নিউজ

আবারও আল জাজিরার বোমা ফাটানো বিশেষ প্রতিবেদন: ইসরাইল থেকে বাংলাদেশের ফোন-হ্যাকিংয়ের সরঞ্জাম কেনার নথি প্রমাণ

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ১১ মার্চ – বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের একের পর এক অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রামাণিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আল জাজিরা। চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ‘অল দ্যা প্রাইম-মিনিস্টার‘র মেন’ প্রচারের অনেকগুলো ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই গণমাধ্যমটি। এবার ইসরাইলের কাছ থেকে ফোন-হ্যাকিংয়ের সরঞ্জাম কেনার নথি প্রমাণভিত্তিক বিশেষ অনুসদ্ধানী আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গত ৮ মার্চ আল জাজিরার ইরেজী অনলাইনে প্রকাশিত ওই বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গোপনে ইসরাইলের কাছ থেকে ফোন-হ্যাকিংয়ের সরঞ্জান কেনার বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, মোবাইল ফোন থেকে ডেইটা সংগ্রহে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে দেশের ‘কুখ্যাত’ আধাসামরিক বাহিনী, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে।

দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, কীভাবে বাংলাদেশ সরকার কীভাবে একটি ইসরাইলী কোম্পানির তৈরী ফোন-হ্যাকিংয়ের সরঞ্জামগুলি ক্রয় করতে কমপক্ষে ৩৩০,০০০ ডলার ব্যয় করেছিল— সেই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে আল জাজিরার তদন্তারী ইউনিট (আই-ইউনিট) এবং ইসরাইলী সংবাদপত্র হারেটজের প্রাপ্ত নথিপত্রে।
সেলিব্রেটি সিকিউরিটি ফার্ম দ্বারা নির্মিত ইউএফইডি হল এমন একটি পণ্য যা মোবাইল ফোন থেকে বিস্তৃত পরিসরে ডেইটা অ্যাক্সেস এবং এক্সট্র্যাক্ট করতে সক্ষম। এনক্রিপ্ট করে ফোন ডেইটা হ্যাক করার ক্ষমতা সিভিল রাইটস ক্যাম্পেইনারদের চিন্তিত করে তুলেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে এর ব্যবহারকে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি, একই সাথে বাণিজ্য নিষেধ করে এবং দেশের নাগরিকদের সেখানে ভ্রমণে বাধা দেয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনিদের সাথে সংহতির ভিত্তিতে সম্পর্ক রয়েছে। যে কারণে ফিলিস্তিনীরা নাগরিক অধিকার বঞ্চিত এবং ইসরাইলের সামরিক দখলের মধ্যে বাস করে।

গত ফেব্রুয়ারীতে আল জাজিরা প্রকাশ করেছিল যে কীভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০১৮ সালে ইসরাইলী ফার্ম পিক্সিক্স লিমিটেডের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ইন্টারসেপশন সরঞ্জাম পাবার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সেই ডক্যুমেন্টারিতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বাংলাদেশী কর্মকর্তারা হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে ইসরাইলী গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রশক্ষণ নিয়েছিলেন বলেও তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য ‘পি৬’ ইন্টারসেপ্ট নামক তৈরীকৃত মোবাইল ফোন মনিটরিং সিস্টেমটি জাতিসংঘের একটি মিশনে ব্যবহারের জন্য কেনা হয়েছিল বলে দাবী করলেও বিশ্ব সংস্থা এক বিবৃতির মাধ্যমে তা প্রত্যাখ্যান করে। চুক্তিতে পি৬ ইন্টারসেপ্টের প্রস্তুতকারককে পিক্সিক্স লিমিটেড হাঙ্গেরি হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হলেও এ জাতীয় সংস্থার কোনও পাবলিক রেকর্ড বিদ্যমান নেই এবং সমস্ত পিক্সিক্স সরঞ্জাম ইসরাইলে তৈরী করা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণ:
আই-ইউনিট দ্বারা প্রাপ্ত সর্বশেষ নথিগুলি আল জাজিরা বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও পেয়েছ। যা ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির সাথে সম্পর্কিত। তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পাবলিক সিকিউরিটি বিভাগের লোকজন, যা ডমেস্টিক সিকিউরিটির অধীনে এবং ওই সমস্ত এজেন্সিতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্ভূক্ত রয়েছেন।
কাগজপত্রের বিবরণে বলা হয়েছে যে কীভাবে দেশের ফৌজদারি তদন্ত বিভাগের নয় জন কর্মকর্তাকে মোবাইল ফোন থেকে ডেইটা আনলক করতে এবং আনার বিষয়ে ইউএফইডের প্রশিক্ষণ নিতে ফেব্রুয়ারী মাসে সিঙ্গাপুরে ভ্রমণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশী কর্মীরা কীভাবে চূড়ান্তভাবে সেলিব্রাইট সার্টিফাইড অপারেটর এবং সেলব্রাইট সার্টিফাইড শারীরিক বিশ্লেষক হিসাবে যোগ্যতা অর্জন করবে তার রূপরেখা এটি তুলে ধরেছে।
নথিগুলিতে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, চলমান প্রকল্পের অধীনে সেলিব্রেটের হ্যাকিং সিস্টেমের ব্যবহার সম্পর্কে আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাবকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যাদের নামে অবশ্য ইতোমধ্যে অপহরণ, নির্যাতন ও নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নথিভূক্ত রয়েছে এবং প্রকল্পটি ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালের জুনে শেষ হবে।

এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার বৈদ্যুতিক নজরদারি সিস্টেমগুলিতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করছে বলে মনে হয় এবং ফাঁস হওয়া নথিগুলি আইএমএসআই-ক্যাচারার, ওয়াইফাই ইন্টারসেপ্টর এবং ড্রোন থেকে শুরু করে সেলুলার ডিভাইসগুলির তথ্য পাবার জন্য টাওয়ারগুলি থেকে নজরদারি করে। সেটি এমন একটি ডিভাইস যা ব্যবহারকারীর অবস্থান এবং বিস্তৃত তথ্য প্রকাশ করে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সিকিউরিটি সংস্থ্যাগুলিকে এমনভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তিতে সুসজ্জিত করা হচ্ছে যে, প্রাইভেট ম্যাসেজ পেতে তারা এনক্রিপ্টড ফোনগুলিতে অ্যাক্সেস করতে সক্ষম। দেশের মানবাধিকারের রেকর্ড থেকে তাই বিষয়টিতে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৮ সালের ডিজিটাল সুরক্ষা আইন (ডিএসএ) নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ, যে আইনের মাধ্যমে অনলাইনে রাষ্ট্রের সমালোচনাকারী সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং আটকের জন্য বিস্তৃত ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে, ১৩টি দেশের রাষ্ট্রদূতরা লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর জন্য তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন, যিনি ডিএসএর অধীনে নয় মাস বিনা বিচারে আটক থাকার পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারী মারা গেছেন। মুশতাক করোন ভাইরাস মহামারী সংক্রান্ত সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে ফেইসবুকে সমালোচনা করেছিলেন।

বাংলাদেশে রফতানি বন্ধ হচ্ছে!
ইসরাইলী মানবাধিকার আইনজীবী আইতা ম্যাক মানবাধিকার বিনষ্টকারী ইসরাইলী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি রফতানির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে হংকং এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে ১৯৯৯-এ গণতন্ত্রপন্থী প্রতিবাদকারীরা কয়েক মাস ধরে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছিলো। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে কতটা অনুপ্রবেশজনক ইসরাইল থেকে বাংলাদেশ সেই প্রযুক্তি কিনেছিলো।
ম্যাক আল জাজিরাকে বলেছেন, আপনি কীভাবে ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে, তাদের সম্পর্কিত মেডিকেল রেকর্ডগুলি, বন্ধুদের নাম এবং সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তাদের সংবাদের কোনও উৎসের নাম সম্পর্কে সমস্ত তথ্য নিতে সক্ষম হবেন।
তিনি বলেন, হংকংয়ের ক্ষেত্রে, পুলিশ ৪,০০০ প্রতিবাদকারীদেও ফোন অ্যাক্সেস করতে সেলব্রাইট সিস্টেম ব্যবহার করেছিল।
জনগণের প্রতিবাদ এবং ম্যাকের আদালতের মামলার পরে সেলিব্রাইট হংকংয়ে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এখন তিনি বাংলাদেশের জন্যও একই কাজ করছেন। গত ৭ মার্চ, সোমবার, ম্যাক ইসরাইলী আদালতে একটি আবেদন করেন, তাদের কাছে সেলিব্রেট এবং পিক্সিক্সের রফতানির লাইসেন্স প্রত্যাহার করতে বলে।
ম্যাক আল জাজিরাকে বলেছেন, সেলিব্রেট বা পিক্সিক্সের মতো কোনও সংলস্থার সিঙ্গাপুরে শাখা পরিচালিত হলেও এটি এখনও ইসরাইলে আইনের অধীনে রয়েছে। যতক্ষণ এই সংস্থা ইসরাইলী নাগরিকদের মালিকানাধীন, তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছ থেকে রফতানির লাইসেন্স দরকার। ম্যাক যুক্তি দেন যে ইসরাইল এই সরঞ্জামগুলির রফতানি বাংলাদেশ, দক্ষিণ সুদান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দুর্বল মানবাধিকার রেকর্ডযুক্ত দেশগুলির সাথে সম্পর্ক তৈরী করতে ব্যবহার করে। তাঁর মতে, এই সরঞ্জামগুলি রফতানি করা সহজ, তিনি উদাহরণস্বরূপ বলেন, যেমন — বাংলাদেশে ইসরাইলী রাইফেল বিক্রি করা। এই ধরণের সিস্টেমস কম দৃশ্যমান এবং ইসরাইল এইভাবে এসব দেশগুলির সাথে গোপন সম্পর্ক তৈরী করতে সক্ষম হয় বলে ম্যাক উল্লেখ করেন।
তিনি আরো বলেন, তবে এটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে এটি ইসরাইলী জনগণ এবং বাংলাদেশী বা আমিরাতের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক নয়। এটি ইসরাইলী সরকার এবং ওই দেশগুলোর স্থানী সরকারের মধ্যে একটি সম্পর্ক। তিনি বলেন, এই জাতীয় সম্পর্কের অর্থ হল ইসরাইল বিশ্বজুড়ে অনেক জায়গায় আভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নে সহায়তা করছে।
আই-ইউনিট পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সেলিব্রাইটের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো পক্ষই প্রকাশের জন্য মন্তব্য জানায়নি।

নিউজ

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close