নিউজ

স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী বাংলাদেশের বাতাস: ৬ শতাধিক গুম!

*গুমকে উৎসাহিত করছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি: মার্কিন কংগ্রেস
*গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন: সরকারকে ফখরুল
*দেশে গুম শুরু বিএনপির আমলে: কাদের
*গুম-খুনের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করিনি: জাফরুল্লাহ

।। সুরমা ডেস্ক ।।
লণ্ডন, ৬ সেপ্টেম্বর : বিশ্ব গুম প্রতিরোধ দিবসে আবারো স্বজনহারাদের কান্না ও গভীর নিঃশ্বাসে ভারী হয়ে উঠলো বাংলাদেশের বাতাস। গুমের বেশীরভাগই আইন শৃংখলাবাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। এনিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও বেশ সমালোচনা হচ্ছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১৫ বাংলাদেশে ৬ শতাধিক ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন। দেখা গেছে যে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের বেশীরভাগই বিরোধী মতের লোক। এদের মধ্যে ভাগ্যক্রমে যারা ফিরে এসেছেন তাদের সংখ্যা অতি নগন্য। বেশীরভাগই লাশ হয়েছেন এবং কাউকে কাউকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আর এখনও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি অনেকের। তাদের ফেরার আশায় বুক বেঁধে আছেন স্বজনরা। সেই স্বজনরাই আবার জড়ো হয়েছিলেন তাদের আপনজনের ফিরে পাবার দাবী নিয়ে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচীতে।

২০১২ সালে রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা মহাখালী থেকে গাড়ীর ড্রাইভারসহ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী আলোড়ন তোলে। এরপর থেকে বাংলাদেশে গুম এক নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী এমপিরা গুম বিষয়ে সমালোচনার জবাবে বিভিন্ন দেশে গুম হওয়ার কথা বলে থাকেন। কিন্তু সচেতনে তাদের এই জবাব গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তাদের মতে, বিভিন্ন দেশে গুমের নজিন থাকলেও তাতে সেসব দেশের আইন শৃংখলাবাহিনীর কোনো জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের আলোচিত নারায়ণগঞ্জের র‌্যাব কর্তৃক সেভেন মার্ডারসহ বিভিন্ন গুমের উদাহরণ রয়েছে। আর গুম ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের আইন-শৃংখলাবাহিনীর মতো বাংলাদেশ সদিচ্ছাও দেখা যায়নি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, গত ১৫ বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর ৬১৪ জন নিখোঁজ বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। জীবিত ও মৃত অবস্থায় ওই ব্যক্তিদেও বেশির ভাগের খোঁজ মিললেও অন্তত ২০০ জন এখনো নিখোঁজ।
আর চলতি মাসেই বাংলাদেশের ৮৬টি গুমের তথ্য তুলে ধরেছিল নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)।
এদিকে, গুম প্রতিরোধ দিবসে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনে বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নিয়ে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। সভায় অবাধ বিচারহীনতার সংস্কৃতি গুমকে উৎসাহিত করছে বলে মন্তব্য করেন বক্তারা হয়। এর আগে জুন মাসে ‘গুম’ হওয়া ৩৪ জনের অবস্থান ও ভাগ্য জানতে চেয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিস-অ্যাপিয়ারেন্স বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায়। ৩৪ জনের তালিকার বেশীরভাগ ব্যক্তিকেই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ৩০ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে থাকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম থেকে সবার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে গুমের হাত থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারটি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আসে এবং কাউকে গুম করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃতি পায়। ২০১১ সাল থেকে ৩০ আগস্ট গুম হওয়া মানুষগুলোকে স্মরণ এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য দিবসটি পালন করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। সনদ অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির কোনো প্রকার হদিস না পাওয়া গেলে এবং সরকার, প্রশাসন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যা করে মৃতদেহ লুকিয়ে ফেললে সেটি গুম বলে বিবেচিত হবে।

