মুক্তচিন্তা

রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা জিয়া: রাজনীতিই তাঁকে প্রতিপক্ষের আসনে বসিয়েছে

।। ডক্টর এম মুজিবুর রহমান ।।

লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক। সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

এক:
গত কিছুদিন ধরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে একটি মহলের অপপ্রচার চলছে। ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা থেকে এখন তাঁর কবর এবং লাশ নিয়েও চলছে কুতর্ক। রাজনৈতিক সমালোচনা গণতন্ত্রের ভিতকে মজবুত করে কিন্তু শহীদ জিয়া সম্পর্কে যেসব বক্তব্য উঠে এসেছে তা ইতিহাস ও বাস্তবতার সাথে শুধু অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষী মনোভাব এবং যা দেউলিয়া রাজনীতির নগ্ন বহিঃপ্রকাশ । স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা, ইতিহাসবিদ এবং তখনকার সামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গ্রন্থের দালিলিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়াউর রহমান ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রমাণিত হয় । মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠন ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার বাস্তব পদক্ষেপসমূহ জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই শুরু হয়। আর এজন্যই আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের দোসরদের কাছে জিয়াউর রহমান বড়ই মনোবেদনার কারণ।  

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির দিকে চোখ রাখলে এটা বুঝার জন্য বড় বিশেষজ্ঞ বা পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পরে না যে, কারা বাংলাদেশে বিদ্বেষ, বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি জিইয়ে রাখতে চায়। বাংলাদেশকে কারা মর্যাদাবান রাষ্ট্রের উত্থান থেকে পিছিয়ে রাখতে চায়। স্বাধীনতা যুদ্বে মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বকে বিতর্কিত করা গেলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের যুদ্ধেকে অন্য একটি দেশের সাথে পাকিস্তানের আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে চিত্রায়িত করার পথটি আরো সুগম হয় । হয়তো আমাদেরকে চরম মূল্য দেয়ার জন্য আগে থেকেই তৈরী করা হচ্ছে। এছাড়া দেশের রাজনীতিতে একজনকে সবার উপরে স্থান দিতে গিয়ে অন্যদের ম্লান করার জোরালো প্রচার চলছে। 

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং অগণিত শহীদের আত্মত্যাগের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলো পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। যদিও ভারতীয় বাহিনী এ যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়েছিলো একেবারে শেষের দিকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। অথচ ভারতের অনেকেই ১৯৭১ সালে সংগঠিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেকে নিতান্তই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করতে পছন্দ করেন। এটা কি শুধু বলার খাতিরে বলা নাকি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ, বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে তা আজ প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে?

প্রথম বিশ্বযুদ্বে জার্মানি পরাজিত হলে তার পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ মিত্র বাহিনীর সহযোগিতায় জার্মানি থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। জার্মানির পূর্বেকার সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার অদম্য বাসনা থেকেই হিটলার তার দেশের জনগণকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের দিকে ধাবিত করেন। একটি দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্রোতধারা এবং বৃহৎ প্রতিবেশীর আচরণ, সর্বোপরি উক্ত অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির গতি প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে । তাই ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে সহনশীলতার বিপরীতে বিদ্বেষ, বিভাজনের রাজনীতি ও প্রতিহিংসামূলক কর্মকান্ড আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে ।  

দুই:
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রয়াত অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ তাঁর একটি গবেষণামূলক লেখায় উল্লেখ করেন, ”বাংলাদেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য করুন, দেখবেন, যে যে ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমান ব্যর্থ হয়েছেন ওই সব ক্ষেত্রেই জিয়াউর রহমানের সাফল্য আকাশচুম্বী। এই ঐতিহাসিক সত্যই বাংলাদেশের রাজনীতিকে করে তুলেছে সংঘাতময়। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেতা নেত্রীর নিকট এই সত্য দুঃসহ এক বোঝার মতো হয়ে রয়েছে। তারা না পারছেন এটা ভুলতে, না পারছেন ফেলতে। তাই তারা জিয়ার সকল সৃষ্ঠির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন। ….লক্ষ্য একটাই শেখ মুজিবকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে হবে হবে। এদেশে তার মতো অন্য কোনো নেতার জন্ম হয়নি – একথা যেন তারা শতমুখে বলতে পারেন, তার উপর দেবত্ব আরোপ করে এরই মধ্যে শেখ মুজিবকে মাটি থেকে আকাশে তোলা হয়েছে। ” মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে জনমনে তুলে ধরেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং দেশ পরিচালনায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অন্য সবার থেকে আলাদা । আর এটাই অন্য পক্ষের মনোক্ষুন্নের কারণ।

