নিউজ

ইমিগ্রেশন নীতি শিথিলের আহবান

ব্রেক্সিট ও করোনার প্রভাবে বৃটেনে চরম কর্মী সংকট

|| সুরমা প্রতিবেদন ||
লণ্ডন, ১০ সেপ্টেম্বর : সাম্প্রতিক সময়ে বৃটেনে চরম কর্মী সংকট দিয়েছে। ব্রেক্সিট ও করোনার ক্ষতিকর প্রভাবে সৃষ্ট কর্মী সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা, হসপিটালিটি থেকে শুরু করে সুপার মার্কেট, ফার্ম এবং আইটি সেক্টরসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাত। জরুরীভিত্তিতে প্রয়োজনীয় লোক নিয়োগ দিয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সেক্টর রক্ষায় ইমিগ্রেশন নীতি শিথিলের আহবান জানিয়েছেন ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ। শীর্ষস্থানীয় নিয়োগকারী সংস্থা কনফেডারেশন অব ব্রিটিশ ইণ্ডাস্ট্রি (সিবিআই) এর নেতৃবৃন্দ সম্প্রতি সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন যে, বৃটেনকে তার নতুন অভিবাসন নিয়ম শিথিল করতে হবে যাতে আরও বেশী বিদেশী কর্মী বৃটেনে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় এবং ব্রেক্সিট ও করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সৃষ্ট শ্রমিকের অভাব দূর করতে পারে।

এই বছরের গোড়ার দিকে কোভিড নিষেধাজ্ঞা সহজ হতে শুরু করে। অর্থনীতি পুনরায় চালু করার অনুমতি প্রদানের পর কোম্পানিগুলি বিশেষ করে হসপিটালিটি খাত, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহে শ্রমিকের অভাব দেখা দিতে শুরু করে, যার দরুণ দেখা যায় সুপারমার্কেটের সেলফ শূন্য হতে শুরু করেছে এবং অনেক রেস্তোরাঁ বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

ট্রাক ড্রাইভারের অভাব এতোটাই প্রবল রূপ ধারণ করে যে, কিছু নিয়োগকর্তাকে ৫,০০০ পাউ- পর্যন্ত সাইন-অন এবং রিটেনশন বোনাস দিতে বাধ্য করেছে এবং সরকারী তথ্যে রেকর্ড সংখ্যক চাকরিতে শূন্যপদের সৃষ্টি হয়েছে। সিবিআই বলেছে যে, অভিবাসনের উদ্দেশ্যে চালক, ওয়েল্ডার, বুচার এবং ইটভাটার লোকদের পেশা অভাব হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা উচিত। এটি ভিসা পেতে সহজে প্রবেশাধিকার দেবে। কিন্তু একই সাথে বৃটেনের নতুন অভিবাসন ব্যবস্থার অধীনে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বেতন কাঠামোর নির্ধারিত সীমার নিচে বেতন প্রদানের জন্য তাদের স্পন্সরকারীদের সহায়তা করতে হবে।

সরকার নিয়োগকর্তাদের আহ্বান জানিয়েছে শূন্যপদ পূরণের জন্য তাদের ব্রিটিশ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে। কিন্তু সিবিআই বলেছে যে এজন্য দুই বছর সময় লাগবে।
এতে বলা হয়েছে, মহামারী এবং সঠিক অভিবাসন বিধি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এই বছরের ১ জানুয়ারী বেশিরভাগ ইইউ কর্মীদের মুক্ত চলাচলের সমাপ্তির জন্য প্রস্তুত করা কঠিন করে তুলেছিল।

