মুক্তচিন্তা

বিস্মৃত কর্মবীর মাওলানা আলী হুসেন “আসীম বিহারী”

পাসমন্দা আন্দোলনের জনক

।। ফাইয়াজ আহমেদ ফাইজি ।। 

।। সম্পাদনা – হাসান মাহমুদ, কানাডা প্রবাসী লেখক, অনুবাদক ও গবেষক ।।
(‘পাসমন্দা’ শব্দের ভাষাগত অর্থ ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী’। প্রায়োগিক অর্থে ভারতবর্ষে এ শব্দে ‘পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠী’ বোঝায়। বাংলায় আমরা যেমন আশরাফ (উচ্চস্তরের মুসলিম) ও আতরাফ (নিম্নস্তরের মুসলিম) বলি তেমনি। মাওলানা আলী হুসেন কবি ছিলেন। তিনি ‘আসীম বিহারী’ কলম-নামে কবিতা লিখতেন, পরে ওই নামটাই বিখ্যাত হয়ে যায়। প্রাচীন জ্ঞানতীর্থ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বিহার শরীফের খাসগঞ্জে এক দেশপ্রেমিক পরিবারে মাওলানা আলী হুসেনের জন্ম। তাঁর দাদা মওলানা আবদুর রহমান ছিলেন ১৮৫৭ সালে প্রবল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন সিপাহী বিদ্রোহে এই এলাকার অন্যতম নেতা।)

 স্বাধীনতা সেনানী এবং প্রথম পাসমন্দা আন্দোলনের জনক মাওলানা আলী হুসেন “আসীম বিহারী” ১৮৯০ সালের ১৫ এপ্রিল বিহার শরীফের মহল্লা খাস গঞ্জে বিহার প্রদেশের একটি দীনদার গরিব পাসমন্দা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১৯০৬ সালে ১৬ বছর বয়সে উষা কোম্পানিতে কলকাতায় কাজ শুরু করেন, চাকরীর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পড়াশোনাও চলতে থাকে। তিনি বিভিন্ন ধরণের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। নানান সীমাবদ্ধতার কারনে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে জীবিকার জন্য তিনি বিড়ি তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি বিড়ি শ্রমিকদের নিয়ে একটি দল গঠন করেছিলেন যাদের সাথে দেশ ও সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিবন্ধ লেখা এবং আলোচনা করা নিত্যদিনের একটি ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। তাঁর আগে ১৯০৮-০৯ সালে মাওলানা হাজী আবদুল জব্বার শেখপুরি একটি পাসমন্দা সংগঠন গঠনের চেষ্টা করেছিলেন যা সফল হয়নি। এ নিয়ে তিনি গভীরভাবে শোকাহত ছিলেন।

১৯১১ সালে মাওলানা আলী হুসেন তাঁতিদের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত “তারিখ-ই-মিনওয়াল ও আহলুহু” পড়ার পরে নিজেকে সংগ্রামের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করেছিলেন। ২২ বছর বয়সে তিনি প্রবীণদের শিক্ষার জন্য পাঁচ বছরের (১৯১২-১৯১৭) একটি পরিকল্পনা শুরু করেন। এই সময়ে তিনি যখনই তার স্বদেশ বিহার শরীফে যেতেন, তখনই সেখানে ছোট ছোট সভাগুলির মাধ্যমে জনগণকে সচেতন রাখার চেষ্টা করতেন। ১৯১৪ সালে যখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪ বছর, তিনি তাঁর নিজ শহর মহল্লা খাসগঞ্জ, বিহার শরীফ, জেলা নালন্দায় বজম-এ-আদব (সাহিত্য সভা) নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার আওতায় একটি গ্রন্থগারও পরিচালিত হত। ১৯১৮ সালে কলকাতায় “দারুল মুজাকারা” (আলোচনার-ঘর) নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যেখানে কর্মরত যুবসমাজ এবং অন্যান্যরা সন্ধ্যায় পঠন-পাঠন, রচনা এবং সাম্প্রতিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতেন। কখনও কখনও, পুরো রাত কেটে যেত এসব আলোচনায়।

১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার পরে যখন লালা লাজপত রায় ও  মাওলানা আজাদের মতো নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখন সেই নেতাদের মুক্তির জন্য দেশব্যাপী পত্র-প্রতিবাদ (Postal Protest) শুরু হয়েছিলো।  সারা দেশের জেলা, শহর থেকে মানুষ প্রায় দেড় লক্ষ পত্র-প্রতিবাদ এবং টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিল ভাইসরয় এবং মহারাণী ভিক্টোরিয়াকে। এই অভিযান শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল এবং সমস্ত নেতারা জেল থেকে মুক্তি পান।  তিনি ১৯২০ সালে কলকাতার তাঁতীবাগে “জমিয়াতুল মোমিনীন” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার প্রথম অধিবেশন ১৯২০ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।  এতে মাওলানা আজাদ বক্তব্যও দিয়েছিলেন।

