ফিচার

মাফিয়া রাষ্ট্রের নিদর্শন: চিন্তার সাহস ও সমষ্টিগত অবক্ষয়!

৤ ডক্টর এম মুজিবুর রহমান ৤

লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক। সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট

বাংলাদেশে অনেকগুলো সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও, অনলাইন নিউজ পোর্টাল আছে । টেলিভিশনে প্রতি রাতে ও দিনে হর হামেশা টক শো’র নামে বাকস্বাধীনতার চর্চাও হচ্ছে। সরকার সব সময় বলছে, এখানে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। সরকারের পাশাপাশি এসব সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ও কর্তাব্যক্তিরা বলে থাকেন, সংবাদ প্রকাশে সরকারের দিক থেকে তাঁদের কখনো কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হয় না। তবে অতি সম্প্রতি একটি টক শোতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্ঠা ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির মালিক সাসালমান এফ রহমান ডয়েচ ভেলে’র সাংবাদিক ও উপস্থাপক খালিদ মহিউদ্দিনকে প্রকাশ্যে শো’তে ‘ইডিয়ট’ বলার ‘অধিকার’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন। এই অধিকারের কথা শুনে খালিদ মহিউদ্দিন হাসলেও অধিকার প্রতিষ্ঠার কারণটি জানান নাই। সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন টিভিতে এখনো কাজ না করে যদি ‘ইডিয়ট’ শুনার খবরদারি রয়ে যায় তাহলে কাজ করার সময় তাদের কি অবস্থা হয় তা সহজেই অনুমেয়।

এর পরেও এসব প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন সরকার ও সরকার সমর্থক মালিকদের সাথে সুর মিলিয়ে তাঁরাও বলেন, দেশে ‘ফ্রিডম অব স্পিচ’ আছে। কিন্তু খবর প্রকাশ অথবা সম্প্রচারের ভাবভঙ্গি দেখে যে কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সংবাদের আউটলেটগুলো উগান্ডার কুখ্যাত নেতা ইদি আমিনের সেই কুখ্যাত কথাটিকেই সরকারের কথা হিসেবে ধরে নিয়েছে। ইদি আমিনের কথাটি ছিল, ‘দেয়ার ইজ ফ্রিডম অব স্পিচ বাট আই ক্যান নট গ্যারান্টি ফ্রিডম আফটার স্পিচ (কথা বলার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু কথা বলার পর স্বাধীনতা থাকবে কি না সেই নিশ্চয়তা দিতে পারছি না)।’ ইদি আমিনের কথাকে মিডিয়া আউটলেটগুলো সরকারের কথা বলে ধরে নিয়েছে বলে জনগণ মনে করছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সিনিয়র সাংবাদিক নাইমুল ইসলাম খান নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিলকে বললেন, অরে ভাই এতই যদি সাহস থাকে বাংলাদেশে আসেন, এসে বসে কথা বলেন তাহলে আই উইল সি। ‘ সঞ্চালক খালেদ মহিউদ্দিন মাফিয়া রাষ্ট্রের নিদর্শন সম্পর্কে তাসনিম খলিলের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরটি বোধহয় সাক্ষাৎ পেয়ে গেলেন!

আল জাজিরার প্রতিবেদনে নতুন কিছু বলা হয় নাই বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। দেশে চুরি, ডাকাতি, জালিয়াতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি সবকিছু প্রতিনিয়ত ঘটছে । তাই এখানে নতুন আর কি তথ্য দেয়া হলো? বাহ্ কি বাহারি যুক্তি ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আবুল ফজলের সুবিধাবাদী চিন্তার পরিবর্তন দেখে মহাত্মা আহমদ ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বলে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ লিখেছিলেন । বর্তমানে অসংখ্য রাজনৈতিক দল আছে কিন্তু নির্বাচন ভোট নেই, গণতন্ত্র নেই। কোটি কোটি মানুষ নিজেদের ভোটটা পর্যন্ত দিতে পারে না। কিন্তু এ নিয়ে তেমন কোনো বিকারও নেই। আবার অসংখ্য গণমাধ্যম আছে কিন্তু চিন্তার সাহসী মানুষ নেই। অর্থ্যাৎ সবকিছুর উপস্থিতি আছে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কিছুই নেই। এটাও বর্তমান সরকারের বিরাট এক জাতিগত উন্নয়ন নয় কি? আহমদ ছফা বেঁচে থাকলে এ ধরণের সমষ্টিগত অবক্ষয় এবং আমাদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিতে পারতেন । তবে কোনো দেশে তেল আর ঘি একদামে পাওয়া গেলে সেখানে যে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না তার লক্ষণ দেখা যায়। তাই আল জাজিরার অনুসন্ধান নিয়ে দেশের সকল গণমাধ্যমের নীরবতা ও সুবিধাভোগী সুশীলদের ব্যাখ্যা জাতিগত চরম অবক্ষয় নয় বলে এখনো বিশ্বাস করতে চাই।

মহাত্মা আহমদ ছফা সেই ১৯৭২ সালে লিখেছিলেন, আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন রক্ত দিয়ে চিন্তা করতে হয়। আজ তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয় লিখতেন, আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন আরো রক্ত দিয়ে চিন্তা করতে হবে। তবে যাদের চিন্তার সাহস নেই তারা চিন্তার স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য কিনা তাও এক বিরাট প্রশ্ন?

লণ্ডন, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close