নিউজ

করোনা: পাবলিক তদন্তের দাবী প্রত‍্যাখ‍্যান বরিসের

*বৃটেনে লকডাউনের এক বছর: নিরবতা পালন ও মোমবাতির আলোয় মৃতদের স্মরণ
*করোনা কেড়ে নিলো প্রায় দেড় লক্ষ প্রাণ
*দ্রুত এগুচ্ছে ভ্যাকসিন কার্যক্রম

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৮ মার্চ – কঠিন লকডাউনের ১ বছর পূর্ণ করলো বৃটেন। লকডাউনের এই বর্ষপূর্তিতে করোনাভাইরাসে মৃতদের স্মরণে নিরবতা পালন, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন এবং লণ্ডন আই, ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম ও কার্ডিফ ক্যাসলসহ দেশের বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পট ও বড় ও বিখ্যাত ল্যাণ্ডমার্কগুলোতে ইয়ালো আলোর প্রক্ষেপন করা হয়। একই সাথে মানুষজন মোমবাতির আলো হাতে দরজায় দাঁড়িয়েও তাদের স্বজনদের স্মরণ করেন। এছাড়া উপাসনালয়গুলোতে মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। সরকারী বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই এক বছরে করোনা প্রায় দেড় লক্ষ প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

গত ২৩ মার্চ প্রথম লকডাউন ঘোষণার একবছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ডাউনিং স্ট্রিটে এক প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেন। প্রেস কনফারেন্সে তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ একবছর দেশটি কষ্ট ও সহিষ্ণুতার ‘মহাকাব্যিক’ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। তবে ‘স্টেপ বাই স্টেপ, জেব বাই জেব’, জাতি আবার স্বাধীনতা ফিরে পাবার দাবীর পথে ছিল।
২০২০ সালের মার্চ মাসে কোভিড বিধিনিষেধ সংক্রান্ত লকডাউন প্রবর্তনের এক বছর পরে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে বরিস জনসন ‘সাহস, অনুশাসন এবং ধৈর্য‘র জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানান।

এক বছর আগে করোনার লাগাম ধরে রাখতে ২০২০ সালের ২৩ মার্চ দেশটিতে জাতীয় লকডাউন জারি করা হয়। ওই সময় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছিলো। লকডাউন জারির মাধ্যমে পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে, তা না হলে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো বলে মনে করেন বেশীরভাগ বিষেশজ্ঞরা।
তারপর ব্রিটিশ সরকারের কোভিড মোকাবেলায় ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। আর এজন্য কোভিড মোকাবেলা সংক্রান্ত পাবলিক তদন্ত প্রবল চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি দ্যা গার্ডিয়ানের এক জরীপে দেখা গেছে যে, ৪৭ শতাংশ ব্রিটিশ জনগণ পাবলিক তদন্তের তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। গত সপ্তাহান্তে আইসিএমের জরিপ অনুসারে, ৩৫ শতাংশ বলেছেন যে তারা এটিকে সমর্থন বা বিরোধিতা কিংবা এ সম্বন্ধে তারা জানেন না। আর তদন্তের বিরোধীতা করেছেন মাত্র ১৮ শতাংশ লোক।
তবে ডাউনিং স্ট্রিটের প্রেস কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী মহামারি মোকাবেলা করতে গিয়ে তাঁর নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণে ত্রুটির কথা স্বীকার করলেও পাবলিক তদন্তের বিষয়টি প্রত্যাখান করেছেন।

সরকারী সরকারী তথ্য অনুসারে, করোনা আক্রান্ত হয়ে এযাবত মারা ১ লক্ষ ২৬ হাজার ২৮৪ জন মারা যাবার তথ্য থাকলেও ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী মহামারীটি শুরু হওয়ার পর থেকে বৃটেনে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে এযাবত মোট ১,৪৯,১১৭ জন মারা যাবার রেকর্ড রয়েছে।
বছরের শুরুতে যখন মৃত্যু ১ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল তখন বরিস জনসন বলেছিলেন যে, আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে দেশ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সাথে সাথে আমরা একত্রিত হয়ে নিঃস্বার্থভাবে আমরা যাদের হারিয়েছি তাদের স্মরণ করবো এবং সম্মুখ সারির সেই সব বীরত্বকে সম্মান জানাবো যারা অন্যকে বাঁচাতে তাদের নিজের জীবন দিয়েছেন।