১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি দেয়াল-পত্রিকা (দিওয়ারি-পত্রিকা) “আল-মোমিন” (ধর্মনিষ্ঠ) প্রথাটি শুরু করেছিলেন। তিনি বড় কাগজে লেখা দেয়ালে টাঙিয়ে রাখতেন যাতে আরও বেশি লোক পড়তে পারে। এটা খুব বিখ্যাত হয়ে গেল। ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর, কলকাতা তান্তিবাগে এক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল যেখানে মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা জওহর, মাওলানা আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। গান্ধীজি কংগ্রেস দলের কিছু শর্তযুক্ত করে এই সংগঠনকে এক লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আসীম বিহারী আন্দোলনের শুরুতেই সংগঠনটিকে যে কোনও ধরণের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে দূরে রাখাকে আরও বেশি যথার্থ মনে করলেন এবং এক লাখের বিশাল আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন যখন সংগঠনটির জন্য টাকার অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।

১৯২২ সালের গোড়ার দিকে সংগঠনটিকে সর্বভারতীয় চেহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি গ্রাম এবং শহর ভ্রমণে রওয়ানা হয়েছিলেন। শুরু হয়েছিল বিহার থেকে, প্রায় ছয় মাস একটানা কঠোর ভ্রমণ করে তিনি ১৯২২ সালের ৩ ও ৪ জুন বিহার শরীফে একটি রাজ্য পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেছিলেন।  সম্মেলনের ব্যয়ের অর্থের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হওয়ায় এবং সম্মেলনের তারিখ নিকটবর্তী হতে থাকায় মাওলানা তাঁর মাকে, ছোট ভাই মাওলানা মাহমুদুল হাসানের বিয়ের জন্য যে অর্থ ও গহনা রেখেছিলেন  সেটা দেওয়ার অনুরোধ করলেন। এবং বলেছিলেন যে ইনশাআল্লাহ বিয়ের আগে এই অর্থ সংগ্রহ করে নেবেন, টাকা ও গহনার আবার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু আফসোস যে সমাজের এই অবস্থার জন্য বিয়ের দিন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা হয় নি। অবশেষে অত্যধিক লজ্জার কারণে তিনি বিয়ের আগে নিঃশব্দে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। মা তাঁকে ফিরে আসার জন্য বার্তাও পাঠিয়েছিলেন কিন্তু তিনি বিয়েতে অংশ নেওয়ার সাহস করতে পারেননি। এই লজ্জা ও অপমানের পরেও বিপ্লবের আবেগের কোনও কমতি হয় নি।

“আল্লাহর ইচ্ছার ওপর, আমার অস্তিত্ব সমর্পণ করলাম

উনার ইচ্ছায় আমার ইচ্ছা, উনি যা চান ঠিক তাই ঘটবে”।

দেয়াল সংবাদপত্র “দিওয়ারী মোমিন” ১৯২৩ সাল থেকে “আল-মোমিন” নামে ম্যাগাজিন আকারে প্রকাশিত হতে লাগলো। ৯ জুলাই ১৯২৩ সালে মাদ্রাসা মইনুল ইসলাম, সোহডিহ, বিহার শরীফ, নালন্দা জেলা সহ বিহারে সংগঠনের (জমিয়াতুল মোমিনীন) একটি স্থানীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ঠিক একই দিনে উনার পুত্র কামারউদ্দিন মারা গেলেন যার বয়স ছিল মাত্র ৬ মাস ১৯ দিন।

তবে তাঁর সংগঠনকে সমাজের মেইনস্ট্রিমে আনার আবেগ এমন ছিল যে তিনি সময় মতো অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছেছিলেন এবং সমাজের অবস্থা ও দিকনির্দেশনা নিয়ে পুরো এক ঘন্টা শক্তিশালী ভাষণ দিয়েছিলেন যার সচেতনতার তরঙ্গ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘন ঘন এবং অবিরাম ভ্রমণগুলিতে উনি আর্থিক সমস্যা সহ অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। অনেক সময় ক্ষুধাও একটি বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইতিমধ্যে ঘরে কন্যা বারকা জন্মগ্রহণ করেছিল কিন্তু পুরো পরিবার ঋণে ডুবে ছিল। এমনকি ক্ষুধার্ত থেকে দিন যাপনের সম্ভাবনাও এসেছিল।

