মুক্তচিন্তা

শায়খুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.) একজন মুখলিস আল্লাওয়ালা পণ্ডিত আলেম ছিলেন

শ্রদ্ধাঞ্জলি

|| সৈয়দ মবনু ||
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

৪ মে ২০২২ ঈদুল ফিতরের পরের দিন রাত ১০ টা ৪৫ মিনিটে শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.) ইন্তেকাল করেন। এইদিন বাদ মাগরিব থেকে তিনি শুধু বলে যাচ্ছিলেন যে, ‘তারা এসেছেন আমাকে নিতে ফুলের মালা হাতে। তোমরা তাদেরকে বসতে দাও।’ সবাই ভাবছিলেন এগুলো তাঁর আবুল-তাবুল কথা। কিন্তু দেখা গেলো সত্যি তারা তিনিকে ১০ টা ৪৫ মিনিটে নিয়ে গেলেন। তিনি যেভাবে বলছিলেন, তারা ফুলের মালা নিয়ে এসেছেন, হয়তো সেভাবেই তাঁকে সম্বর্ধনা দিয়ে নিয়েগেছেন তাঁর প্রত্যাশিত মাওলায়ে কারিমের কাছে। শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.)-এর জন্ম ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে জকিগন্জের বারঠাকুরী গ্রামে। সিলেট থেকে জকিগঞ্জ যাওয়ার পথে মূল জকিগঞ্জ উপজেলা সদরের প্রায় বারো মাইল পূর্বে এই গ্রাম। বারঠাকুরী এখন আর একটি গ্রাম নয়, একটি ইউনিয়নের নাম। বারঠাকুরী নাম থেকে স্পষ্ট, এই গ্রামে যেকোন এক সময় ১২ জন ঠাকুর ছিলেন। এই গ্রামে অসংখ্য জ্ঞানী-গুণীদের জন্ম হয়েছে। মরমী কবি শিতালং শাহ, হাফিজ মাওলানা জহরুল হক, খতিব আল্লামা উবায়দুল হক, শায়খুল হাদিস আব্দুল হক, কলিসদয় দত্ত চৌধুরী, বেনু বাবু, মুফতি নুরুল হক, মাওলানা আউলিয়া হোসেন সহ অসংখ্য জ্ঞানি-গুণিদের নাম বলা যাবে।

হাফিজ মাওলানা জহরুল হক (র.) ছিলেন শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.)-এর পিতা। তাঁর সময় ছিলো ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। তাঁকে স্থানীয়ভাবে ‘বড় মৌলানা ছাব’ ডাকা হতো। সেই সময়ের মাওলানা জহরুল হক বললে কেউ চিনতো না। ‘বড় মৌলানা ছাব’ বললে নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সবাই চিনতো। মাওলানা জহরুল হক (র.)-এর পিতা ছিলেন শ্রদ্ধেয় উমেদ রাজা। মাওলানা জহরুল হক নিজ পরিবারে এবং গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকার মুহসিনিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন এবং পবিত্র কোরআন মুখস্ত করেন। পরে এই মাদরাসা থেকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালিন ক্লাস পদ্ধতির ‘সুওয়াম’ (যা বর্তমানে আলিম ক্লাস) এবং ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে উলা (ফাযিল ক্লাস) পাশ করেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতের মাযাহিরুল উলূম মাদরাসায় ভর্তি হন। কিছুদিন পর সেখান থেকে দারুল উলুম দেওবন্দ চলে যান। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তিনি ‘ফনুনাত’ সম্পন্ন করে ইলমে হাদিসে উচ্চতর ডিগ্রী লাভ করেন। তাঁর হাদিসের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ভারতবর্ষের জ্ঞানতাপস বলে ইসলামী দুনিয়ায় খ্যাত শায়খুলহাদিস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (র.) এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলনকারী ব্যক্তিত্ব এবং দারুল উলূম দেওবন্দেও শায়খুলহাদিস আল্লামা শিব্বির আহমদ উসমানী (র.)। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি পাশাপাশি তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায়ও মনযোগি ছিলেন। হাকীমুল উম্মাহ মাওলানা আশরাফ আলী (র.)-এর কাছে তিনি বাইআত হন এবং ১৩৩৬ হিজরিতে খিলাফাত লাভ করেন।
মাওলানা জহরুল হক (র.) ভারতের সাহরানপুর মাযাহিরুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্ম জীবনের সূচনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকার বেগম বাজার কাসিমুল উলুম মাদরাসায় দীর্ঘদিন সুনামের সাথে হাদিসের শিক্ষকতা করেন। তাকওয়া ও পরহেজগারীর কারণে তিনি অনেক স্থান ছেড়ে আসতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে তিনি নিজ এলাকায় ফিরে আসেন এবং সাধারণ মানুষকে তালিম তারবিয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

