেকিম জানান, দশ দিন আগের বন্যায় তার বাড়ি ভেঙে গেছে। মেরামত করে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পানি বাড়ায় আশ্রয় কেন্দ্রেই থেকে গেছেন। কোম্পানীগঞ্জে এক মাস ধরে চলমান স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানি এখনো পুরোপুরি নামেনি। এখনো উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা প্লাবিত অবস্থায় রয়েছে। কয়েকদিন পানি কমায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছিল। নতুন করে পানি বাড়তে থাকায় মানুষের মধ্যে আবারও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বানভাসি মানুষ।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুসিকান্ত হাজং বলেন, নতুন করে বন্যা দেখা দেওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে বানভাসি মানুষের জন্য ৪৮টি নৌকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার কাজে নৌকাগুলো ব্যবহার করা হবে।

গোয়াইনঘাটে গত কয়দিন পানি অনেকটা কমলেও গত দু’দিন বুধ ও বৃহস্পতিবার থেকে ধীরে ধীরে আবার সারি ও ডাউকি নদী দিয়ে নেমে আসা পানিতে গোয়াইনঘাটে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা আবারও বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়ক সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে। এদিকে সারি-গোয়াইনঘাট সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠেছে। আরও একটু পানি বৃদ্ধি পেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় বিচ্ছিন্ন হতে পারে। তবে, পানি বৃদ্ধি বিপদ সীমার নীচে রয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে গোয়াইনঘাট বাসীর মাঝে আতংক বিরাজ করছে। এদিকে চরম খাদ্য সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে গো-খাদ্যের অভাবে গবাদিপশু নিয়ে কৃষকরা বিপাকে রয়েছেন।

বালাগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানি ধীর গতিতে কমায় উপজেরার ৬টি ইউনিয়নের ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ বন্যার্ত। হাট বাজারসহ উপজেলার সবকটি রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় লোকজন সীমাহিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সিলেট জেলা সদরের সাথে বালাগঞ্জের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও তা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ইপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রীতি ভ‚ষন দাস জানিয়েছেন এ পর্যন্ত বন্যার্তদের মাঝে ১৭৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১৭ লাখ টাকা বিতরণ করনা হয়েছে।

এদিকে গত ২৪ ঘন্টায় সুনামগঞ্জে ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে জেলার সব কটি নদ-নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। টানা বৃষ্টিতে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় সুনামগঞ্জে গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। গতকাল বিকেল ৩ টায় সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে ৭ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বিপদ সীমার ৫ সিন্টিমিটার নিচে। একই সময়ে ছাতকে সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ৯৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছাতকে ২৪ ঘন্টায় গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে একশত মিলিমিটার।

এদিকে, বন্যার পানি পুরোপুরি না কমায় এখনও অনেকের ঘরবাড়ি থেকে পানি নামেনি। ফলে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে পারেনি। ইতোমধ্যে যাদের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমেছিল, তাদের ঘরে আবারও পানি ঢুকেছে। গত বুধবার থেকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিচু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে আবারও তলিয়ে যাওয়ায় আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. জহুরুল ইসলাম জানান, গতকাল বিকেল ৩টায় সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ ষোলঘর পয়েন্টে ৭ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে জেলার ছাতক উপজেলা সদরে সুরমার পানি বিপদসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জে ২৪ ঘন্টায় ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ছাতকে একশত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয়েছে ১২১ মিলিমিটার।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. আহমদ হোসেন জানান, গত ২৪ ঘন্টায় জেলার ১১টি উপজেলায় পানিবাহিত রোগে একশত জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালে পানি বাহিত রোগে মোট রোগী ১৪৯ জন।

উল্লেখ্য, গত ১৬ জুন সুনামগঞ্জ শহরের সব বাসাবাড়িসহ শহরের শতভাগ বন্যার পানিতে নিমুজ্জিত ছিল। গত ১৫ দিনে মূল শহর থেকে বন্যার পানি নামলেও শহরতলীর বাসাবাড়িতে এখন বন্যার পানি টইটুম্বুর করছে। এছাড়াও হাওর এলাকায় বন্যা লেগেই রয়েছে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close