 এই সময়ে পাটনায় আর্য সমাজের পণ্ডিতেরা মুসলিম উলামাদেরকে বিতর্কে পরাজিত করেছিল এবং কেউই তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হননি। এই খবর পেয়ে মাওলানা আলী হুসেন “আসীম বিহারী” এক বন্ধুর কাছ থেকে ভাড়া ধার নিয়ে ভাজা ভুট্টা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে পাটনায় পৌঁছেছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর যুক্তি দিয়ে আর্য সমাজের পণ্ডিতদেরকে এমনভাবে পরাজিত করেছিলেন যে তাদেরকে পালাতে হয়েছিল।

এতো ঝামেলা, উদ্বেগ এবং ঘন ঘন ভ্রমণ সত্ত্বেও তাঁর চিঠিপত্র, নিবন্ধ এবং দৈনিক ডায়েরি লেখা চলতে থাকে। এছাড়াও সংবাদপত্র, পত্রিকা এবং বই পড়া কখনও থামেনি। তাঁর কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র অধ্যায়ন বা সামাজিক-রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তিনি বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে গবেষণা করে সেগুলোর মুলে পৌঁছতে চেয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি তৎকালীন বিখ্যাত সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনের সম্পাদকদেরকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন।

তিনি ১৯২৪ সালের আগস্টে কিছু নির্বাচিত ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষের শক্তিশালী প্রশিক্ষণের জন্য “মজলিস-এ-মিসাক” (অঙ্গীকার/প্রতিজ্ঞা সভা) নামে একটি কর-কমিটির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ৬ জুলাই ১৯২৫ সালের “মজলিস-এ-মিসাক” আল-ইকরাম (সম্মান) নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকার প্রকাশনাও শুরু করেছিলেন যাতে আন্দোলন আরও জোরদার করা যায়।

১৯২৬ সালে দারুত-তারবিয়াত (প্রশিক্ষণ-শালা) নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রন্থাগারের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। বুননের (তাঁতি) কাজটি সংগঠিত ও জোরদার করার এবং ভারত সরকারের সংস্থা কোঅপারেটিভ সোসাইটি (সহকারী সমিতি) থেকে পূর্ণ সহায়তা নেওয়া জন্য ২৬ জুলাই ১৯২৭ সালে তিনি “বিহার ওয়েভার্স অ্যাসোসিয়েশন” গঠিত করেছিলেন।

১৯২৭ সালে বিহারে সংগঠন তৈরির করার পর তিনি উত্তর প্রদেশে (ইউ.পি.) রওনা হলেছিলেন। তাঁর আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি ঝড়ের বেগে গোরক্ষপুর, বেনারস, এলাহাবাদ, মুরাদাবাদ, লক্ষ্মীপুর-খেরি এবং অনান্য জেলাগুলোতে সফর করেছিলেন। ইউপির পরে তিনি দিল্লী, পাঞ্জাব অঞ্চলেও সংগঠনটির শাখা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

১৯২৮ সালের ১৮ এপ্রিল কলকাতায় প্রথম সর্বভারতীয় স্তরের মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহন করেছিলো। দ্বিতীয় সর্বভারতীয় সম্মেলন ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে এলাহাবাদে,  তৃতীয় সম্মেলন ১৯৩১ সালের অক্টোবরে দিল্লিতে; চতুর্থ সম্মেলন লাহোরে এবং পঞ্চম সম্মেলন গায়ায় নভেম্বর ১৯৩২ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংগঠনের গায়া সম্মেলনে মহিলা বিভাগও গঠন করা হয়েছিল।  মহিলা বিভাগের বিশিষ্ট নাম খালেদা খাতুন, জাইতুন আসগর, বেগম মইনা গাউস ইত্যাদি। এছাড়াও ছাত্র এবং তরুণদের জন্য “মোমিন যুব-কনফারেন্স” প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ও “মোমিন স্কাউট” গঠনেরও কাজ চলছিল। একই সঙ্গে কানপুর, গোরক্ষপুর, দিল্লি নাগপুর এবং পাটনায় রাজ্য সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছিল।