সিবিআই মহাপরিচালক টনি ডেঙ্কার বলেছেন, সরকার একটি অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যা বিদেশী শ্রমিকের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের পরিবর্তে আমাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার দিকে মনোনিবেশ করবে। তবুও আমাদের এখানে সুস্পষ্ট এবং স্বল্পমেয়াদী দক্ষদের চাহিদা রয়েছে কিন্তু এমন একটি সিস্টেম যা পূরণে সাড়া দিচ্ছে বলে মনে হয় না।
সিবিআই বলছে, কোন চাকরির জন্য কোন ধরণের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে সেটার জন্য সরকারও অফিসিয়েল পরামর্শ মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কোন ধরনের প্রশিক্ষণ অভাবের অবস্থায় সরকারী শিক্ষানবিশ স্কিমের অধীনে সহায়তার জন্য যোগ্য কিনা সেক্ষেত্রেও খুব সীমাবদ্ধ ছিল।

বৃটেনের সরকার তার অভিবাসন নিয়ম সহজ করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। গত মাসে বিজনস মিনিস্ট্রি খুচরা বিক্রেতা এবং লজিস্টিক ফার্মের ট্রাক চালকদের ছাড়ের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং বলেছিল যে শিল্পের পরিবর্তে বেতন এবং শর্তগুলি উন্নত করা উচিত।
সিবিআই বলেছে যে ৩০ সেপ্টেম্বর সরকারের ফার্লো কর্মসূচির সমাপ্তি। যখন কয়েক লক্ষ বেসরকারি খাতের কর্মীরা বেকার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা আশাকরি না যে, তখন কোম্পানিগুলির জন্য কর্মী খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ করে দেবে।
এদিকে, দ্য রিক্রুটম্যান্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট কনফেডারেশন (আরইসি) এর সর্বশেষ হিসাব মতে, গত আগস্ট শেষে যুক্তরাজ্যে মোট ভেকেন্সির পরিমাণ বেডে ১৬ লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সুপারমার্কেট, ফার্স্ট ফুড এবং পাব চেইনগুলো সম্মিলিতভাবে সরকারের কাছে আহবান জানিয়ে বলেছে, শর্টেজ ওকুপেশন লিস্টের পরিধি বাড়িয়ে দ্রুত কর্মী সংকট মোকাবেলায় ব্যবস্থা নিতে। যাতে তারা বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দিতে পারে।

কর্মী সংকটের শীর্ষে থাকা খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে, লরি ড্রাইভার, নার্স, কেয়ার ওয়ার্কার, প্রোগ্রাম অ্যান্ড সফটওয়্যার ডেভেলপার, প্রাইমারি অ্যান্ড নার্সারি শিক্ষক, শেফ, সেলস অ্যান্ড রিটেইল এসিসটেন্ট, কার্পেনটার অ্যাণ্ড জয়েনার এবং মেটাল ওয়ার্কিং প্রোডাকশন অ্যান্ড মেইটেইন্যান্স। ব্রেক্সিট এবং করোনা মহামারীর কারণে এমন সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্রেক্সিটের কারণে ইইউ থেকে কর্মী আসা বন্ধ হয়ে গেছে। করোনা মহামারী, বেক্সিট, অভিবাসন নীতির পরিবর্তন এবং ট্যাক্সর নিয়ম পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাজ্যে এখনও ১ লাখ ৬৬ হাজারের কর্মী কাজে ফেরেনি।

যুক্তরাজ্যের সুপার মার্কেট গুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খাদ্য সংকট চূড়ান্ত আকারে পৌঁছেছে। করোনাকালীন সময়েও এমন সংকট তৈরী হয়নি। সুপারমার্কেট টেসকো লরি ড্রাইভার হিসেবে যোগ দিলেই এক হাজার পাউ- অগ্রীম বোনাস ঘোষণা করেছে। লরি ড্রাইভারদের বেতন ঘন্টাপ্রতি ১৭ পাউ- থেকে বাড়িয়ে ২৪ পাউণ্ড করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের একটি বৃহৎ সুপার মার্কেট চেইন ওয়েইট্রোজ অ্যান্ড পার্টনার্স। ১৯০৪ সালে সালে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানিটি এখন তাদের সুপারশপে পণ্যের যোগান দেওয়া নিয়ে সমস্যার মুখে।
সরবরাহ বাড়াতে তারা বৃহৎ পণ্যবাহী যান (এলজিভি) চালকদের ৫৩ হাজার ৭৮০ পাউন্ড বার্ষিক বেতনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে। এ বেতন ওয়েইট্রোজ এর মূল মালিকানা কোম্পানি লিউইজ পার্টনারশিপ যে বেতনে সদর দপ্তরের কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দেয় তার থেকেও বেশি। যেমন; লিউইজ পার্টনারশিপ দুজন জ্যেষ্ঠ পদমর্যাদার নির্বাহীকে দেয় মাত্র ৪৫ হাজার পাউন্ড করে, আর একজন একজন আর্থিক বিশ্লেষককে দিচ্ছে ৪৬ হাজার ৭শ পাউণ্ড।

