নিউজ

বিলেতে ভাষাদিবস পালিত

লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের একুশের বিশেষ আয়োজন

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৫ ফেব্রুয়ারী : বর্ণাঢ্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিলেতে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে। ব্যাপক ও ব্যতিক্রমী বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জ্বল এই দিবসটি উদযাপন করে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। অনুষ্ঠানাদিতে বৃটিশ এমপি, মেয়র, স্পিকার, কাউন্সিলর ছাড়াও শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিলো লক্ষণীয়। বাংলাদেশ হাইকমিশন, বিলেতে বাংলা মিডিয়ার প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিশেষ কর্মসূচীর মাধ্যমে দিবসটি পালন করে। লণ্ডনের বাইরে বাংলাদেশী অধ্যুষিত শহরগুলোতেও যথাযোগ্য মর্যদায় দিবসটি পালিত হয়েছে। শহরগুলোর স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে নির্মিত শহীদ মিনারগুলোতে পুষ্পস্তবক অর্পন করেন শহীদদের সম্মান জানান মাতৃভাষা প্রেমীরা। লণ্ডনের ঐতিহাসিক শহীদ আলতাব আলী পার্কে একুশের প্রথম প্রহরের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পনের আয়োজন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বাতিল করা হলেও পরদিন সকালে স্থানীয় মেয়র, কাউন্সিলারবৃন্দসহ স্কুলের শিশু-কিশোর ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিককর্মীদের অংশগ্রহণে পুষ্পস্তবক অর্পন এবং প্রভাতফেরী অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশের বাইরে ওল্ডহামে প্রথম নির্মিত শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন শহরে ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা ভাষাশহীদদের প্রতি সম্মান জানান এবং মাতৃভাষা শিক্ষার গুরুত্ব বিষয়ে আলোচনা করেন।

গত ২০ ফেব্রুয়ারী, রোববার সন্ধ্যা ইস্ট লন্ডনের ব্রাডি আর্ট সেন্টারে লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের আয়োজনে “অমর একুশে ও অহংকারের ৭০ বছর” শীর্ষক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। রাত সাড়ে ৮টায় বৃটেনের বাংলাদেশ সেন্টারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় একুশের আলোচনা সভা। সভার শুরুতে অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম। বৈরী আবহাওয়ার কারণে রোববার রাতে লণ্ডন শহরের হোয়াইচ্যাপলস্থ আলতাব আল পার্কের শহীদ মিনারের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। লণ্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিলেন।

অতিথিদের সঙ্গে লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাব এর সদস‍্যরা

লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের একুশের বিশেষ আয়োজন:
লণ্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব আয়োজিত একুশে ফেব্রুয়ারীর আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, প্রবাসে মাতৃভাষা চর্চা আরও সুদৃঢ় করতে এবং মাতৃভূমির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন তৈরী করতে ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বাঙালি পরিবারে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতি চর্চায় নিবিড় মনোযোগ ছেলে-মেয়েদের মেধা বিকাশের জন্যও বিশেষ সহায়ক। সন্তানদের বাংলা শেখাতে ঘরে ঘরে বাংলা-চর্চার আহবান জানিয়ে বক্তারা বলেন, বাংলা শেখার কাজটি মা-বাবাদেরকেই করতে হবে। আমরা নিজেদের ঘরে ছেলে-মেয়েদের সাথে যতবেশী বাংলায় কথা বলবো, ততই তারা বাংলায় কথা বলতে অভ্যস্থ হয়ে ওঠবে ।
গত ২০ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় পূর্ব লণ্ডনের ব্রাডি আর্ট সেন্টারে ‘অমর একুশ: অহংকারের ৭০ বছর’ শীর্ষক শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এ আয়োজনে আলোচনার পাশাপাশি ছিলো আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠান। বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক ক্লাব সদস্য অংশগ্রহণ করেন।

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি” গানের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এতে ক্লাব সদস্য রুপি আমিন, কণ্ঠশিল্পী ববি রায় ও রিনা দাশসহ নির্বাহী কমিটির সদস্যবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লণ্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদক মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী । তিনি তাঁর সূচনা বক্তব্যে বিলেতে বাংলা ভাষার বিকাশে কমিউনিটি সংবাদপত্রের অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। “ভবনের দেয়ালে আলোর ঝলকানিতে আমরা উচ্ছসিত হই অথচ সেই ভবনের ভেতরেই আলো নিভিয়ে দেয়া হয়েছে” উল্লেখ করে তিনি বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসে বাংলা ভাষা চর্চার দুরাবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করেন।

ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার সম্পাদক তাইসির মাহমুদ—এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে “বিলেতে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ” শীর্ষক মূল আলোচনা তুলে ধরেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ভাষা—সমন্বয়ক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মো. আব্দুল হান্নান।
তাছাড়া “বিলেতে বাংলা—চর্চায় মিডিয়ার ভুমিকা” শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রযোজক মিজানুর রহমান খান, চ্যানেল এস’র অনুষ্ঠান প্রধান ফারহান মাসুদ খান এবং টিভি ওয়ান—এর প্রযোজক ও উপস্থাপক জিয়াউর রহমান সাকলাইন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে বায়ান্নোর ভাষা শহীদদের পরিচিতি তুলে ধরেন ক্লাবের নির্বাহী সদস্য নাজমুল হোসেন। প্রধান আলোচক ড. আব্দুল হান্নান “বিলেতে বাংলা ভাষার ভবিষ্যত” শীর্ষক তাঁর সুচিন্তিত দীর্ঘ আলোচনায় বিলেতে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে আমাদের অগ্রজদের অপরিসীম অবদান এবং সেটি ধরে রাখা ও উন্নয়নে আমাদের করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন,আশির দশকে এখানে যখন বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন আমাদের পুর্বপূরুষরা সরকারি ফান্ডিংয়ের কথা চিন্তা করেননি। তাঁরা তখন সন্তানদের বাংলা শেখানোর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ।
বুঝতে পেরেছিলেন, যদি তাদের বাংলা শেখানো না যায় তাহলে তারা শেকড়—বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে । তাই তাঁরা নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে বাংলা স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু আজ সেই স্কুলগুলো সরকারী ফাণ্ডিংয়ের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা নিজেদের উদ্যোগে সেগুলো চালু রাখতে পারছি না। এটা আমাদের বড় ব্যর্থতা। এখনও সময় আছে, আমাদের সন্তানেরা যাতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে শিকড়—বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে সে জন্য বাংলা শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ছেলে মেয়েদের বাংলা শিক্ষায় মা—বাবাদেরকেই মুখ্য ভুমিকা পালন করতে হবে।

বিবিসি বাংলা’র প্রযোজক মিজানুর রহমান খান বলেন, ভাষা যে শুধু বর্ণমালার সমষ্টি তা নয়, এটি একটি সম্পর্কের ব্রিজ। দেশ, পরিবার ও স্বজনদের সাথে সেই ব্রিজ বা সেতুর সম্পর্ক অটুট রাখতে স্বীয় ভাষা শেখা ও চর্চা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

চ্যানেল এস’র অনুষ্ঠান প্রধান ফারহান মাসুদ খান ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যাপক প্রচারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
টিভি ওয়ান-এর প্রযোজক ও উপস্থাপক জিয়াউর রহমান সাকলাইন মাতৃভাষা চর্চা না হওয়ায় কীভাবে পরিবারের প্রবীণদের সাথে নতুন প্রজন্মের সম্পর্কে ছেদ সৃষ্টি হচ্ছে তা তুলে ধরেন।
মুল আলোচক ড. মো. আব্দুল হান্নানের বক্তব্যের পর মুক্ত-আলোচনায় অংশনেন ক্লাবের তিন সাবেক সভাপতি যথাক্রমে সাপ্তাহিক জনমত সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা, জনমত—এর সাবেক সম্পাদক নবাব উদ্দিন ও সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ, টিভি উপস্থাপিকা উর্মি মাজহার, চ্যানেল এস’র চীফ রিপোর্টার ও প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ জুবায়ের, সাবেক কোষাধ্যক্ষ আ স ম মাসুম, কবি—ছড়াকার দিলু নাসের ও সংস্কৃতিকর্মী নজরুল ইসলাম আকিব।

দ্বিতীয় পর্বে সহ-সাধারণ সম্পাদক সাঈম চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার সালাউদ্দিন শাহীন এবং কবি ও ছড়াকার দিলু নাসের। গান পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পি ববি রায় ও শিশুশিল্পী তানিশা চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের শেষদিকে অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাপ্তাহিক বাংলা পোস্ট সম্পাদক তারেক চৌধুরী এবং নির্বাহী কমিটির সকল সদস্যকে সভামঞ্চে আহবান করে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ সালেহ আহমদ।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close