এই জমিয়াতুল মোমিনীন (মোমিন কনফারেন্স) সংগঠনটি মুম্বাই, নাগপুর, হায়দরাবাদ, চেন্নাই, এমনকি শ্রীলঙ্কা এবং বার্মায় ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ভারতীয় প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আন্তর্জাতিক সংগঠনে পরিণত হয়ছিল। ১৯৩৮ সালে দেশে-বিদেশে সংগঠনটির প্রায় ২০০০  টি শাখা ছিল। কানপুর থেকে সাপ্তাহিক পত্রিকা “মমিন গেজেট” প্রকাশনা শুরু হয়েছিল। সংগঠনে তিনি নিজেকে সর্বদা পিছনে রাখতেন এবং অন্যকে এগিয়ে রাখতেন, নিজেকে কখনই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে প্রকাশ করেননি। এমনকি জনগণের খুব অনুরোধে নিজেকে কেবলমাত্র জেনারেল সেক্রেটারির পদে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। সংগঠনের কাজ যখন অনেক বেড়ে গিয়েছিল, মাওলানা নিজের আর তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য মেহনত মজুরী করার পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছিলেন না তখন সংগঠনটি প্রতিমাসে খুব সামান্য পরিমাণ অর্থ স্থির করেছিল তাঁকে প্রদান করার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটিও তাঁকে অনেকবার পূর্বনির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী দেওয়া হয়নি। “মোমিন কনফারেন্স”-এর শাখা যেখানেই খোলা হয়েছিল সেখানেই নিয়মিত ছোট ছোট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।  একই সাথে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান পরামর্শ কেন্দ্র (দারুত্তারবিয়াত) এবং গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

মাওলানা শুরু থেকেই  আনসারী (তাঁতী) বর্ণ (caste) ছাড়াও অন্য পাসমন্দা জাতকেও সচেতন, সক্রিয় ও সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এজন্য তিনি প্রতিটি সম্মেলনে অন্য পাসমন্দা বর্ণের লোক, নেতা ও সংগঠনগুলিকে যোগ করতেন। মোমিন গেজেটেও তাঁর অবদানকে সম্মানের স্থান দেওয়া হয়েছিল। যেমন ১৯৩০ সালের ১৬ নভেম্বর তিনি “মুসলিম লেবার ফেডারেশন” নামে সকল পাসমান্দা বর্ণের একটি যৌথ রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন, এই শর্তটি সহ যে, মূল সংগঠনের সামাজিক কার্যক্রম যেন এটি দ্বারা প্রভাবিত না হয়। ১৯৩১ সালের ১৭ অক্টোবর মাসে তৎকালীন সমস্ত পাসমান্দা বর্ণের সংস্থার উপর ভিত্তি করে তিনি একটি যৌথ সংস্থা “বোর্ড অফ মুসলিম ভোকেশনাল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ক্লাস” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সেটার পৃষ্ঠপোষক ঘোষনা করা হয়। এতো ব্যস্ততার মধ্যেই তাঁর মেজো ভাইয়ের শরীর খুব খারাপ হওয়ার খবর পেয়েছিলেন এই ভাষায় – “এইতো আজ-কালের মেহমান। দয়া করে তাড়াতাড়ি চলে আসেন।”

কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি বাড়িতে যেতে পারেননি।  তাঁর নিজের ভাইয়ের মৃত্যুর সময়ে তিনি উপস্থিত ছিলেন না, ভাইয়ের সাথে শেষ দেখাও হল না। ১৯৩৫-৩৬ এর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনে মোমিন কনফারেন্সের প্রার্থীরা সারা দেশ থেকে ভাল সংখ্যায় ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। ফলস্বরূপ, তৎকালীন বড় বড় লোকেরাও পাসমন্দা আন্দোলনের শক্তি বুঝতে পেরেছিলেন। তখন থেকেই এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিলো। মেইনস্ট্রিমের রাজনীতিতে সক্রিয় উচ্চ বর্ণের আশরাফ মুসলিমরা বিভিন্ন ধরণের অভিযোগ, ধর্মীয় ফতোয়া, লেখালেখি এবং ম্যাগাজিনের মাধ্যমে মোমিন কনফারেন্স এবং এর নেতাদের নামে দূর্নাম রটানো শুরু করেছিলো। এমনকি তাঁতি বর্নের চরিত্র হননের জন্য “জুলাহা নামা” (কাজী তালাম্মুজ হুসাইন গোরক্ষপুরী) আর “ফিৎনা-এ-জুলাহা” (হামিদ হুসাইন সিদ্দিকী ইলাহাবাদি) বইগুলো প্রকাশিত হয়েছিল। কানপুরে নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন আবদুল্লাহ নামের এক পাসমন্দা কর্মীকে হত্যাও করা হয়েছিল।  সাধারণত মাওলানার ভাষণ প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টার ছিল। কিন্তু ১৯৩৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কান্নৌজে পাঁচ ঘণ্টার ভাষণ এবং ২৫ অক্টোবর ১৯৩৪ সালে কলকাতায় সারা রাতের ভাষণ ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় স্মৃতি। বৃটিশ-বিরোধী “ভারত ছাড়ো” (QUIT INDIA) আন্দোলনেও মাওলানা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাছাড়া ১৯৪০ সালে তিনি দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে দিল্লিতে একটি বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন যেখানে প্রায় চল্লিশ হাজার পাসমন্দা উপস্থিত ছিলেন।