ব্যক্তিগতভাবে জিয়া কারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নন। তাঁর রাজনীতিই তাঁকে প্রতিপক্ষের আসনে বসিয়েছে। । ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র যাত্রা শুরু করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান। এর ফলে ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগসহ নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে বিএনপি’র প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু হয়। এসময়েই বিচারব্যবস্থায় স্বাধীনতা ফিরিয়ে বাক স্বাধীনতা নিশ্চিতকল্পে সংবাদপত্রের উপর থেকে প্রত্যাহার করা হয় সকল নিষেধাজ্ঞা ।  বাকসর্বস্ব ও মেধাহীন রাজনীতির বিপরীতে জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতা ও সততার সমন্বয়ে জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেন । জাতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জায়গায় তিনি রাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। রাষ্ট্রভিত্তিক জাতিয়তাবাদের দর্শন দেশের ধর্ম- বর্ণ- গোত্র- নৃ গোষ্ঠী তথা আপামর সকল মানুষকে অভিন্ন প্লাটফরমে এনে দাঁড় করায় । ফলে বাংলাদেশ বিভেদ ও হানাহানির বাইরে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি তৈরির জন্য একটা সুনির্দিষ্ট পাটাতন লাভ করে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শনেই জাতিসত্ত্বার সঠিক স্বরূপটি মূল্যায়িত হয়, যা আমাদের ভৌগলিক জাতিসত্ত্বার সুনির্দিষ্ট পরিচয় দান করে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশীদের আত্মপরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। রাষ্ট্রভিত্তিক জাতিয়তাবাদের দর্শন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখারও সাহসী অঙ্গীকার।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় মেধা, দক্ষতা ও সততার সমন্বয় ছাড়া জাতি গঠনের রাজনীতির সফলতা মানুষের দ্বারগোড়ায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সততার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্বে জিয়াউর রহমান ছিলেন সোচ্চার। মেধাবী ও দক্ষ লোকদের রাষ্ট্র গঠনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাছে টেনেছিলেন । রাজনীতিতে স্ব স্ব ধর্মের একটা অবদান থাকতে পারে । তাই ধর্মের আবেগকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল নয় বরং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আধুনিক ও সৃষ্টিশীল চিন্তা-চেতনার সমন্বয়ে গণমুখী ও কল্যাণকর রাজনীতির ধারা সূচনা করেন তিনি। যা দেশে হয় সমাদৃত ।  বিশ্ব রাজনীতি বিশেষ করে গণতান্ত্রিক মুসলিম দেশসমূহের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে চার দশক পূর্বে ঘোষিত জিয়াউর রহমানের রাজনীতির চিন্তা-চেতনা ছিল কতটা বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন । ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতাকে বিকশিত করার পাশাপাশি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর রাজনীতির ভিতকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে একটি আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের রাজনীতির প্রবক্তা শহীদ জিয়া।

জিয়া রাজনীতিতে ডান, বাম এবং মধ্যপন্থার চিন্তাশীল মানুষদের গণতন্ত্রের বিকাশ এবং দেশ গঠনে একত্রিত করে উজ্জীবিত করেছিলেন। স্বাধীনতার পর নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র এবং পরবর্তীতে একদলীয় বাকশালের বিপরীতে বহুদলীয় রাজনৈতিক চর্চা বিকশিত হয় তাঁর শাসনামলে । অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির পাশাপাশি গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিকরণের স্বার্থে সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। বহুদলীয় রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দানে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে ভারতে প্রেরণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনেন।

