মুক্তচিন্তা

নট এ পেনি নট এ গান, ইয়াহিয়া ভুট্টো-টিক্কা খান

।। ফারুক আহমদ ।।

লেখক: গবেষক, যুক্তরাজ‍্য প্রবাসী

বিলাতে বাংলার রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ খুব একটা উল্লেখযোগ্য না হলেও উনিশশ’ ষাটের দশক থেকে পূর্ব বাংলাকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্দেশ্যে গঠিত ‘বাংলা অ্যাকাডেমি’, ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউস’ ইত্যাদি সংগঠনের কর্মকাণ্ডে মহিলারাও জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রুকাইয়া কবীর, তালেয়া রহমান, বারবারা হক, রোজমেরি আহমদ (তাসাদ্দুক আহমদের জার্মান স্ত্রী), মিসেস ডায়েন লাম্ব (জাকারিয়া খান চৌধুরীর ইংরেজ স্ত্রী), রিজিয়া চৌধুরী, সুরাইয়া খানম, নোরা শরীফ (সুলতান মাহমুদ শরীফের আইরিশ স্ত্রী) ও নূরুন্নেসা চৌধুরী। ১৯৬৬ সালে ছয়-দফা আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় থেকে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং উৎসাহের সঙ্গে মিটিং-মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই যুক্তরাজ্যবাসী বাঙালি রাজনীতিসচেতন নেতৃস্থানীয় বাঙালি মহিলারা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং পরিস্থিতিকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর আক্রমণের খবর পাওয়ার পরপরই তারাও পুরুষদের পাশাপাশি নিজেদের মতো করে সংগঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করেন মিসেস জেবুন্নিসা বকস ও ফেরদৌস রহমান। এরা দু’জন অন্যান্য নেতৃস্থানীয় মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করে ২৮ মার্চ জেবুন্নিসা বখ্সের (১০৩ লেডবারি রোড, লণ্ডন ডব্লিউ১১) বাসায় একটি সভা আহ্বান করেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন লুলু বিলকিস বানু, সোফিয়া রহমান, ফেরদৌস রহমান, মিসেস জেবুন্নিসা বখ্স, হাসিনা চৌধুরী, শেফালী হক, মিসেস ফাজিলা-তুন-নিসা, নোরা শরীফ, মুন্নি রহমান, জ্যোৎস্না হাসান, কুলসুম উল্লাহ, সেলিনা মোল্লাসহ আরো অনেকে।

১৯৮৯ সালে লণ্ডনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘বাংলাদেশ উইমেনস্ অ্যাসোসিয়েশন্স ইন গ্রেট ব্রিটেন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মিসেস জেবুন্নিসা বখ্স বলেন: “পঁচিশে মার্চের আর্মি ক্র্যাকডাউনের আগে থেকেই আমরা বুঝতে পারছিলাম দেশে ভয়ঙ্কর একটা কিছু হতে যাচ্ছে। এদেশের খবরের কাগজে কিছু কিছু সংবাদ আসছিল। তাই আমরা মহিলাদের পক্ষ থেকে একটা কিছু করার কথা ভাবছিলাম। এরপর এলো ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাত। আমরা বুঝলাম, আর নয়, অপেক্ষা করার দিন শেষ হয়ে গেছে। এবার রাস্তায় নামতে হবে। এর জন্য চাই একটা সংগঠন। আমরা কয়েকজন আলাপ-আলোচনা করতে থাকলাম। অবশেষে ২ এপ্রিল আমার বাড়িতে (১০৩ লেডবারি রোডে) মিসেস ফেরদৌস রহমান, ঊর্মি রহমান, লুলু বিলকিস বানু এবং আরো দু’একজন একত্র হলাম এবং সেই দিনই আমাকে কনভেনার করে ‘বাংলাদেশ উইমেনস্ অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেট ব্রিটেন’ (বাংলাদেশ মহিলা সমিতি) গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে প্রায় তিন মাস এটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন মিসেস সোফিয়া রহমান। জনসংযোগের দায়িত্ব পালন করেন ফেরদৌস রহমান, আনোয়ারা জাহান ও মুন্নি রহমান। পরবর্তীকালে পারিবারিক অসুবিধার কারণে সোফিয়া রহমান সংগঠনের কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে জেবুন্নেসা বখ্স প্রেসিডেন্ট আনোয়ারা জাহান সেক্রেটারি ও খালেদা উদ্দিস ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। মূলত ‘বাংলাদেশ উইমেনস্ অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেট ব্রিটেন’-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ৩ এপ্রিল, শনিবার, টেমস নদীর তীরবর্তী চেরিংক্রস অ্যামবাকমেন্ট এলাকা থেকে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্য দিয়ে।