খবরে বলা হয়েছে, ওয়েইট্রোজের চালকরা বর্তমানে ৫৩ হাজার ৭৮০ ডলারের যে আকর্ষণীয় বেতন পাচ্ছেন তা গড়পড়তা একজন মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষকের ৪০,৮৮০ পাউণ্ড আয়ের চাইতে বেশি। সে তুলনায় একজন আইনজীবী ও প্রকৌশলীর বার্ষিক গড় আয় যথাক্রমে ৪০ হাজার ৮৮০ ও ৪৩ হাজার ১৯০ পাউণ্ড। মূল কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে ৯০ হাজার লরি চালকের বিশাল সংকটের কথা। যে কারণে সঠিক সময়ে সুপার মার্কেট, রেস্তোরাঁ ও পানশালায় পণ্য পৌছাতে পারছে না। নান্দোস ও ম্যাকডোনাল্ডস- এর মতো বড় রেস্তোরাঁ চেইনও যার ফলে তাদের মেন্যু থেকে জনপ্রিয় কিছু খাবার সাময়িকভাবে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্যমতে, সুপার মার্কেট গুলোতে মুরগীর মাংস, মুরগীর মাংসের তৈরিকৃত খাদ্য, দুধ, দুধজাতীয় খাদ্য, বিয়ারসহ বেশ কিছু পন্যের ভয়াবহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু মাত্র খাদ্য সংকটই নয় পেট্রোল স্টেশন গুলোতে তেল নাই। আর এর কারন গাড়ির স্টেশন গুলোতে তেল আনা ও পূর্ন করার জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে যুক্তরাজ্যে নার্স ও কেয়ার ওয়ার্কার সংকট প্রসঙ্গে ইউকে হোম কেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ড. জেন টাউনসন জানান, তার দেখা সব থেকে খারাপ সময় এইটি। কর্মী সংকটের কারনে বেশিরভাগ মানুষকে ওভারটাইম করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তারা বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দিলেও কর্মী পাচ্ছেন না। সর্বশেষ তথ্যমতে, গত সপ্তাহে বিভিন্ন চাকরির ওয়েব সাইটে ৭ হাজার ১৯৬ জন লরি ড্রাইভারের বিজ্ঞপ্তি ছিলো। ৭৯ হাজার ১২৩ জন নার্স ও ৪৯ হাজার ৭৫১ জন কেয়ার ওয়ার্কারের জন্য কর্মস্থল খালি রয়েছে।

এদিকে, কর্মী সংকটের কারণে যুক্তরাজ্যে খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে চলেছে। প্রায় সব পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রেক্সিটের আগে সুপারমার্কেটে একটি কলা বিক্রি হতো ১৮ পেন্স। এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে ২৫ পেন্স। ২০২০ সালের আগস্টে টমেটো প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ৭৫ পেন্স করে। এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে ১ পাউন্ড ৪৭ পেন্স। একইভাবে গত বছর একই সময় ব্রাউন বাল্ব পেয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৪৩ পেন্স করে। চলতি সময় এসে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৩ পেন্স করে।

সুরমা প্রিণ্ট ভার্সন

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close