গুমকে উৎসাহিত করছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি: মার্কিন কংগ্রেস
বাংলাদেশে গুম পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশন সম্প্রতি এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভার আয়োজন করে।
বাংলাদেশে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের উদ্দেশ্যে গুমের মাধ্যমে একধরনের ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে। অবাধ বিচারহীনতার সংস্কৃতি গুমকে উৎসাহিত করছে। গুমের এই চর্চা বাংলাদেশে বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর তদন্ত করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে গুম পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনের এক ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেছেন। মানবাধিকার রক্ষায় কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এই কমিশন।
ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেস সদস্য জেমস পি ম্যাকগভার্ন ও রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেস সদস্য ক্রিস্টোফার স্মিথের উদ্যোগে গত ৩১ আগস্ট, মঙ্গলবার এই ভার্চ্যুয়াল আলোচনা সভা হয়। তাঁদের দুজনই কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনের কো-চেয়ারের দায়িত্বে আছেন।

আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশে গুম বন্ধে জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের ভূমিকার ওপর জোর দেন। বিশেষ করে গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গে র‌্যাবের নাম আসায় বাহিনীর জ্যেষ্ঠ সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
এই আলোচনার আগের দিন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম সভার আয়োজক মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য জেমস পি ম্যাকগভার্ন ও ক্রিস্টোফার স্মিথকে চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি গুমের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূত লেখেন, নিখোঁজের সব ঘটনাকে গুম হিসেবে বর্ণনা করার মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি ও অর্জনকে ক্ষুন্ন করাটা উদ্বেগের। কারণ ‘ঘটনার শিকারে’ পরিণত হওয়া লোকজনের ফিরে আসার মাধ্যমে প্রমাণিত ‘তথাকথিত গুমের’ অভিযোগ মিথ্যা। কিছু দুষ্কৃতকারী র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে অপহরণে যুক্ত আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা আর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

মার্কিন কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনের ভার্চ্যুয়াল সভায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনেন কংগ্রেস সদস্যরা। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, গুম নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানটা কী, তা এই আলোচনা শুরুর আগে রাষ্ট্রদূতে চিঠি থেকে স্পষ্ট। অনেকের আশঙ্কা, সরকারের এ নিয়ে জবাবদিহির কোনো ইচ্ছাই নেই। এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে যে ৮৬ জনের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা আইনের আওতায় আসেননি। এইচআরডব্লিউর এই কর্মকর্তা বলেন, র‌্যাবের বিরুদ্ধে যখন এত অভিযোগ, তখন তাদের বিচারহীনতায় রাখার মধ্য দিয়ে গুমকে উৎসাহিত করা হয়। এতে র‌্যাব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় কি না, সেটাই এক প্রশ্ন।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘কোভিড-১৯ মোকাবিলা নিয়ে সারা বিশ্বে তুমুল সমালোচনা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে এ নিয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করতে গিয়ে লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট আহমেদ কিশোরের যে পরিণতি হয়েছে, সেটি আমাদের উদ্বিগ্ন কওে তোলে।’
আলোচনায় ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে গুমের একটি মামলারও বিচার হয়নি কেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। তার চেয়ে বিস্ময়ের ঘটনা হচ্ছে, যাঁদের নিরাপত্তা বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যায়, বের হয়ে আসার পর তাঁরা নিশ্চুপ হয়ে যান। ফলে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। কথা বলতে হলে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়। এ রকম এক নিপীড়নকারী সরকারের শাসনে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন যখন থাকে না, সংসদে যখন কোনো জবাবদিহির সুযোগ নেই, তখন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ দুরূহ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিস্থিতি উত্তরণের একমাত্র পথ।’
এশিয়ান মানবাধিকার কমিশনের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, র‌্যাবকে বিচারহীনতার আওতায় রেখে কর্মকা- চালাতে দিয়ে ভিন্নমতের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে। কারণ, গ্রেপ্তার এবং গুমের জন্য যখন কাউকে বীর হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়, তখন পরিস্থিতি বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
বিএনপির নেতা সাজুদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তাঁর ভাইসহ গুমের শিকার সবার খোঁজ জানতে চান। গুমের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনাটা জরুরী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
টেক্সাস থেকে ১১ বার নির্বাচিত ডেমোক্রেট কংগ্রেস সদস্য শীলা জেকসন লি প্রশ্ন করেন, এই পরিস্থিতির উত্তরণে নাগরিক সমাজকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে পারে? শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়ে কী করা যেতে পারে?
জবাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন রবার্ট এস কেনেডি হিউম্যান রাইটসের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলিটা বায়েনেস বলেন, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অভিযুক্তদের নিয়োগের (শান্তিরক্ষা) সময় তার ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন: সরকারকে ফখরুল
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গুম হওয়া পরিবারের অসহায়ত্বের দায় সরকারের, তাই সরকারকেই এই দায় নিতে হবে।
গত ৩০ আগস্ট, সোমবার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বিএনপি মানবাধিকার সেলের উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন।

