মুক্তচিন্তা

দেশাত্মা জিয়া

মন্তব্যকথা:

।। আসিফ আরমানি ।।

লেখক: গবেষক।

ভারতীয় জনমানসে স্থায়ীভাবে সবচাইতে শ্রদ্ধার আসনে আছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী আর পাকিস্তানি জনগণের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে আছেন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। বাংলাদেশের জনমানসের সেই আন্তরিক ও অকৃত্রিম শ্রদ্ধার আসনটি কার? সেই আসনটি শেখ মুজিবের হতে পারত কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পযন্ত তিনি নির্মম একনায়কতান্ত্রিক দূঃশাসন জাতিকে উপহার দিয়েছেন তাতে একেবারে অন্ধ স্তাবক ছাড়া বাকি সবার কাছ থেকে তিনি সেই শ্রদ্ধার আসনটি চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন। বিগত প্রায় ১৪ বছর ধরে তার কন্যা জাতিকে যে শাসন উপহার দিয়েছে তাতে জনগণের কাছে শেখ মুজিবের বিভীষিকাময় নির্দয় অপশাসনের দিনগুলো কিরূপ ছিল তা আবারও ফুটে উঠেছে। শেখ মুজিবের বিভীষিকাময় নির্দয় অপশাসনের ফেরাঊনী দিনগুলো শেষ হলে বাংলাদেশের জনগণকে মাত্র চার বছরে এক শান্তিময় পরিবেশ উপহার দিয়ে যিনি জনহৃদয়ে চিরস্থায়ী শ্রদ্ধার আসন দখল করে নিয়েছেন তিনি হলেন দেশাত্বা জিয়াউর রহমান।

তাঁর মৃত্যুর চার দশক পরেও দেশের অর্থনীতি যে আজ এগিয়ে চলেছে সেটা হলো তারই ঠিক করে দেওয়া অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনার টেমপ্লেট অনুসরণ করে। যেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যাংক হিসাবের কথা বলে বর্তমান জোরদখলকারী ভোট চোর সরকার আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে তার প্রধান উৎস প্রবাসী শ্রমিক ও গার্মেন্টস শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল দেশাত্বা জিয়ার হাত ধরেই। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশিরা তাই আজ গর্ব করে বলতে পারে ভারতের যদি থাকেন মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের যদি থাকে কায়দে আযম, আমাদেরও তেমনি একজন আছেন— তিনি হলেন দেশাত্বা জিয়াউর রহমান। ধর্ম বর্ণ গোত্র ভাষা অঞ্চল নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক যাকে এখনো অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা করে। কেবলমাত্র বহিঃশত্রুর স্থানীয় কিছু দালালের কাছে তিনি প্রচন্ড হিংসা ও বিদ্বেষের শিকার। কারণ দেশাত্বা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনচেতা আত্মমর্যাদায় বলিয়ান হয়েও বহিঃ শত্রুকে অস্বীকার করে প্রভাব মুক্ত থাকার যে পলিসি তা এই ধরনের দালাল মীরজাফরদের কোনোকালেই পছন্দনীয় নয়।

বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিকভাবে একটি বৃহৎ বৈরী প্রতিবেশী দেশের প্রচন্ড প্রভাব এর অধীন এবং সেই বৈরী শক্তির স্থানীয় দালালরাই জোরপূর্বক গত প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের গদিতে আসীন হয়ে সব ধরনের নির্যাতন নিষ্পেষণ অপশাসন ও লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা মানুষ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে ভোট চোর গদি দখলকারী বহিঃশত্রুর দালাল তাঁবেদার সরকারের বিরুদ্ধে বারবার ফুঁসে উঠছে। শাসক দল উপায়ান্তর না দেখে তার সকল প্রচেষ্টা নিবদ্ধ রেখেছে স্বাধীনতার মহান ঘোষক, বীর উত্তম উপাধি প্রাপ্ত সর্বকালের সেরা মুক্তিযোদ্ধা এবং শাসক হিসেবে সর্বোত্তম সততার মডেল জিয়াউর রহমানের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করার কাজে। কিন্তু তাদের সকল অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করে জিয়াউর রহমান দিনদিন দেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠছেন এবং আগামী দিনের প্রজন্মের কাছে দেশপ্রমিক সৎ শাসকের সবচাইতে উত্তম মডেল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন।