জামিয়াতুল মোমিনিন (মোমিন কনফারেন্স) প্রার্থীরা ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিপক্ষে জয় অর্জন করেছিলো। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে তিনি পাসমন্দা সমাজকে নতুনভাবে তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেন। তিনি এলাহাবাদ ও বিহার শরীফ থেকে আবার “মোমিন গেজেট” প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সাথে তিনি হজরত আবু আইয়ুব আনসারীর (র:) সুন্নাহকে পুনরুত্থিত করার ব্যাপারেও প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতিতে তাঁর বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করা সীমিত হতে শুরু করেছিল। তিনি যখন এলাহাবাদে পৌঁছলেন তখন তাঁর এক পাও হাঁটার শক্তি ছিলনা। কিন্তু এই অবস্থাতেও তিনি ইউপী রাজ্যে জমিয়াতুল মোমিনিনের সম্মেলনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন, এবং জনগণকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। সব মিলিয়ে, পুরো ভারতবর্ষে মানবকল্যাণে নিবেদিত এমন প্রচণ্ড কর্মদানব খুব বেশী আসেননি। 

কিন্তু তাঁর কাছ থেকে যতটুকু কাজ করানোর ছিলো আল্লাহ তা করিয়ে নিয়েছিলেন।  ৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তিনি হঠাৎ হার্ট স্ট্রোকের শিকার হয়েছিলেন এবং শ্বাস নিতে সমস্যা হয়েছিল, হৃৎপিণ্ডে ব্যাথা ও অস্থিরতা জেগে ওঠে, মুখ ঘামে ভিজে যায় এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। রাত্রি ২ টার দিকে উনি নিজেকে উনার ছেলে হারুন আসীমের কোলে পেয়েছিলেন। তিনি জমিতে মাথা রাখতে ইশারা করে বলেছিলেন, আল্লাহর সামনে যেন সিজদা করতে পারি এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি।  এই পরিস্থিতিতে ১৯৫৩ সালের ৬ ডিসেম্বর রবিবার আটালা আলহাবাদের হাজী কামারউদ্দিনের বাড়িতে তিনি মর্ত্যদেহ পরিত্যাগ করেন।

তাঁর চল্লিশ বছরের প্রাণবন্ত এবং সক্রিয় জীবনে মাওলানা নিজের জন্য কিছুই করেননি, আর কোথায় বা তা করার সুযোগ ছিল তাঁর? কিন্তু যদি তিনি চাইতেন তবে এই পরিস্থিতিতেও নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্যও অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি কখনই সেদিকে মনোযোগ দেননি। মাওলানা আজীবন অন্যের ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা করে গেছেন, আর একটি ছোট প্রদীপ দিয়েও তাঁর নিজের বাড়ি আলোকিত করার চেষ্টা করেননি।

আসীম বিহারী চিরতরে বিদায় নিলেন। তিনি নিজেকে মৃত্যুর চাদরে তুলে নিলেন কিন্তু সমাজকে জীবিত করলেন। সমাজকে জাগ্রত করার পরে, উনি স্বপ্নলোকে চলে গেলেন। তিনি এত গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছেন যে আর কখনও জাগ্রত হবেন না, কিন্তু উনি সমাজকে এমনভাবে জাগ্রত করেছেন যেন এটি কখনই ঘুমোবে না।

লেখক পরিচিতি: – ডাঃ ফৈয়াজ আহমদ ফৈজী লেখক, অনুবাদক, কলামিস্ট, মিডিয়া প্যানেলিস্ট, সামাজিক কর্মী, পেশায় ডাক্তার।

উৎসর্গ: এই নিবন্ধটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্কলার নূর মুরশিদা রাসূল (ফাওজিয়া)-কে উৎসর্গ করেছেন। আমি প্রফেসর আহমেদ সাজ্জাদকেও ধন্যবাদ জানাই। তাঁর সাথে সময়ে সময়ে মুখোমুখি কথোপকথন, ফোনালাপ এবং তাঁর রচিত আসীম বিহারীর জীবনী “বান্দ-এ-মোমিন কা হাথ” (উর্দু) ছাড়া এই নিবন্ধ লেখা সম্ভব ছিলনা।

এই নিবন্ধটি হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদক: ফাইয়াজ আহমেদ ফাইজি এবং নূর মুরশিদা রাসূল (ফাওজিয়া)

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close