মুক্তচিন্তা

বাংলাদেশী কম্যুনিটি এবং কন্সারভেটিভ পার্টি

|| ইমরান চৌধুরী বি, ই এম ||
লেখক: গবেষক, ইতিহাসবিদ, পাবলিক স্পিকার

বাংলাদেশ সমাজ ব্যাবস্থাটা স্বভাবতই আগাগোড়া এগেলেটারিয়ান (সমমাত্রিক) এক সমাজ ব্যাবস্থা । সেই ১৭শ শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই ক্রমাগতভাবে সমাজটা ঐ সমান্তরালেই চলার চেষ্টা করে আসছে; যদিও তখনকার সমাজে ছিল এক জজ্ঞদল পাথর জমিদারী প্রথা – তদপুরিও আপামর গ্রাম ভিত্তিক সমাজ এর সামাজিক কাঠামোটা সব সময়েই ছিল এক ধরনের সমমাত্রিক । ঐ সমাজে সেই ১৮-১৯শ শতাব্দীতে ছিল আরেক বোঝা – সাম্নতবাদী জমিদার এবং তাদের উপর ছিল উপনিবেশিক শাসকদের ষ্টীম রোলার এর মত নিস্প্রেসন এবং বংশ-ক্ল্যান-গোষ্ঠী ভিত্তিক (অলিগারক) এক্সলুসন – তারপরও সমাজ যুগের বিবর্তনে ক্রমাগত ভাবেই কেমন জানি সকলের অগোচরে ধাবিত হয়েছিল এগেলেটারিয়ানিজম এর মত এক নব্য সমাজ ব্যবাস্থার দিকে । যদিও ওয়েট রাইস (সিক্ত চাউল) বপন শুরু হ্য সেই ১৫শ শতাব্দীতে যা কিনা বাংলার আপামর সমাজ ব্যবাস্থাকে সম্পূর্ণ ভাবে ভিন্ন পথে ধাবিত করতে থাকে সেই পথ ধ্রে  কেমন যেন এক নতুন ধরনের সামাজিক অবকাঠামো যেখানে বরজুয়াজি এবং পেটি বরজুয়াজি (বোরজুয়া) এবং অলিগারকদের মধ্যকার স্তরগুলো ভেঙ্গে যেতে থাকে আস্তে আস্তে । বাংলার সমমাত্রিকতা (এগেলেটারিয়ানিজম)টা রুপ লাভ করতে থাকে অর্থনৈতিক এগেলেটারিয়ানিজম এর দিকে । যদিও এখনও অলিগারক শ্রেণী এখনো সেই আগের মতই কেমন জানি একটা এক্সক্লুসিভ জীবনযাপন করে আসছে । পক্ষান্তরে সমাজ এর সব অবকাঠামো গুলো একেবারে সময়ের অবস্টিক্যালে এসে ধাক্কা খেয়ে চুরমার হবার মত একটা অশনি সংকেতের সম্মুখীন আজ দেশে এবং বিদেশে বাংলার সমাজ এর এই তরলীকরণ এর অন্যতম কারন হয়ত বা মাইগ্রেসন (অভিবাসন) । বর্তমান সময়ে আনুমানিক ৮ লক্ষ থেকে দশ লক্ষ (মতান্তরে) বাংলাদেশীরা ইউকেতেই কেবল বসবাস করছে (২০২১ সালের আদমশুমারি অনুজায়ি) । সেই বৃটিশ কন্সারভেটিভ দলের ( রক্ষনশীল দল)  সরকার এর ১৯৬২ সালের কমনোওয়েলথ ইমিগ্রেসন এক্ট প্রনয়নের মাধ্যমে শুরু হয় বাংলাদেশি (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান)-দের (সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দাদের) তথা সকল কমনঅয়েলথ জনগনের আগমন ব্রিটেনএ ।

