মুক্তচিন্তা

ইস্ট পাকিস্তান হাউস: লণ্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের চিন্তার সুতিকাগার

|| নজরুল ইসলাম বাসন ||
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাবেক সম্পাদক: সাপ্তাহিক সুরমা।

৫০ দশকের দিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে কিছু কিছু ছাত্র উচ্চচ শিক্ষার্থে লন্ডনে আসেন, তারা সংখ্যায় খুব বেশি ছিলেন না। তবে ৬০ এর দশকে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লণ্ডনে উচ্চচশিক্ষার্থে আসেন বেশ কিছু মেধাবী ছাত্র। আগেই বলেছি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয় পূর্ব পাকিস্তান থেকে আরো অনেক ছাত্র তখন লন্ডনে বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করতে আসেন। ঐ সব ছাত্ররাই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি ও আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ভেতরের খবরাখবর রাখতেন। কেউ কেউ একটু অগ্রসর হয়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন। পরবতীকালে তাদের অনেকের স্মৃতিকথা মুলক লেখায় এসব তথ্য পাওয়া যায়। এ সব লেখকদের মধ্যে আমি যাদের নাম জেনেছি তারা হলেন সর্বজনাব ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, মওদুদ আহমদ, জাকারিয়া চৌধুরী, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার । বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে লণ্ডনের ইস্ট পাকিস্তান হাউস বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সুচনা করেছিল এসব তথ্য আরো অনেকের লেখায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। বিভিন্ন লেখকদের লেখা থেকে জানা গেছে ৬০ এর দশকেই আবাসিক ছাত্ররা হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দি, মওলানা ভাসানি ও শেখ মুজিবুর রহমানের ( পরে বঙ্গব’ন্ধু) সাথে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ব শাসন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

৫০-৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে লণ্ডনে আসা বাঙালি ছাত্ররা দেশে থাকাকালিন সময়েই আঞ্চলিক বৈষম্যের সাথে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। বৃটেনে আসার পর পাকিস্তানি ছাত্রদের সাথে চলাফেরা করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক বিরোধের মুখোমুখি হলেন তারা।  পাকিস্তানিরা ছিল উন্নাসিক বাঙালিদের তারা নীচু জাত বলে মনে করতো। পাকিস্তান হাই কমিশনের অফিসাররা নিজেদের শাসক মনে করত। লণ্ডনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালী ছাত্ররা এই বৈষম্য ও ঘৃণা করার বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী শাসকদের মিলিটারিতে ছিল আধিপত্য, তারা ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর থেকেই শক্ত অবস্থানে চলে যায় এবং পাকিস্তানের শাসক শ্রেনী হিসাবে আবিভূর্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তানি মেধাবী ছাত্ররা লণ্ডন এসে বাঙালি জাতির যে স্বতন্ত্র আবাস ভুমি প্রয়োজন এটা তারা তখনই উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন।

ইস্ট পাকিস্তান হাউস বা ইস্ট পাকিস্তান ভবন:
এই হোস্টেলের কিছু আবাসিক ছাত্ররা পূর্বসুরি নামে সংগঠন গঠন করেন।  প্রগতিশীল ছাত্রদের উদ্যেগে  পত্রিকা প্রকাশিত হয় তারা একুশ ফেবু্রয়ারি ও বাংলা নববর্ষ পালন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেন। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হয় বলে জানা যায়। লন্ডনের এসব বাঙালি ছাত্ররা প্রকাশ করেন পূর্ববাংলা ও এশিয়ান টাইড পত্রিকা। ইস্ট পাকিস্তান হাউস থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো আলমগীর কবির ও মেসবাহ উদ্দিনের কঠোর পরিশ্রমে প্রকাশিত হতো বলে বিভিন্নজনের লেখায় উল্লেখ রয়েছে। ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত এশিয়ান টাইডের সম্পাদক ছিলেন ফজলে আলি। দেশ স্বাধীন হবার পর আলমগীর কবির তার নির্মিত রুপালি সৈকত ছবিতে দেখান ,ছবির নায়ক লেনিন পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন, তখন ইন্টারোগেশনের সময় লেনিনের (বুলবুল আহমদ) মুখ দিয়ে লন্ডনের ইস্ট পাকিস্তান হাউস ও ইস্ট পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের কর্মকান্ডের ঐতিহাসিক এই অংশ গুলো সেলুলেয়েডের ফিতায় তিনি তুলে ধরে রেখেছেন। যা এখন ইতিহাসের মুল্যবান সম্পদ।

