নিউজ

ব‍্যাক্তিগত সফরে ফিনল‍্যাণ্ড, বিশালবহর নিয়ে জাতিসঙ্ঘে শেখ হাসিনা: রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অপচয়

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সফরের ব্যয় রাষ্ট্র কেন দেবে?
নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ব্যাপক সংঘর্ষে প্রবাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আবারও ভূলণ্ঠিত
বিমানটি এমনিতেই ঢাকায় পড়ে আছে, ওখানে গিয়ে পার্ক করে রাখলাম: ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট বিষয়ে মন্তব্য

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৩ সেপ্টেম্বর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ইস্যুতে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত তিনি তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানার ছেলে রিদওয়ান মুজিব ববিকে দেখতে ফিনল্যাণ্ডে যান। সেখানে চার্টার্ড ফ্লাইটে গিয়ে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে পুরো দুদিন অবস্থান করেন। অতঃপর জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান। সেখানেও করোনাকালীন সীমিতসংখ্যক সঙ্গীর অনুমোদন সত্তেও শতাধিক লোকের বহর নিয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় খরচে ব্যক্তিগত ভ্রমণসহ অপ্রয়োজনীয় বিশাল বহর নিয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদান নিয়ে সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনার চলছে। উল্লেখ্য, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক উন্নত ও শীর্ষ অর্থনীতির দেশের প্রতিনিধিরাও সরাসরি উপস্থিত না হয়ে ভার্চ্যুয়ালি অধিবেশনে সংপৃক্ত হচ্ছেন।

এদিকে, শেখ হাসিনার যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেন্দ্র করে সেখানকার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দু‘পক্ষের মধ্যে ইতোমধ্য ধাওয়া পাল্টা ধাওয়াসহ ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রীর অবতরণের দিন ১৯ সেপ্টেম্বর রোববার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে দু‘পক্ষে ব্যাপক শোডাউন করতে দেখা যায়। এর আগের দিন নিউইয়র্কে বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসে আওয়ামী লীগের দু‘গ্রুপের মধ্য সংঘর্ষের পাশাপাশি বিএনপির সাথেও সংঘর্ষে জড়ায় আওয়ামী লীগ। এতে একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়ায় প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে সেখানকার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মারমুখি অবস্থান এবং উত্তেজক স্লোগান স্থানীয় বাংলাদেশী ছাড়াও বিদেশী নাগরিকদেরও ভীত ও বিস্মত করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন পুলিশকে রীতিমতো হিমশিত খেতে দেখা যায়।

জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানকে কেন্দ্র এই যে অপ্রয়োজনীয় বিশাল বহর নিয়ে সফর করে রাষ্ট্রীয় অর্থের বিশাল অপচয় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় খরচে ফিনল্যাণ্ডে নিজের ভাগ্নেকে দেখতে যাওয়ার বিষয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন — “শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সফরের ব্যয় রাষ্ট্র কেন দেবে?”

অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রীর ব্যয়বহুল চ্যাটার্ড ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রে গমন নিয়ে সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আব্দুস সোবহান গোলাপ বলেছেন, চ্যাটার্ড ফ্লাইট করে নিয়ে আসা বাংলাদেশের বিমানে নতুন যুক্ত হওয়া অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনার এয়ারবাসগুলি ঢাকায় পার্ক অবস্থায় পড়ে আছে। সেক্ষেত্রে সেখান থেকে এখানে নিয়ে পার্ক করে রাখলাম। এতে দোষের কি?

advert

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ১৯ সেপ্টেম্বর, রোববার বিকেলে ফিনল্যাণ্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছান। বাসস’র সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন ও পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী গত শুক্রবার নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সফরের ব্যয় রাষ্ট্র কেন দিবে?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবার পূর্বে ফিনল্যাণ্ডের হেলসিংকিতে বোন রেহানার ছেলে ববির সাথে দেখা করতে সেখানে দুইদিন যাত্রা বিরতি করেন।