হাফিয মাওলানা জহরুল হক (র.) তাকমিল ফিল হাদিস পড়ার সময় নিজ শিক্ষক আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (র.)-এর কাছে সুনান আবু দাউদ অধ্যয়ন করেন। পাঠদানকালে আল্লামা কাশ্মিরী আবু দাউদ শরিফের কিতাবুল বুয়ু (البيوع كتاب) পর্যন্ত যে তাকরির করেন তা হাফিয মাওলানা জহরুল হক আরবি ভাষায় নিজ হাতে লিখে রেখেছিলেন। তিনশত চার পৃষ্ঠার এই মূল্যবান খাতা সংরক্ষণ করেন তাঁর দ্বিতীয় ছেলে খতীব আল্লামা উবায়দুল হক। গুরুত্বপূর্ণ এ পান্ডুলিপি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহন করেছেন খতীব সাহেবের দ্বিতীয় ছেলে সিলেট দরগাহ মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আতাউল হক জালালাবাদী। মাওলানা জহরুল হকের স্ত্রী ছিলেন মুসাম্মাত আয়েশা বেগম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার, পর্দানশীলা, সুন্দরী এবং কর্তৃত্বশীলা। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মাওলানা জহরুল হকের ইন্তেকালের পর এই মহিলা অত্যন্ত শক্তহাতে পরিবারের খাড়াল ধরে রাখেন এবং সন্তানদেরকে মানুষ করেন। তিনি শত বছরের উপরে বেঁচে ছিলেন। তাদের দাম্পত্যে তিন ছেলে এবং চার মেয়ের জন্ম হয়। বড় ছেলে আমার শ^শুড় মাওলানা আহমদুল হক (র.), দ্বিতীয় ছেলে খতিব আল্লামা উবায়দুল হক (র.), তৃতীয় ছেলে শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.)। মেয়েরা হলেন, মুসাম্মাত আমাতুল্লাহ, মুসাম্মাত সাঈদা বেগম, মুসাম্মাত আবিদা বেগম এবং মুসাম্মাত হামিদা বেগম।
তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ছেলে মাওলানা আহমদুল হক (র.) বাবার মৃত্যুতে সংসারের খাড়াল ধরতে মায়ের পাশে দাঁড়ান এবং ভাই-বোনদেরকে মানুষ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখেন। তিনি ছিলেন তৎকালিন সময় একজন সুপরিচিত পুস্তক ব্যবসায়ী। ভারতের ভাঙায় এবং সিলেট শহরের জিন্দাবাজারে তিনি দীর্ঘ ত্রিশ-চল্লিশ বছর বইয়ের ব্যবসা করেছেন। তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিলো, আশরাফিয়া কুতুবখানা, যা আশির দশক পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেটের শিক্ষিত মহলের কাছে খুবই সুপরিচিত ছিলো। দ্বিতীয় ছেলে শায়খুলহাদিস আল্লামা উবায়দুল হক (র.) ছিলেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব। তিনি খতিবের দায়িত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের অসংখ্য মাদরসার শায়খুলহাদিস এবং মুহতামিমের দায়িত্ব আদায় করেন। এক সময় খতিব আল্লামা উবায়দুল হক ঢাকা আলিয়া মাদরাসার হেড মাওলানার দায়িত্বও আদায় করেন। তিনি সিলেট জামেয়া কাসিমূল উলূম দরগাহে হযরত শাহজালাল (র.) মাদরাসার শায়খুলহাদিস ছিলেন। তাঁর সময়ে তিনি ছিলেন বাংলাদেশর আলেমদের মধ্যে গোটা বিশে^ সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব।