জেনারেল বা রাজনীতিবিদের কোনোটাই জিয়ার সঠিক পরিচয় নয়। ইতিহাসে জিয়া অভিহিত হবেন একজন স্টেটসম্যান বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। রাষ্ট্রনায়কের বিভিন্ন সংজ্ঞা আছে। প্রথমেই যেটা বলা হয়, তা হচ্ছে একজন রাজনীতিবিদ শুধু পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন। আর রাষ্ট্রনায়কের থাকে ভিশন, স্বপ্ন এবং তিনি ভাবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। একজন রাজনীতিবিদ একটি প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে তর্ক করেন আর রাষ্ট্রনায়ক আলোচনা করেন প্রকল্পের উপযোগিতা।

ঢাকায় একসময় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্দূত উইলিয়াম বি বাইলাম লিখেছেন, জিয়া যদি ১৯৮১ এর পরিবর্তে ১৯৭৫ সালে নিহত হতেন তাহলে বাংলাদেশ আফগানিস্তান অথবা লাইবেরিয়ার মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে যেতে পারত। মাইলাম লিখেছেন, ‘অবশ্য সেনা শাসকদের মতো কঠোর পদ্বতিতে নয়, গণতান্ত্রিক পদ্বতিতে জিয়া বাংলাদেশকে ওই অবস্থা থেকে রক্ষা করেছেন।‘ রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাতের পর ১৯৮১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট আয়োজিত এক সভায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কমনওয়েলথের তদানীন্তন মহাসচিব স্যার সিদ্ধার্থ রামফাল বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়া বাংলাদেশে শুধু একদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠা করেননি; এ উন্নয়নকর্মী দেশকে সার্বিক উন্নয়নের রাজপথে পরিচালিত করেছিলেন।‘

তিন:
জিয়াউর রহমানের বিরুদ্বে বিষোদ্গার ও অপপ্রচারের আরেকটি কারণ হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়ার সাহসিকতা ও ঈর্ষণীয় সাফল্য। জিয়া হচ্ছেন ইতিহাসের হাতেগোনা জেনারেলদের একজন, যিনি সামরিক অফিসার হিসেবে মাতৃভূমির জন্য দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ব করেছেন । দুটি যুদ্ধই জিয়ার জীবনকে দিয়েছে গৌরবের মর্যাদা। জিয়ার রণকুশলতা সর্ম্পকে ভারতের ইষ্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল অরোরোও প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জিয়ার নেতৃত্বে যদি অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ না করতো তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কিনা সন্দেহ ছিল।’

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আমাদের যে জাতীয় অঙ্গীকারগুলো ছিল দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আজ তা সুদূর পরাহত। আগে যারা আত্মস্বার্থ ত্যাগ করে জাতীয় স্বার্থের জন্য লড়াই করেছেন, তাদের জায়গায় এখন আত্মস্বার্থ কায়েমকারীরা জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু জিয়া তাঁর স্বল্পকালীন শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি যে গভীর দেশপ্রেম, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা আজও কেউ অতিক্রম করতে পারেননি। রাজনৈতিক বিরোধীরাও তাঁর সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেনি। তাই জিয়াউর রহমানের রাজনীতিকে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে কাগুজে ফরমান জারির মাধ্যমে তাঁকে মুছে ফেলার বিকৃত মানসিকতা রাজনৌতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ বৈ অন্য কিছু নয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পূর্বাপর ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী সামরিক অফিসারদের লিখিত দালিলিক তথ্য-উপাত্ত এবং জীবিত মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক অফিসারদের বয়ানে যেসব তথ্যাদি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে তাতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করে যে, জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে একটি গোষ্ঠী বিদ্বেষ, বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতিকে উস্কে দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণাকে প্রশ্নবিদ্ব করে পাকিস্তানের বিরুদ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে অন্য একটি দেশের যুদ্ধ বলে প্রচারণায় ঘি ঢালছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে সম্মুখ সমরে জিয়ার বীরত্মগাঁথা ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে । স্বাধীনতা যুদ্ধের ঊষালগ্নে নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ না করার হীনমন্যতা কাটাতে যারা জিয়াকে খাটো করার অপচেষ্টা করছেন তাদেরকে দেশের জনগণ ও ইতিহাস ক্ষমা করবে না, করতে পারে না ।

