সম্পাদকীয়হোম

নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়:: ইউক্রেন ইস্যু- বাংলাদেশের ইউ-টার্ন! নেপথ্যে অস্থিরতা না অন্য কিছু?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি আসলেই "উজিরে খামাখা"?

ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর দিন দশেক পরে মার্চ মাসের শুরুতে (৪মার্চ) ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আনা আরো একটি প্রস্তাবে বাংলাদেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। আবার গেল সপ্তাহে সঙ্কট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবের পক্ষে বাংলাদেশ ভোট দিয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায় যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অস্থিরতা চলছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন দাবি করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের দুটো প্রস্তাবের ভাষায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, দ্বিতীয় প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেবার কারণ হচ্ছে মানবিক। অবশ্য নিন্দুকেরা বলছেন অন্য কথা। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী সচিবের ঢাকা সফরের পর পরই বাংলাদেশ তার আগের অবস্থান থেকে ইউ-টার্ন নিল।  মার্চের দুই তারিখে ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আমেরিকা যে প্রস্তাব এনেছিল – তাতে বাংলাদেশ ছাড়াও ভোটদান থেকে বিরত ছিল ভারত ও পাকিস্তান। তবে এবার ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থানের কোন পরিবর্তন না হলেও বাংলাদেশের হয়েছে।
প্রথমবার যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি – তাদের নিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিল পশ্চিমা দেশগুলো।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে ভোটদানে বিরত থাকায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে পশ্চিমা দেশের রাষ্ট্রদূতরা পাকিস্তানকে চিঠি দিয়েছিল। এমনকি ভোটদানে বিরত থাকায় বাংলাদেশকে টিকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ইউরোপের দেশ এবং ন্যাটোর সদস্য লিথুয়ানিয়া। অনুমান করা যায় এ ধরনের চিঠি সেগুনবাগিচাস্থ পররাষ্ট্র দপ্তরেও পশ্চিমা দেশগুলো দিয়েছে।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, মূলত ভারতের ইশারাতেই বাংলাদেশ এবার জাতিসংঘের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ভারত এর দ্বারা এক ঢিলে দুই পাখি মারছে। আমেরিকাকে খুশি করা গেল, আবার পুতিনের সাথে সম্পর্ক ও ঠিক রাখছে, কারণ রাশিয়া যে দুটি দেশকে এস-ফোর হান্ড্রেড দিয়েছে তার মধ্যে ভারত একটি।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে কিছু প্রশ্ন পাবলিক ডোমেইনে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন মার্চের দুই তারিখে বাংলাদেশের অবস্থানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন,  বাংলাদেশ শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে‌ আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন ওই প্রস্তাবে কোনো শান্তির বার্তা ছিল না , একটি দেশকে (রাশিয়া) দোষারোপ করা হয়েছিল। রাশিয়া মুক্তিযুদ্ধ থেকেই বাংলাদেশের বন্ধু, তাই ওই প্রস্তাবে ভোটদানে বাংলাদেশ বিরত ছিল।  পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তখনকার কথা সঠিক হলে বাংলাদেশের এখন শান্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রীর এখনকার মানবিকতার তথ্য সঠিক হলে আগের অবস্থানে ছিল অমানবিক। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মুখ্য ব্যক্তি সে কারণেই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন পরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাকে অনেকে এখন বলছেন তিনি কি আসলেই উজিরে খামাখা? আর প্রধানমন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী অবস্থানে ও পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আসলে প্রধানমন্ত্রী কোনো পক্ষে? শান্তির পক্ষে না বিপক্ষে? মানবিকতার পক্ষে না বিপক্ষে?  


জানা গেছে, রাশিয়ার পক্ষে বাংলাদেশের প্রাথমিক অবস্থানের পরে আমেরিকার উষ্মা প্রকাশের বার্তাটি  উত্তরপাড়া খ্যাত শক্তি বলয়ের ভিতরে পৌঁছে যায় এবং ভীষণ অস্থিরতা তৈরি করে। কারণ জলপাই রঙের পোশাকধারীদের ভেতরে এই আশঙ্কা জাগে যে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষ করে আমেরিকায় সামরিক প্রশিক্ষণ একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সেনা নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এরকম কিছু হলে সাধারণ সেনা সদস্য এবং মূল্যবোধে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ কর্মকর্তাদের কাছে ভীষণ ভুল বার্তা দেওয়া হবে । পরিস্থিতি সামলানো সিনিয়র তাবেদার জেনারেলদের পক্ষে দুরূহ হয়ে যেতে পারে।  সেজন্যেই উত্তরপাড়ার কুশীলবদের চাপে তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ রাশিয়ার পক্ষ ত্যাগ করে পশ্চিমা শিবিরে ভোটের মাধ্যমে যোগ দিয়েছে বলে একটি ওয়াকিবহাল সূত্র জানিয়েছে। সামগ্রিকভাবে এতে সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে এবং প্রশ্ন জাগছে যে সব শক্তি কেন্দ্রের ওপর ভর করে এতদিন দু/দুটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পরেও সরকার টিকে ছিল, সেখানে কি তাদের বাঁধন আলগা হতে শুরু করেছে?   নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকার’ গঠনের ব্যাপারে সম্প্রতি লন্ডনে অবস্থানরত নির্বাসনে থাকা বিএনপি নেতা তারেক রহমান যে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন তার সাথে উত্তরপাড়ার এই ধরনের সাম্প্রতিক আলোড়নের কোন একটা সম্পর্ক আছে বলে বোদ্ধামহল মনে করছেন।  বলা হচ্ছে, মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ইঙ্গিতে তারেক রহমান এত আত্মবিশ্বাসী হয়ে কথা বলতে পারছেন। 
কিয়েভ- মস্কোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যদি বাংলাদেশের বর্তমান অচলাবস্থার সমাধানে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে তাতে মন্দ কি!

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close