ভয়াল রাত। আমরা বুঝলাম, আর নয়, অপেক্ষা করার দিন শেষ হয়ে গেছে। এবার রাস্তায় নামতে হবে। এর জন্য চাই একটা সংগঠন। আমরা কয়েকজন আলাপ-আলোচনা করতে থাকলাম। অবশেষে ২ এপ্রিল আমার বাড়িতে (১০৩ লেডবারি রোডে) মিসেস ফেরদৌস রহমান, ঊর্মি রহমান, লুলু বিলকিস বানু এবং আরো দু’একজন একত্র হলাম এবং সেই দিনই আমাকে কনভেনার করে ‘বাংলাদেশ উইমেনস্ অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেট ব্রিটেন’ (বাংলাদেশ মহিলা সমিতি) গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে প্রায় তিন মাস এটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন মিসেস সোফিয়া রহমান। জনসংযোগের দায়িত্ব পালন করেন ফেরদৌস রহমান, আনোয়ারা জাহান ও মুন্নি রহমান। পরবর্তীকালে পারিবারিক অসুবিধার কারণে সোফিয়া রহমান সংগঠনের কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে জেবুন্নেসা বখ্স প্রেসিডেন্ট আনোয়ারা জাহান সেক্রেটারি ও খালেদা উদ্দিস ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। মূলত ‘বাংলাদেশ উইমেনস্ অ্যাসোসিয়েশন ইন গ্রেট ব্রিটেন’-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ৩ এপ্রিল, শনিবার, টেমস নদীর তীরবর্তী চেরিংক্রস অ্যামবাকমেন্ট এলাকা থেকে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্য দিয়ে।

এই সমাবেশকে সাফল্যমণ্ডিত করার লক্ষে জেবুন্নিসা বখ্স, ফেরদৌস রহমান, আনোয়ারা জাহান, সোফিয়া রহমান, মুন্নি রহমান, জেবুন্নিসা খায়ের, শেফালী হক, খালেদা উদ্দিন, পুষ্পিতা চৌধুরী ও সেলিনা মোল্লা প্রমুখের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে ৩ এপ্রিল ব্রিটিশ মিডিয়া ও জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সব মহিলাকে শাড়ি পরে আসতে হবে। যাতে ব্রিটেনের মানুষের জিজ্ঞাস্য বিষয় হয়ে ওঠে যে, রাজপথে বিক্ষোভকারী শাড়িপরা মহিলারা কী চায়? সিদ্ধান্ত মোতাবেক ওই দিন বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের প্রতি বিশ্ববিবেকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পাঁচ শতাধিক মহিলা তাদের ছেলেমেয়ে ও শিশুসহ হাতে ‘নট এ পেনি নট এ গান, ইয়াহিয়া-ভুট্টো-টিক্কা খান’; ‘ওয়ার্ল্ড পাওয়ার, অ্যাক্ট ফর হিউমানিটি’; ‘স্টপ জেনোসাইড, রিকগনাইজ বাংলাদেশ’; ‘লিবারেশন আর্মি, উই আর উইথ ইউ’; ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’; ‘স্বাধীন বাংলা স্বাধীন বাংলা, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি প্ল্যাকার্ড বহন করে টেমস নদীর উত্তর তীরবর্তী ভিক্টোরিয়া-অ্যামব্যাঙ্কমেন্ট এলাকা হতে মিছিল করে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিথের কাছে আবেদনপত্র পেশ করেন। তারা অবিলম্বে বাংলা থেকে পশ্চিমা হানাদার বাহিনী অপসারণের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সহায়তা কামনা করে, কমনওয়েলথভুক্ত বাংলাদেশের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে ব্রিটেনের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা উচিত বলে দাবি জানান। শোভাযাত্রাটি আমেরিকা, ভারত ও চীনসহ মোট দশটি দেশের দূতাবাসে স্মারকলিপি প্রদান শেষে হাইড পার্ক স্পিকার্স কর্নারে গিয়ে শেষ হয়। জনমত পত্রিকার মতে, লন্ডন শহরে বাঙালি নারীদের এতো বড় সমাবেশ আর কখনো দেখা যায় নি। 