রক্ষনশীল দল ( কন্সারভেটিভ পার্টি) আনিত এই লেজিসলেসন আনয়নের ফলে সেই অতীব পরিচিত ভ্যাউচার নামক কাগজটি আমাদের সিলেট ভিত্তিক কম্যুনিটির নিকট অত্যন্ত সমাদৃত একটি কাগজ/অনুমতিপত্র । ১৯৬২ সালের এই আইনের মাধ্যমে এই ভ্যাউচার ( কাজের নিশ্চয়তা দলিল) হিসাবে কাজ করে । যাহা কিনা বিলাতে বিমান বা জাহাজ থেকে অবতরণ করার সময় ইমিগ্রেসন অফিসার দের দেখালেই প্রবেশ করতে দেওয়া হত । কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ পাকিস্থানি শোষক শ্রেণী বাঙ্গালীদের পাসপোর্ট প্রদান করতে গরিমশি করে অনেকের জন্য বিলাতে আসার স্বপ্ন মুলূউতপাটন করে ফেলে এবং আরেক বৈষম্যের উদাহরন সৃষ্টি ভ্যাউচার ইস্যু সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে; বাঙ্গালিদের জন্য সব সময়েই যুগ যুগ ধরেই চলে বৈষম্য । ভ্যাউচার সিস্টেম আসার আগে মাত্র হাতে গোনা কয়েক শ্ত খালাসী (জাহাজী ইংলিশ নামটি অত্যন্ত শ্রুতিকটু – তবুও ইতিহাসের খাতিরে উত্থাপন করছি এখানে – খালাশী বা লস্করদের ইংলিশ ডকুমেন্টএ ওনাদেরকে বলা হত ডঙ্কিম্যান )। বাকি ইতিহাস অনেকেরই জানা আছে অনেক রকমের কিংবদন্তী রুপে। বস্তুতঃ কন্সারভেটিভ পার্টীই শুরু করে এই কমনঅয়েলথ দেশ সমুহ থেকে ইমিগ্রেসন এর  দরজা খোলার মাধ্যমে । ভ্যাউচার (ওয়ার্ক পারমিট) এর মাধ্যমে ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৭-৬৮ সাল পর্যন্ত এক বিসাল অঙ্কের বাঙ্গালী ( ইস্ট পাকিস্তানি ) অভিবাসীরা কর্মসংস্থান আবাস বানাতে থাকে ইংল্যাণ্ড-ওয়েলস-স্কটল্যান্ড এর লণ্ডন, লুটন, বারমিংহ্যাম, শেফিল্ড, ব্রাডফোর্ড, ম্যাঞ্ছেস্টার, প্রেস্টন, ওল্ডহ্যাম, নিউক্যাসেল, গ্লাসগো, এডিণবরা, কার্ডিফ সহ অন্যান্য সব ছোট ও বড় বড়  শহর, সিটি, বন্দর নগরী এবং শিল্প- কলকারখানা অধ্যুষিত এলাকাতে । সেই গোরাপত্তন থেকে আজ বাঙ্গালী কম্যুনিটি বিলাতের অন্যতম এক বর্ধিষ্ণু জাতিগোস্টিতে (এথনিক গ্রুপ) রুপান্তারিত হয়েছে যাহা কিনা এক বিসাল রম্য রচনাকেও হার মানাবার মত; অনেকটা হোমারের এপিক রচনাবলি ইল্যুসিস বা ইলিয়াড সম ।

অক্লান্ত প্ররিস্রম, একাত্ততা, নিষ্ঠা এবং ফ্রুগালিটির মাধ্যমে সেই অগ্রগামী দল সকল বাধা, বিপত্তি, ব্রনবাদ, নিগ্রৃহতা এবং সকল সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে থাকে। এরপর ১৯৬৮ সালে নতুন শ্রমিক (লেবার) দল আবার ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন তাদের দ্বারা প্রণীত ইমিগ্রেসন আইন ১৯৬৮ আবারও বাধা হয়ে দাঁড়ায় কমনঅয়েলথ দেশ সমুহ থেকে ইমিগ্রেসন এর জন্য। সভাবতঃ ভাবে অনেকেই হয়ত এটা বিশ্বাস করতে পারবে না – কিন্তু সকল দলিল পত্র তাই প্রমান করে যে লেবার পার্টী দ্বারা প্রনয়িত ঐ  আইন আমাদের বাঙ্গালী অভিবাশি আগমনের পথে অভিপ্রায়ের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ।