কোভিড-১৯ ব্রেইভড ফ্যামিলি ফর জাস্টিস গ্রুপ সরকারের মিনিস্টারদের তদন্ত শুরু করতে বাধ্য করার জন্য আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিচ্ছে।
এদিকে, ভ্যাকসিন প্রদানের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ইংল্যা-ের ৫০ বছরের বেশী বয়স্ক সকল নাগরিকের জন্য ভ্যাকসিন প্রস্তুত রয়েছে এবং তারা এখন এনএইচএস ওয়েবসাইট থেকে ভ্যাকসিনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এর আগে গত মাসে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করেছিল যে, মে মাসের পূর্বেই দেশের ৫০ বছরের বেশী বয়স্কদের সকলকে ভ্যাকসিন প্রদান করা হবে। ভ্যাকসিন প্রদানের অগ্রাধিকারের তালিকা অনুযায়ী তাতে প্রথমেই ছিলেন ৮০Ñ৯০ বছর বয়সী তারপর যোগ হয় ৭০ বছরের বেশী বয়স্করা। এনএইচএসের সকল কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, ৬৫ বছরের অধিক বয়স্ক, ১৬ বছরের অধিক বয়স্ক যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক, ৫৫ বছরের বেশি বয়স্ক এবং ৫০ বছরের বেশি বয়স্ক। অর্থাৎ, মে মাসের পূর্বেই অগ্রাধিকারভিত্তিতে ভ্যাকসিন পাবে ৯টি আলাদা গ্রুপ।

জয়েন্ট কমিটি অন ভ্যাকসিনেশন এ- ইমিউনিস্যাশন এরই মধ্যে জানিয়েছে, অগ্রাধিকারভিত্তিতে ভ্যাকসিন প্রদানের পরেও বয়সের ওপর ভিত্তি করেই দেশের বাকি নাগরিকদের ভ্যাকসিন সুবিধার আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ, প্রথমে ভ্যাকসিন পাবে ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়স্করা। কমিটির দাবি, এই পদ্ধতিতেই সবার আগে সফলতা পাওয়া যাবে।
আলাদা করে, শিক্ষক, পুলিশ বা সাংবাদিকদের ভ্যাকসিন দিতে গেলে তাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। উল্লেখ্য, এরইমধ্যে বৃটেনে ২৫ মিলিয়নেরও বেশী মানুষকে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ১ মিলিয়নেরও বেশী মানুষ পেয়েছে দ্বিতীয় ডোজও। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন জানিয়েছেন, আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই দেশের সকল প্রাপ্তবয়স্কদের ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা হবে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৩ মার্চ সরকারীভাবে লকডাউনের কারণে হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে যায়। অজানা ভয়,উৎকন্ঠায় ঘরবন্দী হয়ে পড়ে মানুষ। মধ্যখানে কয়েকবার শিথিল করা হলেও কঠিন বিধিনিষেধ জারি ছিলো সার্বক্ষণিক। তৃতীয় দফা লকডাউন ঘোষণার পর এখনও তা জারি রয়েছে এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দোকান-পাট ছাড়া মার্কেটসহ বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পাবলিক প্লেসে মুখে মাস্ক ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক রয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ হার্ডলাইনে রয়েছে। গত এক বছরে লকডাউনের কারণে বৃটেনের অর্থনীতিতে বড় ধরণের ধাক্কা লাগে। যা সামাল দিতে সরকার একের পর এক পরিকল্পনা ও বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগীতা করে যাচ্ছে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close