হাফিজ মাওলানা জহরুল হক (র.)-এর সবছোট ছেলে শায়খুলহাদিস মাওলানা আব্দুল হক (র.)। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী (র.)-এর ¯েœভাজন ছাত্র। আজীবন তিনি কোরআন-হাদিসের শিক্ষা দিয়েগেছেন। তাঁর জন্ম জকিগনজের বারঠাকুরী গ্রামে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি প্রথমিক শিক্ষা নিজ বাড়ী থেকে শুরু করে কাছাড়, ভাঙ্গাবাজার, ময়মনসিংহে কিছু মাদরাসায় লেখাপড়া করে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে বিশ^বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দ গিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে তাকমিল ফিল হাদিস পাশ করে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে তাকমিল ফিত তাফিসির পাশ করেন। দারুল উলূম দেওবন্দে তাঁর হাদিসের শিক্ষকদের মধ্যে শায়খুল ইসলাম সৈয়দ হুসাইন আহমাদ মাদানী (র.) ছাড়াও ছিলেন মাওলানা মাওলানা ইজাজ আলী (র.), হাকিমুল ইসলাম মাওলানা কারী মুহাম্মাদ তায়্যিব (র.) ও মাওলানা ইবরাহীম বালিয়াবী (র.)।
ছাত্র জীবন শেষে শিক্ষকতা দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই পর্যন্ত তিনি কিশোরগঞ্জ জামেয়া ইমদাদিয়ায় শায়খুল হাদিস ও সহকারী শিক্ষা সচিবের (নাজিমে তা’লিমাত) দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাঁর শশুড় ভারত-পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলিম ও রাজনীতিবিদ আল্লামা আতহার আলী (র.)-এর নির্দেশে ময়মনসিংহের জামেয়া ইসলামিয়ায় শায়খুল হাদিস ও শিক্ষা সচিব (নাজিমে তা’লিমাত) পদে যোগ দেন। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর বড়ভাই খতিব আল্লামা উবায়দুল হক (র.)-এর পরামর্শে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় তাফসির বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি এবং তাফসির বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে সরকারী চাকুরী থেকে অবসর গ্রহন করেন। পরবর্তীতে তিনি কুলিয়ারচর জামেয়া ইসলামিয়ায় শায়খুল হাদীস হিসেবে যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি সুত্রাপুর জামিউল কুরআন মাদরাসার মুহতামিম ও শায়খুল হাদিসের দায়িত্ব আদায় করেন।

শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.) বিয়ে করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতা আল্লামা আতহার আলী শায়খে কিশোরগঞ্জী (র.)-এর বড় মেয়ে ও মাওলানা আনোয়ার শাহ (র.)-এর বড় বোন। তারা মূলত সিলেটের বিয়ানীবাজারের বাসিন্দা ছিলেন। পরে চলে গিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জ।
শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.)-এর তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে। তাঁর বড়ছেলে মাওলানা আশরাফুল হক, তিনি এক সময় জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর হাই স্কুলে মাস্টারী করতেন। পরে সিলেট দরগাহ গেইটে আশরাফিয়া কুতুবখানা নামে বইয়ের দোকান করেন। দ্বিতীয় ছেলে মাওলানা আনোয়ারুল হক, ছোটছেলে মুফতি সিরাজুল হক ঢাকায় একটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। তাঁর বড়মেয়ের জামাই বিশিষ্ট্য শায়খুলহাদিস মাওলানা শফিকুর রহমান জালালাবাদী।

শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.)-এর প্রকাশিত গ্রন্থ ১. হায়াতে আশরাফ, যা বাংলা ভাষায় রচিত মাওলানা আশারাফ আলী থানবী (র.)-এর প্রথম প্রকাশিত জীবনী, ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। ২. হায়াতে ইমাম বুখারী (র.), উর্দু ভাষায় রচিত, প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে। ৩. তারিখে ইলমে তাফসির।

শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.)-একজন ভালো পাঠক ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রচারবিমূখ বিনয়ী একজন ইলমওয়ালা, মুখলিস আল্লাওয়ালা আলেম। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এবং বিশে^র বিভিন্ন দেশে তাঁর অসংখ্য ছাত্র রয়েছেন। ৪ মে ২০২২ ঈদুল ফিতরের পরের দিন রাত ১০ টা ৪৫ মিনিটে শায়খুলহাদিস আল্লামা আব্দুল হক (র.) ইন্তেকাল করেন। পরেরদিন বাদ জুহর সিলেট হযরত শাহ জালাল (র.)-এর মাজার সংলগ্ন মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন দরগাহ মসজিদের ইমাম সাহেব। জানাজা শেষে দরগার গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। মহান আল্লাহ তাঁর ইলমের খেদমতকে কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close