সম্পাদকীয়

দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি ও নিয়ামত ইমামের “কালোকোট”

এ সপ্তাহের সম্পাদকীয় ।। ইস‍্যু ২২৪২

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ সংক্ষেপে টিসিবি। ন্যায্যমূল্যে সরকারের পক্ষ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান। বহুকাল আগে থেকেই টিসিবিসবার কাছে পরিচিত।

সাম্প্রতিক সময়ে পিয়াজ তেল আর চাল ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য স্বল্পমূল্যে নগরবাসীকে পৌঁছে দিচ্ছে এই সংস্থাটি। নিম্নবিত্ত মানুষের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু এই প্রতিষ্ঠান সময়ের পরিক্রমায় এখন মধ্যবিত্তের কাছেও আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে টিসিবির গাড়ির পেছনে যারা লাইন দিচ্ছে চেহারাগুলো দেখলেই বোঝা যায় এর বড় একটা অংশ মধ্যবিত্ত। মুখ লুকিয়ে তারা কোন রকমে ন্যায্য মূল্যের পণ্য সংগ্রহ করছেন। পাছে কেউ দেখে ফেলে। এটা হচ্ছে এখন সাধারণ চিত্র। আরেকটা সাধারন চিত্র হচ্ছে চাহিদার তুলনায় টিসিবির যোগান খুবই যৎসামান্য। অল্প কয়েক জনকে দেওয়ার পর গাড়ি শূন্য। তারপর মানুষের হাহাকার। টিসিবির গাড়ির পিছনে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত মানুষের এই হাহাকারের চিত্র এখন বাংলাদেশের এক নির্মম বাস্তবতা। একদিকে উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় আর প্রবৃদ্বির গল্প। আর অন্যদিকে টিসিবির গাড়ির পেছনে লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর, আর খাবারের জন্য হাহাকার। কোন বাস্তবতা সত্য-সঠিক? দিনের আলোর মতো সবার কাছে সেই বাস্তবতার চিত্র পরিষ্কার। মাফিয়াতন্ত্র লুটপাট আর মুদ্রা পাচারের অর্থনীতির মধ্যদিয়ে চারদশকে গড়ে ওঠা ও শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতি তছনছ হওয়ার উপক্রম। দুর্নীতিবাজ, চোর আর লুটেরা শ্রেণীর এই মানুষগুলো এবং তাদের প্রধান প্রধান চরিত্রগুলোকে দেখলে বিবেকবান মানুষ মাত্রই গা রিং রি করে উঠে। 

নীতিগতভাবে এত কদাকার কুৎসিত মানুষগুলো প্রতিদিন ফেরেশতার ভাষায় কথা বলে। আর ঢেকে দিতে চায় তাদের সকল অপকর্ম, অন্যায় আর অপরাধকে। লুটের অর্থনীতি কায়েম, মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি, উৎপাদনের সঙ্গে বাস্তবতা আর প্রবৃদ্বির হিসেবে গরমিল। জনসাধারণের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যাপক অসঙ্গতি, দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি। আর গাজীপুরের টাকশালে ছাপানো লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বেহিসাবি কাগজের টাকা বাজার অর্থনীতিতে চরম এক দুঃসহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ৫০ হাজার টাকায় পরিবার চলে না। অথচ ৫০ হাজার টাকা আয় করতে পারে এমন মানুষ হাজারে সর্বোচ্চ একজন হতে পারে। বাকি ৯৯৯ জনের কি অবস্থা? চিন্তা করার কেউ কি আছে? এজন্যইতো চারিদিকে শুধু হাহাকার। এর পরিণামই কি দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি?

নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের গবেষণায় উপরের এই বাস্তবতাই উঠে এসেছিলো। খাবারের অভাবে নয় বরং ব্যবস্থাপনার সংকটের কারণে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। অব্যবস্থাপনা হয়েছিল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আর লুটের অর্থনীতি কায়েমের কারণে । মাত্র চার দশকের মধ্যে আবারো সেই বাস্তবতা ফিরে আসার উপক্রম। এটা বাঙালি জাতি হয়তো কখনো চিন্তাও করেনি। কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী দুর্নীতি পরায়ন জাতীয় নেতৃত্বের নীতিহীন আর গণবিরোধী রাজনীতিকদের লুটপাট আর অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদে আজ দুর্ভিক্ষের হাতছানি। অচিরেই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা না হলে আলোচিত লেখক নিয়ামত ইমামের উপন্যাস “কালো কোট” এর মতই আরেকটি দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

অতএব সময় থাকতে সাধু সাবধান।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close