এটা সত্যি যে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ গভীর রাত্রে স্বাধীনতার জলদ গম্ভীর দুঃসাহসী ঘোষণা দেওয়ার আগ পর্যন্ত জাতি তাঁকে চিনত না। ৭ই মাচের্র আবেগ সর্বস্ব দিকনির্দেশনাবিহনি শব্দ বোমাবর্ষণ করে ভীতু মুজিব পরবর্তী প্রায় তিন সপ্তাহ জল্লাদ ইয়াহইয়া ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে যে ব্যর্থ আলোচনা চালিয়ে অবশেষে আত্মসমর্পণপূর্বক পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপদে চলে গিয়েছিল তার বিপরীতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা জাতির বুকে ভীষণ সাহস ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। ‘ভয়ে পালায় কাপুরুষ লড়ে যায় বীর’ আপ্তবাক্য অনুসরণ করে পলায়নপর কাপুরুষ মুজিবের বিপরূতে তিনি শুধু স্বাধীনতরা ঘোণণাই দেননি বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুদন্ডের পরোয়া না করে নিজের মাসুম দুই বাচ্চা ও তরুণী স্ত্রী কে পিছনে ফেলে রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং পরবর্তী নয় মাস অকুতোভয়ে যুদ্ধ করে দেশের জন্য স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন।

স্বাধীনতা অর্জনের পর তৎকালীন সরকার তাঁকে বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত করলেও তাকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি বরং তার জুনিয়র একজন কর্মকর্তার অধীনে তাকে চাকরি করতে বাধ্য করেছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনুগত জিয়াউর রহমান এই অনিয়মকে মেনে নিয়েছিলেন এবং ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে সেনাবাহিনীর কর্মরত ছিলেন। সেনা অভ্যুত্থান শুরু হলে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে শেখ মুজিব তাঁর নিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল­াহ কে ফোন করে বলেছিলেন ‘শফিউল্লাহ তোমার ছেলেরা আমার বাড়ি আক্রমণ করেছে আমাকে বাঁচাও’। ভীতু ্ও দুর্বল নেতৃত্বের জেনারেল শফিউল্লাহ শেখ মুজিবকে পরামর্শ দিয়েছিলেন “স্যার আপনি দেখেন কোনরকমে বাড়ির বাইরে চইলা যাইতে পারেন কিনা।”

