নিউজ

শান্তিতে নোবেল- মুক্ত সাংবাদিকতার জয়গান

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রচেষ্টার জন্য দুই সাংবাদিক ফিলিপাইনের মারিয়া রেসা এবং রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতভকে ২০২১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। নোবেল কমিটি বলেছে তারা এই পুরস্কারের ব্যাপারে বিবেচনায় নিয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে, যা গণতন্ত্র এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত। মিসেস রেসা এবং মিস্টার মুরাতভ ফিলিপাইন এবং রাশিয়ায় মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাদের সাহসী লড়াইয়ের জন্য শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন। একই সময়ে, তারা এমন সব সাংবাদিকের প্রতিনিধি যারা এই আদর্শের পক্ষে এমন একটি বিশ্বে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে গণতন্ত্র এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন।

এই পুরস্কার নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। সবচেয়ে বড় তাৎপর্য বিশ্বের দেশে দেশে হুমকির মুখে থাকা বাকস্বাধীনতা আর গণমাধ্যমের জন্য এই এক বিশাল অর্জন’ । এই স্বীকৃতি প্রমাণ করেছে সবকিছুকে ছাপিয়ে শান্তির জন্য ভূমিকা রাখতে পারে সাংবাদিকতা। গণমাধ্যমের জন্য হুমকি সকল ব্যক্তি, সরকার, কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নোবেল পুরস্কার বিশেষ বার্তা প্রধান করছে। গণমাধ্যম এর ঘাতকদের কাছে এই বার্তা পরিষ্কার করা হয়েছে যে নির্ভীক সাংবাদিকতা ও গনমাধ্যমের নিরাপত্তা অন্য সবকিছুর শান্তি ও নিরাপত্তা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।  যে কোন দেশ , সমাজ ও অঞ্চল তার শান্তি উন্নয়ন ও নিরাপত্তার হুমকিগুলো জানতে পারে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম এর কাছ থেকে।  ক্ষমতা ও স্বার্থের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক হওয়ার কারণে ক্ষমতাশালীরা গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরে। প্রকারান্তরে তারা তাদের নিজেদের অশান্তি এবং নিরাপত্তাহীনতাই ডেকে আনে। বাংলায় একটা সহজ কথা আছে- “অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে নিজেকেই সেই গর্তে পড়তে হয়।” গণমাধ্যম যখন অন্যায় অনিয়ম দুর্নীতি কিংবা সমাজে শান্তি ও উন্নয়নের পরিপন্থী যেকোনো বিষয়কে চিহ্নিত করে, তখন তা তদন্ত বা অনুসন্ধান এর প্রয়োজন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। সত্য খবর সকল সরকার বা কতৃপক্ষের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ, তা যত তিক্তই হোক না কেন। তা সুশাসনের অঙ্গীকার পূরণে সাহায্য করে। আর মিথ্যা খবর সমাজে কখনো মৃদু চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলেও তা কখনো দীর্ঘমেয়াদি কোন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না। কারণ একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এর সত্যতা প্রকাশিত হয় এবং মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করে।  ইতিমধ্যে যে ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে কেন্দ্র করে মিথ্যা খবরটি করা হলো, তা প্রকারান্তরে তাদের  জনপ্রিয়তা ও  নৈতিক ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং মিথ্যা কিংবা  অর্ধসত্য খবর নিয়ে বিচলিত হওয়ার কোন কারণ থাকা সংগত নয়। 
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ক্ষমতাশালী ও কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তি কিংবা প্রশাসন ভুয়া সংবাদ, প্রতিপক্ষকে দমন ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। তা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ও কর্তৃত্ব বাদী শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে। অশুভ এই কাজগুলো মোকাবেলা ফিলিপাইন এবং রাশিয়ায় একটা ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা।  গণমাধ্যমকে ঘিরে এসব হুমকি গনমাধ্যমের একটা বাড়তি চ্যালেঞ্জ। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত মারিয়া রেসা তাঁর দেশে  কর্তৃত্ববাদী সরকারের এ ধরনের অপকর্ম মোকাবেলায় উজ্জ্বল সাফল্য অর্জন করেছেন। পথ দেখিয়েছেন গণমাধ্যম ও নির্ভীক সাংবাদিকদের। রাশিয়া সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নানা পরিস্থিতিতে ছয়জন সহকর্মীকে হারিয়েছেন মি. দিমিত্রি। কিন্তু তিনি থেমে যাননি।  নির্ভীক ও কমিটেড প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য ও সহযোগীতা সবকিছুই এই সবকিছুই এবারের শান্তি পুরস্কারের দ্বারা উপকৃত ও অনুপ্রাণিত হয়েছে। বিশ্বের কোন সাংবাদিক আর একা নন। অসত্য ,অনাচার ,দুর্নীতি আর নৈরাজ্যের প্রকাশে তাঁদের সাহস  শত গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই নোবেল এর অনুপ্রেরণায় বিশ্বের দেশে দেশে বাক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র উন্নয়নে সাংবাদিকরা আরো বলিষ্ঠ অবদান রেখে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
মুক্ত সাংবাদিকতা ও গনমাধ্যমের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক সোনালী পালক। ইতিহাসের এই অধ্যায় রচনা জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটিকে ধন্যবাদ। বিজয়ী দুই সাংবাদিককে আমাদের উষ্ণ অভিনন্দন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close