ফখরুল বলেন, ‘সরকার বলছে, এখানে গুম হয় না। তা হলে যাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁরা গেলেন কোথায়? তাঁদের খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফেরত দিতে হবে। এটা অবশ্যই সরকারকে করতে হবে। অন্যথায় জনগণের আদালতে আপনাদের বিচার করা হবে।’
গুম হওয়া পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ তাঁর বাবার ছবি, কেউ তাঁর ভাইয়ের ছবি, কেউ তাঁর সন্তানের ছবি, কেউ তাঁর স্বামীর ছবি হাতে নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই পরিবারগুলোর অসহায়ত্বের দায় কে নেবে? এখানে অনেকে আছেন, ৯–১০ বছর ধরে তাঁদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী, ঢাকার কমিশনার চৌধুরী আলমসহ আজকে আমাদের ৫০০ এর অধিক নেতা-কর্মী গুম হয়ে গেছেন অনেক বছর ধরে। ইলিয়াস আলীর মেয়ে এখন বড় হয়েছে, সে এখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে যে কখন তার বাবা ফিরে আসবেন। বাবা ফিরে আসেন না।’
বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এমন দেশ, এমন রাষ্ট্র আমরা বানালাম, যেখানে আমার সন্তানেরা নিখোঁজ হয়ে যাবে, তাদের হদিস কেউ খুঁজে পাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা তাদের তুলে নিয়ে যাবে, সরকার তার কোনো জবাব দেবে না। আমরা তো আমাদের চোখের পানি রাখতে পারি না। অসহায়ত্বের বেদনার যন্ত্রণা আমাদের কুরে কুরে খায়। তোমাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বলতে চাই, আমরা আর কিছু না করতে পারি, আমরা শুধু তোমাদের পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে চাই যে আমার ভাইকে, আমার বাবাকে, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দাও। আমরা এখান থেকে মুক্তি চাই।’

ফখরুল বলেন, ‘এই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বেআইনিভাবে অবৈধভাবে গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের সংবিধানকে ধ্বংস করেছে, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছে, গোটা প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে। সে জন্য আমাদের উচিত হবে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সরকারকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করে একটা সত্যিকার অর্থেই জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। যে সরকার এই অসহায় বাচ্চাগুলোর, এই পরিবারগুলোর যাঁরা হারিয়ে গেছেন, তাঁদের বের করে নিয়ে আসার জন্য তারা কাজ করবে।’
বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে অন্যান্যের মধ্যে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, গুম হওয়া মো. সোহেলের মেয়ে সাবা, মো. কাউসারের মেয়ে মীম, সেলিম রেজার বোন রেহানা আখতার মুন্নী, সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আখি ও খালেদ হোসেনের মেয়ে শাম্মী আখতার নিপা বক্তব্য দেন।