বোদ্ধাদের মতে স্বাধীনতার পর যোগ্যতা ও সিনিয়রিটি অনুযায়ী জেনারেল জিয়াউর রহমান যদি সেনাবাহিনীর প্রধান হতেন তাহলে শেখ মুজিবের এরকম পরিণতি নাও হতে পারত। শেখ মুজিবের মৃত্যু ঘটেছিল তার নিযুক্ত অনুপযুক্ত সেনাপ্রধানের চোখের সামনে এবং শেখের লাশ দাফন করার আগেই তৎকালীন তিন বাহিনীর প্রধান রেডিও ও টিভির সদর দপ্তরে গিয়ে খন্দকার মোশতাকের সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন। শেখ মুজিব খুনের কোন কালিমা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে স্পর্শ করেনি। বরং শেখ মুজিবের করুণ মৃত্যুর খবরটা পাওয়ার সাথে সাথে তিনি জানতে চেয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জীবিত আছেন কি না এবং সেটা জানার বলেছিলেন ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার, গো এন্ড আপহোল্ড দা কনস্টিটিউশন‘। একজন পেশাদার সেনানায়ক এর মত ঐরকম সঙ্কট মুহূর্তেও তিনি সংবিধানকে সমুন্নত করার জন্য আদেশ প্রদান করেছিলেন অথচ আজ তাকেই কিনা আওয়ামী লীগ মুজিব হত্যার জন্য দায়ী করে থাকে! তবে অভিশপ্ত আওয়ামী লীগের কাছে সম্মান না পেলেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন আপামর জনসাধারণের কাছে , বিশ্বজনতার কাছে এবং তৎকালীন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে ও। তার শাহাদাত বরণের পরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, ইন্দিরার ভাষায় ফারসাইটেড স্টেটসম্যান। ইন্দিরার পোষ্য শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরে তিনি কিন্তু তার সম্পর্কে এ ধরনের কোনো কথা বলেননি। অক্সফোর্ডে শিক্ষিত ইন্দিরা গান্ধী জিয়াউর রহমানকে কিন্তু সাধারন একজন রাজনীতিবিদ বলেননি, রাষ্ট্রনায়ক বা স্টেটসম্যান বলেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন একজন রাজনীতিবিদ ব্যস্ত থাকেন বর্তমান নিয়ে আর পরবর্তী ইলেকশন নিয়ে। অন্যদিকে একজন রাষ্ট্রনায়ক নিয়োজিত থাকেন সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত দেশ রেখে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর দৈনন্দিন কার্যকলাপ এবং পরিকল্পনার সবটাই ছিল জনগণের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা নিয়ে। এমন এক বাংলাদেশ যেখানে অর্থনৈতিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত হবে, সামাজিক ন্যায়বিচার থাকবে এবং জনগণের মানসিক বিকাশের সকল পথ উন্মুক্ত থাকবে।

শেখ মুজিবের ভৌগলিক, অন্তঃসারশূন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জিয়াউর রহমান জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন আদর্শভিত্তিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ যা শুধুমাত্র নৃতাত্ত্বিক বাঙ্গালীদের কে ছাপিয়ে অন্যান্য সকল নেতাদের জনগোষ্ঠী যেমন চাকমা মারমা সাঁওতাল গান ইত্যাদি সকল জনগোষ্ঠীর একটি আদর্শ ও ইনসাফ ভিত্তিক দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শেখ মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল অসম্পূর্ণ কারণ তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী পশ্চিমবাংলায় ছিল বাঙালি জাতির অংশ। কিন্তু তাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা মারমা কুকী ময়মনসিংহ-শেরপুর-নেত্রকোনার গারো বা দিনাজপুরের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর কোন অংশগ্রহণ বা একাত্মতাবোধ ছিল না। বিয়াল্লিশ সাল থেকে বাহাত্তর সাল পর্যন্ত ৩০ বছর রাজনীতি করেও শেখ মুজিব যেটা বুঝতে পারেননি সেটা জিয়াউর রহমান তার শাসন ক্ষমতার প্রথম বছরেই বুঝতে পেরে ছিলেন। একটি রচনায় তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদেও ব্যখ্যা দিয়েছিলেন। তাতে তিনি লিখেছেন ‘‘আমরা বলতে পারি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মোটামুটি সাতটি মৌলিক বিবেচ্য বিষয় রয়েছে যা হচ্ছে—
এক. বাংলাদেশের ভূমি অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যবর্তী আমাদের এলাকা
দুই. ধর্ম গোত্র নির্বিশেষে আমাদের জনগণ
তিন. আমাদের ভাষা বাংলা ভাষা
চার. আমাদের সংস্কৃতি: জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা উদ্দীপনা ও আন্তরিকতার ধারক আমাদের নিজস্ব দেশীয় সংস্কৃতি
পাঁচ. দুইশত বছরের উপনিবেশ থাকার প্রেক্ষাপটে বিশেষ অর্থনৈতিক বিবেচনার বৈপ্লবিক দিক
ছয়. আমাদের ধর্ম: প্রতিটি নারী ও পুরুষের অবাধে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন রীতিনীতি পালন এর পূর্ণ স্বাধীনতা
সাত. সর্বোপরি আমাদের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ যার মধ্য দিয়ে আমাদের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বাস্তব ও চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে আমাদের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন জনমানুষের চেতনায় প্রোথিত এই ভাবনাগুলোই জিয়াউর রহমানের কলমে ও পরিকল্পনায় ভাষা খুঁজে পেয়েছে এবং যে কারণে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগায় এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকে সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে যায়।
দেশাত্মা জিয়া জানতেন সামরিক বিষয়ের সমাধান সেনাপতিরা করতে পারেন কিন্তু রাজনীতির বিষয়ে সমাধানের জন্য রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন লোকের প্রয়োজন। সেজন্যেই তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে সকল মত, পথ ও বিশ্বাসের মানুষের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। জাতিকে কৃত্রিমভাবে তিনি বিভক্ত করে রাখতে চাননি বলেই সকলকেই তার জাতীয়তাবাদী দলের বৃহৎ বৃক্ষের ছায়ার নীচে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তিনি ইচ্ছে করলেই তৎকালীন সময়ে গণধিকৃত ও চরমভাবে ঘৃণিত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারতেন। কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শুধু আওয়ামী লীগকে পুনর্জীবিতই করেননি বরং দিল্লিতে স্বেচ্ছানির্বাসিত হাসিনা ওয়াজেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং তাতে কোন প্রকার বাধা হয়ে দাড়াননি। ১৯৮১ সালের ১৭ই মে মিসেস হাসিনা ওয়াজেদ মিয়া ঢাকায় বিমানবন্দরে অবতরণ করলে জিয়াউর রহমান তার সকল প্রকার নিরাপত্তা ও সম্মানের ব্যবস্থা করেছিলেন যদিও এর মাত্র তেরো দিন পরেই ষড়যন্ত্রীদের হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন।