খবরে বলা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার বিকেলে ফিনল্যাণ্ডের রাজধানী হেলসিংকি ভাড়া বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের উদ্ধৃতি দিয়ে সরকারি বার্তা সংস্থা শুক্রবার এ খবর নিশ্চিত করে। প্রেস সচিব জানান, ফিনল্যাণ্ড বাংলাদেশের অনাবাসী রাষ্ট্রদূত মো. নাজমুল ইসলাম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছিলেন। এর আগে, প্রধানমন্ত্রী এবং তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী ফ্লাইটটি শুক্রবার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (এইচএসআইএ) থেকে ছেড়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের উপরোক্ত বিবরণে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি ব্যক্তিগত সফর। কারণ ফিনল্যাণ্ডের কোনো সরকারী কর্মকর্তা এমনকি প্রটোকল বিভাগের একজন কর্মচারীও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর অভ্যর্থনায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ বিমান সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে, সরাসরি ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক যাত্রা না করে ফিনল্যাণ্ডে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এই ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট অবতরণ ও ও সেখানে দুদিনের ল্যাণ্ডিং চার্জসহ সফরসঙ্গীদের যাবতীয় খরচ বহন করতে খরচ হবে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। দু’বছর আগেও লণ্ডনে চোখের চিকিৎসা করাতে এসে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী লণ্ডনের কাটিয়েছিলেন এবং সাইড ভিজিট হিসেবে ব্যক্তিগত সফরে ফিনল্যাণ্ড তাঁর বোন শেখ রেহানার ছেলে ববির শ্বশুর বাড়ীত বেড়াতে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে এবারও তিনি সেখানে বেহাইর বাড়ীতে বেড়াতে গেছেন এবং কোনো কোনো সূত্র বলছে, ভাগ্নে রিদওয়ান মুজিব ববির মান ভাঙাতে তিনি সেখানে গেছেন। গত ক’বছর রিদওয়ান মুজিব ঢাকায় থেকে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। কোনো বিশেষ বিরোধের জের ধরে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। গত কয়েক মাস ববি আর ঢাকা যাননি। এ কারণেই ভাগ্নের মান ভাঙাতে প্রধানমন্ত্রীকে জাতিসংঘ যাবার পথে ফিনল্যাণ্ড তাঁর সফরসঙ্গী দলবলসহ এই ব্যয়বহুল সফরে যেতে হয়েছে। তিনি সেখানে দুদিন থেকে রবিবার নিউইয়র্কে যান। রাষ্ট্রীয় কাষাগার শূন্য করে প্রধানমন্ত্রীর এইসব ব্যয়বহুল ব্যক্তিগত সফর নিয়ে ঢাকার কোনো গণমাধ্যমকে অতীতের ন্যায় এবারও কোনো প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে সাপ্তাহিক সুরমার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বহিঃপ্রচার বিভাগের মহাপরিচালকের সাথে রবিবার যোগাযোগ করেও পাওয় যায়নি। তবে এ ব্যাপারে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করবে বলে সাপ্তাহিক সুরমা আশা প্রকাশ করে।

এদিকে, রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও বিলাসী সফরের এই ঘটনা আলোচিত হওয়ার প্রাসঙ্গিকতায় বর্তমান সরকারের সময়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এখনও সবার মুখে মুখে। আর সেটি হচ্ছে — দুই দশক আগে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দুই কোটি টাকা ব্যবস্থাপনায় “অনিয়মে”র কথিত অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ইতিপূর্বে দুই বছর কারাবরণ করতে হয়েছে এবং আরো অন্তত আট বছর জেল-জরিমানা মাথায় নিয়ে কার্যত গৃহবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। এছাড়া সম্প্রতি ফিনল্যাণ্ডের একটি ঘটনা কাকতালীয়ভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বিলাসী সফরের সঙ্গে আলোচনায় পাবলিক ডোমেইনে উঠে এসেছে। ফিনল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রীর ব্রেকফাস্টের বিল মাসে ৮শ’ ইউরো গ্রহণের বৈধতার প্রশ্নে বিতর্ক, এমনকি বিতর্কের জের ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করার মতো দাবী পর্যন্ত উঠতে শুরু করেছে সেখানে। এছাড়া সম্প্রতি ফিনিশ অর্থমন্ত্রীকে সরকারী অর্থে তার সহকারীদের মিডিয়া ট্রেইনিং দেওয়ার অভিযোগে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

শেখ হাসিনার সফরকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে বিএনপি-আ’লীগ মুখোমুখি, ব্যাপক সংঘর্ষ:
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক গমনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়েছে সেখানকার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ১৯ সেপ্টেম্বর, রোববার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে জড়ো হয়। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে ‘গণতন্ত্র হত্যাকারী’ ও ‘ভোট চোর’ আখ্যয়িত করে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিরোধীতা করে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে।

নিউইয়র্কের বিভিন্ন বাংলা অনলাইন টিভিতে প্রচারিত ভিডিওচিত্রে দেখা যায় যে, দু’পক্ষের পরস্পর বিরোধী স্লোগানে এয়ারপোর্ট এলাকা প্রকম্পিত করে তুলছে। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে আগের দিন নিউইয়র্কের বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটসে দু’পক্ষ মিছিল ও সমাবেশ করে। তাদের মিছিল ও সমাবেশ থেকে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং এতে একজন আহত হয়েছেন বলেও সেখানকার বাংলা মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদ থকে জানা গেছে।

প্রিণ্ট ভার্সন

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close