নিউজ

লর্ডদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

বিতর্কিত সিটিজেনশীপ বিল

টোরিদের ‘বর্ণবাদী ও কর্তৃত্ববাদী’ আইনে ইউক্রেনীয় শরণার্থীরাও ইউকেতে ঢুকলে জেলে যেতে হতে পারে

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৪ মার্চ : ক্ষমতাসীন টোরি সরকার উত্থাপিত ন্যাশনালিটি এণ্ড বর্ডার্স বিলটির বিতর্কিত ধারাগুলোতে অমত জানিয়ে হাউজ অব লর্ডস সদস্যরা তা পুনঃবিবেচনার জন্য হাউজ অব কমন্সে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ট টোরি এমপিদের ভোটে সেসব প্রত্যাখাত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ধারা কাউকে না জানিয়েই সিটিজেনশীপ বা নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার বিষয়টি তুলে নেওয়ার পক্ষে লর্ড সদস্যরা ভোট প্রদান করেন এবং তা বিবেচনার জন্য হাউজ অব কমন্সে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হাউজ অব লর্ডসের এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানান এমপিরা। বিশেষ করে টোরি সংখ্যাগরিষ্ট এমপিদের ভোটে তা প্রত্যাখাত হয়ে যায়। হাউজ অব লর্ডসের সংশোধনীর বিপক্ষে পড়ে ৩১৮ ভোট এবং পক্ষে পড়ে ২২২ ভোট। ফলে সংশোধনীটির বিপক্ষে ৯৫ জনের সংখ্যাগরিষ্টতা পায়। এছাড়া লর্ডরা রিফিউজি বা শরণার্থী ধারাটিতে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাঁচটি সংশোধনী আনেন, সেগুলোর বিপক্ষে দাঁড়ান এমপিরা। ৮২ ভোটের সংখ্যাগরিষ্টতায় তাও প্রত্যাখাত হয়। সংশোধনীর বিপক্ষে ভোট দেন ৩১৩ এবং পক্ষে ভোট দেন ২৩১ জন এমপি। ‘বর্ণবাদী ও কতৃর্ত্ববাদী’ আইনটি টোরি এমপিদের সমর্থন করার ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা ইউকেতে ঢুকলেও জেলে যেতে হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষে এ বিষয়ে যুক্তি দেখানো হয়েছে যে, ইংলিশ চ্যানেল ক্রসিংয়ের ক্রমাগত সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে পার্থক্য নির্ণয় করতে এমনটি করেছে, তারা কীভাবে দেশে এসেছে তার উপর নির্ভর করবে। আর এর উদ্দেশ্য ছিলো নিরাপদ ও বৈধ পথ ব্যতীত অন্যদের ইউকে ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা।
এদিকে, বর্তমান টোরি সরকার কতৃর্ক পূর্বে কোনো ধরণের সতর্কীকরণ নোটিশ ছাড়াই যে কারো ব্রিটিশ সিটিজেনশীপ বা নাগরিকত্ব বাতিলের ক্ষমতা চেয়ে প্রস্তাবিত নতুন ন্যাশনালিটি এণ্ড বর্ডার্স সংশোধনী বিল হাউজ অব কমন্সে উত্থাপনের পরপরই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে । একই সাথে বিলটির বিরোধীতা করে বিভিন্নভাবে ব্যাপক প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি চলে সিগনেচার ক্যাম্পেইন। বিষয়টি হাউজ অব কমেন্স পাশ হয়ে গেলেও ভরসা ছিলো হাউজ অব লর্ডসের উপর। হাউজ অব লর্ডস ঠিকই বিতর্কিত ধারাটি বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সংশোধনীর জন্য আবার হাউজ অব কমন্সে ফেরত পাঠায়। কিন্তু টোরি সংখ্যাগরিষ্ট পার্লামেন্টে এমপিদের ভোটে সেই সংশোধনী প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় জনমনে আবারও শঙ্কার সৃষ্টি হলো।