অকৃতজ্ঞ আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্ব জিয়াউর রহমানের উদারতা এবং অবদানকে যদিও আজ স্বীকার করেনা বরং অষ্টপ্রহর তার ব্যক্তি চরিত্র এমনকি তার পরবর্তী তৃতীয় প্রজন্ম কে পর্যন্ত আক্রমণের ক্ষতবিক্ষত করার কাজে নিয়োজিত তবুও জনগণ জানে এই দেশের স্বাধীন ভাবে টিকে থাকার পেছনে এই মহান নেতার অবদান সর্বাধিক তিনি হলেন দেশাত্বা জিয়াউর রহমান। তিনি বিভক্তির রাজনীতি করেননি বরং সমন্বয় রাজনীতি করেছেন। তিনি মাওলানা ভাসানীর ধানের শীষ কে নিজের দলের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন, শেখ মুজিবের বাকশালী হুকুমে একদিনের মধ্যে দেশের সকল পত্রিকা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তকে বদলে দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে জাতীয় প্রেসক্লাব করে দিয়েছিলেন, শেখ মুজিবের একনায়তান্ত্রিক একটি মাত্র দল বাকশালের বিপরীতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। নিজে কোনো মার্শাল ল দেননি বরং বিচারপতি সায়েম এর দ্বারা জারিকৃত মার্শাল ল প্রত্যাহার করেছিলেন, মাত্র চার বছরে খাল খনন কর্মসূচি কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ ইত্যাদির মাধ্যমে খাদ্য উত্পাদন প্রায় দ্বিগুণ করেছিলেন জনগণের অংশগ্রহণে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে গ্রাম সরকার গঠনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন বিশৃঙ্খলা ও সর্বশক্তির মাত্র ৩০০০০ সদস্যের সেনাবাহিনীকে দেড় লক্ষ সদস্যের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত করেছিলেন, পুলিশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী আর্মড পুলিশ আনসার ব্যাটালিয়ন প্রভৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা সহ অসংখ্য অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশকে এমন এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে পরবর্তীতে দেশদ্রোহী শক্তিরা শত কসরত করেও দেশকে সিকিম বানাতে বা ভারতের অন্তর্ভুক্ত করাতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের স্বর্ণভূমি আরব রাষ্ট্রসমূহের সাথে কূটনৈতিক সম্পকের্র সূচনা তার হাতেই হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রের মতোই সৌদি আরব চায়না ইত্যাদি প্রভাবশালী দেশের সাথে স্থায়ী ও অর্থবহ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং নিজ নেতৃত্বগুণের কারণে ভারতের তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে যথেষ্ট সমীহ ও মর্যাদা আদায় করেছিলেন। আজকের গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশের সূচনা তার হাত ধরেই। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণরকে ডেকে নিয়ে বন্ডেড ওয়্যারহাউস চালু করার নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তিনি গার্মেন্টসকে একটি শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেন এবং এর জন্য সকল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করেন। তৎকালীন দ্বিমেরুর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে জাতিসংঘে তিনি তৃতীয় বিশ্বের মহান নেতা ও কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন। ওআইসিতে সরব ও ব্যক্তিত্বশালী ভূমিকা পালন করেন। আঞ্চলিক জোটবদ্ধ বাণিজ্যের উপকারিতা সম্পর্কে বুঝতে পেরে সার্কেও মতো সংগঠন তৈরীর পদক্ষেপ নেন যা এখন ইতিহাসের অংশ। বিশ্বের রাজনীতি বিজ্ঞানের যেকোনো ছাত্র এবং প্রফেসর বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ভাবে তৃতীয় বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ দারিদ্র্যক্লিষ্ট একটি রাষ্টে্রর রাষ্ট্রপতি মাত্র সাড়ে চার বছর সময়কালে কিভাবে এত বেশিসংখ্যক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনও যার ডিভিডেন্ড তার জাতি তার মৃত্যুর চার দশক পরেও পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দুটি ক্ষেত্র যথাক্রমে গার্মেন্টস শিল্প ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী তিনি।