কিছু প্রগতিশীল ছাত্রদের উদ্যেগে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে গঠন করা হয় গ্রুপ ২১। এই গ্রুপ টুয়েন্টি ওয়ানের উদ্যেগে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হত। রাজনৈতিক ভাবে সচেতন ছাত্ররা আরো এক ধাপ এগিয়ে ‘ইস্ট পাকিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট’ নামে একটি গ্রুপ ও গঠন করেন।  শোনা যায়, লণ্ডনে কিউবার দূতাবাসের মাধ্যমে একটি গ্রুপের সাথে ও তাদের যোগাযোগ হয়েছিল।  ঐ গ্রুপের সহায়তায় সশস্ত্র প্রশিক্ষনের উদ্যেগ ও নেয়া হয়েছিল। ডা: জাফরুল্লা চৌধুরির মত অনেকেই  মুক্তিযুদ্ধের সময় লণ্ডন থেকে  সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে চলে গিয়েছিলেন। । লন্ডন ফেরত দুই ডাক্তার ডা: জাফরুল্লা চৌধুরি ও ডা: মুবিন। ডা: মুবিন লণ্ডনে তার গাড়ী বাড়ী বিক্রি করে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে খালেদ মোশাররফের সেক্টরে মেলাঘরের অনতিদূরে ফিহ্ব হাসপাতালে তারা দুজনে যোগ দিয়েছিলেন। প্রবাসীদের কেউ কেউ প্রবাসি সরকারের দূতের ভুমিকা পালন করেছিলেন।  লণ্ডন থেকে কলকাতা গিয়ে প্রবাসি সরকারের চিঠি পত্র আনেন ও যথাস্থানে পৌছে দেন। এ প্রসংগে মরহুম এম এ রকিব (কানাইঘাট) ও হাফিজ মজির উদ্দিনের (গোলাপগঞ্জ) নাম বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ আছে।

ইস্ট পাকিস্তান হাউস কেনা ও বেচা: বাংলাদেশ ভবনের অপমৃত্যু:
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার এই ভবনটির নাম বাংলাদেশ ভবন রাখা হয়। বাংলাদেশ ভবন নামের ছাত্রাবাসটি রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে । ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ছাত্ররা এই হোস্টেলটি ব্যবহার করেছিলেন। এস আর দোহা হাইকমিশনার থাকাকালে ভবনটির মালিকানা হাইকমিশনকে হস্তান্তর করা হয়। হাইকমিশন মালিক হবার পর তাদের উদাসীনতার কারনেই ভবনটি আর তার ঐতিহাসিক অতীত ভুমিকা আর ধরে রাখতে পারেনি।  দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়ে বাংলাদেশ হাই কমিশন এই ভবনটির কোন ধরনের রক্ষনাবেক্ষন করেনি। এক পর্যায়ে  বাংলাদেশ হাইকমিশন মহিলা সমিতিকে এই ভবনটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল মহিলা সমিতি ও  আর্থিক অভাবে এটা চালাতে পারেননি।

১৯৯৯ সালে ৪৮৫,০০০ হাজার পাউন্ডে এই ঐতিহাসিক বাংলাদেশ ভবনটি বিক্রি করে দেয়া হয়। ২০০০ সালে পূর্ব লন্ডনের ৪৪ কভর্ণ রোডে ৩৪০, ০০০ হাজার পাউণ্ডে একটি বাড়ী কেনা হয়। পরে এই বাড়ীটিও বিক্রি করে দেয়া হয়। জনাব মুফাজ্জল করিম হাই কমিশনার থাকা কালে এই বাড়িটির বিক্রয়লব্ধ অর্থ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে দিয়ে দেন বলে জানা যায়। বৃটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটি অসহায় হয়ে দেখলো তাদের চোখের সামনে তাদের সম্পত্তি বিক্রি হয়ে গেলো,লন্ডনের বাংলাদেশী কমিউনিটি  কিছুই করতে পারল না। শোনা যায়, বাংলাদেশ ভবনের বিক্রয়লব্ধ অর্থ এখনও নাকি সোনালি ব্যাংকে রয়েছে? কেউ এই অর্থের হদিস জানেন না, তবে এই অর্থ যেহেতু রাস্ট্রের কোষাগারে আছে,সেহেতু কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের দান করা এই অর্থ নৈতিক কারনে এই অর্থ শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক কোন প্রকল্প ব্যয় করাই যুক্তিযুক্ত।

লণ্ডন
২৬/১১/২১

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close