চার:
জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ১৫ আগস্টের হত্যার মদদের অভিযোগ করে থাকে আওয়ামী লীগ । তবে সত্য হলো আওয়ামী লীগ আমলে দায়েরকৃত ও বিচারকৃত মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে জিয়াকে আসামি করা হয়নি, প্রকাশিত রায়ে হত্যাকাণ্ডে জিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথাও বলা হয়নি। আর ১৯৭২ সালে মার্চ মাসে রক্ষীবাহিনী গঠনের পর তাদের অত্যাচার, নির্যাতন, লুটতরাজ ও গোপনে-প্রকাশ্যে হত্যাকান্ডের দায় থেকে মুক্তি দিতে ১৯৭৪ সালে জাতীয় রক্ষীবাহিনী আইনের সংশোধনীতে প্রথম ইনডেমনিটি দেয়া হয়।

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে ‘উই রিভোল্ট’ বলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। রণাঙ্গনে জিয়াউর রহমান সম্মুখ সমরে অংশ নেয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা প্রণয়নেও তাঁর বুদ্বিদীপ্ত ভূমিকার কথা মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন লেখাতে উঠে এসেছে। তিনি যুদ্ধ ঘোষণা এবং নিজে যুদ্ধ করেছেন। তিনি ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাত্র ৫ মাসের মাথায় ১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট কুড়িগ্রামের রৌমারীতে যে স্বাধীন প্রশাসনের উদ্বোধন করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশে, এটি ছিলো শহীদ জিয়ার সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে রৌমারীতে স্বাধীন প্রশাসন প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাহস ও বীরত্বের একটি অনন্য উদাহরণ। মুক্তিযুদ্ধের শেষ ভাগে সিলেট অঞ্চলে তাঁর বাহিনীর কাছেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে অদম্য সাহসিকতার নিদর্শনস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব ও সম্মুখ সমরে বীরত্মের ইতিহাসকে খাটো করাসহ তাঁর কবর এমনকি লাশ নিয়ে যা বলা হচ্ছে   তা প্রতিহিংসামূলক এবং রক্তের বিভাজন ও বিদ্বেষ জিইয়ে রাখার অপকৌশল । রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাসমূহ রাষ্ট্রীয় মদদে গুম, খুন, দুর্নীতির অপশাসনে নিমজ্জিত রাষ্ট্রকে মাফিয়া রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করছে, তখন এ থেকে জনগণের দৃষ্টি আড়াল করতে জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের ইস্যুটি সামনে আনা হচ্ছে  । পাশাপাশি দেশে রাজনৈতিক বিদ্বেষ  সৃষ্টি করে হানাহানির পথকে উস্কে দেয়ার মাধ্যমে আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের পথকে সুগম করা। সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকির মূখে ঠেলে দেয়ার নামান্তর । 

বাংলাদেশের স্বাধীন স্বত্তা এবং আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান যাদের কাছে অপছন্দনীয় তাদের কাছে জিয়াউর রহমানের বীরত্মগাঁথা অন্তরজ্বালা সৃষ্টি করে। এজন্যই জিয়াউর রহমানের বিরুদ্বে তাদের বিদ্বেষী ও বিকৃত মানসিকতার অপপ্রয়াস লক্ষ্য করা যায় । তবে বাংলাদেশ ও জিয়াউর রহমান এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাতের তালু দিয়ে নিজের চোখ ঢাকা যায় কিন্তু সূর্যকে নয়। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ থেকে জিয়াউর রহমানের নাম যারা মুছে ফেলতে চান, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে একদিন তারাই নিক্ষিপ্ত হবেন। জিয়া একটি ইতিহাস, জিয়া একটি বৈপ্লবিক চেতনা।  তাই জিয়া বহন করছেন রাজনৈতিক অমরত্বের উত্তরাধিকার।
লণ্ডন, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close