বিশৃংখল ও শতধাবিভক্ত বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে ঐক্য ও সংহতি ফিরিয়ে আনতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষ করে ৭৪ সালে ভারত কর্তৃক সিকিমের স্বাধীনতা গিলে খাবার ঘটনা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে বাংলাদেশের সক্ষম সকল পুরুষ ও নারী কে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণের মধ্যে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করলে বিপদের মুহূর্তে তাদেরকে সক্রিয় প্রতিরোধ যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। তিনি আনসার ও ভিডিপি গঠন করেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর গঠনের মাধ্যমে দেশ গঠন দেশপ্রেম ও নিরাপত্তায় দেশের আগামী দিনের নাগরিক ছাত্র-ছাত্রীদের গঠনমূলক ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেন যা তাদের মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছিল।

শেখ মুজিবের উদ্ভট সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক বিশৃংখল ইউটোপিয়ান চিন্তাধারার বদলে বাজারকেন্দ্রীক অর্থনীতির প্রচলন করেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার জন্য বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেন। তার আমলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খালকাটা কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং জনগণ যাতে গ্রামে বসেই কর্মসংস্থান করতে পারে সেজন্যে স্বনিভর্র বাংলা কর্মসূচির মত নানা রকম আত্ম-উন্নয়ন ও আয়বর্ধনমূলক প্রকল্প গ্রহণ করেন। নারীর ক্ষমতা য়নের জন্য তৈরি করেন মহিলা মন্ত্রণালয় শিশুদের কল্যাণে তৈরি করেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমী আর স্বাস্থ্যকর সুখী ও নিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার পরিবার গঠনের জন্য তৈরি করেন পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় যার মাধ্যমে তৎকালীন রক্ষণশীল পশ্চাৎপদ বাংলাদেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সূচনা করেন।