পরিবার সকলেরই প্রায় দেশে ছিল তখন, কিছু সংখক পরিবার কেবল আসতে সক্ষম হয়েছিল ইতিমধ্যে কেবল সেই পরিস্থিতিতে ঐ বৈষম্যমূলক আইনটি খুবি বাধার সৃষ্টি করেছিল তখন (যার উদ্ধ্রৃতি পাওয়া যায় অনেকের গবেষণায় এবং লেখনীতে) । ইতিমধ্যে শুরু হয় কারী হাউস প্রতিষ্ঠা বিপ্লব এর । অন্যের কাজ না করে বাঙ্গালী সম্প্রদায় নিজের জন্য কর্ম বা নিজেদের জন্য নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে করমসংস্থানের অভিপ্রায়ে মননিবেশ করে গড়ে তুলতে শুরু এই নব্য অধ্যায়ের । যদিও মনের গহীন কোনে র‍য়ে যায় ঐ নতুন আইন প্রণয়নের সুপ্ত ব্যাথা ।

গণতন্ত্রের সূতিকাগার ওয়েস্ট মিন্সট্যার এ ইতিমধ্যে ১৯৭০ সালে আবার জনগণের ভোটে কন্সারভেটিভ পার্টী সরকার গঠন করেই ১৯৭১ সালে প্রথমেই প্রদান করতে থাকে  সকল ধরনের সহায়তা,  অভিবাসী বাঙ্গালীদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বব্যাপী মতানৈক্য দূর করে বাঙ্গালীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বিশ্বব্যাপী মতামত গড়ে তুলতে এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ জোগানে । এখানে উল্লেখ্য যে, ঐ সময় বামপন্থী সকল দল গুলোও জোরদার সহায়তা করে । সেই একই সালে প্রধান মন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ এর সরকার প্রনয়ন করে ঐতিহাসিক ইমিগ্রেসন এণ্ড এসাইল্যাম এক্ট অব ১৯৭১ । ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশের জাতির পিতাকে সকল ধরনের প্রটোকল উপেক্ষা করে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাত করেন লণ্ডনে এবং ব্রিটেন ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ কে স্বীকৃতি প্রদান করে । মুক্তিযুদ্ধে অভিবাশি/প্রবাসী বাঙ্গালীদের অবদান ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে অনাগত কাল ।

স্বাধীন দেস বাংলাদেশ নেই আর কোন পরাধীনতা এবং তখন আর পাসপোর্ট পাবার পাকিস্থানি পাঞ্জাবিদের দ্বারা সৃষ্ট বৈষম্য এবং তার উপর কন্সারভেটিভ দল এর নতুন আইনের কারনে শুরু  হয় এক নতুন এক্সুড্যাস এবং যার ফলস্রুতিতে ব্রিটেনে হাজার হাজার  বাংগালী অভিবাসীদের পরিবার এবং সন্তান সন্ততিরা ব্রিটেন অতিব সহজেই আগমন করতে পারে । যা ছিল একটি যুগান্তকারী উপ্যাখান । ইতিমধ্যে পরিশ্রমী বাঙ্গালী অভিবাসীরা গড়ে তুলে এক বিসাল ব্যবসা নেটওয়ার্ক এবং প্রতিপত্তি দেশে এবং বিলাতে ।

 চলবে……।।

ইমেল: ic2430@gmail.com

সুত্র: ১। ব্রিটিশ সরকারের দলিল । ২। বিভিন্ন লেখকের আরটিক্যাল থেকে সঙ্কলিত

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close