অশ্বেতাঙ্গ বিশেষ করে মুসলমানদের টার্গেট করে গত বছরের নভেম্বরে হোম সেক্রেটারি প্রীতি প্যাটেলের উত্থাপিত এই সংশোধনী বিল বৃটেনের এথনিক কমিউনিটিকে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করে এবং সর্বত্র সমালোচিত হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আইনের শাসনের মূলনীতির লঙ্ঘন। এতে করে একজন ব্যক্তি কিছু জানার আগেই তার নাগরিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এধরণের আইন ব্রিটিশ নাগরিকত্বে দ্বি—স্তর বা দ্বৈত নীতি প্রতিষ্ঠা করবে।

বৃটেনের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়তেও এর কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়েছিলো, কোনো ধরণের নোটিশ ছাড়াই কারো নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এছাড়া নাগরিকত্ব সংক্রান্ত এই বিল রাষ্ট্রহীন শিশুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হতে পারে এবং তাদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেতে বাড়তি বিপত্তি হবে বলে এমপিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আর হিউম্যান রাইটসের জয়েন্ট কমিটি এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে যে, ন্যাশনালিটি এণ্ড বর্ডার্স বিল বৃটেনে জন্ম নেওয়া শিশুদের রাষ্ট্রহীন করা থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হবে।
উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত সিটিজেনশীপ বিলের ধারা ৯ অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্তের নোটিশ সরবরাহ করার দায় থেকে অব্যহতি দেয়া হয়েছে। সরকার যদি মনে করে জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা জনস্বার্থে এমনটি করা বাস্তব সম্মত, তাহলে তা করতে পারবে।

সমালোচকরা বলছেন, নাগরিকত্ব অপসারণ, যেমন শামিমা বেগমের ক্ষেত্রে করা হয়েছে। যিনি একজন স্কুল ছাত্রী থাকা অবস্থঅয় সিরিয়ায় তথাকথিত ইসলামিক স্টেইটে যোগ দেওয়ার জন্য বৃটেন থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এখন বিনা নোটিশে নাগরিকত্ব বাতিল করার ক্ষমতার মানে হলো এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে অসীম ক্ষমতা প্রদান করা।
এই আইন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত দ্বৈত নাগরিকদের (যারা বেশিরভাগই জাতিগত সংখ্যালঘু) নাগরিকত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার পূর্ববর্তী ব্যবস্থাগুলির ওপর ভিত্তি করে তৈরী। আগের আইনটি বিদেশে অবস্থান করা কালে কেবলমাত্র ব্রিটিশ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা এবং ন্যায্যতার মৌলিক নিয়মগুলির লঙ্ঘন।
২০০৫ সালে লণ্ডনে বোমা হামলার পর ব্রিটিশ নাগরিকদের নাগরিকত্ব বাতিল করার জন্য হোম অফিসকে ক্ষমতা দেয়া হয়। কিন্তু ২০১০ সালের তৎকালীন হোম সেক্রেটারি টেরিজা মে’র সময় এর ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং ২০১৪ সালে তা আরো বিস্তৃত করা হয়।
২০১৮ সালে নোটিশ না দিয়ে নাগরিকত্ব খর্ব করার বিষয়টি নমনীয় করে ব্যক্তির ফাইলে একটি অনুলিপি রেখে হোম অফিসকে নোটিশ দেওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। তবে তা কেবলমাত্র কোনো ব্যক্তির অবস্থান অজানা থাকলে প্রয়োগ করা যেত।
প্রস্তাবিত নতুন ধারাটি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাউকে কোনো ধরণের নোটিশ দেয়ার প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি দূর করবে। এই ধারাটি আইনে পরিণত হওয়ার আগে কোনও ব্যক্তির বিনা নোটিশে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়ে থাকলে তা ভূতপূর্বভাবে প্রয়োগ হবে, যা তাদের আপিল করার ক্ষমতাকে খর্ব করবে।

https://issuu.com/home/published/sur001_4cdadb666b7616

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close