গঙ্গার পানির হিস্যা নিয়ে ভারতের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ফারাক্কা সমস্যাকে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করেন, ওআইসি সম্মেলনে তা তুলে ধরেন জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন অতা তুলে ধরেন এবং সর্বশেষে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অত্যন্ত বলিষ্ঠ গলায় উপস্থাপন করেন এই ত্রিমুখী আন্তর্জাতিক চাপে ভারতের তৎকালীন সরকার অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাংলাদেশের সাথে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী ভারত গঙ্গার পানির হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে সম্মত হয়। তৎকালীন মুজিব সরকার এবং বর্তমানে হাসিনা সরকারের উপরে ট্রানজিট করিডর ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ভারত যেভাবে এককেন্দি্রক সুবিধা নিয়েছে এবং নিচ্ছে সেসব বিষয়ে তিনি বন্ধ করে দেন এবং ভারতের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করেন। বর্তমানে যেভাবে সীমান্তে হত্যাসহ নানা ভাবে ভারতীয় বাহিনীর চড়াও হচ্ছে এবং বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নতজানু হয়ে তাদের মার খেয়ে চলেছে এরকম পরিস্থিতিতে দেশাত্ব জিয়ার দূরত্ব মূলক চিন্তা-দর্শন ও কার্যসূচির বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি ভাবে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
দেশাত্মা জিয়া তাঁর যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে বাংলাদেশ নামক রাষ্টে্রর ও তার জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন, চিন্তা ভাবনা করে গেছেন এবং সেই চিন্তাকে বাস্তবায়ন করার জন্য সকল উদ্যোগ গ্রহণ করে গেছেন। দেশ ছিল তাঁর আত্মা, দেশ ছিল তাঁর নিঃশ্বাসে-স্বপ্নে-জাগরণে এবং বিশ্বাসে। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মীয় বিশ্বাসের সহাবস্থান, সমাজনীতি, ব্যক্তিগত উচ্চ নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পকের্র বিন্যাস ও ভারসাম্য সর্বক্ষেত্রেই দেশাত্মা জিয়াউর রহমান অসামান্য সফলতা দেখিয়েছেন। সেনা ব্যারাক থেকে বের হয়ে আসা পৃথিবীর অন্য কোন সামরিক নায়কই রাজনীতির ক্ষেত্রে এত বড় সাফল্য দেখাতে পারেননি যেটা দেশাত্মা জিয়া করে দেখিয়েছিলেন। দেশাত্মা জিয়ার ছিয়াশিতম জন্মদিনে তার প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। কবির ভাষায়
দশকের পর দশক গেল
এদেশ ভোলেনি তাঁরে,
তাঁর প্রতীক ধানের শীষকে
জয়ী করেছে বারে বারে।

কত না চেষ্টা শত্রুপক্ষের
মুছে দিতে তাঁর নাম,
কী আশ্চর্য! প্রতিমুহূর্তেই
জাতি তাঁকে জানায় লাল সালাম।

মুছে দিতে পারো জিয়া এয়ারপোর্ট
কিংবা জিয়া শিশু পার্ক,
কিন্তু কি করে মুছবে তুমি
হৃদয়ে জিয়ার মার্ক?

যতবার মুছো ভেসে উঠবেই
জিয়ার স্মৃতি অবিনাশী,
পারবে না পারবে না যতোই আনো
দিলি­র দাস ও দাসী।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে
মিশে আছে তাঁর সত্তা,
দেশটাই ছিল সবকিছু তাঁর
দেশটাই ছিল তাঁর আত্মা।

দেশাত্বা জিয়া দেশাত্বা জিয়া
তুমি আমাদের গৌরব,
বাংলার ফুল আজো ফুটে ফুটে
বিলায় যে তোমার সৌরভ।

দেশাত্বা জিয়া দেশাত্বা জিয়া
তোমার গৌরব গাঁথা,
রক্ষা করতে বিলিয়ে দেব
আমাদের অযুত মাথা।

দেশাত্বা জিয়া দেশাত্বা জিয়া
তুমি চির অমলিন,
তোমার অবদান দেশ ও জাতি
ভুলবে না কোনদিন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close