গুম-খুনের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করিনি: জাফরুল্লাহ
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গুম-খুন হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিজেকে আমার অপরাধী মনে হয়; লজ্জা পাই। কারণ এ দেশের জন্য আমারও অবদান আছে। আমরা গুম-খুনের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করিনি।

সোমবার আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে খুন, গুম ও অপহৃত হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন জাফরুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে গুম-খুনের তথ্য উদ্ঘাটনে প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি করার দাবী জানান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, আজকে এ জিনিসের (গুম) অবসান প্রয়োজন। সে জন্য প্রাক্তন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, এটিএম আফজাল, এমনকি ফজলুল করিমও হতে পারেন; এর সঙ্গে আমাদের অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি করে এটা পরিষ্কার করা হোক। জাতিকে পরিষ্কার করে বলুক- এ ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সরকার উন্নয়নের কথা বলবে, আর ঘর থেকে ডেকে নিয়ে মানুষ গুম করে ফেলবে; খবরও দেবে না- ওই রকম রাষ্ট্র আমরা চাই না।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, গুম-খুনের বিচার হবে। একদিন এ দেশের মাটিতেই তাদের বিচার হবে। প্রধানমন্ত্রীকে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আসিফ নজরুল বলেন, রাষ্ট্র কেন গুম হওয়াদের বের করার ব্যবস্থা করে না? তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি না- এদের গুমের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কারণ জড়িত।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, আজ শুধু দেশের অভ্যন্তরে গুম হচ্ছে না। এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশে। পরে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আরেক জায়গায়। এই যে আন্তঃদেশীয় ব্যবস্থা; এটা কখনোই রাষ্ট্রীয় সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়।
আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, যতদিন পর্যন্ত বিচার না পাওয়া যাবে, ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

গত ৩০ আগস্ট, সোমবার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি চলে প্রায় তিন ঘণ্টা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ অনেক সাধারণ মানুষ। (সূত্র: প্রথম আলো)

দশে গুম শুরু বিএনপির আমলে: কাদের
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দাবি করেছেন, দেশে গুম শুরু হয়েছিল বিএনপির শাসনামলে।
আওয়ামী লীগের শাসনে গত এক যুগে পাঁচশ’র বেশি মানুষ গুম হয়েছে বলে বিএনপির অভিযোগের জবাবে গত ৩১ আগস্ট, মঙ্গলবার এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্যে এই দাবি করেন তিনি।
জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ঢাকার কৃষিবিদ ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে কৃষক লীগের আলোচনা সভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, “শেখ হাসিনার সরকার গুম-খুনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। দেশের মানুষ জানে এদেশে গুম খুনের রাজনীতি চালু করেছে বিএনপি।
“ঢাকা সিটি ছাত্রলীগের নেতা মাহফুজ বাবু কোথায়? যে রাতে অন্ধকারে নিয়ে গিয়েছে জিয়াউর রহমানের বাহিনী, চট্টগামে টর্চার করতে করতে মেরে ফেলা হয়েছে। তার লাশ আমরা দেখিনি।”
বিএনপি মহাসচিবকে উদ্দেশ করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, “২০০১ এর পর আপনারা কত হাজার মানুষকে গুম করেছেন? জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে ওই নভেম্বর মাসে সেনাবাহিনীর কত অফিসারকে গুম করে হত্যা করেছেন? সেই ইতিহাস কি মুছে গেছে? গুমের ইতিহাস তো আপনাদের।
“আপনাদের দলের নেতা খালেদা জিয়ার আমলে চট্টগ্রামের বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিনকে গুম করা হল। গুম শব্দটা আপনারাই চালু করেছেন জিয়াউর রহমানের আমলে, বেগম জিয়ার আমলে সেটা আরও ১০ গুণ বেড়েছে।”
বিএনপি গুমের ঘটনা সাজাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ওবায়দুল কাদের। (সূত্র: বিডিনিউজ)

সাপ্তাহিক সুরমা প্রিণ্ট ভার্সন

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close