‘বাংলাদেশ স্টুডেন্টস্ অ্যাকশন কমিটি’সহ অন্যান্য সংগ্রাম কমিটির সদস্যরাও সেই সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। সেদিনের বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেবুন্নিসা বখ্স, লুলু বিলকিস বানু, আনোয়ারা জাহান, মুন্নি রহমান, সোফিয়া রহমান, ফেরদৌস রহমান, সায়েকা চৌধুরী, কুলসুম উল্লাহ, সাহানা আহমেদ, খালেদা উদ্দিন, সাহানা ইসলাম, ফরিদা হাসান, ফিরোজা বেগম, তাহেরা হক, জেবুন্নিসা খায়ের, সুরাইয়া খালেক, উমা রকিব, নাহার ইসলাম, মুসফেকা ইসলাম, রাবেয়া ভুঁইয়া (পরবর্তীকালে ব্যারিস্টার ও মন্ত্রী), রিজিয়া চৌধুরী, শাহেদা ইসলাম, শেফালী সুলতানা, হাসিনা চৌধুরী, জ্যোৎস্না হাসান প্রমুখ।

৩ এপ্রিলের সেই বিক্ষোভ সমাবেশ সম্পর্কে আনোয়ারা জাহান বলেন, সেদিন আমরা শপথ নিয়েছিলাম দেশকে শত্রুমুক্ত করতে যা কিছু করা প্রয়োজন তা আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে করবো। বিক্ষোভ-মিছিল শেষে হাইড পার্ক স্পিকার্স কর্নারে সমবেত হয়ে মহিলা নেত্রীরা দেশের দুর্দিনে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে বক্তৃতা করেন।৩ এপ্রিলের পরে সমগ্র ব্রিটেনে সমিতির শাখা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তীকালে একে একে ব্রাডফোর্ড, প্রেস্টন, পোর্টসমাথ, সাউদাম্পটন ও স্কটল্যান্ডে সমিতির শাখা খোলা হয়। অতি অল্পদিনের মধ্যে সমিতির সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫০ জনে। ৪ এপ্রিল বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের দাবিতে মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে জরুরি তারবার্তা পাঠানো হয়। ৮ এপ্রিল ইউএনওর সেক্রেটারি জেনারেল উ থান্ট, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদগোর্নি, জার্মান প্রেসিডেন্ট হ্যার ব্রান্ট এবং হিউম্যান রাইটসের ম্যাকনামারার কাছে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের দাবিতে বিশেষ তারবার্তা পাঠানো হয়। ১৩ এপ্রিল নয়টি সাহায্যদানকারী দেশের এইড কনসোর্টিয়াম সদস্যের কাছে পাকিস্তানকে সাহায্য না দেয়ার দাবি জানিয়ে চিঠি দেয়া হয় এবং চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের দফতরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। ১৬ এপ্রিল বিশ্বের ৪৭টি দেশের দূতাবাসে এবং রেডক্রসের কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাহায্য পাঠানোর জন্য আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

১৮ এপ্রিল পোপ জন পল ও মিসেস নিক্সনের কাছে তারবার্তা এবং মিসেস জোমো কেনিয়াত্তা, মিসেস বারবারা কাসেল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী মিসেস মেরি উইলসন এবং এমপিদের স্ত্রীদের কাছে বাংলাদেশের পক্ষে সুপারিশ এবং সাহায্যের জন্য চিঠি পাঠানো হয়। ৯ এপ্রিল থেকে প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে হাজির হয়ে মহিলারা এমপিদের সঙ্গে লবিং করেন। তারা তাদের নিজ নিজ এলাকার এমপিদের কাছে চিরকুট পাঠিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার্লামেন্ট ভবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার পর তাদের সঙ্গে দেখা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কাহিনী তুলে ধরে বাংলার নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের প্রতি তাদের কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে পার্লামেন্টে আলোচনা, স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান। পার্লামেন্টে লবিং করতে অংশগ্রহণ করেন মিসেস জেবুন্নিসা খায়ের, আনোয়ারা জাহান, সোফিয়া রহমান, বেগম কুলসুম উল্লাহ, বেলা ইসলাম, বদরুন্নেসা পাশা (বার্মিংহাম) মিসেস শরফুল ইসলাম খান প্রমুখ।
[লেখাটি ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘বিলাতে বাংলার রাজনীতি’ গ্রন্থ থেকে সঙ্কলিত]

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close